Golden Bangladesh
Eminent People - সূর্যসেন

Pictureসূর্যসেন
Nameসূর্যসেন
DistrictChittagong
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন
Life Style
অপরাধ, দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য ব্রিটিশ শাসন-শোষণ, অন্যায়-অত্যচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন। এজন্য তাঁকে মরতে হবে। মাষ্টারদা সূর্যসেন পায়েচারী করছেন আর ভাবছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য আরো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে এবং এজন্য অনেককেই জীবন উৎসর্গ করতে হবে। তাই তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা লিখে যান। অন্যদিকে সূর্যসেনের সহযোদ্ধারা ও ভারত উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে সূর্যসেনের কথা ভাবছেন। অনেক সহযোদ্ধার মনে নেতার সাথে তাঁদের লড়াই-সংগ্রামের অসংখ্য স্মৃতির কথা ভেসে উঠছে। রাত ১২ টা ১ মিনিটে তাঁরা তাঁদের প্রিয়নেতাকে রেড স্যালুটের মাধ্যমে বিদায় জানিয়ে স্বাধীনতার জন্য অগ্নি শপথ নিবেন। অনেকেই নেতার লাশ ছুয়ে স্বাধীনতার জন্য শপথ নিবেন বলে জেলগেটে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেনের লাশ দেয়নি। কারণ তারা ভেবেছিল, সূর্যসেনের মৃতদেহ লড়াই-সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, তাই মৃতদেহটিকে গুম করে ফেলেছিল তারা। পরে জানা যায়, মৃতদেহটি লোহার খাঁচায় ভরে সমূদ্রে ফেলে দেয়া হয়েছিল। চট্টগ্রাম জেলে ফাঁসির ৫ ঘণ্টা পূর্বে লেখা মাস্টারদা সূর্যসেনের শেষ বাণী : "আমার শেষ বাণী- আদর্শ ও একতা। ফাঁসির রজ্জু আমার মাথার উপর ঝুলছে। মৃত্যু আমার দরজায় করাঘাত করছে। মন আমার অসীমের পানে ছুটে চলছে। এই ত সাধনার সময়। বন্ধুরূপে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এই ত সময়। ফেলে আসা দিনগুলোকে স্মরণ করার এই ত সময়। কত মধুর তোমাদের সকলের স্মৃতি। তোমরা আমার ভাই-বোনেরা তোমাদের মধুর স্মৃতি বৈচিত্রহীন আমার এই জীবনের একঘেঁয়েমিকে ভেঙে দেয়। উৎসাহ দেয় আমাকে। এই সুন্দর পরম মুহূর্তে আমি তোমাদের জন্য দিয়ে গেলাম স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন। আমার জীবনের এক শুভ মুহূর্তে এই স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। জীবনভর উৎসাহভরে ও অক্লান্তভাবে পাগলের মতো সেই স্বপ্নের পেছনে আমি ছুটেছি। জানি না কোথায় আজ আমাকে থেমে যেতে হচ্ছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগে মৃত্যুর হিমশীতল হাত আমার মতো তোমাদের স্পর্শ করলে তোমরাও তোমাদের অনুগামীদের হাতে এই ভার তুলে দেবে, আজ যেমন আমি তোমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা- এগিয়ে চল, এগিয়ে চল- কখনো পিছিয়ে যেও না। পরাধীনতার অন্ধকার দূরে সরে যাচ্ছে। ঐ দেখা যাচ্ছে স্বাধীনতার নবারুণ। কখনো হতাশ হয়ো না। সাফল্য আমাদের হবেই। ভগবান তোমাদের আশীর্বাদ করুন। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম ইস্টার বিদ্রোহের কথা কোনও দিনই ভুলে যেও না। জালালাবাদ, জুলখা, চন্দননগর ও ধলঘাটের সংগ্রামের কথা সব সময় মনে রেখো। ভারতের স্বাধীনতার বেদীমূলে যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম রক্তাক্ষরে অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো। আমাদের সংগঠনে বিভেদ না আসে- এই আমার একান্ত আবেদন। যারা কারাগারের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে, তাদের সকলকে জানাই আমার আশীর্বাদ। বিদায় নিলাম তোমাদের কাছ থেকে। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক বন্দেমাতরম" চট্টগ্রামের বিপ্লবী ইতিহাসের মহানায়ক সূর্যসেন জন্মেছিলেন ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ। চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পূর্ণনাম সূর্যকুমার সেন। তাঁর বাবার নাম রাজমণি সেন। মা শশীবালা সেন। তিনি ছিলেন বাবা-মার চতুর্থ সন্তান। পাঁচ বছর বয়সে সূর্যসেনের বাবা মারা যায়। এরপর থেকে সূর্যসেন তাঁর বড় কাকা গৌরমণি সেনের কাছে লালিত-পালিত হয়েছেন। পরবর্তীতে জ্যাঠাতুতো দাদা চন্দ্রনাথ সেন তাঁর অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন। সূর্যসেনের বর্ণমালার হাতেখড়ি বাবার কাছে। তারপর তাঁর বাবা তাঁকে নোয়াপাড়া দয়াময়ী প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করে দেন। প্রাইমারী স্কুলের পাঠ শেষ করে সূর্যসেন নোয়াপাড়া মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। এখানে তিনি ৪ বছর পড়েন। পড়াশুনার জন্য ভাল হওয়া সত্বেও মাইনর স্কুলের সরকারী অনুমোদন না থাকায় তাঁর চাচা গৌরমণি সেন তাঁকে চট্টগ্রাম নন্দনকাননের ন্যাশনাল স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। পড়াশুনার পাশাপশি ন্যাশনাল স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক হরিশ দত্তের কথাগুলো সূর্যসেনের সবসময় মনে পড়ে, "সত্যিকারের একটা মানব সন্তান চাই, মন দিয়ে লেখাপড়া শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হওয়া চাই"। এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার বেশ কিছুদিন পর সূর্যসেন ছাত্র পড়ানো শুরু করেন। এতদিন জ্যাঠার সাথে ছিলেন। এখন টিউশনি করে যে টাকা পান তা দিয়ে নিজে চলেন এবং মাকেও কিছু পাঠান। পড়াশুনা আর মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চিন্তায় মগ্ন থাকেন তিনি। ওই সময় বঙ্গভঙ্গ রোধকল্পে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তার ঢেউ বাংলার প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এই বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের মূল বিষয় সূর্যসেন না বুঝলেও মাষ্টার মশাইয়ের কাছে শুনে মোটাদাগে এর অনেক কিছু বুঝেছিলেন। এ আন্দোলন তাঁর মাঝে রেখাপাত করে। ১৯১০ সালে সূর্যসেনের মা মারা যান। মা মারা যাওয়ার পর কিছুদিন ভীষণ মন খারাপ ছিল তাঁর। মনের কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তিনি গুপ্ত সমিতিতে নাম লেখান। দেশমাতাকে মা করে নেওয়ার দীক্ষা নেন। দেশমাতাকে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্ত করার কাজে যুক্ত হন তিনি। ১৯১২ সালে ওই স্কুল থেকে অংকে লেটারসহ প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ.-তে ভর্তি হন। এই কলেজে পড়ার সময় কলেজের অধ্যাপক শতীশ চক্রবর্তীর সংস্পর্শে তিনি বৈপ্লবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে 'অনুশীলন সমিতি'তে যুক্ত হন। 'অনুশীলন সমিতি' ছিল ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠন। শিক্ষক শতীশ চক্রবর্তী ক্লাস থেকে বেছে বেছে ছাত্রদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন। তাদেরকে ধীরে ধীরে বিপ্লবী দলে যুক্ত করতেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করার পর সূর্যসেন পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে বি.এ. ভর্তি হন। এই কলেজে পড়ার সময় তিনি বিপ্লবী 'যুগান্তর' দলে যোগ দেন। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯১৮ সালে তিনি বি.এ. পাস করেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং গণিতের শিক্ষক হিসেবে সেখানকার ওরিয়েন্টাল স্কুলে যোগ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের (গুপ্ত সমিতি) দু'একজন ছাড়া প্রায় সকলকেই ব্রিটিশ সরকার গ্রেফতার করে। ফলে সূর্যসেনের কাঁধে বিপ্লবী দল ও আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব এসে পড়ে। সূর্যসেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী শহরের দেওয়ানবাজার দেওয়ানজী পুকুর পাড়ে শান্তি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সেখানেই থাকেন এবং বিপ্লবী দল গোছানোর চেষ্টা করেন। বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে বিপ্লবীদের সাংগঠনিক শক্তি মতাদর্শিক পার্থক্যের কারণে চারুবিকাশ দত্ত তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে 'অনুশীলন সমিতি'তে যোগ দেন। এর কিছুদিন পর সূর্যসেন 'যুগান্তর' দলের সভাপতি হন। ১৯১৯ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সূর্যসেনের দাদা-বৌদি তাঁর বিয়ের আয়োজন করেন। বিয়ে না করার কথা দাদা-বৌদিকে জানিয়ে দেন সূর্যসেন। কিন্তু কোনো আবেদনই তাঁরা শুনলেন না। অবশেষে তিনি বিয়েতে রাজী হলেন। পাত্রী চট্টগ্রামের কানুনগো পাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দেবী। বিয়ের আসরে বসেই সূর্যসেন খবর পান, তাঁর সহযোগিরা নতুন করে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, সূর্যসেনকেই এ সংগঠনের দায়িত্ব নিতে হবে। তাই বিয়ের রাত্রেই পুষ্পকুন্তলা দেবীর কাছে নিজের জীবনের লক্ষ্য এবং ব্রহ্মচর্য পালনের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে ক্ষমা চাইলেন এবং সেই রাতেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। এরপর আত্মনিয়োগ করলেন বিপ্লবী আন্দোলনে। ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলনে সূর্যসেন এবং তাঁর দল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯২০-২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় একটি জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। তখন সূর্যসেন এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এটি উমাতারা স্কুল নামে পরিচিত হয়। এই সময় তিনি 'মাস্টারদা' নামে পরিচিত হতে থাকেন। তিনি ছাত্রদেরকে স্নেহ-ভালোবাসা দিয় জয় করতেন। আর তাই ছাত্ররাও তাঁকে অত্যন্ত ভক্তি-শ্রদ্ধা করত। এক সময় এই স্কুলই তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ছাত্রদের সামনে তিনি তুলে ধরতেন স্বাধীনতার আহ্বান। ১৯২২ সালের শুরুতেই গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেয়ায় চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা হতাশা আর স্থবিরতার আঘাত সামলে গণআন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার উদ্যোগ নিলেন। তাঁরা অর্থ, অস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের সব রকম প্রস্তুতি নিতে থাকেন। নগেন সেন বা জুলু সেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টে হাবিলদার পদে উন্নীত হয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে শুরু হল বিপ্লবীদের সামরিক প্রশিক্ষণ। এ সময় বিপ্লবীরা অর্থসংগ্রহের জন্য ডাকাতির আশ্রয়ও নিয়েছিলেন। প্রথম ডাকাতি সংগঠিত হয়েছিল আনোয়ারা থানার জমিদার সরসী বাবুর বাড়িতে। এ ডাকাতি থেকে নগদ ১৫/২০ হাজার টাকা ও সোনা-গহনা সংগ্রহ করা হয়। ১৯২৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দিনের বেলায় প্রকাশ্য রাস্তায় সূর্যসেনের নেতৃত্বে রেলওয়ে কর্মচারিদের বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকা ছিনতাই করা হয়। পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দেয়। পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ 'নাগরথানা পাহাড়খণ্ড যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের পর সূর্যসেন ও অম্বিকা চক্রবর্তী ধরা পড়েন। কিন্তু মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করতে না পারায় তাঁরা ছাড়া পান। জেল থেকে বেরিয়ে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না সূর্যসেন। আবার শুরু হল সশস্ত্র অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি। ১৯২৪ সাল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে সারা ভারত উপমহাদেশে। সর্বত্র সংগঠিত হচ্ছে সশস্ত্র বিপ্লববাদী সংগঠন। চট্টগ্রামে রেলওয়ে ডাকাতি, বঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক ডাকাতি ও বিপ্লববাদীদের সশস্ত্র কার্যকলাপের কারণে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে ব্রিটিশ সরকার "১ নং বেঙ্গল অর্ডিনেন্স" নামে এক জরুরি আইন পাশ করে। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল - রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সন্দেহভাজনদের বিনা বিচারে আটক রাখা। ১৯২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের নোয়াপাড়ায় একটি অস্ত্রলুটের ঘটনায় মাস্টারদা জড়িত ছিলেন। এই অপরাধে চট্টগ্রাম থেকে সূর্যসেন, অম্বিকা চক্রবর্তীসহ অনেককেই এই আইনে আটক করা হয়েছিল। তাঁরা কিছুদিন পরে মুক্তি পান। এই বেঙ্গল অর্ডিনেন্স ঘোষণা করে ব্রিটিশ সরকার সারা বাংলায় বিপ্লবীদেরকে ব্যাপকভাবে গ্রেফতার শুরু করে। শুধু ১৯২৪ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ২০০ বিপ্লবী নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, অনিলবরণ রায় প্রমুখ নেতারাও। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে কলকাতায় আশ্রয় নেন। ওই সময় তাঁরা কলকাতার দক্ষিণেশ্বরে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতেন এবং থাকতেন শোভাবাজারে। ১৯২৫ সালের ১০ নভেম্বর শোভাবাজারে বিপ্লবীদের আস্তানায় পুলিশ হানা দেয়। তখন সূর্যসেন কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে যান। এরপর কিছু দিন আত্মগোপনে থেকে বিপ্লবী সংগঠনের কাজ সেরে কলকাতায় চলে যান। ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর কলকাতার এক মেস থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় 'মুরারিপুকুর ষড়যন্ত্র মামলা' ও টেগার্ট হত্যা প্রচেষ্টা মামলা। মাস্টারদা যখন জেলে তখন প্রকাশিত হয় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাড়া জাগানো উপন্যাস 'পথের দাবী'। ব্রিটিশ সরকার এ বইটি বাজেয়াপ্ত করলেও বিপ্লবীরা গোপনে নানা উপায়ে তা সংগ্রহ করতেন এবং গভীর মনোযোগের সাথে পড়তেন। 'পথের দাবী' উপন্যাসটি সূর্যসেন ও তাঁর সাথীদের মনে ব্যাপক নাড়া দেয়। ১৯২৮ সালের শেষের দিকে তিনি মুক্তি পান। স্ত্রী পুষ্পকুন্তলার অসুস্থতার খবর পেয়ে সূর্যসেন তাঁকে দেখতে যান। যেদিন তিনি বাড়ি পৌঁছলেন, পুষ্পকুন্তলা সেদিনই মৃত্যুবরণ করেন। অবসান ঘটল তাঁদের ৯ বছরের বিবাহিত জীবনের। স্ত্রীর মৃত্যুশোক কাটতে না কাটতেই সূর্যসেন আক্রান্ত হলেন টাইফয়েডে। তিন মাস শয্যাশায়ী থাকলেন। এরই মধ্যে একদিন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট এসে হাজির। প্রস্তাব দিলেন রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর । শুধু তাই নয়, বন্ড সই দিলে সংসারের খরচও ব্রিটিশ সরকার চালাবে বলে জানানো হল। সূর্যসেন চুপ করে রইলেন। এরপর একদিন অকস্মাৎ উধাও হয়ে গেলেন তিনি। চলে গেলেন আত্মগোপনে। কিন্তু বিপ্লবীরা তাদের কাজকর্ম প্রকাশ্যে পরিচালনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। চট্টগ্রাম শহরে অনন্ত সিংহ ও লোকনাথ বলের পরিচালনায় একটি ব্যায়ামাগার স্থাপন করা হল। নাম দেয়া হল 'সদরঘাট ক্লাব'। ওই ক্লাবই পরিণত হল বিপ্লবীদের মিলনক্ষেত্রে। এবার তাঁরা ডাকাতির আশ্রয় না নিয়ে নিজেদের বাড়ি থেকে চুরি করে ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে অর্থ সংগ্রহ করা শুরু করলেন। ইতিমধ্যে মাস্টারদা সূর্যসেন প্রকাশ্যে চলে এলেন। ১৯২৯ সালের প্রথম দিকে তিনি চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই বছরের মে মাসে সূর্যসেন দলের উদ্যোগে চট্টগ্রামে চারটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩০ সালের শুরু থেকেই তাঁর উদ্যোগে ভবিষ্যৎ সশস্ত্র আন্দোলনের ব্যাপক পরিকল্পনা শুরু হয়। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল সশস্ত্র অভ্যুত্থান করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন তাঁরা। অস্ত্রাগার দখলের প্রধান কারণ অস্ত্র সংগ্রহ। ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনাকে রমেশচন্দ্র মজুমদার 'ভারতের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে সাহসিকতাপূর্ণ কাজ' হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যা ছিল দেড়শত বছরের ইতিহাসের মধ্যে ইংরেজদের জন্য খুবই অপমানজনক ঘটনা। এটি ছিল এদেশের মানুষের কাছে ইংরেজ বাহিনীর প্রথম পরাজয়। ১৮ থেকে ২১ এপ্রিল এই চারদিন চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসন কার্যত অচল ছিল। পরাধীন জাতির ইতিহাসে বিপ্লবীদের এ বিজয় ছিল গৌরবগাঁথা। ২২ এপ্রিল ভোর ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে চট্টগ্রাম নাজিরহাট শাখা রেললাইনের ঝরঝরিয়া বটতলা স্টেশনে একটি সশস্ত্র ট্রেন এসে থামে। বিপ্লবীদের তখন বুঝতে বাকি রইল না যে তাঁদের সম্মুখযুদ্ধের ক্ষণ আসন্ন। ওইদিন ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেন, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহ ও লোকনাথ বলকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ হাজার টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করে। ২২ এপ্রিল সকালে বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তখন কয়েকজন কাঠুরিয়া ওই পাহাড়ে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে যায়। খাকি পোশাকে রাইফেলধারী কিছু যুবককে সেখানে দেখে তারা দ্রুত লোকালয়ে ফিরে গিয়ে লোকজনের কাছে বলে দেয়, স্বদেশীরা ওই পাহাড়ে আছে। এই খবর পুলিশের কাছে পৌছার পর সেনাবাহিনীর সশস্ত্র রেল গাড়ি জালালাবাদ পাহাড়ের কাছে এসে থামে। জালালাবাদ পাহাড়ে তখন বিপ্লবীরা কেউ রাইফেল পরিষ্কার করছে কেউ বা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। গাছের ডালে পাহারারত বিপ্লবীরা দেখতে পায় সামরিক ট্রেনটি কোন স্টেশন না থাকা সত্ত্বেও অদূরে রেললাইনের উপর থেমে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে বিপ্লবীদের ছোঁড়া হঠাৎ গুলির আঘাতে সৈন্যদল বিভ্রান্ত হয়ে পিছিয়ে যেতে থাকে। সৈন্যরা এরপর জালালাবাদ পাহাড়ের পূর্ব দিকে ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর লুইসগান বসিয়ে বিপ্লবীদের দিকে গুলিবর্ষণ করে। দেশপ্রেম আর আত্মদানের গভীর আগ্রহে তরুণ বিপ্লবীরা পাহাড়ের বুকের উপর শুয়ে সৈন্যদের লুইসগানের গুলিবর্ষণের জবাব দিচ্ছিলেন। তিন প্রধান নেতা সূর্যসেন, নির্মল সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী সঙ্গে থেকে ঘন ঘন তাঁদের উৎসাহিত করছেন, গুলি এগিয়ে দিচ্ছেন। জীবিত বিপ্লবীরা শহীদদের মৃতদেহ পাশাপাশি শুইয়ে রেখে সামরিক কায়দায় শেষ অভিবাদন জানায়। পাহাড়ে সুর্যসেনের নেতৃত্বে কয়েকশ পুলিশ আর সেনা বাহিনীর সাথে বিপ্লবীদের সম্মুখযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৮০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ১৯৩০ সালের ১ ও ২ সেপ্টেম্বর কলকাতার নিকটবর্তী চন্দন নগরের ফরাসি কলোনিতে অবস্থিত বিপ্লবীদের ঘাঁটিতে পুলিশ হানা দেয়। পুলিশী হামলায় শহীদ হন জীবন লাল ঘোষ। আর গ্রেফতার হন গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল ও আনন্দ গুপ্ত। সূর্যসেনকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার প্রচুর টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এ সময় তাঁকে বেশ কিছু দিনের জন্য আত্মগোপনে থাকতে হয়। ১৯৩১ সাল জুড়ে আত্মগোপনে থাকেন তিনি। ১৯৩২ সালের ১৩ জুন। পটিয়ার ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে বিপ্লবীরা মিলিত হলেন এক গোপন বৈঠকে। হঠাৎ ক্যাপ্টেন ক্যামেরনের নেতৃত্বে একদল ইংরেজ সিপাহী সেখানে হানা দিল। তারা বাড়িটি ঘিরে ফেলল। ব্রিটিশ সৈন্যদের ঠেকিয়ে রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদ হন নির্মল সেন ও অপূর্ব সেন (ভোলা)। ক্যাপ্টেন ক্যামেরনও নিহত হলেন বিপ্লবীদের হাতে। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম থেকে ১০ মাইল দূরে পটিয়া থানার গৈরিলা গ্রামের ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে সূর্যসেন আত্মগোপন করে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ব্রজেন সেন, কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত। নগেন সেন নামের এক বিশ্বাসঘাতক এ খবর পৌঁছে দিল ব্রিটিশ পুলিশের কাছে। পুলিশ-বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেলে। শুরু হয় লড়াই। অবশেষে পুলিশ গ্রেফতার করে মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনকে। কল্পনা দত্ত ও মনি দত্ত পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। গ্রেফতারের পর মাস্টারদা ও ব্রজেন সেনের ওপর চালানো হয় বর্বর অত্যাচার। হাত-পা শিকলে বেঁধে মাস্টারদাকে তারা নিয়ে যায় চট্টগ্রামে। ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদেরকে জেলে পাঠানো হয়। ব্রিটিশ শাসক মাস্টারদার ফাঁসির হুকুম জারি করে। ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি। বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন হাসি মুখে ফাঁসির রজ্জুতে জীবন বিসর্জন দেন। সোমেন চন্দ তারুণ্যের গান, সৃষ্টির উন্মাদনা ও বিদ্রোহের অগ্নি জেলে সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন সোমেন চন্দ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সোমেন চন্দ সম্পর্কে লিখেছিলেন, "নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি"। সোমেন চন্দ অন্যায়, অত্যাচার, অসঙ্গতি ও অসহায়ত্বের কাছে কখনো মাথা নত করেননি। সকল অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছিলেন আপোষহীন। রাজপথে শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও শ্রেণী বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আর লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে আনার অবিচল প্রত্যয়ে তিনি ছিলেন ইস্পাতদৃঢ়। সোমেন চন্দের সাহিত্য ছিল কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে ঘিরে। শোষণ-বৈষম্য থেকে মানুষকে মুক্ত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন। এস্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে নিয়েজিত করেন সেই শৈশব থেকে। ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। সোমেন চন্দ এমন একটি মানুষ, যার সৃষ্টি হতাশাগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে জাগ্রত করে নতুন উদ্যমে পথ চলতে সহয়তা করে। কমিউনিজম ছিল তাঁর প্রেরণা। কমিউনিজমের দর্শনের আলোয় চেতনাকে তিনি প্রতিনিয়ত শান দিতেন। কমিউনিজমই ছিল তাঁর মূল জীবনদর্শন। কলম ছিল তাঁর সংগ্রামের পাথেয়। আর খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ ছিল তাঁর বেঁচে থাকার প্রেরণা ও সৃষ্টির মোলিক কাঁচামাল। খাঁটি কমিউনিস্ট বলতে যা বুঝায়, সোমেন চন্দ ছিলেন তাই। সোমেন চন্দ জন্মগ্রহণ করেন ১৯২০ সালের ২৪ মে, মাতুলালয়ে। ঢাকার নিকটবর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পাড়ে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে। তবে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত সোমেন চন্দ (জীবনী গ্রন্থমালা) বইয়ে হায়াৎ মামুদ লিখেছেন, 'সোমেন চন্দের জন্ম কেরানীগঞ্জ থানার অধীনস্থ পারজুয়া এলাকায় অবস্থিত ধিতপুর গ্রামে'। তাঁর বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দ। আর মায়ের নাম হিরণবালা। সোমেন চন্দের পিতামহের নাম রামকুমার। নরেন্দ্রকুমার চন্দের আদিনিবাস ছিল ঢাকার নরসিংদি জেলার বালিয়া গ্রামে। নরেন্দ্রকুমার চন্দ ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল ও হাসপাতালের স্টোরস বিভাগে চাকুরি করতেন। মা হিরণবালা। তিনি ছিলেন কেরানীগঞ্জের মেয়ে। মাত্র ৪ বছর বয়সে সোমেন চন্দ তাঁর মাকে হারান। হিরণবালার মৃত্যুর পর নরেন্দ্রকুমার সোমেন চন্দকে লালন-পালনের জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে ঢাকার অদূরে টঙ্গীর তিন মাইল পশ্চিমে 'ধউর' গ্রামের ডা. শরৎচন্দ্র বসুর কন্যা সরযূদেবীকে বিয়ে করেন। সোমেন চন্দ সৎ মা সরযূদেবীকে মা বলে জানতেন। আর সরযূদেবীও সোমেন চন্দকে নিজের সন্তানের মতো আদর-স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে বড় করেছেন। বাবার চাকুরির কারণে ঢাকায় তিনি বেড়ে উঠেছেন। এখানেই তাঁর শৈশব-কৈশোর ও মানস চেতনা গড়ে উঠে। সোমেন চন্দ শহরের বাইরে অর্থাৎ গ্রামে একনাগাড়ে কখনো বসবাস করেননি। তবে মাঝে মাঝে তিনি মামা বাড়ি 'ধউর' গ্রামে বেড়াতে যেতেন। তাঁর শৈশব- কৈশোরের বেশকিছু সময় কাটে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে। সোমেন চন্দের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। বিশেষ করে বাবার কাছে। তারপর অশ্বিনী কুমার দত্তের কাছে পড়াশুনা করেন। প্রাথমিক পড়াশুনা শেষে ১৯৩০ সালে তাঁকে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয় পুরান ঢাকার পোগোজ হাই স্কুলে। এই স্কুল থেকে ১৯৩৬ সালে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ডাক্তারী পড়ার জন্য ভর্তি হন ঢাকা মিডফোর্ড মেডিকেল স্কুলে। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পড়াশুনা আর চালিয়ে যেতে পারেননি তিনি। ১৯৩৫ সালের নভেম্বরে লন্ডনে ভারতীয় ও বৃটিশ লেখকদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ই এম ফরস্টার, হ্যারল্ড লাস্কি, হার্বাট রিড, রজনী পাম দত্ত, সাজ্জাদ জহির, মূলক রাজ আনন্দ, ভবানী ভট্টাচার্য প্রমুখ। নানা আলোচনার পর তাঁরা একটি ইশতেহার প্রকাশ করেন ডিসেম্বরে। এরই সূত্র ধরে ভারতে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ গঠিত হয়। চার বছর পর ঢাকায় স্থাপিত হয় এর শাখা। লন্ডন বৈঠকে সাহিত্যিকরা এ সংগঠনের নাম 'প্রগতি সাহিত্য সংঘ' রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যখন ইশতেহার প্রকাশিত হয় তখন প্রস্তাবিত নাম রাখা হয় 'প্রগতি লেখক সংঘ'। ১৯৩৬ সালের ১০ এপ্রিলের এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত হিন্দি লেখক মুন্সী প্রেমচান্দ। সভায় সংগঠনের নামকরণ করা হয় 'নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ'। এর সভাপতি নির্বাচিত হন প্রেমচান্দ, সম্পাদক সাজ্জাদ জহির। ১৯৩৭ সালে সোমেন চন্দ প্রত্যক্ষভাবে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৮ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পাঠচক্রের সম্মুখ প্রতিষ্ঠান প্রগতি পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন তিনি ও তাঁর পরিবার শহরের দক্ষিণ মৈশন্ডিতে থাকতেন। এসময় তিনি বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর মতো আজীবন বিপ্লবী শিক্ষকের রাজনীতি ও দর্শনের পাঠ নেন। রনেশ দাশ গুপ্তের সান্নিধ্যে থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, ম্যাক্সিম গোর্কী, মোপাঁসা, রঁলা, বারবুস, জিদ, মারলো, কডওয়েল রালফ ফক্সসহ আরো অনেকের লেখা বই পড়েন। তিনি রালফ্ ফক্স নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, সেটি নিম্নে উল্লেখ করা হল। রালফ্ ফক্সের নাম শুনেছো? শুনেছো কডওয়েল আর কনফোর্ডের নাম? ফ্রেদরিকো গার্সিয়া লোরকার কথা জান? এই বীর শহিদেরা স্পেনকে রাঙিয়ে দিল, সবুজ জলপাই বন হলো লাল, মার - বুক হল খালি - তবু বলি, সামনে আসছে শুভদিন। চলো, আমরাও যাই ওদের রক্তের পরশ নিতে, ওই রক্ত দিয়ে লিখে যাই শুভদিনের সংগীত। ১৯৪১ সালের ২২ জুন। হিটলার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নকে আক্রমণ করে। বিশ্বযুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। এ সময় ভারত উপমহাদেশের প্রগতিবাদী জনতা ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সংগ্রামরত দেশপ্রেমিক সোভিয়েত যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শান্তির লক্ষ্যে হীরেন মুখোপাধ্যায় ও স্নেহাংশু আচার্যকে আহ্বায়ক করে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে বঙ্গদেশে গড়ে উঠে 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি'। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় প্রগতি লেখক সঙ্ঘের উদ্যগে গড়ে উঠে 'সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি'। এর যুগ্মসম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। একপর্যায়ে সোমেন চন্দ এ সমিতির অন্যতম সক্রিয় সংগঠক হয়ে উঠেন। এই সমিতির প্রধান প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটা অন্যতম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার অগ্রগতি প্রসঙ্গে চিত্র প্রদর্শনী করা। এই প্রদর্শনীতে 'প্রগতি লেখক সঙ্ঘে'র সোমেন চন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর অবিরত শ্রমের কারণে ঢাকায় অল্পদিনের মধ্যে 'প্রগতি লেখক সঙ্ঘ' ও 'সোভিয়েত সুহ্রদ সমিতি' ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকায় এক সর্বভারতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করা হয়। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী কিছু দল এ সম্মেলন বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। রেল শ্রমিকদের সাধারণ সম্পাদক সোমেন চন্দ রেল শ্রমিকদের মিছিল নিয়ে যখন সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তখন ঢাকার সুত্রাপুরে সেবাশ্রম ও লক্ষ্মীবাজারের হৃষিকেশ দাস লেনের কাছে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির গুণ্ডারা তাঁর উপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন: "সোমেন হত্যার ব্যাপারটি, বিশেষ করে তখনকার পটভূমিতে এবং প্রেক্ষিতে এই হত্যাকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী। সোমেন ছিলেন সে সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি, আর প্রগতি লেখক সঙ্ঘের অনেকখানি"। ১৯৪২ সালে সোমেন চন্দের মৃত্যুর পর কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে প্রগতি 'লেখক সঙ্ঘ'-র নামকরণ হয় 'ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ'। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় আবার এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ'। সোমেন চন্দের মৃত্যু সম্বন্ধে সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিচারণ: "ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিলো অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবি ও লেখকরা শহরে এক ফ্যাসিবাদ বিরোধী সম্মেলন আহবান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত হন। সম্মেলন উপলক্ষ্যে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামোটিভাবে তুষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহীদ। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পরও যথারীতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আমাদের প্রতি আরও লোক আকৃষ্ট হয়"। সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। প্রগতি লেখক সংঘের প্রধান সংগঠকও ছিলেন তিনি। সংঘের সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক বৈঠকগুলোতে নিয়মিত লেখা উপস্থাপনের তাগিদ থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা বিস্তারলাভ করে। ১৯৪০ সালের শেষের দিকে কম্যুনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী হিসেবে ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের কাজ শুরু করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়া। ১৯৪১ সালে মাত্র বিশ বছর বয়সে তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ হয়। ১৯৪০ সালের মাঝামাঝি সময় গেন্ডারিয়া হাইস্কুল মাঠে সম্মেলনের মাধ্যমে প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কাজী আবদুল ওদুদ। রণেশ দাশগুপ্ত ও সোমেন চন্দ সংগঠনের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছর ছিল সোমেন চন্দের লেখক জীবনের পরিধি। তাঁর রচনার মধ্যে ছিল-২৬টি গল্প, একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস, তিনটি কবিতা, দুটি একাঙ্কিকা ও আটটি চিঠি। এছাড়া বিভিন্ন পত্রিকায় ছড়িয়ে আছে তাঁর আরও কিছু রচনা। কিন্তু পত্রিকাগুলো দুষ্প্রাপ্য। ফলে এসব রচনা আজও উদ্ধার করা যায়নি। ২৬ টি গল্পের রচনাকাল, বিষয়বস্তু ও প্রকাশভঙ্গির বিচারে গল্পগুলোকে দুটি পর্বে ভাগ করা যেতে পারে। ১ম পর্ব ১৯৩৭-৩৯ এবং ২য় পর্ব ১৯৩৯- ৪২ সাল পর্যন্ত। ১ম পর্বের গল্পগুলোর মধ্য বিভুতিভূষণের কিছুটা প্রভাব দেখা যায়। আর ২য় পর্বে মানিক বন্দোপাধ্যায়ের। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সোমেন চন্দ পরিবর্তনে বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন বিপ্লবে। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ হিসেবেই রাজনীতি চলে আসে তাঁর লেখায়। নিত্যদিনের ঘরকন্নার মধ্য দিয়ে তিনি অবলীলায় দেখিয়ে দেন শাসনযন্ত্রের কুটিল চালপ্রয়োগ, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতার সুক্ষ্ম জাল। তিনি লিখেছেন মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা । তাঁর রচিত ইঁদুর গল্পের ইঁদুরগুলো যেন দারিদ্রেরই কিলবিলে রূপ যা এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেয়না। ক্রমাগত শ্রেণীস্বাতন্ত্র টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে রত নিম্ন মধ্যবিত্তরা। নিরেট প্রেমের গল্প 'রাত্রিশেষ'-এও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে শ্রেণীসংঘাত যা থেকে মুক্ত নয় আপাত সংস্কারত্যাগী বৈষ্ণবরাও। তাঁর রচিত অকল্পিত গল্পে তিনি দেখান, "যারা রাষ্ট্রদেবতার মন্দিরের কাছাকাছি থাকেন, যারা বিশ্ব মানচিত্রে নিজের ক্ষুদ্র অবস্থান সম্পর্কে বেশ সচেতনই বলা চলে, যারা দেখতে পায় কিংবা দেখেও না দেখার ভান করে আমাদের চারিদিকে চাপা কান্নার শব্দ, আমাদের চারিদিকে জীবনের হীনতম উদাহারণ, খাদ্যের অভাবে, শিক্ষার অভাবে কুৎসিত ব্যারামের ছড়াছড়ি, মানুষ হয়ে পশুর জীবন-যাপন। আমাদের চারিদিকে অবরুদ্ধ নিশ্বাস, কোটি কোটি ভয়ার্ত চোখ, তারা যেন খুনের অপরাধে অপরাধী একপাল মানুষ"। প্রত্যাবর্তন গল্পে তিনি গাঁয়ের কথা বলেন, "পঁচিশ বছর আগের পুরুষরা একদিন আকাশের দিকে চাহিয়া নিরুপায়ে কাঁদিয়াছে, তার বংশধরেরা আজও কাঁদিতেছে। তাহাদের চোখ-মুখ ফুলিয়া গেল"। সোমেন চন্দ জীবনের এই স্বল্প পরিসরে শেষের কয়েকটি বছর সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন । প্রতিটি রচনাতেই রয়েছে সৃষ্টিশীলতার ছাপ। তাঁর 'ইঁদুর' গল্প বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। 'ইঁদুর' গল্প প্রসঙ্গে লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেন, "সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প 'ইঁদুর' পড়ার পর নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার ও মনসুবিজন নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি"। ১৯৪০-এ প্রকাশিত সংঘের সংকলন 'ক্রান্তি'-তে তাঁর বিখ্যাত গল্প 'বনস্পতি' প্রকাশিত হওয়া ছিল বিরল ঘটনা। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ভাল একটি উপন্যাসও লিখেছিলেন, নাম - 'বন্যা'। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তাঁর কোন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। সোমেন চন্দের 'উৎসব' গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় সিলেট থেকে প্রকাশিত ১৩৪৮ সালের 'স্মৃতি'র শরৎ সংখ্যায়। 'স্মৃতি'র সম্পাদক ছিলেন জীতেশমাধব দত্ত ও হিরণ্ময় দাশগুপ্ত।

তথ্যসুত্র : গুণীজন 


Rationale
UploaderRaihan Ahamed