Golden Bangladesh
Eminent People - ফজলে রাব্বি

Pictureফজলে রাব্বি
Nameফজলে রাব্বি
DistrictPabna
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeচিকিৎসা বিজ্ঞান
Life Style

১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর। কলিংবেল বেজে উঠল ডা. ফজলে রাব্বির বাসায়। বাবুর্চি ঘরে ঢুকে ফিসফিস করে তাঁকে বলল, 'সাহেব বাড়ি ঘিরে ফেলেছে।' তিনি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন একটা সাদা কাদা মাখানো মাইক্রোবাস আর একটি জিপ দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বাসার সামনে। নিচু গলায় পেছন না ফিরে তিনি বললেন, 'টিঙ্কুর আম্মা, ওরা আমাকে নিতে এসেছে।' তিনি দারোয়ান ইদ্রিসকে ডেকে সদর দরজা ও সিঁড়ির দরজা খুলে দিতে বললেন। দারোয়ান দরজা খুলে দিল। পাঁচ-সাত জন সশস্ত্র সৈন্য চারপাশ দিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলল। তিনি ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন। স্ত্রী জাহানারা বাধা দিতে চেষ্টা করলেন। ওদের মধ্যে থেকে দুজন এগিয়ে এসে জাহানারার বুকে বন্দুক চেপে ধরল। জাহানারা স্থানুর মতো স্থির দাঁড়িয়ে গেলেন। ডা. ফজলে রাব্বি মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে গেলেন। গাড়িটা আস্তে আস্তে চলতে শুরু করার পর হায়েনারা জাহানারার বুকের ওপর থেকে বন্দুক নামানোর সাথে সাথে জাহানারা চেতনা লুপ্ত হয়ে ঢলে পড়েন।
  
কয়েক মিনিট পর জ্ঞান ফিরলে তিনি টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চারদিকে পাগলের মতো টেলিফোন করতে লাগলেন। কর্নেল হেজাজীকে ফোন করলেন। হেজাজী তাঁকে জানালেন, ডা. রাব্বি ও ডা. আলীম চৌধুরীসহ ইউনিভার্সিটি থেকে ২০ জন প্রফেসরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অপরাধ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। তিনি আরও জানালেন, আগামীকাল সকালে দেখা যাবে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে জাহানারা কর্নেল হেজাজীকে আবার ফোন করেন। হেজাজী জানালেন- তাদের কি হয়েছে তিনি জানেন না। কর্নেলের এ কথার অর্থ জাহানারা আঁচ করতে পারেন। তারা কাউকে হত্যা করার পরই এ ধরনের কথা বলে। তিনি নিরুপায় হয়ে স্বামীর খোঁজে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে বের হলেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করলেন। ইউনাইটেড নেশনের চেয়ারম্যান জন কেলির কাছে গেলেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তখন আত্মসমর্পণের বিষয় নিয়ে সভা হচ্ছিল। এমন অবস্থায় তিনি ছোটখাটো একটা খন্ডযুদ্ধের মধ্যে পড়লেন। অবশেষে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করল।
দেশ স্বাধীন হলো। সারা বাংলায় আনন্দের জোয়ার বইছে। রাজধানী ঢাকা বিজয়ের মিছিলে মুখরিত। বিংশ শতকের হিটলাররূপী বর্বররা নিঃশর্ত আত্মসর্মপণ করেছে। দীর্ঘ নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবনের সব নির্যাতনের অবসান ঘটেছে। সমগ্র দেশবাসী বিজয়ের এই আনন্দে বিভোর। আর এদিকে জাহানারা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁর স্বামীর খবরের জন্য। কলিংবেলের শব্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসছেন দরজার কাছে এই বুঝি তাঁর স্বামীর খবর নিয়ে কেউ এল। কিন্তু বারবার তিনি হতাশ হচ্ছেন কারণ কেউ তাঁর স্বামীর খবর বলতে পারছে না। ঠিক সেই সময়ে এল মর্মান্তিক এক খবর। রায়েরবাজারের কাটাসুরে ও মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে আবিষ্কৃত হয়েছে মানব সভ্যতার নৃশংসতম বধ্যভূমি। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র দুইদিন। সমগ্র দেশ তখন আনন্দে মাতোয়ারা। খবরটি শোনার পর স্বাধীনতার সেই আনন্দকে গ্রাস করল কান্নার রোল। পরাজয়ের আগে মেরুদন্ডহীন এই কাপুরুষেরা শেষ কামড় দিয়েছে। নির্মম আক্রোশের বশবর্তী হয়ে নরঘাতকরা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। রায়েরবাজার ও ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন গর্ত থেকে অসংখ্য মৃতদেহ উদ্ধার করা হলো। বেশিরভাগ মৃতদেহই বিকৃত, চেনার উপায় নেই। এক সপ্তাহ আগে এদের অনেকেই নিখোঁজ ছিলেন। স্বজনরা তাঁদের জন্য অস্থির। সবাই হন্যে হয়ে ওদের খুঁজছে। ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিন লিখেন- "এখানে এই বুদ্ধিজীবীরা শুয়ে আছেন। তাঁদের শরীরের ওপর জমেছে ধূলো কাদা, দেহগুলো গলতে শুরু করেছে। একটি বাঁধের ওপর একটি কঙ্কাল পড়ে আছে। ঢাকার কুকুরগুলো নাটকীয়ভাবে দেহটাকে মাংসমুক্ত করে ফেলেছে। বাঙালী জনতা এই ডোবাগুলোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিমায় চলাচল করছে। এখানে তাদের ক্রোধান্বিত মনে হয় না। অনত্র তারা ক্রোধোন্মত্ত। কিন্তু এখানে তারা হাঁটছে, মৃদু ফিসফিস করে কথা বলছে, তারা যেন গির্জা পরিদর্শনরত পর্যটক।" ইতিহাসের এই কসাইখানায় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা তাদের মৃতদেহ শনাক্ত করতে দলে দলে ভিড় করছিল। ফজলে রাব্বির মৃতদেহ পাওয়া গেল ১৮ ডিসেম্বর।
তাঁর এক আত্মীয় খুঁজে আনল তাঁর মৃতদেহ। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি দৈনিক আজাদে এই হত্যাকান্ডের বর্ণনায় খুঁজে পাওয়া মৃতদেহ সম্পর্কে হামিদা রহমান লিখেন। লেখাটি ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা সূত্রে। তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিখেন- "প্রায় ঘন্টাখানেক। একে একে সবাই এসে এখানে হাজির হচ্ছে। ডা. রাব্বির মৃতদেহটা তখনও তাজা। জল্লাদ বাহিনী তাঁর বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত যে, তিনি চিকিত্‍সক ছিলেন। তাই তাঁর হৃত্‍পিন্ডটা ছিঁড়ে ফেলেছে জল্লাদের দল। চোখ বাঁধা অবস্থায় কাত্‍ হয়ে দেহট পড়ে আছে। ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। রাব্বি সাহেবের পা দুখানা তখনও জ্বলজ্বল করে তাজা মানুষের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নাক-মুখ কিছুই অক্ষত ছিল না তাঁর। হায়েনাদের নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।" কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত বর্ণনার সঙ্গে রাব্বির স্ত্রীর বর্ণনার ফারাক রয়েছে। তাঁর স্ত্রী পরবর্তী সময়ে 'স্মৃতি ১৯৭১' গ্রন্থে লিখেন- "তিনি ঘুমিয়ে আছেন শান্তিতে। মুখটা ডান দিকে একটু হেলানো। বাঁ দিকের গালের হাড়ে ও কপালের বাঁ পাশে বুলেটের ছিদ্র। তবে একথা মিথ্যা যে, তাঁর বুক কেটে ফেলা হয়েছিল।" এভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে শহীদ হলেন ডা. ফজলে রাব্বি।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চারদিক থেকেই খবর আসছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর চূড়ান্ত বিজয় খুব বেশি দূরে নয়। গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলিতেও এই আলোচনা। প্রতিটি মানুষই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থেকে মুক্তির প্রতীক্ষা করছিল। তবে এই নিরাপত্তাহীনতায় তাদের কোনো আফসোস নেই। তবু স্বদেশের মুক্তি চায় তারা। প্রিয় স্বদেশের বুকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ ও অত্যাচার তারা (পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ) মুখ বুজে মেনে নেয়নি। এজন্যই এ যুদ্ধ। অবশ্য শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রতিবাদ করে আসছে। সোচ্চার হয়েছে অধিকার আদায়ে। হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে রাজপথে। আজ যে প্রতিটি মানুষ অস্থির ও অনিশ্চিত এক সময় অতিক্রম করছে, তা সেই বহুদিনের শোষণ ও প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ফয়সালার জন্যই। এর মধ্য দিয়ে বাঙালী নিশ্চিত করতে চায় তাদের নিজের ভবিষ্যত্‍। এই যুদ্ধে হেরে গেলে জাতি হিসেবে কোথায় দাঁড়াবে এ কথা দেশের আপামর জনসাধারণ আন্দাজ করতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে এ কথার ঈঙ্গিতই ছিল। সেদিনের সভায় জনমানুষের সমুদ্রের ঢেউসম উপচে পড়া ভিড় দেখেই বোঝা যাচ্ছিল নিষ্পেষিত হওয়া বাঙালি এবার মুক্তি চায়। জাতির অবিসংবাদিত নেতার স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। পূর্ব বাংলার প্রতিটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশকে অমোঘ বিধান মেনে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে কিছু লোক ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তানের কথিত ইসলামতন্ত্রে মুগ্ধ ছিল। তারা এ যুদ্ধের ঘোর বিরোধিতা করে। পাক হানাদারদের মতো তারাও দেশপ্রেমিক জনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তান বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত খোঁজ-খবর প্রদান করে তারা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশনেও অংশগ্রহণ করে এই দেশীয় শত্রুরা। তারা বিভিন্ন নামে সংগঠিত যেমন রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি। এসব দেশীয় শত্রুদের জন্য পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও বেশি ভয়ানক হয়ে উঠছিল। এসব নিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক থাকলেও হতাশা নেই। জীবনের চরম বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অধিকার আদায় করতে হবে এটা তাঁরা বুঝতে পারে। তবে সবাই একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে, এ যুদ্ধে বিজয় অনিবার্য।
নভেম্বরের মাঝামাঝিতে পূর্ব পাকিস্তানের এই সংগ্রামে সমর্থন দিলেন তত্‍কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। যুদ্ধ তখন নতুন মাত্রা লাভ করল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ভারত সরকারের এই সহযোগিতা পাকিস্তান সরকার সহজভাবে মেনে নিতে পারল না। তারা ক্রমাগত বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এমন পরিবারের প্রতি চড়াও হওয়ার মাত্রাটা বেশি ছিল তাদের। রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এমন পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছিল। ঢাকা শহরের পরিস্থিতি দিনকে দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এমন অবস্থায় মানুষের নিত্যদিনের কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে অবশ্য কেউ কেউ শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছে গ্রামগঞ্জের দিকে। কেউ কেউ ভাবছে শিগগিরই ঢাকা ত্যাগ করবে। যেমন ডা. জাহানারা রাব্বি। তিনি সবকিছু গোছগাছ করে রেখেছেন। স্বামী ডা. ফজলে রাব্বির সঙ্গে আলাপও করেছেন। কিন্তু ডাক্তার সাহেব কর্তব্যের কথা বিবেচনা করে শিগগিরই নিরাপদে যেতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছেই। যখন তখন রোগী আসছে আবার বিদায় নিচ্ছে। এমতাবস্থায় ডাক্তার হিসেবে তিনি কি ওদের ফেলে চলে যেতে পারেন? আর এখানে যারা আসছে তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধের অবর্ণনীয় পরিস্থিতির স্বীকার। তাছাড়া তিনি নিজেও এ যুদ্ধের একজন সৈনিক। স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন বাংলাদেশের। স্ত্রী জাহানারা অবশ্য সবই জানেন। তারপরও এক ধরনের অজানা শঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠছেন তিনি।
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর জাহানারা রাব্বি সকালেই বাসা থেকে বের হয়ে স্বামী ডাক্তার রাব্বির খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে গেলেন। সেখানে ডা. রাব্বিকে না পেয়ে তিনি হাসপাতালের দিকে হাঁটা দিলেন। রাব্বি তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে বসে ছিলেন। সহকর্মীদের অনেকেই জাহানারার শিক্ষক। তাঁদের সামনেই ইতস্তত করে জাহানারা তাঁর উদ্বেগের কথা বললেন- সকলেই বলছে তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে চলে যেতে। আর বোধ হয় থাকা ঠিক হবে না। কিন্তু জাহানারার কথা শোনার পর কেউই তেমন গুরুত্ব দিলেন না। ফেরার পথে গাড়িতেই আবার প্রসঙ্গটা তুললেন জাহানারা- এবার কোথাও যাওয়া উচিত। ডাক্তার নির্বিকারভাবে বললেন, 'আচ্ছা দেখি কারও সঙ্গে আলাপ করে। আজ বিকালে ঠিক করা যাবে।' বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন জাহানারা। কিন্তু বিকালে ঘটল আরেক বিপত্তি; কারফিউ জারি করল সরকার। ডাক্তার দম্পতি অবাক হলেন। যুদ্ধের সময় পৃথিবীর কোথাও কোনো কারফিউ দেয়ার রীতি নেই। এটা কী করে সম্ভব! জাহানারা তাঁর স্বামীর চোখের দিকে তাকালেন। ভেতরে এক ধরনের অজানা আশঙ্কা। ভাবেন ওই হায়েনারা কি জেনে গেছে আজ আমরা পালাব! ডা. রাব্বির মনেও এ ধরনের ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। স্ত্রীকে বললেন- 'এবার হয়ত ওরা আমাদের ঘরের থেকে তুলে মারবে।' ১২ ডিসেম্বর কারফিউ উঠল না। ১৩ তারিখে ২ ঘন্টার জন্য উঠল। ১৪ তারিখেও উঠল না।
এরই মধ্যে ১৩ ও ১৪ তারিখ রাতে জাহানারা এক দুঃস্বপ্ন দেখলেন। একটা সাদা সুতির চাদর গায়ে দিয়ে তিন ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি কোনো এক জায়গায় জিয়ারত করছেন। সেখানে চারটা কালো থামের মাঝখানে সাদা চাদরে ঘেরা কি যেন আছে। ১৫ ডিসেম্বর এ স্বপ্নের কথা স্বামীর কাছে বললেন। তিনি শুনে দীর্ঘক্ষণ চুপ হয়ে রইলেন। একটা কালো ছায়া নেমে এল রাব্বির মুখে। অস্থির হয়ে বললেন- 'তুমি বোধহয় আমার কবর দেখেছ।' জাহানারা ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি তাড়াতাড়ি টেলিফোনটা টেনে এনে স্বামীকে বললেন, 'এক্ষুণি ফোন কর সবাইকে।' রাব্বি কয়েকজন প্রফেসরের বাসায় ফোন করলেন। কিন্তু তাঁদেরকে বাসায় পাওয়া গেল না। এরমধ্যে আবার অধিকাংশ টেলিফোন বিকল। পুরো অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান আকাশে উড়ছে। রকেট লাঞ্চার ফেলছে, শেল পড়ছে। এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে সবকিছু। হঠাত্‍ বেলা ১০টার দিকে কারফিউ উঠে গেল। রাব্বি গাড়ি বের করলেন। পুরানো ঢাকায় এক অবাঙালী রোগী দেখতে যাবেন। জাহানারা স্বামীকে রোগী দেখতে যেতে বারবার নিষেধ করলেন। কিন্তু তিনি শুনলেন না। চলে গেলেন। রোগী দেখে ফিরলেন সাড়ে এগারোটার দিকে। ফেরার পথে অনেক মাছ-মাংস-সবজি নিয়ে এলেন। স্ত্রীকে বললেন, 'দেখো কত কি নিয়ে এসেছি। এখন আত্মসমর্পণের সময় খুব গোলমাল হবে। কোনো জিনিস পাওয়া যাবে না, তাই নিয়ে এলাম।' জাহানারা নতুন করে কিছু রান্না করলেন না। আগের দিনের তরকারি দিয়েই পরিবারের সবাই খেলেন। চারদিকে অস্থির গুমট পরিবেশ। বোমা পড়ছে, যুদ্ধ চলছে। রেডিওতে ইন্ডিয়ান আর্মি স্টাফ জেনারেল মানেকশরের আত্মসমর্পণের আহ্বান ভেসে আসছে। এক অজানা আশঙ্কায় মানুষজন যুদ্ধ সমাপ্তির আশা করছে। জাহানারা আবার বললেন- 'চল এখন যাই। একটা অ্যাম্বুল্যান্স ডাক।' অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য ফোন করে রাব্বি বললেন, 'আচ্ছা দুপুরটা একটু গড়িয়ে নিই তারপর যাব।' জাহানারার মুখে কোনো কথা নেই। তিনি অনেকটা নির্জীব হয়ে রইলেন। তাঁর চোখেমুখে ভয়ের ছাপ। আসন্ন বিপদ যেন তাঁকে প্রতি মুহূর্তেই ইশারা করছে। বিকাল ৪টার দিকে রাব্বি ছেলেমেয়েদের ডেকে বললেন- 'দেখো তোমার মা ভয়ে কেমন নীল হয়ে গেছে।' এরপর তিনি বারান্দায় যান। দেখেন প্লেন থেকে বোমা পড়ছে। জাহানারা ডেকে বললেন- 'ভেতরে এসো। স্প্লিন্টার এসে লাগবে।' ঘরে এসে রাব্বি স্ত্রীকে বললেন, 'এত ভয় পাচ্ছো কেন? দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেল।' এর কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এল তাঁর বাসায় এবং তাঁকে ধরে নিয়ে গেল। যে দৃশ্যের বর্ণনা শুরুতেই দেওয়া হয়েছে।
ফজলে রাব্বি জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার হেমায়েতপুর থানার ছাতিয়ানী গ্রামে। বাবা আফসার উদ্দিন আহমেদ। মা সুফিয়া খাতুন। ফজলে রাব্বি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ১৯৪৮ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে মেধা তালিকায় বিশিষ্ট স্থান দখল করে মাধ্যমিক পাশ করেন। এবং ভি.পি.আই ও জেলা ভিত্তিক বৃত্তি লাভ করেন। তাঁর পরবর্তী শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকা কলেজে। সেখানেও তিনি আশাতীত সাফল্য অর্জন করে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তী সময়ে চিকিত্‍সক হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি এমবিবিএস- এ প্রথম পার্ট পরীক্ষায় অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে সম্মানসহ এমবিবিএস ফাইনালে শীর্ষস্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫০-৫৫ সাল পর্যন্ত ছাত্র থাকাকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রসেক্টর হন। ১৯৫৫-৫৬ সালে কমপালসারি ইন্টার্নিশিপ ট্রেনিং নেন। ১৯৫৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসিস্ট্যান্ট সার্জন পদে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৯ সালে মেডিসিনের রেজিস্টার পদে উন্নীত হন এবং ১৯৬০ সালের মার্চ মাসে কলম্বো প্ল্যানের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের এডিনবরায় যান। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের গুণে তিনি ঐ বছরের শেষের দিকে কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি ডিগ্রী লাভ করেন। আরও ব্যাপক অভিজ্ঞতার জন্য তিনি লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করেন এবং সেইসঙ্গে পড়াশুনাও চালিয়ে যান সমান তালে। ১৯৬২ সালে সাফল্যের সাথে জেনারেল মেডিসিন ও এমআরসিপি ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হন তিনির এরপর লন্ডনের হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে সিনিয়র রেজিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এক বছর। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে একই সাথে তাঁকে প্রফেসর অব মেডিসিন ও প্রফেসর অব কার্ডিওলজির দায়িত্বও পালন করতে হয়।
ফজলে রাব্বি ১৯৫৭ সালের ৮ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ডা. জাহানারা রাব্বি। তাঁর দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে নাসরিন শিক্ষক। ছেলে ওমর রাব্বি ব্যবসায়ী। ছোট মেয়ে নুসরাত রেটিনা, আইটি বিশেষজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর একমাত্র ছেলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম লেখান। দীর্ঘ দুইমাস পর তাঁকে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনেন ফজলে রাব্বি।
গানবাজনা ও কবিতা খুব পছন্দ করতেন তিনি। ফটোগ্রাফি ও টাইপিং এর দিকে ঝোঁক ছিল তাঁর। এছাড়া বই কিনতেন প্রচুর। আর লেখালেখির প্রতিও আগ্রহ ছিল খুব। অধ্যাপনা, চিকিত্‍সা ও অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি গবেষণার কাজও করতেন। 'ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল' ও 'ল্যান্সেট'-এ তাঁর প্রচুর গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মেডিসিন বিষয়ে একটি পাঠ্যবই লেখা শুরু করেছিলেন; কিন্তু তা শেষ করে যেতে পারেননি। ছাত্রদের প্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনিই প্রথম ১৯৭০ সালে এক ভাষণে গণমুখী চিকিত্‍সার ধারণা ছাত্র ও ডাক্তারদের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, 'চিকিত্‍সা ও সেবা গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে দিতে হবে।' এদেশের চিকিত্‍সকরা সমাজের সর্বোচ্চ স্থানের অধিকারী- তাঁর এই বক্তব্যকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। সে সময় পশ্চিমা শাসকরা বিভিন্ন চিঠির মাধ্যমে ফজলে রাব্বিকে ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করে। তাদের এ ধরনের হুমকিতে তিনি বিচলিত হননি। দেশের মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তিনি বরাবরই ছিলেন সোচ্চার। মানুষকে তিনি বিভাজনের দৃষ্টিতে বিবেচনা করতেন না। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জীবিত থাকা সময় পর্যন্ত বাঙালীর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আন্দোলনেই অংশগ্রহণ করেছেন। এজন্য তিনি সর্বত্রই ছিলেন পরিচিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ছিল অসামান্য ভূমিকা। সে সময় তাঁর বাসায় মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আসতেন। এদের মধ্যে ডা. আলীম চৌধুরী, প্রফেসর গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। অনেক আহত মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের তিনি সরাসরি সাহায্য করতেন। বধ্যভূমিতে তাঁকে হত্যা করার আগে পাক সেনাবাহিনীরা তাঁকে যে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল তা জানা যায় সেই বধ্যভূমি থেকে ফিরে আসা একজনের কাছ থেকে। তাঁর স্ত্রী জাহানারা রাব্বির স্মৃতিধর্মী লেখাসূত্রে তা জানা যায়। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরা তাঁকে জিজ্ঞেস করে- 'তুমি ডা. রাব্বি?' উত্তরে ডা. রাব্বি বলেন, 'হ্যাঁ।' পাকিস্তানী সেনাবাহিনীরা প্রশ্ন করেন, 'কত টাকা দিয়েছিলে মুক্তিযোদ্ধাদের?' ফজলে রাব্বি জবাবে বলেন-'আমি সরকারী চাকুরে, তাদের আমি কোনো সাহায্য করিনি।'
বন্দিদের মধ্যে সেদিন অনেকেই কেঁদেছিল, প্রাণভিক্ষাও চেয়েছিল কেউ কেউ। কিন্তু ফজলে রাব্বি অবিচলভাবে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করেছেন। মাথা নোয়াননি।
দেশ মাতৃকার প্রতি দায়বদ্ধতাই ফজলে রাব্বিকে অমর করেছে। নিজের স্বার্থের কথা বিবেচনা না করে মাটি ও মানুষের কথা আজন্ম ভেবেছেন তিনি। কর্তব্যের কাছে নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করেছেন তিনি। আর তাই তো স্ত্রী বারবার বলার পরও কর্তব্য পরায়ণ এই মানুষটি কর্তব্যে অবহেলা করে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যাননি। তাঁর এই আত্মদান বাঙালী শ্রদ্ধাভরে ম্মরণ করবে সারাজীবন।
সংক্ষেপে ডা. ফজলে রাব্বি
জন্ম :
ফজলে রাব্বি জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার হেমায়েতপুর থানার ছাতিয়ানী গ্রামে। বাবা আফসার উদ্দিন আহমেদ। মা সুফিয়া খাতুন।
পড়ালেখা :
অসাধারণ মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৪৮ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন এবং ডিপিআই ও জেলাভিত্তিক বৃত্তিলাভ করেন। এমবিবিএসে প্রথম পরীক্ষায় অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে সম্মান লাভ করেন। ফাইনাল এমবিবিএসে অধিকার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক লাভ করার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৫০-৫৫ পর্যন্ত ছাত্র থাকাকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রসেক্টর হন। ১৯৫৫-৫৬ সালে কমপালসারি ইন্টার্নিশিপ ট্রেনিং নেন।
পরিবার :
ফজলে রাব্বি ১৯৫৭ সালের ৮ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রী ডা. জাহানারা রাব্বি। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে নাসরিন শিক্ষক। ছেলে ওমর রাব্বি ব্যবসায়ী, ছোট মেয়ে নুসরাত রেটিনা আইটি বিশেষজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একমাত্র ছেলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য নাম লেখান। দীর্ঘ দুইমাস পর তাকে সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনেন ফজলে রাব্বি।
পেশা :
১৯৫৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসিস্ট্যান্ট সার্জন পদে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৯-৬০ সালে মেডিসিনে রেজিস্ট্রার পদে উন্নীত হন। ১৯৬০ সালের মার্চে কলম্বো প্ল্যানের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের এডিনবরায় যান। ঐ বছর সেপ্টেম্বরে কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিজ্ঞতা লাভের জন্য তিনি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করেন। ১৯৬২ সালের প্রথম দিকে লন্ডন থেকে জেনারেল মেডিসিনে এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন। লন্ডনের হ্যামারস্মিথ হাসপাতালেও তিনি সিনিয়র রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারিতে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে একই সঙ্গে প্রফেসর অব মেডিসিন ও প্রফেসর অব কার্ডিওলজির দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যু :
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার অপরাধে ১৫ই ডিসেম্বর বিকালে ডা. ফজলে রাব্বিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তান আর্মি। ১৮ই ডিসেম্বরে রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়।  
 
কয়েক মিনিট পর জ্ঞান ফিরলে তিনি টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। চারদিকে পাগলের মতো টেলিফোন করতে লাগলেন। কর্নেল হেজাজীকে ফোন করলেন। হেজাজী তাঁকে জানালেন, ডা. রাব্বি ও ডা. আলীম চৌধুরীসহ ইউনিভার্সিটি থেকে ২০ জন প্রফেসরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অপরাধ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। তিনি আরও জানালেন, আগামীকাল সকালে দেখা যাবে। ১৬ ডিসেম্বর সকালে জাহানারা কর্নেল হেজাজীকে আবার ফোন করেন। হেজাজী জানালেন- তাদের কি হয়েছে তিনি জানেন না। কর্নেলের এ কথার অর্থ জাহানারা আঁচ করতে পারেন। তারা কাউকে হত্যা করার পরই এ ধরনের কথা বলে। তিনি নিরুপায় হয়ে স্বামীর খোঁজে অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ে বের হলেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করলেন। ইউনাইটেড নেশনের চেয়ারম্যান জন কেলির কাছে গেলেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে তখন আত্মসমর্পণের বিষয় নিয়ে সভা হচ্ছিল। এমন অবস্থায় তিনি ছোটখাটো একটা খন্ডযুদ্ধের মধ্যে পড়লেন। অবশেষে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করল।
দেশ স্বাধীন হলো। সারা বাংলায় আনন্দের জোয়ার বইছে। রাজধানী ঢাকা বিজয়ের মিছিলে মুখরিত। বিংশ শতকের হিটলাররূপী বর্বররা নিঃশর্ত আত্মসর্মপণ করেছে। দীর্ঘ নয় মাসের অবরুদ্ধ জীবনের সব নির্যাতনের অবসান ঘটেছে। সমগ্র দেশবাসী বিজয়ের এই আনন্দে বিভোর। আর এদিকে জাহানারা অধীর হয়ে অপেক্ষা করছেন তাঁর স্বামীর খবরের জন্য। কলিংবেলের শব্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসছেন দরজার কাছে এই বুঝি তাঁর স্বামীর খবর নিয়ে কেউ এল। কিন্তু বারবার তিনি হতাশ হচ্ছেন কারণ কেউ তাঁর স্বামীর খবর বলতে পারছে না। ঠিক সেই সময়ে এল মর্মান্তিক এক খবর। রায়েরবাজারের কাটাসুরে ও মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে আবিষ্কৃত হয়েছে মানব সভ্যতার নৃশংসতম বধ্যভূমি। দেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র দুইদিন। সমগ্র দেশ তখন আনন্দে মাতোয়ারা। খবরটি শোনার পর স্বাধীনতার সেই আনন্দকে গ্রাস করল কান্নার রোল। পরাজয়ের আগে মেরুদন্ডহীন এই কাপুরুষেরা শেষ কামড় দিয়েছে। নির্মম আক্রোশের বশবর্তী হয়ে নরঘাতকরা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। রায়েরবাজার ও ধানমন্ডি এলাকার বিভিন্ন গর্ত থেকে অসংখ্য মৃতদেহ উদ্ধার করা হলো। বেশিরভাগ মৃতদেহই বিকৃত, চেনার উপায় নেই। এক সপ্তাহ আগে এদের অনেকেই নিখোঁজ ছিলেন। স্বজনরা তাঁদের জন্য অস্থির। সবাই হন্যে হয়ে ওদের খুঁজছে। ইতিহাসের এই জঘন্য হত্যাকান্ড নিয়ে সাংবাদিক নিকোলাস টোমালিন লিখেন- "এখানে এই বুদ্ধিজীবীরা শুয়ে আছেন। তাঁদের শরীরের ওপর জমেছে ধূলো কাদা, দেহগুলো গলতে শুরু করেছে। একটি বাঁধের ওপর একটি কঙ্কাল পড়ে আছে। ঢাকার কুকুরগুলো নাটকীয়ভাবে দেহটাকে মাংসমুক্ত করে ফেলেছে। বাঙালী জনতা এই ডোবাগুলোতে এক অদ্ভুত শান্ত ভঙ্গিমায় চলাচল করছে। এখানে তাদের ক্রোধান্বিত মনে হয় না। অনত্র তারা ক্রোধোন্মত্ত। কিন্তু এখানে তারা হাঁটছে, মৃদু ফিসফিস করে কথা বলছে, তারা যেন গির্জা পরিদর্শনরত পর্যটক।" ইতিহাসের এই কসাইখানায় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরা তাদের মৃতদেহ শনাক্ত করতে দলে দলে ভিড় করছিল। ফজলে রাব্বির মৃতদেহ পাওয়া গেল ১৮ ডিসেম্বর।
তাঁর এক আত্মীয় খুঁজে আনল তাঁর মৃতদেহ। ১৯৭২ সালের ২ জানুয়ারি দৈনিক আজাদে এই হত্যাকান্ডের বর্ণনায় খুঁজে পাওয়া মৃতদেহ সম্পর্কে হামিদা রহমান লিখেন। লেখাটি ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা সূত্রে। তিনি প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিখেন- "প্রায় ঘন্টাখানেক। একে একে সবাই এসে এখানে হাজির হচ্ছে। ডা. রাব্বির মৃতদেহটা তখনও তাজা। জল্লাদ বাহিনী তাঁর বুকের ভেতর থেকে কলিজাটা তুলে নিয়েছে। তারা জানত যে, তিনি চিকিত্‍সক ছিলেন। তাই তাঁর হৃত্‍পিন্ডটা ছিঁড়ে ফেলেছে জল্লাদের দল। চোখ বাঁধা অবস্থায় কাত্‍ হয়ে দেহট পড়ে আছে। ধাক্কা দিয়ে গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়েছে। রাব্বি সাহেবের পা দুখানা তখনও জ্বলজ্বল করে তাজা মানুষের সাক্ষ্য দিচ্ছে। নাক-মুখ কিছুই অক্ষত ছিল না তাঁর। হায়েনাদের নখের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত।" কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত বর্ণনার সঙ্গে রাব্বির স্ত্রীর বর্ণনার ফারাক রয়েছে। তাঁর স্ত্রী পরবর্তী সময়ে 'স্মৃতি ১৯৭১' গ্রন্থে লিখেন- "তিনি ঘুমিয়ে আছেন শান্তিতে। মুখটা ডান দিকে একটু হেলানো। বাঁ দিকের গালের হাড়ে ও কপালের বাঁ পাশে বুলেটের ছিদ্র। তবে একথা মিথ্যা যে, তাঁর বুক কেটে ফেলা হয়েছিল।" এভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ডের শিকার হয়ে শহীদ হলেন ডা. ফজলে রাব্বি।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস। চারদিক থেকেই খবর আসছিল মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর চূড়ান্ত বিজয় খুব বেশি দূরে নয়। গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলি-গলিতেও এই আলোচনা। প্রতিটি মানুষই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থেকে মুক্তির প্রতীক্ষা করছিল। তবে এই নিরাপত্তাহীনতায় তাদের কোনো আফসোস নেই। তবু স্বদেশের মুক্তি চায় তারা। প্রিয় স্বদেশের বুকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের শোষণ ও অত্যাচার তারা (পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ) মুখ বুজে মেনে নেয়নি। এজন্যই এ যুদ্ধ। অবশ্য শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ প্রতিবাদ করে আসছে। সোচ্চার হয়েছে অধিকার আদায়ে। হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে রাজপথে। আজ যে প্রতিটি মানুষ অস্থির ও অনিশ্চিত এক সময় অতিক্রম করছে, তা সেই বহুদিনের শোষণ ও প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ফয়সালার জন্যই। এর মধ্য দিয়ে বাঙালী নিশ্চিত করতে চায় তাদের নিজের ভবিষ্যত্‍। এই যুদ্ধে হেরে গেলে জাতি হিসেবে কোথায় দাঁড়াবে এ কথা দেশের আপামর জনসাধারণ আন্দাজ করতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে এ কথার ঈঙ্গিতই ছিল। সেদিনের সভায় জনমানুষের সমুদ্রের ঢেউসম উপচে পড়া ভিড় দেখেই বোঝা যাচ্ছিল নিষ্পেষিত হওয়া বাঙালি এবার মুক্তি চায়। জাতির অবিসংবাদিত নেতার স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। পূর্ব বাংলার প্রতিটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশকে অমোঘ বিধান মেনে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে কিছু লোক ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পাকিস্তানের কথিত ইসলামতন্ত্রে মুগ্ধ ছিল। তারা এ যুদ্ধের ঘোর বিরোধিতা করে। পাক হানাদারদের মতো তারাও দেশপ্রেমিক জনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। পাকিস্তান বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত খোঁজ-খবর প্রদান করে তারা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশনেও অংশগ্রহণ করে এই দেশীয় শত্রুরা। তারা বিভিন্ন নামে সংগঠিত যেমন রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি। এসব দেশীয় শত্রুদের জন্য পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও বেশি ভয়ানক হয়ে উঠছিল। এসব নিয়ে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক থাকলেও হতাশা নেই। জীবনের চরম বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে অধিকার আদায় করতে হবে এটা তাঁরা বুঝতে পারে। তবে সবাই একটা বিষয়ে নিশ্চিত যে, এ যুদ্ধে বিজয় অনিবার্য।
নভেম্বরের মাঝামাঝিতে পূর্ব পাকিস্তানের এই সংগ্রামে সমর্থন দিলেন তত্‍কালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। যুদ্ধ তখন নতুন মাত্রা লাভ করল। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ভারত সরকারের এই সহযোগিতা পাকিস্তান সরকার সহজভাবে মেনে নিতে পারল না। তারা ক্রমাগত বেপরোয়া হয়ে উঠছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে এমন পরিবারের প্রতি চড়াও হওয়ার মাত্রাটা বেশি ছিল তাদের। রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এমন পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছিল। ঢাকা শহরের পরিস্থিতি দিনকে দিন অবনতির দিকে যাচ্ছিল। এমন অবস্থায় মানুষের নিত্যদিনের কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে অবশ্য কেউ কেউ শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাড়ি জমিয়েছে গ্রামগঞ্জের দিকে। কেউ কেউ ভাবছে শিগগিরই ঢাকা ত্যাগ করবে। যেমন ডা. জাহানারা রাব্বি। তিনি সবকিছু গোছগাছ করে রেখেছেন। স্বামী ডা. ফজলে রাব্বির সঙ্গে আলাপও করেছেন। কিন্তু ডাক্তার সাহেব কর্তব্যের কথা বিবেচনা করে শিগগিরই নিরাপদে যেতে রাজি হচ্ছেন না। কারণ হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছেই। যখন তখন রোগী আসছে আবার বিদায় নিচ্ছে। এমতাবস্থায় ডাক্তার হিসেবে তিনি কি ওদের ফেলে চলে যেতে পারেন? আর এখানে যারা আসছে তাদের বেশিরভাগই যুদ্ধের অবর্ণনীয় পরিস্থিতির স্বীকার। তাছাড়া তিনি নিজেও এ যুদ্ধের একজন সৈনিক। স্বপ্ন দেখেন স্বাধীন বাংলাদেশের। স্ত্রী জাহানারা অবশ্য সবই জানেন। তারপরও এক ধরনের অজানা শঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠছেন তিনি।
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর জাহানারা রাব্বি সকালেই বাসা থেকে বের হয়ে স্বামী ডাক্তার রাব্বির খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে গেলেন। সেখানে ডা. রাব্বিকে না পেয়ে তিনি হাসপাতালের দিকে হাঁটা দিলেন। রাব্বি তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে বসে ছিলেন। সহকর্মীদের অনেকেই জাহানারার শিক্ষক। তাঁদের সামনেই ইতস্তত করে জাহানারা তাঁর উদ্বেগের কথা বললেন- সকলেই বলছে তাড়াতাড়ি শহর ছেড়ে চলে যেতে। আর বোধ হয় থাকা ঠিক হবে না। কিন্তু জাহানারার কথা শোনার পর কেউই তেমন গুরুত্ব দিলেন না। ফেরার পথে গাড়িতেই আবার প্রসঙ্গটা তুললেন জাহানারা- এবার কোথাও যাওয়া উচিত। ডাক্তার নির্বিকারভাবে বললেন, 'আচ্ছা দেখি কারও সঙ্গে আলাপ করে। আজ বিকালে ঠিক করা যাবে।' বিকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন জাহানারা। কিন্তু বিকালে ঘটল আরেক বিপত্তি; কারফিউ জারি করল সরকার। ডাক্তার দম্পতি অবাক হলেন। যুদ্ধের সময় পৃথিবীর কোথাও কোনো কারফিউ দেয়ার রীতি নেই। এটা কী করে সম্ভব! জাহানারা তাঁর স্বামীর চোখের দিকে তাকালেন। ভেতরে এক ধরনের অজানা আশঙ্কা। ভাবেন ওই হায়েনারা কি জেনে গেছে আজ আমরা পালাব! ডা. রাব্বির মনেও এ ধরনের ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে।

Rationale
UploaderRaihan Ahamed