Golden Bangladesh
Eminent People - গাজীউল হক

Pictureগাজীউল হক
Nameগাজীউল হক
DistrictNoakhali
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeভাষা আন্দোলন
Life Style
গাজীউল হক একজন ভাষাসৈনিক। পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে মিছিল করেন। স্লোগান দেন। এজন্য তাঁকে সরকারের রোষানলে পড়ে কারাবরণ করতে হয়েছে কয়েকবার। কিন্তু কারাবরণের ভয়ে তিনি ভীত হননি। কর্মজীবনে তিনি একজন আইনজীবী। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তিনি একজন লেখক, কবি, গীতিকার। রাষ্ট্রভাষা বাংলা মর্যাদা পাবার পরও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা চালু না হওয়ায় তিনি ভীষণ কষ্ট অনুভব করতেন। বিভিন্ন সময় তাঁর কথা, লেখায় এই আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলনা। জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় গাজীউল হক ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি পীর সাহেব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে তাঁকে বিশের দশকে নোয়াখালী জেলা থেকে বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জাপানে বোমাবর্ষণ শুরু হলে তাঁর বাবা তাঁদের পরিবারের সকলকে নিয়ে বগুড়া চলে আসেন। মা নূরজাহান বেগম ছিলেন গৃহিনী। মা'র কাছে প্রথম তিনি বৃটিশ খেদাও আন্দোলন এবং বৃটিশ পণ্য বর্জনের গল্প শোনেন। তাঁর দাদা মওলানা আবদুল বারী এবং নানা মওলানা সাকরুদ্দীন পীরসাহেব ছিলেন। পাঁচ ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বড় ভাই ফরিদউদ্দিন, ছোট তিন ভাইয়ের মধ্যে নিজাম-উল হক, গোলাম কিবরিয়া এবং কাজল। বোনেরা আফিয়া বেগম, ফিরোজা বেগম হীরা এবং আব্রু বেগম রানী। শৈশবকাল ছেলেবেলায় গাজীউল হক ছিলেন অনেক দুরন্ত, সাহসী এবং জেদি। হাতের কনুই দিয়ে নারকেল ভেঙ্গে ফেলতেন। একবার কোনো কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলে তা তিনি করেই দেখাতেন। পনের/ষোল বছর বয়সে একদিন তিন বাড়ির থেকে কিছুটা দূরে এক মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর এক বন্ধু। মাঠে তাঁরা একটি ষাঁড় দেখতে পান। ষাঁড় দেখে বন্ধুটির মাথায় খেলে গেল এক দুষ্টু বুদ্ধি। তিনি গাজীউল হককে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুই যদি ঐ ষাঁড়ের সঙ্গে লড়ে জিততে পারিস তাহলে তোকে পাঁচ টাকা পুরস্কার দেবো। গাজীউল হক আর দেরি করলেন না। দ্রুত ষাঁড়ের সঙ্গে লড়ার জন্য মাঠে নেমে যান। ষাঁড়কে কাবু করে বন্ধুর কাছ থেকে জিতে নেন পাঁচ টাকা। শিক্ষাজীবন গাজীউল হকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা যখন শুরু হয় তখন তিনি থাকতেন নোয়াখালী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে। বাড়ির সামনে একটি মক্তবে তাঁর পড়াশুনা শুরু হয়। মক্তবে তাঁর শিক্ষক ছিলেন জমিরউদ্দিন। শিক্ষাজীবনের প্রথম শিক্ষক সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, 'এলাকা জুড়ে তার শিক্ষক জমিরউদ্দিনের সুনাম ছিল। তিনি মিথ্যা কথা বলতেন না। আর আচরণের মধ্যে একটা অদ্ভুত বিষয় ছিল-তিনি কখনও তাঁর ছাত্রদের তুমি বলতেন না। ছোট ছোট শিশুদের আপনি করে বলতেন।' এই মক্তব পরীক্ষায় তিনি দু'টাকার বৃত্তি পান। মক্তবের পড়াশুনা শেষ করে তিনি কাশিপুর স্কুলে ভর্তি হন। তৃতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বের হলে তিনি দেখলেন প্রথম হয়েছে অন্য ছাত্র। কিন্তু তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনিই প্রথম হবেন। এ কারণে নিজের ভুল খুঁজে বের করার জন্য তিনি শিক্ষকদের কাছে পরীক্ষার খাতা দেখতে চাইলেন। অংক খাতা নিরীক্ষা করে ধরা পড়ল ভুলে শিক্ষক তাঁকে অংকে নম্বর কম দিয়েছেন। তিনি অংকে একশত নম্বরই পেয়েছেন। পরে সব বিষয়ের নম্বর যোগ করে দেখা গেল তিনি প্রথম হয়েছেন। এই স্কুল থেকে তিনি উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি লাভ করেন। এখান থেকে ১৯৪১ সালে গাজীউল হক বগুড়া জেলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। গাজীউল হক ছিলেন ক্লাশের একমাত্র মুসলিম ছাত্র। এর ওপরে আবার পীরের ছেলে। মুসলিম হলেও অল্পসময়ের মধ্যেই সহপাঠীদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকদের কাছেও তিনি প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পরই ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উদযাপন করার জন্য ছাগলনাইয়ায় মিছিল বের হয়। গাজীউল হক এই মিছিলে অংশ নেয়। মিছিল এগিয়ে ছাগলনাইয়া থানা কার্যালয়ের সামনে পৌঁছলে তিনি সেখানে বৃটিশ পতাকা উড়তে দেখেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৃটিশ পতাকা ইউনিয়ন জেক নামিয়ে সেখানে পাকিস্তানি তিনকোণা পতাকা উড়িয়ে দেন। একাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন তাঁর দুই সহপাঠী মুজিবুল হক এবং খলিলউল্লাহ। এই অপরাধে পুলিশ তাঁদের ধরে নিয়ে হাজতে চালান দেয়। মেধাবী শিক্ষার্থী হওয়ায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁদের কয়েক ঘন্টার মধ্যে হাজত থেকে মুক্ত করে আনেন। এই স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি ইতিহাস শিক্ষক সুরেন স্যারের সান্নিধ্যে আসেন এবং বৃটিশ বিরোধী মনোভাব তার ভেতরে দানা বাঁধে। এতেই থেমে রইলেন না তিনি। সে সময়ে কয়েকজন ছাত্র মিলে 'বিদ্রোহী' নামে একটি হাতে লেখা ম্যাগাজিন বের করতেন। গাজীউল হক ওই পত্রিকায় একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি জেলা প্রশাসনের নজরে পড়ে। জেলা প্রশাসন দ্রুত বিদ্যালয় কতৃর্পক্ষকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। সহকারী প্রধান শিক্ষক আবেদ আলী জেলা প্রশাসনের এই নির্দেশকে মানতে পারলেন না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করেন। প্রতি বছরই বিদ্যালয়ে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। একবার তিনি এই সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বির্তক, আবৃত্তি এবং গানে অংশ নিয়ে পুরস্কার পান। আর চার লাইনের একটি ছড়া লিখে তিনি বেশি আলোচিত হন। ছড়াটি ছিল - আমি গাইব গান মুক্ত কন্ঠে, জীবন দীপের আলো জ্বেলে, সুর ছড়াবো, রং ছড়াবো, পুড়বো আমি, আলো ছড়াবো। ১৯৪৬ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপরই তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আইএ ভর্তি হন। কলেজে ভর্তি হয়েই তিনি অধ্যক্ষ ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সংস্পর্শে আসেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বগুড়া কলেজের আর্থিক সাহায্যের জন্য বিভিন্ন ইছালে ছওয়াবে বক্তৃতা দিতেন। প্রায় প্রতিটি জলসায় তালেবালেম হয়ে তাঁর সঙ্গী হতেন গাজীউল হক। এ থেকে যে অর্থ পাওয়া যেতো তা সম্পূর্ণ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কলেজের উন্নয়ন তহবিলে দান করতেন। পাশাপাশি কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রদের সাংস্কৃতিক বিকাশ ও মননশীলতার অনুশীলনের জন্য 'শিল্পায়ন' নামে একটি পাঠচক্র গড়ে তোলেন। যে ক'জন শিক্ষক এটি গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক আবুল খায়ের, অধ্যাপক গোলাম রসুল ও অধ্যাপক পৃথ্বিশ দত্ত। এই পাঠচক্রে অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে গাজীউল হক, কবি আতাউর রহমান, তছিকুল আলম খান, জালাল উদ্দিন আকবর প্রমুখ নিয়মিত পড়াশুনা করতেন। সপ্তাহে একদিন রোববার এই পাঠচক্রে আসর বসতো। এই আসরে ছাত্ররা গল্প, কবিতা রচনাসহ আবৃত্তি করতেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অসাম্প্রদায়িক যুব প্রতিষ্ঠান গণতান্ত্রিক যুবলীগের দুদিনব্যাপী কমী সম্মেলনের আয়োজন করে। গাজীউল হক বগুড়ার পাঠচক্র 'শিল্পায়নে'র সদস্যদের সঙ্গে অংশ নেন। এই সম্মেলনে নেতৃত্ব দেয় তাসাদ্দুক হোসেন, মোহাম্মদ তোয়াহা, শামসুল হক প্রমুখ। সম্মেলনে প্রস্তাব পাঠ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। যার অন্যতম প্রস্তাব ছিল 'মাতৃভাষাই হবে শিক্ষার বাহন, অফিস আদালতের ভাষা হবে বাংলা।' এভাবেই তিনি ভাষা আন্দোলনের একনিষ্ঠ কমী হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে এসব কাজে জড়িয়ে পড়ায় পড়াশুনার প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য তিনি আই.এ. পরীক্ষার পনের দিন আগে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে পড়াশুনা শুরু করেন। পরীক্ষার ফল বেরুলে তাঁর প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানালেন গাজীউল হক ফেল করেছে। তাঁর বাবা ছেলের কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতেন। তিনি তাদের কথা বিশ্বাস করলেন না। বরং ধমকে দিলেন এই বলে তাঁর ছেলে এমন ফল করতেই পারে না। অবশেষে গাজীউল নিজে কলেজে গিয়ে জানলেন তিনি স্টার মার্কস নিয়ে পাশ করেছেন। ১৯৪৮ সালে তিনি বগুড়া কলেজ থেকে আই.এ. পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিষয়ে অর্নাসে ভর্তি হন। এরপরই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র হন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কারাবরণ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন-বেতন কর্মচারিগণ ধর্মঘট আহবান করলে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে তিনিও এর সমর্থন করেন। এই ধর্মঘট আন্দোলনে কেন্দ্রীয়ভাবে কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ১৬ নং কক্ষ থেকে। এই কক্ষটি গাজীউল হকের নামে বরাদ্দ ছিল। এখানে আসতেন ছাত্রনেতা অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুর রহমান চৌধুরী, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ। '৪৯ এর এই ধর্মঘট আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সালে অর্নাস পাশ করে এম.এ.-তে ভর্তি হন। এবার তিনি ফজলুল হক হলের আবাসিক ছাত্র হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের উপস্থিত বক্তৃতা, আবৃত্তি, বির্তক প্রভৃতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। গান গেয়েও গানের আসরকে মাতিয়ে তুলতেন। ১৯৫২ সালে তিনি এম.এ. পাশ করেন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ তাঁর এম.এ. ডিগ্রি কেড়ে নেয়। পরবতীতে ছাত্রনেতা ইশতিয়াক (ব্যারিস্টার), মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান (আওয়ামী লীগের নেতা) প্রমুখের প্রচণ্ড আন্দোলনের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর এম.এ. ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন শাস্ত্রে ভর্তি হন। এ বছরের ১৪ এপ্রিল তাঁকে চার বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে ছাত্র আন্দোলনের চাপে কারাগারে থাকতেই তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে বহিষ্কারাদেশের কারণে তিনি কারাগারে বসে আইন পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাননি। পরবতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জেংকিন্স ও রেজিষ্টার হাদী তালুকদারের আন্তরিক সহযোগিতায় ১৯৫৬ সালে তিনি একসঙ্গে ১১ পেপার আইন পরীক্ষা দেন। এরপরও তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে কৃতকার্য হন। এরপরই তাঁর ছাত্রজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। পারিবারিক জীবন গাজীউল হকের বাবা-মা, ভাই-বোনদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। বাবার সঙ্গে তিনি পড়াশুনা নিয়ে যেমন আলোচনা করতেন, তেমনি রাজনীতি নিয়েও আলোচনা করতেন। ভাইবোনদের পড়াশুনার প্রতি খেয়াল রাখতেন। শুধু তাই নয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আবহ গড়ে তোলেন। তিনি যেমন ভালো সেতার বাজাতে পারতেন, তেমনি ছোট বোন হীরা ও নিজাম ভাল গান গাইতেন। মাঝে মাঝে বাড়িতে ঘরোয়া জলসার আয়োজন করা হতো। সেই জলসায় তাঁর মা হারমোনিয়াম বাজিয়ে দরুদ শরীফ করতেন। তাঁর ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে এক মজার ঘটনা আছে। তাঁর বড় ভাই ফরিদউদ্দিন সাকী ছোট বোন রানীর বিয়ে ঠিক করেন এক মৌলভীর সঙ্গে। গাজীউল হক এ বিয়েতে অমত প্রকাশ করলেন। তাঁর অমতের কথা বাবাকে জানালেন। সেখানেই থেমে রইলেন না। বন্ধু মোজাহারুল ইসলাম আবুর সঙ্গে বোনের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আবুর বাবার কাছে গেলেন। আবুর বাবা গাজীউল হকের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলেন। কয়েকদিনের মধ্যে মোজাহারুলের সঙ্গে ধুমধামে বোনের বিয়ে দেন। বিয়ের পর মাঝে মাঝে বোন বোনের জামাইসহ তাঁদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। তিনি আগে থেকে তাঁদের আসার খবর জানতে পারলে সেতার নিয়ে বাজাতে বসতেন। আর মজা করে বলতেন, 'তোমরা আসবে জেনেই এই আগমনী সুর বাজাচ্ছি।' তাঁদের বাড়ির খুব কাছেই ছিল কাটনাপাড়ার নামাযগড়। এখানে তাঁর এক রাজনৈতিক বন্ধু বাস করতেন। নাম আবু মুসা জহুরুল হক। আবু মুসার বাবা ছিলেন আইনজীবী। বগুড়াতেই তিনি প্র্যাকটিস করতেন। তিনি তাঁর তৃতীয় কন্যা জাহানারা বেগম এলিনার বিয়ের জন্য পাত্রের খোঁজ করছেন। এলিনা সবে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে বি.এ. পরীক্ষা দিয়েছেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে এলিনার বড় ভাই আবু মুসা গাজীউল হককে বলেন, 'গাজী তুই কী আমার বোনকে বিয়ে করবি?' তিনি কনে না দেখেই তত্ক্ষনাত্ হ্যাঁ করেন। তখনি বন্ধু আবু মুসা বলেন, 'আমার বোনকে দেখবি না?' গাজীউল হক প্রতি-উত্তরে বলেন, 'তোর বোন কানা হোক, ন্যাংড়া হোক, আমি বিয়ে করব। আমি যখন বলছি, তাহলে বিয়ে করব।' ১৯৫৭ সালের ২৫ মার্চ ছিল গাজীউল হকের বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাড়িতে ওরস হচ্ছে। ওরস চলাকালীন সময়ে তাঁর মা হঠাত্ করে অজ্ঞান হয়ে যায়। এদিকে তাঁকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। এসব দেখে আত্মীয়-স্বজন সবাই বিচলিত হয়ে ওঠেন। তখনই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেয় বাচ্চুকে (গাজীউল হকের ডাক নাম) বিয়ে করাতে হবে। গাজীউল হকের চাচা সে সময়ে ওরসে উপস্থিত ছিলেন। তখনই তাঁরা নিজেদের মধ্যে প্রাথমিক কথাবার্তা আলোচনা করে আবু মুসাকে বিয়ের দিন ঠিক করার পরামর্শ দেন। তিন দিনের মাথায় ২৮ মার্চ জাহানারা বেগম এলিনার সঙ্গে গাজীউল হকের বিয়ে হয়। তাঁদের চার মেয়ে, এক ছেলে। ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় স্ত্রীর বড় বোনের বাসায় বেড়াতে আসেন। তাঁর জেঠাস জাহেরা বেগম পেশায় চিকিত্সক ছিলেন এবং তাঁর স্বামী কামরুল ইসলাম ছিলেন আইনজীবি। তাঁরা থাকতেন সুত্রাপুর থানার রূপচাঁদ লেনের একটি বাড়িতে। বাড়ির ছাদে বসে বিকেলবেলা সবাই মিলে গল্প করছেন। গল্পের রেশ ধরেই গাজীউল হক বারবার হেসে উঠছিলেন। তাঁর হাসির শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল। এই বাড়ির কয়েকটি বাড়ির পরে একটি বাসায় রণেশ দাশ গুপ্ত এবং সত্যেন সেন বেড়াতে এসেছেন। তাঁরা গাজীউল হকের হাসির শব্দ শুনে চিনে ফেলে এখানেই কাছের কোনো বাড়িতে গাজীউল হক আছে। এটিতো গাজীউল হকের হাসির শব্দ। তাঁরা দেরি করলেন না খোঁজে বেরিয়ে পরলেন। খুঁজতে খুঁজতে তাঁকে আবিষ্কার করলেন কামরুল ইসলামের বাসায়। বড় মেয়ের বয়স যখন নয় মাস তখন তিনি জেলে যান। স্ত্রী এলিনা শাশুড়ি ও মেয়েকে নিয়ে মাঝে মাঝে জেলখানায় গাজীউল হকের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তিনি জেলখানায় মেয়েকে দেখামাত্র ছোট্ট হাতে একটা চকোলেট ও একটা ফুল তুলে দিতেন। একবার ঘটল অন্যরকম ঘটনা। ছোট্ট নতুনা একটু একটু করে হাঁটতে শিখেছে। শাশুড়ি ও নতুনাকে নিয়ে স্ত্রী তাঁর সঙ্গে বগুড়া কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করতে যান। গাজীউল হক সেদিন একটি বিশেষ কারণে চিন্তিত ছিলেন। জেলার তাঁকে বন্ড দেবার জন্য চাপ দিচ্ছে। বন্ডে লিখতে হবে তিনি আর রাজনীতি করবেন না। বন্ড না দিলে তারা তাঁকে ছাড়বে না। তিনিও কিছুতেই বন্ড দেবেন না। এই বিষয়টি তিনি সিগারেটের চিকচিক কাগজের মধ্যে ছোট্ট একটু চিরকুট লিখেছেন। তিনি চিরকুটে এক শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে লিখেছেন, 'তোমরা তাঁর কাছে যাও। তিনি হয়তো জেল থেকে আমার বের হওয়ার একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন যাতে এই বন্ডটা না দিতে হয়।' এজন্য তিনি স্ত্রীকে দেখা করতে ডেকেছেন। এই চিরকুটটা তিনি স্ত্রীকে দিবেন। কিন্তু কীভাবে? একটি বড় টেবিলের এককোণে বসেছেন গাজীউল হক। অন্যকোণায় জেলার। আর একপাশে স্ত্রী এবং অন্যপাশে মা। নার্ভাসে তাঁর কপাল জুড়ে ঘাম জমতে থাকে। এ কারণে তিনি সেদিন মেয়ের জন্য চকোলেট ও ফুল আনতে ভুলে গেছেন। প্রতিদিনের অভ্যাস মতো নতুনা বাবার কাছ থেকে চকোলেট ও ফুল না পাওয়ায় বারবার কাছে গিয়ে বায়না ধরে। তাঁর ভেতর অস্থিরতা কাজ করছিল এই ভেবে চিরকুটটি স্ত্রীকে দেবার সময় যদি জেলারের কাছে ধরা পড়ে যায় তাহলে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে। অস্থিরতায় বারবার রুমাল দিয়ে মুখের ঘাম মুছেন। এলিনা স্বামীর আচরণ দেখে উদ্বিগ্ন হন। তিনি সেদিন একটি নতুন শাড়ি পড়ে গিয়েছিলেন। এর আগে গাজীউল স্ত্রীকে এই শাড়িটি কখনো পরতে দেখেননি।এই সুযোগটি তিনি পুরোপুরি কাজে লাগালেন। শাড়ি দেখার ভঙ্গীতে তিনি একটু কাত হয়ে চিরকুটটি স্ত্রীর কোলে ফেলে দেন। এলিনা চিরকুটটি দেখতে পেয়ে হাতের মধ্যে নিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে একটু হাসেন। স্ত্রীর মুখে হাসি দেখে তিনি এবার স্বস্তি পান। গাজীউল হক জেলখানায় বেশিরভাগ সময় থাকার পরও তাঁদের দুজনের মধ্যে এমনি একটি সমঝোতা ছিল। ১৯৬০-৬১ সালের ঘটনা। গাজীউল হককে বগুড়া জেল থেকে রাজশাহী জেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জেলার ছিলেন বাঙালি। তিনি গাজীউল হকের বাড়িতে লোক মারফত সংবাদ পাঠালেন স্টেশনের একটি হোটেলে তাঁকে নাশতা খাওয়াতে নিয়ে যাওয়া হবে। তাঁরা সাক্ষাত্ করতে চাইলে দ্রুত এসে দেখা করে যেতে পারেন। স্ত্রী এলিনা খবর পাওয়ামাত্র যেভাবে ছিলেন সেভাবেই শাশুড়িকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে ঐ হোটেলে আসেন। মা স্ত্রী সন্তানকে পাঁচ মিনিট সময়ের জন্য চোখের দেখা তাঁকে অনেকটা শান্তি দেয়। বড় মেয়ের বয়স যখন তিন বছর তখন তিনি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। বড় মেয়েকে বগুড়া ভি এম গার্লস স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়ে তিনি এক নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। তিনি মেয়ের নাম রাখেন নতুনা হক। ইসলামি নাম না হওয়ায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই নাম পছন্দ হলো না। প্রধান শিক্ষক সরাসরি বললেন, 'এটি বাংলা নাম। বাংলা নামে আপনার মেয়েকে ভর্তি করাব না। নাম বদলে আসলে আমরা ভর্তি করাতে পারি।' গাজীউল হক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পাল্টা জবাব দেন, 'আমার মেয়ে যদি এই নামে ভর্তি হতে পারে তাহলে ভর্তি হবে। তা না হলে আমার মেয়ে বাসায় পড়াশুনা করবে। আমার মেয়েকে এই বিদ্যালয়ে পড়াব না।' এই কথা বলে তিনি মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে এলেন। পরবতীতে ভিএম গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা বাসায় লোক মারফত খবর পাঠালেন তারা মেয়েকে ভর্তি করাবেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সপরিবারে ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন। বড় মেয়ে নতুনা হক, মেজ মেয়ে সুজাতা হক, তৃতীয় মেয়ে সুতনুকা হক ও ছোট মেয়ে সুমনিকা হক আর একমাত্র ছেলে রাহুল গাজী। রাজনীতি, আইন ব্যবসা নিয়ে তাঁর ব্যস্ত সময় কাটলেও সন্তানদের তিনি সময় দিতেন। ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে বেরুতেন। সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় কিনে দিয়েই কেনাকাটা শেষ করতেন না। ঈদে সাজার জন্য চুড়ি, ফিতে, ক্লিপ, নেলপলিশ যার যেটা পছন্দ তা কিনে দেবার জন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে করে নিয়ে দোকানে ছেড়ে দিতেন। তারা যেন তাদের পছন্দমতো জিনিসটি কিনতে পারে। ছেলেমেয়েরাও মহোল্লাসে যা পছন্দ হতো তাই কিনে নিতো। বাড়তি জিনিস কিনে ছেলেমেয়েরা টাকা অপচয় করেছে এ নিয়ে তিনি কখনও ভাবতেন না। বরং সন্তানদের খুশি দেখেই তিনি আনন্দিত হতেন। রাজনৈতিক জীবন গাজীউল হক ১৯৪১ সালে ছাগলনাইয়া স্কুল থেকেই রাজনীতি অঙ্গনে প্রবেশ করেন। এর পরের বছর পারিবারিক কারণে বগুড়ায় এসে বসবাস শুরু করেন। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই বগুড়ার রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ঘটে। বগুড়া আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হবার সময় অধ্যক্ষ হিসেবে পান ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। তাঁর সংস্পর্শে এসে গাজীউল হক বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন। একই বছর কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্সে তিনি যোগ দেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি ধুবড়িতে অনুষ্ঠিত আসাম মুসলিম লীগ কনফারেন্সে যোগ দেন। এখানে তিনি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ব্যক্তিত্ব, বাগ্মীতা এবং নেতৃত্বে আকৃষ্ট হন। এর ছয় মাস পর বাহাদুরাবাদ ঘাটে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অপর একটি সম্মেলনে তিনি অংশ নিলে মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রপাত হয়। পাকিস্তান হওয়ার পর অধিকাংশ মুসলিম ছাত্র বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গাজীউল হকও সেই রাজনীতিতে অংশ নেয়৷। ১৯৪৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুব লীগের ঈশ্বরদী কনফারেন্সে উত্তরবঙ্গ শাখার যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচন হন। ১৯৪৮ সালে পূব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি হন। এ বছরই প্রথম বাংলা ভাষার দাবিতে প্রদেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে বগুড়ার ছাত্রদের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে নেতৃত্বদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বগুড়াতে কবি আতাউর রহমানকে আহ্বায়ক করে একটি 'বাংলা ভাষা সংগ্রাম কমিটি' গঠন করা হয়। এই কমিটিতে শিক্ষক ও ছাত্র ছাত্রী প্রতিনিধি ছিলেন। বগুড়ায় দু'জন ছাত্রী রহিমা খাতুন ও সালেহা খাতুন এই কমিটিতে ছিলেন। ১১ মার্চ গাজীউল হক বগুড়া কলেজ থেকে ছাত্রদের মিছিল নিয়ে বগুড়া শহরের দিকে এগিয়ে যান। তখন ড. শহীদুল্লাহ রিকশায় চড়ে কলেজের দিকে আসছিলেন। গাজীউল হক ছাত্রদের নিয়ে তাঁর রিকশা থামিয়ে তাঁকে মিছিলে নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করেন। ড. শহীদুল্লাহ ছাত্রদের এই অনুরোধে সম্মতি জানিয়ে রিকশা থেকে নেমে মিছিলে অংশ নেন। সঙ্গে সঙ্গে মিছিলে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা তুমুল করতালির মধ্য দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন করেন। তিনি গাজীউল হকের দিকে তাকিয়ে তাঁর স্বভাবসুলভ ঢঙ্গে বলেন, 'মানে কি যে অ্যাঁ আমাকে কি করতে হবে?' গাজীউল হক বললেন, 'স্যার, আপনাকে মিছিলের নেতৃত্ব দিতে হবে এটা আমাদের দাবি।' তিনি কিছুক্ষণ ভাবলেন এরপর একটু হেসে তাঁর চিরপরিচিত সেই ব্যাগটি গাজীউল হকের হাতে দিয়ে বললেন, 'মানে কি যে আঁওপীর সাহেব, তাহলে তুমি আমার বোঝাটা নাও আর আমি তোমার বোঝাটা নিয়ে নিলুম।' বগুড়া জেলা স্কুল ময়দানে সেদিনের সভার সভাপতি ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সভাপতি হিসেবে বাংলাকে রাষ্ট্র্রভাষা করার দাবির স্বপক্ষে দীর্ঘ সময়ব্যাপী যুক্তি ও তথ্য নির্ভর ভাষণ দেন। এই ভাষণ সেদিন জনসমাবেশকে বিমোহিত করে। প্রদেশব্যাপী বামপন্থী প্রগতিশীল আন্দোলন যখন দানা বেঁধে উঠেছিল, সেই সময়ে বগুড়া থেকে গাজীউল হক, আবু মো. মজাহারুল ইসলাম, আতাউর রহমান (বগুড়া), তাছিকুল আলম খান (সম্পাদক অগত্যা মাসিক), জামালউদ্দিন আকবর প্রমুখ ঢাকায় ডেমোক্রেটিক ইকুথ লীগ কনভেশনে যোগ দেন। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন প্রকাশ্যে পাবলিক হলে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগের কনভেশন করতে বাধা দেওয়ায় অনুষ্ঠানটি ইয়ার মোহাম্মদ খানের বাসায় অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ লীগ গঠিত হয়। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কয়েকজন প্রথম সারির নেতা মনি সিং, খোকা রায়, আবদুল কাদের চৌধুরী, আলতাফ হোসেন, রণেশ দাশ গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ওই সময়ে বগুড়ার যুব ছাত্রলীগের ভেতরে প্রগতিশীল আন্দোলনকে চাঙ্গা করার জন্য আরেকটি সংগঠন গড়ে উঠেছিল। তার নাম 'প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘ'। এর বৈঠক হতো বগুড়া কলেজের ইসলামিক ইতিহাসের অধ্যাপক আবুল খায়ের আহম্মদ-এর বাসায়। এই আসরে গাজীউল হক, কবি আতাউর রহমান, ব্যঙ্গ লেখক তাছিকুল আলম খান, জালালউদ্দিন আকবর, কমিউনিস্ট আবদুল মতিন, শ্যামাপ্রসাদ সেন, মমতাজ উদ্দীন তরফদার প্রমুখ তাঁদের স্বরচিত লেখা পাঠ করতেন। ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্ন কর্মচারীরা ধর্মঘট আহ্বান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ কর্মচারীদের এই ধর্মঘটের সমর্থনে ধর্মঘট করে। মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম দিকে আবদুর রহমান চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সভা হয়। এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয় নিম্ন কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত উপাচার্যের বাসভবনে অবস্থান ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবস্থান ধর্মঘট চলতে থাকে। এই কারণে ১০ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতর্পক্ষ ১১ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ করে দেয়। এসময় গাজীউল হক সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের দোতলায় পূর্ব দিকে ১৬ নং কক্ষের আবাসিক ছাত্র। এই কক্ষে দুটি সিট ছিল। একটি গাজীউল হকের অন্যটি আলী আশরাফের। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করায় আলী আশরাফ হল ছেড়ে চলে যান। তাঁর সিট দখল করেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরা দুজনে ১৬ নং কক্ষে থেকেই আন্দোলনে অংশ নেন। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ মাসের ১১ তারিখে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দান থেকে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি ভুখা মিছিল বের হয়। এই মিছিলে গাজীউল হকও শরিক হন। মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে তিনি প্রথম সারিতে ছিলেন। মিছিল থেকে মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫০ দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। যদিও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন না। গাজীউল হক ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বগুড়ার মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত করেন। শুধু তাই নয় কাগমারী সম্মেলনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনে আওয়ামী লীগের সর্বাঙ্গীন প্রতিকূলতা প্রতিরোধে ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং এই পার্টি গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। কর্মজীবন ১৯৫৭ সালে আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পূর্ব-পাকিস্তান ঢাকা হাই কোর্টে আইন ব্যবসায়ের সনদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে যোগদান করেন। সর্বোচ্চ আদালতে একজন আইনজীবী হিসেবে দক্ষতার সঙ্গে আইন ব্যবসা পরিচালনা করেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে অংশগ্রহণ ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১০ তারিখে ঢাকার নবাবপুর, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলি, লক্ষ্মীবাজার, বনগ্রাম এলাকায় দাঙ্গা ভয়াবহ আকার নেয়। এ দাঙ্গায় বহু হিন্দু নিহত হয়। এই দাঙ্গার প্রথম দিনেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে একটি দাঙ্গা বিরোধী মিছিল বের হয়। খালেক নেওয়াজ খানের নেতৃত্বে 'পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগে'র কয়েকজন ছাত্র রাস্তায় বের হয়। মেডিকেল কলেজের অধিকাংশ ছাত্র ড. গোলাম মওলার নেতৃত্বে শান্তি মিছিলে যোগ দেন। ফজলুল হক মুসলিম হল থেকেও কয়েকজন ছাত্র মোশাররফ হোসেন, আবদুল মোমিনের নেতৃত্বে মিছিলে যোগ দেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে গাজীউল হক, সৈয়দ মোহাম্মদ আলী, রুহুল আমিন কায়সার, গোলাম কিবরিয়া, খন্দকার গোলাম মোস্তফা, সাদেক খান, নাজির হোসেনসহ কয়েকজন ছাত্র দাঙ্গা বিরোধী মিছিলে যোগ দেবার জন্য বের হতেই পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কিছু ছাত্র রুহুল আমিন কায়সারকে হিন্দুর দালাল বলে মারধর করতে উদ্যত হয়। গাজীউল হকের হস্তক্ষেপেই রুহুল আমিন রক্ষা পান। প্রচণ্ড বাধা সত্ত্বেও তাঁরা একটি দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন। সেই সঙ্গে একটি শান্তি কমিটিও গঠন করা হয়। এই শান্তি কমিটির সভাপতি হন ড. কাজী মোতাহার হোসেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক মাহমুদ, ড. নূরুল হুদা, অধ্যাপক নাজমুল করিম এবং আরো অনেকেই এ কমিটিতে ছিলেন। শান্তি কমিটির উদ্যোগে ১২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ড. কাজী মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা চলাকালীন সময়ে বক্তারা যখন দাঙ্গার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন তখন একজন শান্তিনিকেতনী কবির নেতৃত্বে নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কিছু ছাত্র এই সভায় আক্রমণ চালায়। গাজীউল হক কয়েকজন ছাত্র নিয়ে দাঙ্গাকারীদের প্রতিহত করার জন্য পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই পরিস্থিতিতে টিনের চোঙ্গা নিয়ে কবি হাসান হাফিজুর রহমান দাঙ্গাকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অন্যদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দাঙ্গা সমর্থকদের হটিয়ে দেবার পর টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে বলেন, 'আমি কোরান হাদিস পড়েছি, আমি চ্যালেঞ্জ করছি কেউ যদি কোরান কিংবা হাদিস থেকে দেখাতে পারে যে নিরীহ এবং নিরস্ত্র হিন্দুদেরকে হত্যা করা পুণ্যের কাজ তবে আমি তার দাসত্ব স্বীকার করবো।' গাজীউল হক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর দৃঢ়তা দেখে অভিভূত হয়ে যান। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও একটি ঘটনা ঘটে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর পি সি চক্রবতীকে সরকার পূর্ববঙ্গ থেকে বহিষ্কারের নোটিশ প্রদান করে। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একটি মিছিল বের করে। এই মিছিলে গাজীউল হকও অংশ নেন। মিছিল শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাবিবুর রহমান শেলীর সভাপতিত্বে একটি সভা হয়। উক্ত সভায় শিক্ষকদের ওপর সরকারি হামলার নিন্দা করা হয়। কিন্তু পরবতীতে পিসি চক্রবতীকে দেশ ছেড়ে যেতে সরকার বাধ্য করেন। গাজীউল হকসহ অন্যান্য ছাত্ররা তা ঠেকাতে পারেননি। বায়ান্নো'র ভাষা আন্দোলন ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। আবদুল মতিনকে এই কমিটির আহ্বায়ক নিযুক্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটির উদ্যোগে ১৯৫০ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকায় এসে পল্টনের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন 'উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা'। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্র হলে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। ঘোষণানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। গাজীউল হকও সেই সভায় অংশ নেয়। সভা শেষে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে ফুলার রোড হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্য মন্ত্রী নূরুল আমীনের বাসভবনের সামনে (বর্তমান বাংলা একাডেমী ) বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এদিনই ঢাকা মোক্তার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠন করা হয়। এতে আওয়ামী মুসলিম লীগ, খেলাফতে রাব্বানী, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব-পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রভৃতি দল থেকে দু'জন করে প্রতিনিধি এবং প্রতিটি হল থেকে দু'জন করে হল ইউনিয়নের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক এ পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সভায় সিদ্ধান্ত অনুসারে ৪ ফেব্রুয়ারি সারা ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দলে দলে ছাত্র মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এসে সমবেত হয়। এই সভার সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক। এর পেছনেও একটি মজার ঘটনা রয়েছে। মিছিলবিরোধী পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্যগণ যাতে কোনো রকম সুযোগ না পায় এজন্য যুবলীগ ও অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্ররা বেশ তত্পর ছিলেন। মধুদার ক্যান্টিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় একটি ছোট টেবিল আনা হয়। মধুদার ক্যান্টিন থেকে টেবিল আনার পর চেয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন খালেক নেওয়াজ খান। তাঁর সঙ্গে পূর্ব-পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্যান্য কমীরাও অপেক্ষা করছেন। চেয়ার এসে সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই এম আর আখতার মুকুল টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে সভাপতি হিসেবে গাজীউল হকের নাম প্রস্তাব করেন। এরপরেই কমরুদ্দীন শহুদ পায়ের আঙ্গুলের ওপর ভর করে উচুঁ হয়ে হেঁড়ে গলায় প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। এম আর আখতার মুকুল টেবিল থেকে নেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীউল হক টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে দু'মিনিট বক্তৃতা করেই মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সভা শেষে ১০ সহস্রাধিক ছাত্র-ছাত্রীর এক বিরাট শোভাযাত্রা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলতলায় সমবেত হয়।

তথ্যসূত্র : গুণীজন
Rationale
UploaderRaihan Ahamed