Golden Bangladesh
Eminent People - হেনা দাস

Pictureহেনা দাস
Nameহেনা দাস
DistrictSylhet
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeসংগঠক
Life Style
ছেলেবেলা থেকেই স্বদেশী গান এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে তিনি খুব ভালোবাসতেন। আবার সবুজ ঘাসে দৌড় ঝাঁপ ও খেলাধুলা শিশু বয়সে তাঁর খুব প্রিয় ছিল। সাথীদের নিয়ে প্রতিদিন বিকেল বেলা খেলাধুলা করতেন। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর বুদ্ধিদীপ্ত এই মেয়েটি স্কুল জীবন থেকেই ছিলেন দেশ ও সমাজ সচেতন। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি বই ও পত্রিকা পড়তেন। ফলে সমাজ, রাজনীতি ও ব্রিটিশ সরকারের শোষণ বিষয়ে ছেলেবেলা থেকেই তিনি স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছেন। তিনি যখন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন তখন দেশ জুড়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের আগুন জ্বলছে। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালে ব্রিটিশ সরকারের নিষিদ্ধ ঘোষিত পত্রিকা পড়ার সাহস তাঁর হয়েছিল। পরবর্তীতে নারী শিক্ষা, প্রান্তিক ও বঞ্চিত নারীদের সংগঠিত করা, নানকার নারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামসহ আরো বহু ক্ষেত্রে এই অসামান্য নারী কাজ করেছেন। ব্রিটিশ-বিরোধী-আন্দোলন, ভাষা-আন্দোলন, ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামসহ দেশের সকল ক্রান্তিলগ্নে তিনি ছিলেন সক্রিয়। এই সাহসী সংগ্রামী নারী হলেন হেনা দাস। যিনি সারাজীবন সাধারণ জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। বাংলার নারী জাগরণে যে ক'জন নারী তাঁদের সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিশেষ অবদান রেখেছেন হেনা দাস তাঁদের মধ্যে অন্যতম। হেনা দাস তাই এক সাহসী যোদ্ধার নাম- এক প্রেরণা ও আপোষহীন ব্যক্তিত্বের নাম। ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হেনা দাস সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সতীশচন্দ্র দত্ত একজন স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন। হেনা দাসের মা মনোরমা দত্ত ছিলেন চুনারুঘাট থানার নরপতি গ্রামের জমিদার জগত্চন্দ্র বিশ্বাসের বড়ো মেয়ে। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হেনা দাস সর্ব কনিষ্ঠ। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্কে অংশগ্রহণ করতেন। মাঝে মাঝে বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাস করতেন। হাই স্কুল পার হবার আগেই হেনা দাস স্থানীয় বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। স্থানীয় অনেক রাজনীতিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তির সংস্পর্শে এসে হেনা দাস সাম্রাজ্যবাদের শাসন ও শোষণ সম্পর্কে ধারণা পান। বুঝতে পারেন দেশের জন্য কিছু করতে হবে। বিশেষ করে নারী সমাজের জন্য তিনি সব সময়ই কিছু একটা করার তাগিদ অনুভব করতেন। ভারতীয় উপমহাদেশের জন্য ত্রিশ দশক ছিল বিক্ষোভ, আন্দোলন ও বিদ্রোহের সূচনাকাল। হেনা দাসের বাড়ি ছিল সিলেট শহরের কেন্দ্রস্থল পুরান-লেন পাড়ায়। বাড়ির কাছে ঐতিহাসিক গোবিন্দ পার্ক ছিল মূলত সমাবেশের কেন্দ্র। ফলে তিনি কাছ থেকে শ্লোগান, মিছিল ও সভা-সমাবেশ দেখেছেন। দেখেছেন স্বদেশিদের ওপর বর্বর পুলিশি নির্যাতন। এসব তাঁর মনের গভীরে দাগ কেটেছিল। এভাবেই হেনা দাসের মনে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জন্ম নেয়। ফলে কৈশোর থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে হেনা দাসের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৪০ সালে ঐ স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর কয়েক বছর রাজনীতির জন্য লেখাপড়া বন্ধ ছিল। নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে দীর্ঘদিন পর তিনি আবার পড়াশুনা শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালে বি.এ. পাস করেন। শিক্ষকতা করার সময় তিনি ময়মনসিংহ মহিলা ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এ. প্রথম পর্ব এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি লাভ করেন। হেনা দাস যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সে সময় তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মেয়েকে বিয়ে করার অনুরোধ করেন। অসুস্থ বাবার অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ের জন্য রাজি হন। বিয়ে ঠিক হয় পার্টির সক্রিয় কর্মী কমরেড রোহিনী দাসের সাথে। তিনি ছিলেন সিলেট জেলা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় বর ও কনেকে গোপনে কলকাতায় চলে যেতে হয় এবং ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন ঘরোয়াভাবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর পার্টির নির্দেশে হেনা দাস ও রোহিনী দাস অনেকদিন আত্মগোপন করে ছিলেন। বিয়ের পর স্বামীর সাথে অন্য দশজনের মতো সংসার করা হয়ে ওঠেনি হেনা দাসের। সংগ্রামী নারী হেনা দাসকে পার্টির গোপন আস্তানায় বা বিশ্বস্ত কোনো কর্মীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এরই মধ্যে ১৯৫২ সালে হেনা দাসের প্রথম মেয়ে বুলু জন্মগ্রহণ করে। বুলুকে নিয়ে এভাবে আত্মগোপন করে থাকা তাঁর পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। উপায়ান্তর না দেখে ১৯৫৬ সালে হেনা দাস চার বছরের মেয়ে বুলুকে নিয়ে কলকাতায় পিসীর বাড়িতে যান। কিন্তু সেখানেও তিনি স্থির হতে পারেননি। অবশেষে দীর্ঘ দশ বছরের আত্মগোপনীয়তা থেকে বেরিয়ে তিনি অবশেষে ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার 'গেণ্ডারিয়া মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়ে' শিক্ষকতার চাকরি নেন। সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১১৫ টাকা। কিন্তু স্বামী রোহিনী দাস তখনো আত্মগোপনে। ছুটি পেলে বছরে দু'একবার হেনা দাস বুলুকে নিয়ে সিলেটে যেয়ে স্বামীর সাথে দেখা করতেন। বিয়ের ১৩ বছরের মাথায় হেনা দাস ১৯৬১ সালে 'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে' প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগদান করেন। ওই স্কুল থেকে তাঁর নামে একটি কোয়ার্টার বরাদ্দ করা হয়। এই কোয়ার্টারেই তিনি নিজস্ব সংসার গোছানোর সুযোগ পান। এরপর 'মহাখালী ওয়ারলেস স্টেশন স্কুলে'-ও তিনি কিছুদিন প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় তিন যুগ শিক্ষকতার পর হেনা দাস ১৯৮৯ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। 'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ের' কোয়ার্টারে থাকার সময় তাঁর স্বামী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হেনা দাসের কোয়ার্টারে চলে আসেন। এই অসুস্থতার কারণে তাঁর স্বামী আর রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেননি। ১৯৬৫ সালে হেনা দাসের দ্বিতীয় মেয়ে চম্পা জন্মগ্রহণ করে। হেনা দাস মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত ও প্রগতিশীল সমাজের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন। বড় মেয়ে দীপা ইসলাম (বুলু) স্বনামধন্য গাইনোকোলোজিস্ট এবং ছোট মেয়ে চম্পা জামান কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। হেনা দাসের স্বামী রোহিনী দাস সেই যে অসুস্থ হলেন আর সুস্থ হতে পারেননি। এজন্য তাঁকে ঘরেই থাকতে হতো, কোনো কাজে সক্রিয় হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। দীর্ঘ দিন তিনি অসুখে ভোগার পর ১৯৮৫ সালের শেষে তিনি আরো অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি রোহিনী দাস পরলোকগমন করেন। স্বামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের হাজার স্মৃতি নিয়ে হেনা দাস গর্বিত। হেনা দাস নবম-দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। ১৯৪০ সালে মাধ্যমিক পাসের পর তিনি সুরমা ভ্যালি গার্লস্ স্টুডেন্টস্ কমিটি গঠনের কাজে যুক্ত হন। ছাত্রদের থেকে পৃথকভাবে ছাত্রী সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনায় তিনি সফল হন এবং ছাত্রী সমাজকে সফলভাবে সংগঠিত করেন। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হেনা দাস ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আইনসঙ্গত বলে ঘোষিত হয়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। এ সময় সারা দেশে অর্থনৈতিক সঙ্কট বাড়তে থাকে। দেখা দেয় ভয়ঙ্কর মন্বন্তর (বাংলা ১৩৫০)। খাদ্যাভাবে বাংলার মানুষ তখন দিশেহারা। প্রতিদিন শত শত মানুষ অনাহারে মারা যাচ্ছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছিল নারী ও শিশুরা। ওই অবস্থায় নারী সমাজকে সংগঠিত ও সচেতন করার প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভব করলেন হেনা দাস। আর তখনই সারা বাংলাদেশে গড়ে উঠলো নতুন নারী সংগঠন 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'। সিলেট জেলায় হেনা দাসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে দলমত নির্বিশেষে সমস্ত নারীকে ঐক্যবদ্ধ করাই ছিল 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'র লক্ষ্য। পার্টি কর্মী হিসেবে এবং 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি'র নেত্রী হিসেবে হেনা দাস প্রথমবারের মতো গ্রামে গেলেন। শহরের উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত কিশোরী মেয়ে হয়ে গ্রামীণ জীবন ও কৃষক মেয়েদের সাথে একাত্ম হয়ে তাদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলাটা তাঁর জন্য একটা কঠিন সংগ্রাম ছিল। গ্রামে গিয়ে গ্রামীণ নারীসমাজের পশ্চাত্পদতার সাথে হেনা দাসের প্রথম পরিচয় ঘটে। তখন থেকেই তিনি নারীদের নিয়ে কাজ করার কথা চিন্তা করেন। গ্রামের নারীদের সংগঠিত করার পথে তাঁর প্রধান বাধা ছিল অশিক্ষা, কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, ধর্মীয় গোঁড়ামি সর্বোপরি সামন্ততান্ত্রিক শোষণ। ওই বাধা দূর করে গ্রামের নারীদের সচেতন করে তুলতে প্রয়াসী হন হেনা দাস। কয়েক বছরের অবিরাম প্রচেষ্টায় সিলেট জেলায় 'মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি' সত্যিকারের সাংগঠনিক রূপ লাভ করেছিল। নারী আন্দোলনের পাশাপাশি 'গণনাট্য' আন্দোলনের সাথেও যুক্ত ছিলেন হেনা দাস। এসময় সারা ভারতে 'গণনাট্য সংঘ' তার শাখা বিস্তার করেছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের উদ্যোগে সিলেট শহরেও 'সুরমা ভ্যালী কালচার স্কোয়াড' নামে একটি 'গণনাট্য সংঘ' আত্মপ্রকাশ করেছিল। গণনাট্য আন্দোলন সংস্কৃতিকে রূপান্তরিত করেছিল সংগ্রামের এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে। ওই নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রচার গণমানুষের মধ্যে নতুন চেতনার বিকাশ ঘটায়। সাধারণ মানুষ দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ হয় এর মাধ্যমে। ১৯৪৬ সালের সংগ্রামের জোয়ারের মধ্যেই নেত্রকোণা জেলায় 'নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন' হয়েছিল। ওই সম্মেলনে লক্ষাধিক সংগ্রামী জনতার সামনে 'গণনাট্য সংঘে'র শিল্পী হিসেবে প্রথম ও শেষবারের মতো সঙ্গীত পরিবেশন করেন হেনা দাস; কারণ ১৯৪৮ সালের পর থেকে গোপন জীবন শুরু হলে তাঁর গানের কন্ঠও স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে সিলেট জেলায় ছাত্র আন্দোলনকে আরো জোরদার করার জন্য বিশেষ করে ছাত্র সমাজের মধ্যে ছাত্র ফেডারেশনকে প্রসারিত করার জন্য হেনা দাসকে আবার ছাত্র ফ্রন্টে নিয়ে আসা হয়। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন গড়ে তোলার প্রথম প্রয়াস গ্রহণ করা হয় ময়মনসিংহ জেলায় এবং সেখানেই হয় প্রথম সম্মেলন। হেনা দাস ওই সম্মেলনে পূর্ব-পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর তিনি আত্মগোপন অবস্থায় গ্রামে চলে যান। সিলেট জেলায় কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য অত্যন্ত গৌরবময়। স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল ব্যাপক কৃষক আন্দোলন, প্রজাস্বত্ব আইন সংশোধন আন্দোলন, খাজনা বন্ধ আন্দোলন, গাছ কাটার অধিকারসহ কৃষকদের বিভিন্ন অধিকার আদায়ের আন্দোলন। ওইসব আন্দোলনের ঐতিহ্য ও শক্তি বহন করে গড়ে উঠেছিল নানকার আন্দোলন। নানকার মেয়েদের সচেতন করে তোলা ও আন্দোলন সংগঠিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন হেনা দাস। শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হেনা দাস নানকার আন্দোলনের শেষ পর্যন্ত ওই এলাকায় থাকতে পারেননি। চিকিত্সার জন্য শহরে চলে এসেছিলেন। কিন্তু শহরে তখন হেনা দাসের মতো সংগ্রামী নারীদের খুব কম বাড়িতেই আশ্রয় মিলতো। আত্মগোপন অবস্থায় তখন নিরাপদ আশ্রয়ের প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। কিছুদিন পর যখন শহরতলিতে কমিউনিস্ট পার্টির আস্তানা তৈরি হলো, তখন তিনি সেখানে চলে গেলেন। স্থির হলো ওই আস্তানাকে কেন্দ্র করে চা বাগান এলাকায় গিয়ে তিনি কাজ করবেন। হেনা দাস '৫২-র ভাষা আন্দোলনের সময় আত্মগোপন অবস্থায়ও রাজপথে আন্দোলনরত নারীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। ১৯৬০-৬২ সালে সারা দেশে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হলে তিনি শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। হেনা দাস ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় 'মহিলা সংগ্রাম পরিষদ' গঠন করেন। এসময় তাঁর কর্ম এলাকা ছিল প্রধানত নারায়ণগঞ্জ। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি সকল স্তরের উদ্বাস্তু শিক্ষকদের নিয়ে 'উদ্বাস্তু শিক্ষক সমিতি' গড়ে তোলেন। তিনি এসব শিক্ষকদের ও উদ্বাস্তু শিবিরের অন্যান্য নারীদের জন্য ত্রাণ, আশ্রয়, চিকিত্সাসহ বিভিন্ন সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া এ সমিতির মাধ্যমে উদ্বাস্তু শিবিরে ৫০টি ক্যাম্প স্কুল স্থাপন করে শিশু-কিশোরদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। এছাড়াও তিনি সে সময় কলকাতা মহিলা পরিষদের রিলিফ আন্দোলন ও নারীদের সংগঠিত করতে ব্যস্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও শিক্ষক সমিতির মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বেসরকারি মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তিনি সংহতি প্রকাশ করেন। 'পূর্ব-পাকিস্তান শিক্ষক সমিতি' যা দেশ স্বাধীনের পর হয় 'বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি' -হেনা দাস এই শিক্ষক সমিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ও শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য তিনি এই শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে সব সময়ের জন্য সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৪ বছর শিক্ষক সমিতির জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৭ সালে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন করার জন্য হেনা দাস তিন দিন জেলে বন্দি থাকেন। তিনি জানান, এই তিন দিন বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর ওপর মারাত্মকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর ১৯৮৬ সালে শিক্ষকদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করলে তত্কালীন স্বৈরচারী সরকার এই আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং আবারো হেনা দাসকে বন্দি করা হয়। ১ মাস ৮ দিন তিনি চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দি থাকেন। সব বাধা উপেক্ষা করে অব্যাহতভাবে তিনি অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে গেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি 'রোকেয়া পদকে' সম্মানিত হয়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ পৌরসভা, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, ঢাকেশ্বরী মন্দির, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট, আহমেদ শরীফ ট্রাস্টসহ তিনি বহু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। রাজশাহীর একটি প্রতিষ্ঠান হেনা দাসের ওপর একটি অডিওভিজু্য়াল ডকুমেন্টারি তৈরি করেছে। নারীপক্ষ ও নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা থেকে প্রকাশিত দুটি বই-এ হেনা দাসের সংক্ষিপ্ত জীবনী প্রকাশিত হয়েছে। হেনা দাস কেবল একজন সাহসী, সংগ্রামী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বই নন, তিনি একজন কলম সৈনিকও বটে। ইতিমধ্যে হেনা দাসের অর্ধডজন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বইগুলো হলো: 'উজ্জ্বল স্মৃতি', 'শিক্ষা ও শিক্ষকতা জীবন', 'স্মৃতিময় দিনগুলো', 'নারী আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা', 'স্মৃতিময়-'৭১' এবং 'চার পুরুষের কাহিনী'। হেনা দাস তাঁর আত্মজীবনী লিখেছেন 'চার পুরুষের কাহিনী' শিরোনামের বইটিতে। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে হেনা দাসের লেখা বিভিন্ন কলাম ও প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে। এসব লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে 'প্রবন্ধ সংকলন' শিরোনামে আরেকটি বই। সাহিত্য প্রকাশের মফিদুল হক 'মাতৃমুক্তি পথিকৃত' নামে তাঁর জীবনের উপর একটি বই প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য তিনি সারাজীবন কাজ করেছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জন্মলগ্ন ১৯৭০ সাল থেকে হেনা দাস এর সাথে জড়িত ছিলেন। কবি সুফিয়া কামাল-এর পরলোকগমনের পর ২০০০ সালের শুরুতে হেনা দাস বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী নিযুক্ত হয়েছিলেন। নারী উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনসহ শিক্ষা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। হেনা দাস বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল কমিশনের সদস্য এবং বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির উপদেষ্টা ছিলেন। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী দক্ষিণ গণসম্মিলনের একজন অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০৯ সালের ২০ জুলাই মারা যান। সারাজীবন তিনি নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। যেখানেই কোনো অন্যায়, অবিচার দেখেছেন সেখানেই তাঁর প্রতিবাদী কন্ঠ শোনা গেছে। আর তাই হেনা দাসের নাম বাংলাদেশের মানুষ তথা নারী সমাজের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে সবসময়। সংক্ষিপ্ত জীবনী: জন্ম: ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হেনা দাস সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মা: তাঁর বাবার নাম সতীশচন্দ্র দত্ত। আর মার নাম মনোরমা দত্ত। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে হেনা দাস সর্ব কনিষ্ঠ। পড়াশুনা: সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণীতে ভর্তির মাধ্যমে হেনা দাসের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। ১৯৪০ সালে ঐ স্কুল থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেন এবং ১৯৪২ সালে তিনি প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর কয়েক বছর রাজনীতির জন্য লেখাপড়া বন্ধ ছিল। নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে দীর্ঘদিন পর তিনি আবার পড়াশুনা শুরু করেন এবং ১৯৪৭ সালে বি.এ. পাস করেন। শিক্ষকতা করার সময় তিনি ময়মনসিংহ মহিলা ট্রেনিং কলেজ থেকে বি.এড. ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এ. প্রথম পর্ব এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ হয়ে স্নাতকত্তোর ডিগ্রি লাভ করেন। বিয়ে ও ছেলেমেয়ে: হেনা দাস যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে সক্রিয় এবং পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সে সময় তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মেয়েকে বিয়ে করার অনুরোধ করেন। অসুস্থ বাবার অনুরোধ রাখতে তিনি বিয়ের জন্য রাজি হন। বিয়ে ঠিক হয় পার্টির সক্রিয় কর্মী কমরেড রোহিনী দাসের সাথে। তিনি ছিলেন সিলেট জেলা কৃষক আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রতিকূলে থাকায় বর ও কনেকে গোপনে কলকাতায় চলে যেতে হয় এবং ১৯৪৮ সালের ২৮ জুন ঘরোয়াভাবে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর পার্টির নির্দেশে হেনা দাস ও রোহিনী দাস অনেকদিন আত্মগোপন করে ছিলেন। ১৯৮৭ সালের ৩ জানুয়ারি রোহিনী দাস পরলোকগমন করেন। তাঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ে দীপা ইসলাম (বুলু) গাইনোকোলোজিস্ট এবং ছোট মেয়ে চম্পা জামান কম্পিউটার সায়েন্সে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কর্মজীবন: ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকার 'গেণ্ডারিয়া মনিজা রহমান বালিকা বিদ্যালয়ে' শিক্ষকতার চাকরি নেন। সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১১৫ টাকা। কিন্তু স্বামী রোহিনী দাস তখনো আত্মগোপনে। ছুটি পেলে বছরে দু'একবার হেনা দাস বুলুকে নিয়ে সিলেটে যেয়ে স্বামীর সাথে দেখা করতেন। বিয়ের ১৩ বছরের মাথায় হেনা দাস ১৯৬১ সালে 'নারায়ণগঞ্জ বালিকা বিদ্যালয়ে' প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগদান করেন। ওই স্কুল থেকে তাঁর নামে একটি কোয়ার্টার বরাদ্দ করা হয়। এই কোয়ার্টারেই তিনি নিজস্ব সংসার গোছানোর সুযোগ পান। এরপর 'মহাখালী ওয়ারলেস স্টেশন স্কুলে'-ও তিনি কিছুদিন প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় তিন যুগ শিক্ষকতার পর হেনা দাস ১৯৮৯ সালে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তথ্যসূত্র:www.gunijan.org.bd
Rationale
UploaderRaihan Ahamed