Golden Bangladesh
Eminent People - সুচিত্রা সেন

Pictureসুচিত্রা সেন
Nameসুচিত্রা সেন
DistrictSirajganj
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeচলচিত্র ও নাটক
Life Style

সুচিত্রা সেন 

সুচিত্রা সেন (৬ এপ্রিল, ১৯৩১ - ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪) ছিলেন একজন ভারতীয় অভিনেত্রী। তাঁর জন্মগত নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। তিনি মূলত বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের বিপরীতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে তিনি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

১৯৬৩ সালে সাত পাকে বাঁধা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে সুচিত্রা সেন "সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেস" জয় করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে। শোনা যায়, ২০০৫ সালে তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল; কিন্তু সুচিত্রা সেন জনসমক্ষে আসতে চান না বলে এই পুরস্কার গ্রহণ করেননি। ২০১২ সালে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গবিভূষণ প্রদান করা হয়।

যক্তিগত জীবন ও শিক্ষা

১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে সুচিত্রা সেনের জন্ম। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী। পাবনা শহরে লেখাপড়া শিখে সুচিত্রা সেন কলকাতায় চলে যান এবং পরবর্তীকালে মনোমোহিনী চিত্র তারকা হিসাবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন পাবনা জেলার অন্তর্গত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই তিনি পড়াশোনা করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। তাঁদের একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী। ১৯৫২ সালে সুচিত্রা সেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত হন।

পঞ্চাশ-ষাট দশক থেকে সুচিত্রা নামটি বাংলার জনজীবনে এমন মোহিনী মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আছে যে, এই নামটি শোনা মাত্র পাশের বাড়ির সুন্দরী সুচিত্রা সাহা কিংবা জনপ্রিয় লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্য কিংবা গায়িকা সুচিত্রা মিত্র কিংবা গায়িকা-নায়িকা সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তি সহ আর কোনও সুচিত্রাকে মনে পড়ে না - চোখের সামনে ভেসে ওঠে শুধু একজনেরই স্মিত হাসিতে উজ্জ্বল সুষমাদীপ্ত মুখ। সে মুখটি রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে সেকালে নন্দিত বন্দিত অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের। তাঁর সমকালে তাঁর চেয়ে সুঅভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, গ্ল¬্যামারাস সুপ্রিয়া দেবী, রূপসী সুমিত্রা দেবী (১৯২৭-৯০) আর মহিমাময়ী অরুন্ধতী দেবী (১৯২৫-৯০)। কিন্তু তাঁর মতো জনবিমোহিনী নায়িকা হয়ে উঠতে পারেন নি তাঁদের কেউই। তাহলে কোন জাদুতে সুচিত্রা সেন ভাস্বর করে তুলেছিলেন বাংলা ছবির রুপালি পরদার জগৎ ও জীবনকে?
অনেকে বলেন, এ জাদুর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বাংলা ছবির কিংবদন্তির নায়ক উত্তম কুমার (১৯২৬-৮০)। তাঁর সঙ্গে অভিনয়গত এক সার্থক সমন্বয়, সমঝোতা ও রসায়ন ঘটেছিল সুচিত্রা সেনের। ফলে জুটি বেঁধে এই দু
জন স্বতন্ত্র এক ধারাই সৃষ্টি করেছিলেন বাংলা ছবির। তাঁদের যাত্রা শুরু ১৯৫৩ সালে - সাড়ে চুয়াত্তর ছবির মাধ্যমে। নির্মল হাসির ওই ছবিটি বক্স অফিসে পায় বিপুল সাফল্য। আর ওই সাফল্যই মোড় ঘুরিয়ে দেয় তাঁদের অভিনয়-জীবনে। সেই থেকে তাঁরা দুজন বাংলা রোমান্টিক ছবির আদর্শ জুটি হয়ে বিরাজ করেন বিশ বছরেরও বেশি কাল ধরে। তাঁরা যে কিংবদন্তির গৌরব গরিমা অর্জন করেন তা অক্ষয় অম্লান হয়ে আছে আজও। তাঁদের ছবিগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে - তারকাদের, বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের, সফট-ফোকাস ক্লোজ আপ, মনোরম নিসর্গদৃশ্যের পটভূমিতে ভালবাসাবাসি, সুসজ্জিত ঘরদোর ... যেখানে সারি-সারি পরদা উড়ছে... দুলছে, টবে গুচ্ছ-গুচ্ছ গোলাপ- এ রকম আরও অনেক নয়নসুখ দৃশ্যের কারণে। এছাড়া বাংলা পারিবারিক ও গতানুগতিক ধারার ছবির নায়িকাদের বাইরে একটু অন্যরকম এক অবস্থানে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন সুচিত্রা সেন। এ অবস্থানটি ছিল পরিস্থিতির শিকার এক বেদনার্ত যুবতীর। তাঁর অভিনয়ে পরিপাটি হওয়ার প্রয়াস ছিল, দুর্বলতাও ছিল, বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতিও ছিল, কিন্তু বিভ্রম-বিপন্ন সুন্দরী হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল সবকিছু ছাড়িয়ে।
তবে আরও কিছু ছিল সুচিত্রা সেনের। কেবল এই জুটিগত সাফল্য নয়, সমকালীন কারিগরি উৎকর্ষ নয়, বিশেষ ধরনের চরিত্রায়নও নয়। সেই
আরও কিছু সম্পর্কে লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সাংবাদিক-সমালোচক রবি বসু। একটু দীর্ঘ হলেও তাঁর সেই লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি কৌতূহলী দর্শক-পাঠকদের জন্য:
... নবাগতা নায়িকা সুচিত্রা সেন যে কেবল সৌন্দর্যের কারণেই মনোহারিণী নন, ওঁর মধ্যে যে বিরাট অভিনয়ের প্রতিভা লুকিয়ে আছে, তার পরিচয় পাওয়া গেল ওই ১৯৫৩ সালেই দেবকী বসু পরিচালিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছবিতে। দর্শকরা চমকে গেল সুচিত্রা সেনের বিস্ময়কর অভিনয় দেখে।... পরবর্তীকালে শ্রীমতী সেনের অনেক চমকপ্রদ অভিনয় দেখেছি, কিন্তু আমার কাছে শ্রেষ্ঠ হয়ে আছে (ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছবিতে) তাঁর (অভিনীত) বিষ্ণুপ্রিয়া (চরিত্রটি)। অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তাঁরা সপ্তপদী, দীপ জ্বেলে যাই, সাত পাকে বাঁধা কিংবা উত্তরফাল্গুনী অথবা আঁধি ছবির প্রসঙ্গ তুলবেন। কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও আমি বলবো, আমার কাছে ওই বিষ্ণুপ্রিয়া-ই তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্রচিত্রণ। কেন?
তাহলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছবিটার কথা একবার ভাল করে ভাবুন। ওই ছবির মুখ্য চরিত্র চৈতন্যদেব, যেটি করেছিলেন বসন্ত চৌধুরী। (পরিচালক) দেবকী বসুর চিত্রনাট্যেও চৈতন্যদেবকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সেই তুলনায় বিষ্ণুপ্রিয়া চরিত্রের সুযোগ কত কম। কিন্তু ওই চরিত্রেও সুচিত্রা সেন কি অসাধারণ অভিনয় করলেন। ছবির অন্য সব চরিত্রকে ছাপিয়ে গেলেন তিনি। তাঁর প্রতিটি সংলাপ যেন উঠে আসছিল হৃদয়ের গভীর থেকে। স্বামীর প্রতি তাঁর আত্মনিবেদনের ভঙ্গিটি প্রকাশিত হচ্ছিল বোধের গভীরতা থেকে। ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন যেন একটা ঘোরের মধ্যে। কোথাও এতটুকু বাড়াবাড়ি নেই। কোথাও এতটুকু খামতি নেই। তাঁর চলাফেরা তাকানো সব যেন আমাদের ভুলিয়ে দিয়েছিল যে তিনি বালিগঞ্জ প্লে¬সের এক অভিজাত বাড়ির গৃহবধূ। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল তিনি যেন নবদ্বীপের চৈতন্য-ঘরণী। ওটা ছাড়া পৃথিবীতে তাঁর আর কোনও অস্তিত্বই নেই।
এই ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে হাততালি পাওয়া যায় না। এক স্বামী-পরিত্যক্ত গৃহবধূর জন্য বড় জোর কিছু বেদনাবোধ থাকে দর্শকের মনে। তা-ও যে মহৎ প্রয়োজনে চৈতন্যদেব গৃহত্যাগ করেছেন তাতে দর্শকের পূর্ণ সহানুভূতি চৈতন্য চরিত্রের প্রতিই ন্যস্ত থাকে। এতদ্সত্ত্বেও ছবি দেখার পর দর্শকের মন জুড়ে যে বিষ্ণুপ্রিয়া বিরাজ করতে থাকেন এটা শ্রীমতী সেনের অসাধারণ অভিনয়ের জন্যই। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত থাকতে পারে না। সুতরাং আমি যদি বলি আমার দেখা সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবিগুলোর মধ্যে ওই বিষ্ণুপ্রিয়া-ই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রচিত্রণ, তাহলে কি আমাকে অনৃতভাষণের জন্য দায়ী করা যাবে? বোধহয় না।
কিন্তু এই যে বালিগঞ্জ প্লেসের একজন গৃহবধূ একটা ছবিতে এমন অসামান্য অভিনয় করতে পারলেন, সে কৃতিত্ব কি একা সুচিত্রা সেনের? না। এর পেছনের মূল কারিগরটি হলেন দেবকী কুমার বসু। ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য ছবির আগে মিসেস সেন যে কটি ছবিতে অভিনয় করেছেন তাতে তো তাঁর প্রতিভার স্ফুরণ তেমন একটা দেখা যায় নি। তাহলে এমন একটা যুগান্তকারী ঘটনা কেমন করে সম্ভব হলো?...
... আমার তো মনে হয় (পরিচালক দেবকী বসু) শ্রীমতী সুচিত্রা সেনের মনে... গেঁথে দিতে পেরেছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়ার চরিত্রটি। তাই বালিগঞ্জ প্লে¬সের এক গৃহবধূ আস্তে-আস্তে বিষ্ণুপ্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে গেলেন। মিসেস সেনের মধ্যে যে একটি সংবেদনশীল অনুভূতির অস্তিত্ব আছে সেটা দেবকী বাবু আবিষ্কার করেছিলেন। তাই কাদামাটির তালটিকে নিজের মনের মতো করে গড়ে নিতে তাঁর অসুবিধা হয় নি। তাঁরই কল্যাণে আমরা সুচিত্রা সেনের মতো একজন বড় মাপের শিল্পীকে পেয়ে গেলাম, যিনি আজ আমাদের গর্বের বস্তু।...
অর্থাৎ সুচিত্রা সেনের কিংবদন্তি হয়ে ওঠার উৎস হিসেবে
সাড়ে চুয়াত্তর-এর সাফল্যের পাশাপাশি মনে রাখতে হবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য-এর সার্থকতাকে, নায়ক হিসেবে উত্তম কুমারের সমর্থনের পাশাপাশি স্মরণ করতে হবে পরিচারক দেবকী কুমার বসু (১৮৯৮-১৯৭১)-র অবদানকে।
এবার সুচিত্রা সেন সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য:
বাংলা ছবির এই
প্রেমদুঃখী নায়িকার আসল নাম রমা দাশগুপ্তা। ডাকনাম কৃষ্ণা। পৈতৃক নিবাস পাবনায়, জন্ম মামার বাড়ি পাটনায়। তারিখটি ৬ই এপ্রিল, তবে সন নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল এতকাল - ১৯৩৪ না ১৯৩১। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সালটি আসলে ১৯২৯। কারণ ১৯৪৭ সালে অষ্টাদশী রমা দাশগুপ্তার বিয়ে হয় কলকাতার বালিগঞ্জ প্লেস-এর অভিজাত পরিবারের সন্তান দিবানাথ সেনের সঙ্গে। তিনি হলেন রমা সেন। দিবানাথ সেনের পিতামহ ঢাকার বিখ্যাত সম্ভ্রান্ত বংশীয় ব্যক্তিত্ব দীননাথ সেন - যাঁর নামে এখনও একটি রাস্তা রয়েছে পুরনো ঢাকায়।
বিয়ের পর রমাকে দেখে সম্পর্কে মামাশ্বশুর, প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক-পরিচালক বিমল রায় (১৯০৯-৬৬) মন্তব্য করেছিলেন,
বাঃ! তোমার ফেস্টি বড় চমৎকার। সিনেমায় নামলে তুমি দারুণভাবে অ্যাকসেপটেড হবে। বিমল রায় পরে তাঁর দেবদাস (১৯৫৫) ছবিতে এই ভাগ্নেবউকে নিয়েছিলেন পার্বতী চরিত্রে। তবে সেদিন তাঁর মন্তব্যটি বদলে দিয়েছিল রমার জীবন। বছর চারেক পর থেকে তিনি খুঁজতে থাকেন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ। স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে থাকেন প্রযোজক-পরিচালকদের অফিসে-অফিসে। তখন বড় কষ্টের দিন গেছে রমার। প্রেমেন্দ্র মিত্রের মতো সাহিত্যিক-চলচ্চিত্রকার সহ অনেক নামী-অনামী রথী-মহারথী দুর্ব্যবহারও করেছেন তাঁর সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ১৯৫১ সালে তিনি অভিনয়ের সুযোগ পান শেষ কোথায় ছবিতে। অনেকখানি কাজ হলেও ছবিটি শেষ হতে পারে নি নানা কারণে।
ওদিকে পরিচালক নীতীশ রায় নাম পালটে দেন রমা
র, তিনি হয়ে ওঠেন সুচিত্রা সেন। শেষ কোথায় শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে শ্রাবণসন্ধ্যা নামে। ছবিটিতে দুই বয়সের সুচিত্রা সেনকে দেখা গেছে কিম্ভূত জগাখিচুড়ি অবস্থায়।
১৯৫৩ সালে
সাত নম্বর কয়েদী ছবিতে প্রথম দর্শকের সামনে আসেন সুচিত্রা সেন। তবে তিনি সকলের নজর কাড়েন এর দু সপ্তাহ পর মুক্তিপ্রাপ্ত সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে। তবুও কষ্টের দিন শেষ হয় নি তাঁর। কাজরী ছবিতে নায়িকা মনোনীত হয়েও বাদ পড়েন তিনি। শেষে ওই ছবিতে নায়িকা মনোনীত হন সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, আর তাঁকে করতে হয় পার্শ্বচরিত্র। কষ্ট ছাড়াও অনেক গ্লানিকর অভিজ্ঞতা তখন হয়েছে সুচিত্রা সেনের। এজন্য এক কুৎসিত ছবিতে কুৎসিততম ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা গেছে তাঁকে। এমন একটি কদর্য ছবি এটম বোম। অতি স্বল্প বসনে, প্রায় গাখোলা হয়ে, তাঁকে অভিনয় করতে হয়েছে ওই ছবিতে।
কেরিয়ারের শুরুতেই
রূপমঞ্চরূপাঞ্জলি পত্রিকার সম্পাদকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন সুচিত্রা সেন। ওই বিরোধের জের কাটে নি এখনও। সেই থেকে তিনি এড়িয়ে চলেছেন সাংবাদিকদের। ফলে তাঁর চলচ্চিত্রের পর্দাগত অংশ ছাড়া আর সব কিছুই রয়ে গেছে অস্পষ্ট, অজানা। নিজের মনকে তিনি খুলে ধরেন নি কখনও। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাউকে জানতে দেন নি নিজের কোনও কিছু।
জনগণমননন্দিনী নায়িকা হিসেবে সুচিত্রা সেনের যাত্রা শুরু
অগ্নিপরীক্ষা (১৯৫৪) ছবি থেকে। ওই ছবিতে তাঁর বিপরীতে নায়িকা ছিলেন উত্তম কুমার। এই দুজন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জুটি হিসেবে বাংলা ছবিতে যে স্বর্ণযুগের সৃষ্টি করেন তা নন্দিত বন্দিত হয়ে আছে আজও। তাঁদের রোমান্টিকতা কয়েক প্রজন্ম ধরে ছুঁয়ে গেছে প্রেম ও বেদনার শিখরকে, এখনও হয়তো হারিয়ে যায় নি একেবারে।

চলচ্চিত্র জীবন

১৯৫২ সালে শেষ কোথায় ছবির মাধ্যমে তার চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু হয় কিন্তু ছবিটি মুক্তি পায়নি।

উত্তম-সুচিত্রা জুটি

উত্তম কুমারের বিপরীতে সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স-অফিসে সাফল্য লাভ করে এবং উত্তম-সুচিত্রা জুটি উপহারের কারনে আজও স্মরনীয় হয়ে আছে। বাংলা ছবির এই অবিসংবাদিত জুটি পরবর্তী ২০ বছরে ছিলেন আইকন স্বরূপ।

সম্মাননা

১৯৫৫ সালের দেবদাস ছবির জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেন, যা ছিল তার প্রথম হিন্দি ছবি। উত্তম কুমারের সাথে বাংলা ছবিতে রোমান্টিকতা সৃষ্টি করার জন্য তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিনেত্রী। ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকে তার অভিনীত ছবি মুক্তি পেয়েছে। স্বামী মারা যাওয়ার পরও তিনি অভিনয় চালিয়ে গেছেন, যেমন হিন্দি ছবি আন্ধি। এই চলচ্চিত্রে তিনি একজন নেত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। বলা হয় যে চরিত্রটির প্রেরণা এসেছে ইন্দিরা গান্ধী থেকে। এই ছবির জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন এবং তার স্বামী চরিত্রে অভিনয় করা সঞ্জীব কুমার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার জিতেছিলেন। হিন্দি চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর দাদাসাহেব সম্মাননা প্রদান করে ভারত সরকার। চলচ্চিত্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এ সম্মাননা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব সম্মাননা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন তিনি। সম্মাননা নিতে কলকাতা থেকে দিল্লি যেতে চাননি বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি।

অন্তরীন জীবন

১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরগ্রহণ করেন। এর পর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন এবং রামকৃষ্ণ মিশনের সেবায় ব্রতী হন।  ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য সুচিত্রা সেন মনোনীত হন, কিন্তু ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নিতে দিল্লী যাওয়ায় আপত্তি জানানোর কারনে তাকে পুরস্কার দেয়া হয় নি।

মৃত্যু

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি ভারতীয় সময় সকাল ৮টা ২৫ মিনিট নাগাদ কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়। তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের জন্য তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শেষকৃত্যে গান স্যালুট দেবার কথা ঘোষণা করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ও ভারতীয় জনতা পার্টির প্রধানমন্ত্রী-পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী সুচিত্রা সেনের মৃত্যুতে শোকবার্তা পাঠান।

পরিবার

তার মেয়ে মুনমুন সেন এবং নাতনী রিয়া সেন ও রাইমা সেন ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।

সুচিত্রা সেন অভিনীত ছবির তালিকা (বন্ধনীতে বিপরীত অভিনেতার নাম):
১৯৫৩  সাত নম্বর কয়েদী (সমর রায়); সাড়ে চুয়াত্তর (উত্তম কুমার); কাজরী (বীরেন চট্টোপাধ্যায়); ভগবান শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য (বসন্ত চৌধুরী);
১৯৫৪  এটম বোম (রবীন মজুমদার); ওরা থাকে ওধারে (উত্তম কুমার); ঢুলি (প্রশান্ত কুমার, রবীন মজুমদার); মরণের পরে (উত্তম কুমার); সদানন্দের মেলা (উত্তম কুমার); অন্নপূর্ণার মন্দির (উত্তম কুমার); অগ্নিপরীক্ষা (উত্তম কুমার); গৃহপ্রবেশ (উত্তম কুমার); বলয়গ্রাস (নীতিশ মুখোপাধ্যায়);
১৯৫৫  সাঁঝের প্রদীপ (উত্তম কুমার); সাজঘর (বিকাশ রায়); শাপমোচন (উত্তম কুমার); মেজ বৌ (বিকাশ রায়); ভালবাসা (বিকাশ রায়); সবার উপরে (উত্তম কুমার);
১৯৫৬  সাগরিকা (উত্তম কুমার); শুভরাত্রি (বসন্ত চৌধুরী); একটি রাত (উত্তম কুমার, কমল মিত্র); ত্রিযামা (উত্তম কুমার); শিল্পী (উত্তম কুমার); আমার বৌ (বিকাশ রায়);
১৯৫৭  হারানো সুর (উত্তম কুমার); চন্দ্রনাথ (উত্তম কুমার); পথে হল দেরী (উত্তম কুমার); জীবন তৃষ্ণা (উত্তম কুমার);
১৯৫৮  রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত (উত্তম কুমার); ইন্দ্রাণী (উত্তম কুমার); যৌতুক (উত্তম কুমার); সূর্যতোরণ (উত্তম কুমার);
১৯৫৯  চাওয়া পাওয়া (উত্তম কুমার); দীপ জ্বেলে যাই (বসন্ত চৌধুরী);
১৯৬০  হসপিটাল (অশোক কুমার); স্মৃতিটুকু থাক (অসিত বরণ, বিকাশ রায়);
১৯৬১  সপ্তপদী (উত্তম কুমার);
১৯৬২  বিপাশা (উত্তম কুমার);
১৯৬৩  সাত পাকে বাঁধা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়); উত্তরফাল্গুনী (বিকাশ রায়, দিলীপ মুখার্জি);
১৯৬৪  সন্ধ্যাদীপের শিখা (দিলীপ মুখার্জি);
১৯৬৭  গৃহদাহ (উত্তম কুমার, প্রদীপ কুমার);
১৯৬৯  কমললতা (উত্তম কুমার, নির্মল কুমার);
১৯৭০  মেঘ কালো (বসন্ত চৌধুরী);
১৯৭১  নবরাগ (উত্তম কুমার); ফরিয়াদ (উৎপল দত্ত);
১৯৭২  আলো আমার আলো (উত্তম কুমার); হার মানা হার (উত্তম কুমার);
১৯৭৪  শ্রাবণসন্ধ্যা (জহর গঙ্গোপাধ্যায়); দেবী চৌধুরাণী (রঞ্জিত মলি¬ক);
১৯৭৫  প্রিয়বান্ধবী (উত্তম কুমার);
১৯৭৬  দত্তা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়);
১৯৭৮  প্রণয় পাশা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)।
সুচিত্রা সেন অভিনীত হিন্দি ছবির তালিকা:
১৯৫৫  দেবদাস (দিলীপ কুমার);
১৯৫৭  মুসাফির (শেখর); চম্পাকলি (ভারত ভূষণ);
১৯৬০  সরহদ (দেব আনন্দ); বম্বাই কা বাবু (দেব আনন্দ);
১৯৬৬  মমতা (অশোক কুমার, ধর্মেন্দ্র);
১৯৭৫  আঁধি (সঞ্জীব কুমার)।

পুরস্কার ও সম্মাননা

বছর

পুরস্কার/সম্মাননা

ফলাফল

চলচ্চিত্র

১৯৬৩

৩য় মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব - শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী

জয়ী

 ১৯৬৩-এর চলচ্চিত্র সপ্তপদী

১৯৬৬

ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার

মনোনীত

 মমতা

১৯৭২

পদ্মশ্রী

 

 চলচ্চিত্র শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য

১৯৭৬

ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী পুরস্কার

মনোনীত

 আঁধি

২০১২

বঙ্গবিভূষণ


 চলচ্চিত্রে সারা জীবনের অবদানের জন্য


লেখক : সাযযাদ কাদির

 

 
Rationale
UploaderMd. Mijanur Rahman Niloy