Golden Bangladesh
Eminent People - কবি মহসিন হোসাইন

Pictureকবি মহসিন হোসাইন
Nameকবি মহসিন হোসাইন
DistrictJessore
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeকবি
Life Style

পারিবারিক পরিচিতি :
সত্তর দশকের সব্যসাচী কবি মহসিন হোসাইন ১৩৬১ সালের ২১ বৈশাখ (১৯৫৪ সালের ৪ মে) যশোর জেলা (বর্তমান নড়াইল জেলা)-র কালিয়া উপজেলার প্রাচীন কেলাবাড়ি বর্তমান কলাবড়িয়া গ্রামের দশানি-মোল্যাপাড়ার সুপ্রাচীন জোতদার পবিবার (জমিদার পরিবার)-এ রোজ মঙ্গলবার ভূমিষ্ঠ হন। পিতা:আবদুর রাজ্জাক মিয়া, মা: সাহেদা খানম। কবি মহসিন হোসাইনের উর্ধতন নবম পুরুষ পির খান জাহানের সহোদর বলে পরিচিত পির জাহানন্দার খা। জাহান্দার ছিলেন সুলতানি শাসনামলের সেনানায়ক, তিনি ‘কিশোয়ার খাঁ’ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর পূত্র ওয়ালি মাহমুদ খাঁ কেলাবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা। কেলা শব্দের অর্থ দুর্গ বা ফোর্ট। কেলাবাড়ি প্রথমে ডিহি ও মুঘল আমলে তরফের মর্যাদা পায়। প্রাচীন কেলাবাড়ি বা প্রাচীন কেলস্নার অবস্থান বর্তমান কলাবাড়িয়া গ্রামের নলিয়া নদীর পশ্চিম তীরে গ্রামের দক্ষিণাংশের ‘ঠাকুরভিটে’ নামে পরিচিত। তাঁর উর্ধতন পঞ্চম পুরুষ কোরেশ মাহমুদ পলাশি যুদ্ধোত্তর (১৭৬৯সাল) ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ২ খানা বিশাল চালের নৌকা লুট করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন। সেকালের যশোর থানাদারের আদালতে তিনি ও তার বড়ো ভাই চাঁদ মাহমুদ অভিযুক্ত হয়েছিলেন। মহসিন হোসাইনের উর্ধতন চতুর্থ পুরুষ জমিদার জকি মাহমুদ (স্থানীয় নীলকুঠির মালিক এলএম কামিন ডানলপকে প্রথম দিকে প্রশ্রয় দিলেও পরে নীলকরকে কুঠিছাড়া করার জন্য বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনিই বিখ্যাত ‘জকি মোল্যা এস্টেট’-এর প্রতিষ্ঠাতা। মহসিন হোসাইনের প্রপিতামহ মর্দান মিয়া (মদন মিয়া) দানধ্যানে বিশেষ খ্যাতিমান চিলেন। তার সহোদর গগন মিয়ার লিখিত (১৮৯০ সালে লেখা) একখানি ব্যক্তিগত  পত্র প্রাচীন পত্রসাহিত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহসিন হোসাইনের পিতামহ জমিদার  আবদুস সামাদ মিয়া দয়ালু ও  শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার জ্ঞাতিকাকা এম নুরুজ্জামান ১৯৭৫ সালে মানিকগঞ্জের জেলা গভর্নর নিযুক্ত হন। মহসিন হোসাইনের জ্ঞাতিভাই এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কালিয়া থানা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মা-বাবার দ্বাদশ সন্তান,জীবিতদের মধ্যে দ্বিতীয়। মহসিন হোসাইনের জীবিত সহোদর-সহোদরা হলেন যথাক্রমে, মশিয়ুর রহমান, লুতফুন্নেসা, মোকাররম হোসাইন, ইকবাল হোসাইন, রশিদা বেগম, জালাল হোসাইন ও হাফিজুর রহমান।

শৈশব :
মহসিন হোসাইনের শিশুকাল কাটে অনেকটা বাড়ির কাজের লোকদের প্রযত্নে। মায়ের ব্যস্ততা ও পরিবারের নিয়মানুসারে এই ব্যবস্থা সেযুগে বলবত ছিলো। সারা দিনের মধ্যে মায়ের দেখা পাওয়া শিশুকবির কাছে ছিল বেশ কঠিন ব্যাপার। রাতে থাকতেন মাতামহী মালেকা বানুর কাছে। উদার আকাশ গ্রাম্যপ্রকৃতি, সবুজ মাঠ, পাখির কলকাকলির মধ্যে তিনি বেড়ে ওঠেন। শৈশবে গ্রামীণগান বিশেষত মেয়েলিগান, বিয়েরগান, ভিখারি বৈঞ্চবের গান, গুনাই যাত্রা, রূপবানযাত্রা, রামায়ণগান, বড়োযাত্রা, সাগরভাসাপালা, অষ্টদলের গান প্রভৃতির ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। এ ছাড়া গ্রামীণ মেলা ও উতসব অনন্দে শৈশবে অংশ নিতেন তিনি। গ্রামীণ খেলধুলা,মাছ ধরা,পাখির বাসা খোঁজা,পাখির ছানা পোষা ছিলো কিশোর মহসিন হোসাইনের নেশা। এই নিয়ে মায়ের বকুনি ও মারপিট ছিল তার জন্য নিত্যদিনের বিষয়। সহজ কথায় ডানপিঠে হিসেবে শৈশবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন মহসিন। কিশোর বয়সেই কবিতা লেখা শুরু সেই সাথে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোই যেন ছিলো তার কাজ। তাই কিশোর বয়সেই এলাকায় তার পরিচিতি হয়ে ওঠে ‘বুনোকবি’ হিসেবে। শৈশবে তিনি যেমন ডানপিঠে ছিলেন তেমনি ছিলেন খেয়ালি। সবার থেকে ব্যতিক্রমি।

শিক্ষাজীবন :
প্রথম জীবনে কবি মহসিন হোসাইন মায়ের আদরে ও শাসনের মধ্য দিয়ে তালপাতায় ঘরে তৈরি কালিতে বাংলা বর্ণমালা, গণিতের সংখ্যা ও ইংরেজি বর্ণমালা লেখা শুরু করেন। মা শাহেদা খানমই তার প্রথম শিক্ষক। মায়ের কাছ থেকে বর্ণমালার জ্ঞান আহরণ করে এক সময়ে পাঠশালা ও মক্তবে যেতে শুরু করেন। বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার পুকুরিয়া গ্রামে মাতুলালয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম পড়াশুনা শুরু করেন তিনি।  সেখান থেকে ফিরে নিজ গ্রাম কলাবাড়িয়ার দক্ষিণপাড়া-শ্রীনগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফুফু বাড়িতে অবস্থান করে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেন। সেস্কুলেও বেশি দিন মন টেকে নি তার। এরপর তিনি কলাবাড়িয়া পূর্বপার মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে মহসিন হোসাইন ৫ম শ্রেণি পাশ করেন।  ১৯৬৬ সালে স্থানীয় কলাবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালযের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর এসএসপি পরীক্ষা দেয়ার কথা থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের কারণে তাকে পরীক্ষা দিতে ১৯৭২ সালের প্রথম পর্বে। মুক্তিযুদ্ধ চলা কালে ১৯৭১ সালের ২৯ অগস্ট বা ১২ ভাদ্র তেরখাদা যুদ্ধের প্রচন্ড গোলাগুলির মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে  মহসিন হোসাইনের পিতা আবদুর রাজ্জাক মিয়া ইন্তেকাল করেন। ১৯৭২ সালে মহসিন হোসাইন  এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন তেরখাদা-কাটেঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রে। এই পরীক্ষায় তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে এসএসপি পাশ করেন। এরপর তিনি  ভর্তি হন খুলনা মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজে। এখান থেকে মেধাবি ছাত্র হিসেবে আইআরসি স্টাইপেন পেয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি।  এই কলেজ থেকেই মহসিন হোসাইন ১৯৭৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চতরবাংলা বিষয় নিয়ে এইসএসসি পাশ করেন।  এরপর তিনি দৌলতপুর বিএল কলেজে বাংলায় বিএ অনার্স অধ্যয়নের প্রস্তুতি কালে কলেজ ত্যাগ করেন। এই জন্য দায়ি ছিলো একটি রাজনৈতিক দলের প্ররোরচনা এবং মহসিন হোসাইনের বাউন্ডুলেপনা।

সাহিত্যকর্ম:
মহসিন হোসাইন স্থানীয় কলাবাড়িয়া পূর্বপার মডেল প্রাইমারি স্কুলের ৫ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে ১৯৬৫ সালে প্রথম কবিতা রচনা করেন। এই কবিতার প্রথম পংক্তি ছিলো: 'যুদ্ধেতে ভাই সাইরেন বাজে তোরা সবে চল'। মহসিন হোসাইনের পিতা আবদুর রাজ্জাক মিয়া যেমন কাব্য ও সঙ্গীতামোদী তেমনই কবিতা, ছড়া ও প্রবন্ধ রচনার চেষ্টা করতেন। তার কিছু রচনার নমুনা আজো আছে। মহসিন মূলত: পিতার রচিত কবিতা পাঠ শুনে নিজে কবিতা রচনা করেন ১৯৬৫ সালে, যা আমরা আগেই বলেছি। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তার কৈশরিক কাব্যসাধনা অব্যাহত রাখেন। তিনি কলাবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় অধ্যয়নকালে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি করতেন এবং পুরস্কৃত হতেন। কবি মহসিন হোসইন যখন এসএসপি পরীড়্গার্থী ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির ভাষাদিবস সংখ্যার সাপ্তাহিক "স্বাধীকার" পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশ পায়। এতে এলাকাবাসীর কাছে তিনি এক বিস্ময়কর কিশোরে পরিণত হন। দৈহিক সৌষ্ঠব, পারিবারিক অবস্থান, মেধা ও কাব্য প্রতিভায় তিনি কিশোর বয়স থেকে কিংবদন্তিবালকে পরিণত হন। কবি মহসিন হোসাইন বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক কিংবদন্তি নাম:সব্যসাচী সাধক। মূলত তিনি কবি। সাহিত্যের বিচিত্র পথে একান্ত পদচারণা করেছেন। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, ছড়াকার, গল্পকার, ঐপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ফিচারলেখক, ফোকলোরবিদ, ইতিহাসগ্রন্থরচয়িতা, লোকসংস্কৃতিসংগা্রহক, গ্রামসমীক্ষ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচয়িতা, স্মৃতিকথা রচয়িতা, যাত্রাপালা রচয়িতা, নাট্যাভিনেতা, চলচিত্র অভিনেতা, টিভি নাট্যাভিনেতা, যাত্রাভিনেতা, পেশাদার বক্তা, বেহালাবাদক, রেডিও ব্রডকাস্টার, রেডিওর পান্ডুলিপি রচয়িতা ও টিভির কথক। মহসিন হোসাইনের মোট প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮০। বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর মোট ৪খানা গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছ। ইসলামিক ফাইন্ডেশন থেকেও তার আরো ৪খানা গ্রন্থ প্রকাশ পায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ, ছড়াগ্রন্থ, অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ, গীতিকবিতা গ্রন্থ ও সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থসহ এর সংখ্যা ২৭।


মহসিন হোসাইনের উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থ গুলো হলো: 
১.কাকজোছনার নীড় (কাব্য)
২.বনজের প্রাণ ছুঁয়ে যাও (কাব্য)
৩.নীলছায়া দিন (কাব্য)
৪.শুধূ রাত চাই সুকোমল (কাব্য)
৫.জলৌকা,কুয়াশা তুমি (কাব্য)
৬.মেডুসার চুল (কাব্য)

৭.গালিবের শেরগুচ্ছ (অনুবাদ কাব্য)
৮.গালিবের শের রূপান্তর (অনুবাদ কাব্য)
৯.মির তকি মিরের শেরগুচ্ছ (অনুবাদ কাব্য)

১০.শত বছরের সেরা কবিতা (সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ)
১১. শত বছরের প্রিয়কবিতা (১ম স.সম্পাদিত কাব্য)
১২.শত বছরের প্রিয়কবিতা (২য় স.সম্পাদিত কাব্য)
১৩. শত বছরের প্রিয়কবিতা (৩য় স,সম্পাদিত)
১৪.একুশের সেরাকবিতা (সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ)
১৫.মুক্তিযুদ্ধের সেরাকবিতা (সম্পাদিত কাব্যগ্রন্থ)

১৬.ইকিরমিকির চিকিরদান (ছড়া)
১৭.উটকো রাজা উটুসফুটুস (ছাড়া)
১৮. সেই হাতিরা উড়তে পারে (ছাড়া)
১৯.মুক্তিযুদ্ধের ছড়া (ছড়া)
২০.পাখির রাজ্যে কিচিরমিচির (ছড়া)
২১.পায় না শিশু পোড়ারুটি (ছড়া)
২২.প্রীতির ছড়া জয়ের পড়া (ছড়া)
২৩.চাঁদের দেশে জোছনা ঝরে (ছড়া)
২৪.বাঁচতে হলে জাগতে হবে (ছড়া)
২৫.ছড়ায় ছড়ায় নদ ও নদী (ছড়া)
২৬.মহসিন হোসাইনের একুশের ছড়া
২৭.ছাড়ায় ছড়ায় ইসলাম (ছড়া)

২৮,স্মৃতির অলিন্দে শিল্পি সুলতান (স্মৃতিকথা;প্রথম প্রকাশ)
২৯.স্মৃতির অলিন্দে শিল্পি সুলতান (স্মৃতিকথা;দ্বিতীয় সংস্করণ)
৩০. কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতিসান্নিধ্যে (স্মৃতিকথা)

৩২.হার্মাদের প্রেম (উপন্যাস)

৩৩.ভূতের সংসার (গল্পগ্রন্থ)

৩৪.নড়াইল জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস)।

মহসিন হোসাইনের কবিতা হলো এক বিরল বৈদদ্ধজাতরসময় বাক্যপ্রতিমা। যথাশব্দ নির্মাণ ও প্রয়োগে ইতোমধ্যে তিনি দুই বাংলার পাঠকের কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছেন। তাঁর কবিতা স্বপ্ন ও বিস্ময়ের এক অভিনব সংমিশ্রণ। জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতার স্পর্শ তিনি দিয়ে যেতে চান তাঁর কবিতার শরীরে। উপমা-উতপ্রেক্ষা নির্মাণ, ছন্দের যথাযথ প্রয়োগ, দেশি ও বিদেশি মিথ বা পুরানের ব্যবহারে মহসিন হোসাইন বিশেষ পারঙ্গম। গবেষকদের ধারণা,সত্তর দশকের কবিদের মধ্যে কবিতায় তিনিই সর্বোচ্চ সংখ্যখ মিথ ব্যবহার করার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। তিনি আধুনিক জীবনবোধ, নাগরিকযন্ত্রণা, গ্রামীণকমলসৌন্দর্য, প্রকৃতির রূপসুষুমা, আগামী দিনের স্বপ্ন ও স্মৃতি লালন করেন তার কবিতায়। তিনি বিচিত্র মত, পথ ও আদর্শের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁর কাব্যের সুরম্যপরিধি নির্মাণে এগিয়ে এসেছেন। মহসিন হোসাইন কবিতার শরীর নির্মাণে ব্যতিক্রমী। তাঁর কবিতায় আছে গভীর জীবনবোধ, দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি, তীক্ষ শব্দাবলী, আলোছায়া ও অনুভবের বিচিত্ররহস্য।
এবার আমরা কবি মহসিন হোসাইনের ৩ ধারার তিনটি কবিতা উদ্ধৃত করছি:

বিস্মৃতি কতোটুকু কেড়ে নেবে

এক দিন সমস্ত শহর পেরিয়ে তান্ডব এলো গ্রামের জঠরে।  সবুজ আকাশ
হলো বহ্নির রঙে রঞ্জিত। ঠিক যেন রক্তমাখা কারবালা।  যতুগৃহ
পোড়ার দুর্গন্ধ লুফে নিলো সাধারণ গৃহস্থ ঘর
সখের বাগান পুকুর খোঁপের কবুতর গোলাবাড়ি শিশু
কিশোরি কিশোর যুবক ও যুবতীর স্বপ্নাতুর দুই কালো
চোখ।  ঘোলা হলো অগণিত দম্পতির স্বোচ্চার আকাঙ্কা
ভেঙে তছনছ মাটির সানকি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো
অন্ধবুড়ির পান্থাভাত। ধ্বনি থেকে প্রতিধ্বনি ভেসে
গেলো ইথারে ইথারে: শক্তহাতে অস্ত্র ধরো, বাংলা-
দেশকে স্বাধীন করো।

এরপর প্রচন্ড হিম্মতে মায়াময় ঘরে শুয়ে থাকা বোবা
উদ্দাম এলো। ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে শাণিত বল্লম তরবারি
শপথি ঝলক দিতে থাকে। সারা মাঠ ময়দান বনবাদাড়ও
নদী বক্ষে বারুদের চারা জাগে। বাংকারে বাংকারে বেজে
ওঠে প্রতিশোধী মুক্তির টংকার। সমস্ত প্রকৃতি ছেয়ে
গেলো রক্তমেঘে। শিতের প্রহরগুলো ধারালো গ্রেনেড
হলো, নগর ও গঞ্জ হলো জ্বলন্ত আগুন। বৈশাখি রম্নদ্র
ঝঞ্ঝা ছোটে মৃত্যুঞ্জয়ী মু্‌ক্তিসেনা। 

ছেড়া জামা গায়ে পোড়া চুলে টগবগে রক্তস্নানে ফিরে
এলো নওশার সাজে বাঐসোনার দূরন্ত যোদ্ধা
আকমান। কলাবাড়িয়ার খোকা মিয়া, রামডাক্তার ও পাচু
শিকদার, পানিপাড়ার কিশোরি বধু রূপবান দুই বছরের
শিশু বুকে চৌচির হলো গোলার আঘাতে ঠিক মাদার গাছের
মতো।  হায়ানার ছোবলে দদ্ধ অসংখ্য তাজা প্রাণ, পুষে
রাখা সমভ্রম হারিয়েছে অসহায় বোনেরা আমার। তেরখাদা
যুদ্ধের সকালে আমার পিতার দেহ লাশ হলো। বিদায়ের
মূর্হূতে জীবন্ত হয়ে লেগে আছে সারাটি সম্মুখ। হাড়হাড্ডি
স্বপ্নচিতকার অর্তনাদ পচে সোঁদা গন্ধ হলো মাটি, শান্ত
সবুজ হলো এ বাংলার মুখ।

গভীর বিশ্বাসী পিতা জেগে থাকে সারাক্ষণ বিস্মৃতি
কতোটুকু কেড়ে নেবে স্মৃতিসম্ভার।

রবীন্দ্রনাথ

বাল্মিকীর আদি কবিতার নিষাদ ধানুক ভেঙে ছিলো ক্রোঞ্চের
যুগল মিলন।  মৃত ক্রোঞ্চের বিরহে ক্রোঞ্চির দীর্ঘশ্বাস
মিশে ছিলো ইথারে ইথারে। সেই থেকে অচ্ছুত বিরহ
গীতি, নৈঃশব্দ প্রেম, অশোকনিসর্গ, মানবসমপ্রীতি
পুঞ্জেপুঞ্জে সঞ্চিত তুমি রবীন্দ্রনাথ। কৃপাহীন নিষ্ঠুর শব্দের শিকারি
তুমি। বৈদিক মননধৃতি, সুফির মরমি সত্য, হাফিজ ও
উপনিষদের ময়ুখ বিলোল প্রজ্ঞা তোমাতে সুস্থির; মহান খলিন।

একদিন বিপন্ন বিস্ময়ে ছিলো পড়্গীচঞ্চুর ভাষা। তাকেই পরালে
হিরকের আভারণ বৈশ্বিক প্রগাঢ় প্রেম। স্বোপার্জিত রসপূট
পূণ্যাহে বিলালে মননে মননে। কবিতার বিস্বাদ বিস্রস্ত
আধিভার দূরে দিলে হে কবীন্দ্র আপন প্রতাপে। ক্লান্তি
অবসাদ অন্ধকার তাড়ানিয়া তুমি এক অখন্ড সঙ্গীত। মহা-
কালের অজর বিস্ময়।


পথের শেষেই পড়ে থাকে

পদ্ধগন্ধী দুই ঝাঁপি ফুল আকড়ে রাখি ভীষণ রকম
লুটের মালের মতো। তখন তো আমি রাজার চেয়েও  রাজা
সিংহাসনকে তুচ্ছ মেনে সব পাওয়াতে মারছি
পদাঘাত। সোনার এবং রূপার কাঠির ঘুম পড়ানো জোছনা
মেঘের উপল খুঁজে ফিরি। মুখে আমার একটি পদ্য; বদ্ধ মাতাল
কোরাস, সৌগন্ধে বিবশা দুই নাক। সারা ভূমির
চমক লুটোয় শিউলি বিছানো পথে। যাদুর বাঁশির
মিড় জেগেছে বিলোল। অনু থেকে পরমাণুর দেশেই।

দুই ঢালুতল লেপ্টে নিছে আমায় এবং সুখের মধ্যে
কষ্টে ভেজা হাসি। চোখ ধাঁধানো জোস্না ঝরা সাগর তীরের
গান। উজান পথেই স্বেদ মেখে নেই মুখে তখন আদিম
সুক্তি ফোটে, ভেসে যাওয়া মধ্যরাতে কামিনী সৌরভ।

বাইরে তখন হাওয়া অচল সচল শুধু মড়ার ওপর
আমি। দুই পৃথিবীর মাটি লোপাট কখনো কুঞ্চিত, যতো
বোঝার ততোটা যায় বোঝা,বোঝানো তো সত্যি সহজ নয়।

পথের শেষেই পড়ে থাকে নিঃশেষ হওয়া দৃইটা দুধেল
বাটি, নেতিয়ে পড়া ক্লান্ত কালো মুখে। 


রাজনৈতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ:
কবি মহসিন হোসাইন ১৯৭০ সালে কলাবড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে একটি বামরাজনৈতিক দলে যোগদেন। এই দলে তিনি অন্তুরিক ও সক্রিয় ছিলেন।  পার্টি লাইনের সব সিদ্ধান্ত একান্ত ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। একাত্তরে স্বাধীনতার ডাকে নিজের সিদ্ধান্তেই অংশ গ্রহণ করেন। রাজনৈতিক নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে তিনি ১৯৭৬ সালে রাজনীতি থেকে দূরে সরে দাঁড়ান। ১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলে মহসিন হোসাইন অংশ নিয়ে ছিলেন।

মহসিন হোসাইন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮ ও ৯ নং সেক্টরের কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী সেই কিশোর বয়সেই তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোল্যা মনিরুজ্জামান (কলাবাড়িয়া নিবাসী)-এর নেতৃত্বে কলাবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তিনি তেরখাদার প্রথম যুদ্ধে অন্যান্য যোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করেন। এর আগে ২৯ এপ্রিল যশোর সেনানিবাস ঘেরাও অভিযানের যোদ্ধা হিসেবে অংশ নেন কিশোরকবি। সেই সময়ে হাজার হাজার জনতা নড়াইল-যশোর সড়কের যোগাযোগ রক্ষাকারী তুলারামপুর ব্রিজ ভাঙার উদ্যোগ নেন। এটা ছিল যুদ্ধনীতির কৌশল। এই প্রতিরোধ কাজের জন্য মহসিন হোসাইন অন্যান্যদের সঙ্গে বাড়ি থেকে একখানি শাবলসহ অনেকের সঙ্গে প্রায় ৪৫ কি: মি: দূরত্ব অতিক্রম করে তুলারামপুরে উপস্থিত হন। ব্রিজভাঙা শুরুও করা হয়েছিল। ব্রিজের পশ্চিম পার্শ্বে বড় গর্ত ও ক্রংক্রিট ভাঙা শুরু হয়। তবে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অনুরোধে ব্রিজভাঙার কাজ বন্ধ করা হয়। কাজলা নদীর পশ্চিম পারে ব্রিজের দুই পাশে পাকহানাদারদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে অনেকগুলো মরিচা খনন করা হয়েছিলো। বীর মুক্তিযোদ্ধা মহসিন হোসাইন যে শাবলখানা সেদিন ব্রিজ ভাঙা ও মরিচা খননের কাজে ব্যবহার করেছিলেন সেই শাবলখানা মু্‌ক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য দান করেছেন।

মহসিন হোসাইন এক পর্যায়ে দ্বিতীয় বারেরমতো ভারতে গমন করেন সেপ্টেম্বর মাসের প্রথমার্ধে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণের জন্য। ভারত যাওয়ার প্রক্কালে কালিয়া মু্‌ক্তিযোদ্ধা থানা কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ তাঁর সহোদর ভারতের কল্যাণী ইউথ ক্যাম্পের উপপরিচালক ও বি-কোম্পানি কমান্ডার আবুল বাশার আজাদকে পত্র লিখে মহসিন হোসাইনকে যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করানোর জন্য নির্দেশ দেন। পরে তিনি কল্যাণী ক্যাম্প থেকে ৫নং টালিখোলা ক্যাম্পে অবস্থান গ্রহণ করেন। এই ক্যাম্পটি ছিলো পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বনগ্রামে। এক পর্যায়ে খুলনা ও যশোর জেলা সীমান্তের গাজিরহাটের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান নিয়ে মহসিন সেকালের যশোর ও খুলনা অঞ্চলের রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি একাত্তরে যুদ্ধকালে যে সব ছড়া লিখেছেন তা পরে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা:একাত্তরের ছড়া’ নামে বই আকারে প্রকাশ পায়। এছাড়াও তিনি মুক্তযুদ্ধ চলাকালে আরো কবিতা ও গান রচনা করেন; যা অপ্রকাশিত। মহসিন হোসাইন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখেছেন দুইখানা: ১. মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস: কালিয়া উপজেলা (১৯৮৫) ও ২. নড়াইল জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (২০০৯)। এ ছাড়া তাঁর লেখা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি স্মৃতিচারণামূলক রচনা প্রকাশ পায় ‘বেতারবাংলা’ পত্রিকায় ১৯৮৮ সালে। মহসিন হোসাইন ‘মুক্তিযুদ্ধের বাছাই কবিতা’ গ্রন্থ সম্পাদনা  করেন ২০১১ সালে। তিনি ভারতের ৫নং টালিখোলা ক্যাম্পে অবস্থান কালে রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মুক্তিযুদ্ধ মোটিভেশন ক্লাশে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে মুক্তিযোদ্ধাভাইদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। সেই কিশোর বয়সেই কবি হিসেবে মহসিন হোসাইন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পরিচিতি অর্জন করেন। যুদ্ধ দিনের অনেক পত্রিকা তার সংগ্রহে ছিল। শেষ পর্যন্ত তার সংগ্রহে টিকে থাকে ১৯৭১ সালের বিজয় দিবস বা ১৬ ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘নতুন বাংলা’ ও ২৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ’ পত্রিকা। দুটি পত্রিকায়ই কবি মহসিন হোসাইন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দান করেছেন। এ ছাড়া তিনি কালিয়া যুদ্ধের তৃতীয় দিনে অর্থাত ৮ ডিসেম্বর ফিরে যান গাজিরহাট ক্যাম্পে; সেই রাতেই একটি পরিত্যক্ত কলেজ ম্যাগাজিনের অব্যবহৃত পৃষ্ঠায় কবিতা লেখেন ‘তোমাকে নিয়ে যাবই’। পরের দিনগত রাতে অর্থাত কালিয়া বিজয়ের রাতে লেখেন কবিতা ‘অভিযান’ (নড়াইল মুক্তদিবস পালিত হয়ে থাকে ১০ ডিসেম্বর; নড়াইলের সামগ্রিক বিজয় অনুকরণ করে কালিয়ায়ও মু্‌ক্তদিবস পালিত হয় ৯ ডিসেম্বরের স্থলে ১০ ডিসেম্বর), এবং মহসিন হোসাইন ১২ ডিসেম্বর রচনা করেন কবিতা ‘বল কর সঞ্চার’। এই ৩টি কবিতার মূলপান্ডুলিপি তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরাক্ষণের জন্য দান করেছেন। এ ছাড়া দান করেছেন ১৯৭১ সালে তোলা তার ২খানি আলোকচিত্রও।

কবি মহিসন হোসাইন কমান্ডার মনিরুজ্জামান ও সেকালের ইপিআর সুবেদার মেজর শওকাত (গ্রাম: ইসলামপুর; উজজেলা কালিয়া)-র সঙ্গে ভারতে গমন করেন। কিশোর মহসিন হোসাইন সেসময়ে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অফিস (৮নং থিয়েটার রোড), ৮নং সেক্টর কমান্ডের সাবসেক্টর কমান্ড অফিস,কলকাতার বাংলাদেশ দূতাবাস অফিস, স্থানীয় এমএনএ ও এমএলএ-এর অস্থায়ী অফিস বনগাঁও ডাকবাংলা, বালিগঞ্জ স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অফিসে গিয়ে দেশজাতির প্রকৃত অবস্থা ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে খোঁজখবর গ্রহণ করে বনগাঁর ৫নং টালিখোলা ক্যাম্পে মু্‌ক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করতে থাকেন। তিনি ছিলেন টালিখোলা ক্যাম্পের ইকো প্লাটুনের যোদ্ধা। এই ক্যাম্পে ট্রেনিং গ্রহণ কালে মহসিন হোসাইন রাতের দরবার অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতা পাঠ করে সহযোদ্ধাদের উদবুদ্ধ করেছিলেন।

ভারত থেকে দেশে ফিরে আসা কমান্ডার মনিরুজ্জামানের নির্দেশে কবি পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। এবং কালিয়ার অদূরে গাজিরহাট মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে যোদ্ধা হিসেবে অস্ত্রসহ অবস্থান গ্রহণ করেন। এই ক্যাম্পে অবস্থানকালে কালিয়া বিজয়সহ কয়েকটি গুরম্নত্বপূর্ণ যুদ্ধে মহসিন হোসাইন বীরত্বের সঙ্গে অংশ গ্রণণ করেন। কবি গোপালগঞ্জ, খুলনা ও পূর্ব যশোরের কয়েকটি প্রত্যড়্গযুদ্ধে অংশগ্রহণ নেন। বিশেষত: খুলনার শিরমণিতে পাকবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যুদ্ধের পাশাপাশি কমান্ডার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি কমান্ডার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে সেনহাটি ও শিরমণি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। ১৬ ডিসেম্বরে সারা দেশমুক্ত হলেও অবরুদ্ধ খুলনাসহ ব্যাপক এলাকা পাক হানাদারদের দ্বারা অবরুদ্ধ  ছিলো। এই পরিস্থিতিতে কমান্ডার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি বড়ো মুক্তিযোদ্ধাদল খুলনা ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন। কবি  সেই দলের হয়ে প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।


সঙ্গীতে অবদান:
শিশুকাল থেকে মহসিন হোসাইন গ্রাম্যসঙ্গীতের আবহে লালিত হন। সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণের কারণে পরিবারে বড়োদের কাছ থেকে তাকে নানা সময়ে ভর্তসনা শুনতে হয়েছে। বাড়ির গ্রামোফোন ও পরবর্তীকালে রেডিওর গান শুনে শুনে মহসিন হোসাইন সঙ্গীতের প্রতি নিবিষ্ঠ হন। ১৯৬৭ সালে ৭ম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি গান রচনা করেন। এই সময়ে তার গান সুর দিতেন বাল্যবন্ধু সুগায়ক জাহাঙ্গির আলম ভূইয়া (মূলখানা গ্রাম নিবাসী)। তার গান সে যুগে স্বাধীনতা দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হতো। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ বেতার আয়োজিত জাতীয় দেশত্ববোধক সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে কবি মহসিন হোসাইন প্রশংসাসনদ লাভ করেন।  ১৯৮৫ সালে তিনি রেডিও বাংলাদেশের গীতিকার তালিকাভুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে কবি বাংলাদেশ টেলিভিশনের গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এখন তিনি টেলিভিশনের ‘ক’ শ্রেণির গীতিকার। রেডিও টিভিই নয় বিভিন্ন অডিও ভিডিও কোম্পানির জন্যও তিনি লিখেছেন প্রচুর গান। তার মোট রচিত গানের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার।

মহসিন হোসাইন যেসব গান রচনা করেছেন তার শ্রেণি হলো: ১. রাগপ্রধান গান ২. আধুনিক গান ৩. পল্লিগীতি ৪. ভাটিয়ালি ৫. মুর্শিদি ৬. বন্দনা ৭. হামদ ৮. নাত ৯. গজল ১০. কেয়াম ১১. কীর্তন ১২. ভজন ১৩. শ্যামাসঙ্গীত ১৪. ভোরগোষ্ঠ ১৫. ফেরত গোষ্ঠ ১৬. আগমনী ১৭. সখিসংবাদ ১৮. কবিগান ১৯. ধুয়াগান ২০. গাজির গানের আসর বন্দনা ২১. মানিক পিরের গানের আসর বন্দনা ২২. দেশত্ববোধক গান ২৩. গণসঙ্গীত ২৪. ভাষার গান ২৫. মুক্তিযুদ্ধের গান ২৬. একুশের গান ২৭. ভাসানগান ২৮. ছড়াগান ২৯. দেহতত্ত্ব গান ৩০. আলস্নাহ তত্ত্বগান ৩১. মুর্শিদি গান ও বাউল গান। মহসিন হোসাইনের রচিত গান নিয়ে একটি একক অডিও (প্রথম দেখা) ও ৮টি মিশ্র অডিও ক্যাসেট বাজারে গিয়েছে। যেসব কন্ঠশিল্পী তাঁর রচিত গান রেডিও ও টেলিভিশনে পরিবেশন করেছেন তারা হলেন, ১. ফিরোজ সাঁই ২. ফকির আলমগির ৩, সুফিয়া মনোয়ার ৪. মনির খান ৫. সরদার গিয়াসউদ্দিন ৬. সরদার আশরাফউদ্দিন বাবুল ৭. নুরুন্নাহার আউয়াল ৮. শিখা চৌধুরি ৯. জহির আলিম ১০. শাহিন সরদার ১১. মুহম্মদ সফর আলি ১২. কল্পনা রাজবংশী ১৩. নিখু আচার্য ১৪. আশরাফ উদাস ১৫. মুহম্মদ শফিউদ্দিন ১৬. হালিমা পারভিন ১৭. সুলতানারা বেগম ১৮. আঞ্জুমানারা শিমূল ১৯. আবদুস সত্তার(ধনু সাত্তার) ২০. নাসরিন জাহান ২১. দিলদার হোসেন মোড়ল ২২. রশিদ মিয়া ২৩. মো:ইব্রাহিম ২৪. জাহানারা মফিজ ২৫. নুরুন্নাহার সঙ্গীতা ২৬. শাহনাজ বুলবুল ২৭. আব্দুল মান্নান ২৮.  সালমা আলি ২৯. হাসিনা বেগম ৩০. তাপস মজুমদার প্রমুখ। যেসব সুরকার মহসিন হোসাইনের গানে সুর দিয়েছেন তারা হলেন, লোকমান হাকিম, সরদার গিয়াসউদ্দিন, ফকির আলমগির, মনোয়ার হোসেন খান প্রমুখ।

সঙ্গীতের নেশায়ই মহসিন হোসাইন কৈশর থেকে যৌবনে পদার্পণের সময়ে  কবিগান, ভাবগান (কড়চাগান) ও জারি গানের দল তৈরি করে নিজের গান প্রচারে চেষ্টিত হয়েছিলেন। তিনি এই সব গানের সরকার বা রচয়িতা হিসেবে কাজ করেছেন। এক সময়ে গ্রামীণ গায়কেরা মহসিন হোসাইনের কাছে বিশেষত খুলনা বেতারের কন্ঠশিল্পীরা সুর করা গান নিয়ে পরিবেশন করার জন্য ভিড় জমাতেন। এক সময়ে কবিয়াল বিজয় সরকারের কবির দলে তিনি যোগ দেন, কবিয়াল বিজয় তাকে সরকারি শেখানোর জন্য ব্যকুল ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি চারণবৃত্তির দিকে যাননি। আধুনিক গান, কবিতা ও সাহিত্যই তাঁর মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে।  মহসিন হোসইনের একটি জনপ্রিয় আধুনিক গান যা রেডিও, টিভি ও অডিও ক্যাসেটে প্রচার পেয়ে এক সময়ে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায় তা হলো:

তুমি কোথায় কেমন আছো
বহু দিন জানি না,
তুমি যে আমার নও
দূরে থেকেও মানি না।।

দক্ষিণা বাতাস এলে বাগানে
মন ভরে ওঠে আজো সে গানে
যে গানে তোমার স্মৃতি
কেঁদে ওঠে মনোবীণা।।

তোমায় ভাবি আমি এ মনে
তুমিও আমায় ভাবো গোপনে
তুমি আছো তাই আছি
নিয়ে বেদনা।।

শিল্পি সুফিয়া মনোয়ারের গাওয়া মহসিন হোসাইনের লেখা বেশ কিছু গান রেডিওর স্টুডিও রেকর্ডে ও বিটিভিতে পরিবেশিত হয়ে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়, সেই সময়ের তেমন একটি গান এখানে উদ্ধৃত করা হলো:

বন্ধু তোমার চিঠির ভাষা ছিলো ‘ভুলো না আমায়’
লিখেছিলে ‘মনে রেখ’ তা কি ভোলা যায়।।

মানুষ মরিয়া গেলে রেখে যায তার স্মৃতি
যদি ওগো সেই মানুষে বাড়ায় কারো প্রীতি;
দূরে আছো আমায় ভুলে তবু তোমায় মনে চায়।।

দিন যায়গো কথা থাকে, থাকে ভালোবাসা
ভালোবাসা হয়েছে গো আমার সর্বনাশা;
তোমায় ছাড়া অভাগিনীর বুক যে ফেটে যায়।।

এবার কবি মহসিন হোসাইনের কয়েকটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পাওয়া গানের প্রথমাংশ উদ্ধৃত করা হলো:

১. ও আমার শ্যামলভূমি বাংলা মাগো বিশ্ব রূপের রাণী
২. ফাগুন এসেছে আজ বনে বনে
৩. পলাশ শিমূল ফুটেছে আজ বনে বনে
৪. একুশের রাজপথে রক্ত ঝরালো যারা
৫. মাটির দেহ কাঁচাঘর দম ফুরাইলে সবি পর
৬. যদি আকাশের তারাগুলো হতো ফুল
৭. বন্ধুর বাড়ি আমার বাড়ি মধ্যে ছোট নদী
৮. বন্ধুর কী আর হবে সময় সখি আসিতে এ গোকুলে
৯. নিদয় বন্ধুরে বাঁচি না আর তোমার বিহনে

কবি মহসিন হোসাইন যাত্রাপালা রচনার সাথে সাথে যাত্রাপালার জন্য গানও রচনা করেছিলেন। বেশ কয়েকটি বড়ো যাত্রাদলের সূচনাসঙ্গীত রচনা করে মহসিন হোসাইন বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত গান যাত্রা দলের ব্যালেড্যান্সের সঙ্গেও গীত হতো। এই বিষয়ে তাঁকে সহযোগিতা করেছিলেন কালিয়া নিবাসী যাত্রাদলের প্রবীণ সঙ্গীত ও নৃত্য পরিচালক নিখিলচন্দ্র ঘোষ।

গীতিকার মহসিন হোসাইন একটি ব্যতিক্রমী গান রচনা করছেন নতুন শতাব্দী উপলক্ষ্যে। ১৪০০ সাল পূর্তি উপলক্ষ্যে নতুন বর্ষ ও নববৈশাখকে আহ্বান করে তিনি গানটি রচনা করেন। গানটি ঐ বছর ১ বৈশাখ ঢাকাস্থ কিশোরগঞ্জ সমিতিরি শিল্পিরা সমবেত কন্ঠে ট্রাকে চড়ে সার রাজধানী শহর বিশেষ করে শাহবাগ, রমনা, প্রেস ক্লাব ও আর্ট ইন্সটিটিউটের সামনে পরিবেশিত হয়। গত শতাব্দীর নব্বই দশকে মহসিন হোসাইন সঙ্গীতে স্থায়ী আসন রাখার জন্য ঢাকার বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (সদরঘাট) তে বেহালা বাদন শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি উচ্চাঙ্গসঙ্গীত বাদনে বিশেষ পরদর্শিতা দেখিয়েছিলেন।  বিখ্যাত সঙ্গীতপরিচালক, সুরকার ও কবির বেহালার শিক্ষার  ওস্তাদ আলাউদ্দিন মিয়া লিখেছেন, ‘তিনি (মহসিন হোসাইন) যদি শিল্পের অন্যান্য দিকে বেশি সময় না দিয়ে বেহালায় সময় দিতে পারতেন তা হলে আমাদের সঙ্গীত জগতের এক উজ্বল তারকা হিসেবে বিরাজ করতেন।’

রেডিও টিভিতে অংশগ্রহণ :
কবি মহসিন হোসাইন ১৯৭৪ সাল থেকে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে রেডিওর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়ে তার রচিত বহু ছড়া-কবিতা শিশু শিল্পিদের কন্ঠে পরিবেশিত হয়েছে খুলনা বেতারে। গানও প্রচার হয়েছে বেনামিতে। তিনি ১৯৮৫ সালের ২ অক্টোবর রেডিও বাংলাদেশের গীতিকার ও শিল্পি হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৮৯ সালে খুলনা বেতারের ‘প্রভাতী’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে ‘কিংবদন্তির বাংলা’ নামের পান্ডুলিপি রচনা করতেন। এই অনুষ্ঠানটি স্থায়ী হয়েছিল ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯০ সাল থেকে খুলনা বেতারের ‘প্রতিধ্বনি’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের জন্য ‘লোকঐতিহ্য’ কথিকার পান্ডুলিপি রচনা করতেন মহসিন হোসাইন। এই অনুষ্ঠানটি প্রচার হতো রাত ৯টা ২ মিনিট থেকে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত। মহসিন হোসাইন ১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার ‘দেশপত্র’ পত্রিকায় সহযোগি সম্পাদকের চাকরি গ্রহণ করলেও তিনি খুলনা বেতারের জন্য ‘লোকঐতিহ্য’ কথিকার পান্ডুলিপি রচনার কাজ অব্যাহত রাখেন। এই অনুষ্ঠানটি চলেছিলো ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। খুলনা বেতারের জন্য লেখালেখির সুযোগ করে দিয়েছিলেন "স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রখ্যাত" বেতারব্যক্তিত্ব বেলাল মোহাম্মদ। বেলাল মোহাম্মদ মহসিন হোসাইনের বিশেষ গুণগ্রাহী ছিলেন। খুলনা বেতারে ও পরবর্তী কালে ঢাকার বহির্বিশ্ব কার্য়ক্রম অনুষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত স্বরশিল্পি আবদুস সবুর খান চৌধুরি কবি মহসিন হোসাইনকে বিশেষ সহযোগিতা করেছিলেন।

১৯৯০ সালে ঢাকা বেতার কেন্দ্রের বহির্বিশ্ব কাযক্রম অনুষ্ঠানের ‘বর্ণালী’-র  জন্য মহসিন হোসাইনকে কথিকা লেখার সুযোগ করে দেন পরিচালক মোবারক হোসেন খান। এই সময়ে সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার ও অনুষ্ঠান সংগঠক মনোয়ার হোসেন খান তাকে বিশেষ সহয়োগিতা করছিলেন। এই অনুষ্ঠানের জন্য তিনি পান্ডুলিপি রচনার কাজ করেন ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। ‘বর্ণালী’ অনুষ্ঠানে লিখেছিলেন যে সব ধারাবাহিক কথিকা সেগুলো হলো, ‘শ্বাশত বাংলা, ‘লোকাচার’ ও ‘সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ’। এই কথিকাগুলো মহসিন হোসাইন যেমন রচনা করেছেন তেমনি কন্ঠও দিয়েছিলেন। এই সময়ে মহসিন হোসাইন স্বরচিত কবিতাও পাঠ করেছেন বেতারে।

২০০০ সালের ২০ নভেম্বর বহির্বিশ্ব কার্যক্রমের ‘আজকের কবি’ অনুষ্ঠানে কবি মহসিন হোসাইনের একটি মূল্যবান সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। সাক্ষাৎকারের সঙ্গে যে সব স্বরচিত কবিতা তিনি পাঠ করেন সেগুলো হলো, ‘সুগন্ধী নিশিপদ্ম’, অভিমানী, বংশীনদী ও হেয়ালিছড়া। অনুষ্ঠানটি উপাস্থপনা করেন, রাজিয়া সুলতানা।

তথ্যসূত্র : www.jessore.info 

Rationale
UploaderMd. Mijanur Rahman Niloy