Golden Bangladesh
Eminent People - মহাদেব সাহা

Pictureমহাদেব সাহা
Nameমহাদেব সাহা
DistrictBogra
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeকবি
Life Style

গ্রামের এক বালিকা বিদ্যালয়ে শুরু হয়েছিল তাঁরপড়াশুনা। যদিও নামে সেটি ছিলবালিকা বিদ্যালয় কিন্তু সেখানে ছেলে-মেয়ে সকলেইএক সাথে পড়াশোনা করত। এখানথেকে প্রাইমারি ধাপটি পাশ করে ভর্তি হন গ্রামেরইউচ্চ বিদ্যালয়ে। পরে চলে আসেনবগুড়ার ধুনট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে বন্ধুদের সাথেমিলে বের করতেন দেয়াল পত্রিকা। এই বিদ্যালয়েরলাইব্রেরিতে ছিল প্রচুর বই। এসববইয়ের মধ্য দিয়েই তিনি গড়েতোলেন পাঠাভ্যাস। তখন থেকেই আলাদা করে পড়তেনরবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর জীবনানন্দদাশের কবিতা। বাড়ির সকলের ও বন্ধুদের চোখ ফাঁকিদিয়ে অংকের খাতা ভরে তুলতেনকবিতা দিয়ে। বিদ্যালয় ছুটির পর বন্ধুরা যখন মাঠেখেলতে যেত, তিনি তখন ঘুরেবেড়াতেন নদীর তীরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে।

সকলের চোখের আড়ালে কবিতা দিয়ে অংকের খাতা ভরেতোলা এই ছেলেটিই হচ্ছেনআমাদের প্রধান প্রিয় কবিদের একজন। নাম মহাদেবসাহা। গত চার দশকে তাঁর হাতেসমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা কবিতা। কিন্তু এখনো তিনি তাকিয়েআছেন নতুনতর সৃষ্টি সুখেরউল্লাসের দিকে। এই কবির কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছেআমাদের চিরপরিচিত জীবনেরইক্লেদ-যন্ত্রণা আর সুখের অনুসঙ্গগুলি। বাংলা কবিতারআবেগময় রূপটিকে মহাদেব সাহাসজীব ও জনপ্রিয় করে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব বৈচিত্র্যদিয়ে। যে কারণেই পাঠক বারবারফিরে আসে তাঁর কবিতার কাছে দ্রোহ বা প্রকৃতি কিংবাভালবাসার ছোঁয়া পেতে।

বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই নিজের ভিতরে অনুভব করলেনকবিতা যেন তাঁর বয়স বাড়িয়েদিচ্ছে। আর সবার মতো তিনি নন। কিছুটা মগ্ন। কিছুটাঅন্যরকম। এরই মধ্যে ১৯৬০ সালেধুনট হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। স্কুলের পাঠশেষ করে চলে আসেন ঢাকায়।ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। কিন্তু কঠিনটাইফয়েডে অক্রান্ত হয়েশারীরিক অসুস্থতার কারণে পড়া শেষ না করেই চলে যানবগুড়ায়। বগুড়া তখনশিল্প-সাহিত্য-রাজনীতির সমঝদার শহর। এ ছোট জেলাশহরটি তখন সাহিত্যের প্রতিখুবই আগ্রহী। কিছু তরুণ কবিতাপ্রেমী ছিল এর নেপথ্যে।মহাদেব সাহাও ভিড়ে গেলেনসেই দলে। বগুড়াতে থাকাকালীন সময়েই সাহিত্য আরপত্র-পত্রিকার সঙ্গে গভীরযোগাযোগ তৈরি হয় মহাদেব সাহার। তখন অধ্যাপকমহসীন আলী দেওয়ান বের করেন 'বগরা বুলেটিন'শিল্প-সাহিত্যে আগ্রহী এই মানুষটিএকটি সাহিত্য পত্রিকাও বেরকরতেন। কবি আতাউর রহমান তখন বগুড়ায়। ফলে জমেউঠতে বিশেষ সময় লাগল না তাঁর।বগুড়া 'বেনীপুর বুক হাউস' তখন শহরের সকলসাহিত্যমোদীদের ঠিকানা। বগুড়ার এসবসাহিত্যমোদীদের সাথে আড্ডা দেওয়ার পাশাপাশি চলততাঁর পড়াশুনা। তিনি বগুড়া কলেজথেকে ১৯৬৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন এবং সেখানথেকেই বাংলায় সম্মানসহস্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

বগুড়া কলেজে পড়ার সময় সব আধুনিক ও প্রগতিশীল তরুণরামিলে বের করে ফেললেন লিটলম্যাগাজিন 'বিপ্রতীক'সেসময় 'বিপ্রতীক' ঢাকায়ওযথেষ্ট আলোড়ন তোলে। বেনীপুর বুকহাউসে তখন নতুন নতুন সব পত্রিকা আর বই যেত। একদিনমহাদেব সাহার হাতে পড়ে 'কন্ঠস্বর' নামে একটি পত্রিকা। সম্পাদক আব্দুল্লাহ আবুসায়ীদ। 'কন্ঠস্বর' তখনঅন্যরকম এক পত্রিকা। এটি যেন চুম্বকের মতো টেনেনিয়ে যায় তরুণ কবিতাপ্রেমীদের। 'কন্ঠস্বর'-এর ঘোষণাটি ছিল যেমন ধারালো তেমনিযুগোত্তীর্ণ। অভিভূত হয়ে যানমহাদেব সাহা। যেন নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতেপান পত্রিকার জীবন দর্শনে :-

"যারা সাহিত্যের স্বনিষ্ঠ প্রেমিক, যারা শিল্পেউন্মোচিত, সৎ, অকপট, রক্তাক্ত, শব্দতাড়িত, যন্ত্রণাকাতর, যারা উন্মাদ, অপচয়ী, বিকারগ্রস্ত, অসন্তুষ্ট, বিবরবাসী; যারা তরুণ, প্রতিভাবান, অপ্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধাশীল, অনুপ্রাণিত; যারা পঙ্গু, অহংকারী, যৌনতাপিষ্ট- 'কন্ঠস্বর' তাদেরই পত্রিকা।"

একদিকে 'কন্ঠস্বর'-এর রৌদ্র-তাপিত ঘোষণা, অন্যদিকেপূর্ব পাকিস্তানেরউত্তাল-অস্থির রাজনীতি। লাঙ্গলের ফলা ফেলে কৃষক বুকেতুলে নিয়েছে স্বায়ত্তশাসনেরশপথ। কল-কারখানার শ্রমিক চলে এসেছে রাজপথে। দেশহাঁটছে স্বাধীনতার পথে ধীরেধীরে। এরই মধ্যে মহাদেব সাহা এসে উঠেছেন রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়ে। এইবিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৬৮ সালে বাংলায় এম.এ.ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৯সালে ইংরেজি বিভাগে পুনরায় ভর্তি হন।বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই পদ্মা নদী।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সবকিছু ভুলেডুবে যান মতিহারের অপারপ্রকৃতির রাজ্যে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন সত্যিকারঅর্থেই সাহিত্যের তীর্থভূমি।কবি ও সাহিত্যিক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও মুস্তাফানুরউল ইসলামের সম্পাদনায় বেরহয় 'পূর্বমেঘ'-এর মতো বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা। লোকগবেষক কবি মযহারুল ইসলামবের করেন 'উত্তর অন্বেষা'রাজশাহী থেকে বের হয়আরও তিনটি সাহিত্য পত্রিকা 'সুনিকেত মল্লার', 'বনানী' 'একান্ত'আর অধ্যাপকসালাউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপকবদরুদ্দীন উমর, অধ্যাপক মশাররফ হোসেন, হাসান আজিজুলহক, গোলাম মুরশিদ, সনত্‍কুমার সাহা, আবদুল হাফিজ, আলী আনোয়ার সবাই মিলেযেন এক শিল্প-সাহিত্যের রাজত্বতখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা লেখার কারণেসকলেরই স্নেহ পান মহাদেবসাহা। এমন পরিবেশে নিজেকে বুঁদ করে রাখেন কবিতালেখায়। ঢাকার অনেকপত্রিকাতেই তখন নিয়মিত কবিতা ছাপা হচ্ছে তাঁর।বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ রেডিওরগীতিকার। তাঁদের উত্‍সাহে মহাদেব সাহা নিজেওগীতিকার হয়ে যান। সারাদিনঘোরাঘুরি, রাতভর আড্ডা, তর্ক-বিতর্ক, শেষ রাতে হলেফেরা। সব কিছুতেই নিজেকেলীন করে দেন মহাদেব সাহা। আবার গোপনে বুনে তোলেননিজস্ব এক ঠিকানাও।

এতোকিছুর মধ্যেও যেন 'কন্ঠস্বর' মোহবিষ্ট করে রাখেতাঁকে। সাহস করে একদিনসেখানে পাঠিয়ে দিলেন একটি কবিতা। অসম্ভব দ্রুততায়মহাদেব সাহার হলের ঠিকানায়একটি খসখসে হলুদ ঘাম এসে হাজির। 'কন্ঠস্বর' সম্পাদকআব্দুল্লাহ আবু সায়ীদলিখেছেন, আগামী সংখ্যাতেই কবিতাটি ছাপা হচ্ছে।চিঠি পেয়ে সে কী আনন্দ আরউত্তেজনা। মনে মনে অনুভব করেন 'কন্ঠস্বর'-এর অস্থিরউদ্দীপ্ত প্রবল জীবনের সঙ্গেমিলতে হবে। ভেতরে ভেতরে ঢাকা আসার উত্তেজনা ওস্বপ্ন দেখেন তিনি, যেটি ছিলোসত্যিকার অর্থেই কবিতা নিয়ে মেতে ওঠা এক অজ্ঞাততরুণের ঢাকা আসার প্রস্তুতিপর্ব।

কিন্তু এরই মধ্যে ঘটে যায় এক কালজয়ী ঘটনা, আবারপ্রিয় মুখ হারানোর কষ্টও। আইয়ুবখান তখন পাকিস্তানের শাসক। পশ্চিম পাকিস্তানে থেকেপূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণকরেন মৌলিক গণতন্ত্রের নামে। এ দেশে তার চেলামোনায়েম খাঁ আর নূরুল আমীন। পূর্ববাংলায় তখন গোটা দেশ উত্তালবিক্ষোভ-মিছিল-মিটিংয়ে। প্রায় প্রতিদিন টানটানউত্তেজনা৷ উত্তপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও। সময়টা '৬৯-র ১৮ফেব্রুয়ারি। আর্মি, পুলিশ, ইপিআর ঘিরে ফেলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেইট বন্ধ।অগ্নিশিখার মতো জ্বলজ্বলে সবার চোখ। ১৪৪ ধারা ভেঙেবেরিয়ে গেল ছাত্র-ছাত্রীরা।ড. জোহা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর। তিনিএসেছিলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদেরবাঁচাতে। কিন্তু নিজেই বুক পেতে নিলেন ঘাতকের গুলি।মহাদেব সাহা তখন মাত্র কয়েকগজ দূরে। তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। শোকেপাথর হয়ে গেলেন তিনি। আইয়ূবশাহীর পতন হল বটে কিন্তু দেশ চলল আরও অনিশ্চয়তারপথে।

'৬৯-র জুন মাসে 'কন্ঠস্বর' সম্পাদক আবদুল্লাহ আবুসায়ীদ উদ্যোগ নেন তরুণকবি-লেখকদের নিয়ে প্রথম সাহিত্য উত্‍সব করার।সম্মেলন হবে ঢাকার তোপখানা রোডেপাকিস্তান কাউন্সিল মিলনায়তনে। সভাপতি মুনীরচৌধুরী। সম্মেলনে একটি প্রবন্ধপড়ার জন্য মহাদেব সাহাকে অনুরোধ করেন 'কন্ঠস্বর' সম্পাদক। একটু অবাকই হন মহাদেবসাহা। কারণ তখন একমাত্র মহাদেব সাহা ছাড়া ষাটেরলেখকেরা প্রায় সারবেঁধেদাঁড়িয়ে গেছেন ততদিনে। রাজশাহী থেকে সেদিনমহাদেব সাহা ছিলেন শেষ বাসেরযাত্রী। অধ্যাপক আবদুল হাফিজও প্রবন্ধ পড়বেনসম্মেলনে। তাই আব্দুল হাফিজ আরমহাদেব সাহা দুজনই সম্মেলনে যোগ দিতে এলেন ঢাকায়।উঠলেন আবু সায়ীদেরই গ্রীনরোডের ছোট্ট দুই রুমের বাসায়। এই আসাটাই যেনমহাদেব সাহাকে সত্যিকার অর্থেঢাকা চিনিয়ে দিল। সম্মেলনে নতুন লেখকদের সঙ্গেপরিচয় যেমন হল, প্রবন্ধ পড়ে কিছুপ্রশংসা আর মফস্বলী বলে কিছু বিদ্রূপ ও তীক্ষ্ণঅট্টহাসিও জুটল। কিন্তু এরই মধ্যে যাবোঝার বুঝে গেলেন মহাদেব সাহা। ঢাকা যেনচোরাগুপ্তা টানে টানছে তাঁকে। এখানেপাড়ি না জমালে যেন কবিতার বিকাশ নেই। এক অন্ধমোহ সারাক্ষণ লেগে থাকে তাঁরপিছু। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। ঢাকায়ই আসবেন। এদিকেরাজশাহীতে বাকি রইল গবেষণাআর শিক্ষা-দীক্ষার যত উপাচার।

যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মহাদেব সাহাকে দিয়েছিলগভীর অনুভূতির দ্যোতনা সেইপ্রিয় মতিহার ছেড়ে আসতে হলো কবিতারই কারণে। পড়েরইল প্রমত্তা পদ্মা। কবি উঠেপড়লেন কবিতার ভেলায়। মহাদেব সাহার নিজের ভাষায়- 'গার্ড বাঁশি বাজালেন। পেছনে পড়ে রইল রাজশাহী, মতিহার, কাজলা, উন্মুক্ত উথালপদ্মা, আমি তাকিয়ে আছি অনন্তের দিকে। আর সঙ্গেনিয়ে চলেছি বহু আনন্দ-বেদনা, ভালবাসার স্মৃতি। সবার জীবনে যেমন আমার জীবনেওতেমনি সেই উদ্দীপ্ত মুখরদিবারাত্রির কলধ্বনি নীরবে বহে চলেছিল মনে। আমিরাজশাহী ছেড়ে ঢাকা যাচ্ছি, সে ছিলো অতল জলের আহ্বান, কবিতাময় দিনরাত্রিরস্বপ্ন।'

ষাটের দশকে ঢাকা কলেজে পড়ার সময় কিছুকাল পরিচয়ছিল ঢাকার সঙ্গে। কিন্তু সেযাত্রা আর এবারের যাত্রার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক।কবিতার জন্য যাত্রা। তবেঅন্যদের চাইতে মহাদেব সাহাকে একটু ভাগ্যবানই বলতেহবে। অন্যদের মতো তাঁকেএকেবারে খালি হাতে ঢাকায় আসতে হয়নি। পায়ের নিচেমাটি আছে একটু। মানে একটাচাকরি পাওয়া গেছে। সেটাও নাটকীয়। কোন ইন্টারভিউনেই, ধরাধরি নেই, বলাবলিনেই। এক দরখাস্তেই চাকরি হয়ে গেল। ১৯৬৯-এর জুলাইমাসে দৈনিক 'পূর্বদেশ'-এসহকারী সম্পাদক পদে যোগদান করেন তিনি।

১৯৭৩ সালে ঢাকায় দেখা হয় কুমিল্লার মেয়ে নীলাসাহার সাথে। বার দুয়েকেরদেখাশোনায় নিজেদের একটু জানাশোনাও হয়। ১৯৭৪সালের ফেব্রুয়ারীতে নিজেদেরপছন্দে দুজন বিয়ে করে ফেলেন। তাঁদের দুই পুত্র সন্তানতীর্থ ও সৌধ।

১৯৭৫ সালের জুন মাসে 'পূর্বদেশ' বন্ধ হয়ে যায়। টানাপাঁচ বছর বেকার। এরপর ১৯৭৮সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নিয়মিত কলাম লিখতেন 'সংবাদ'-এ। সারথি নামে।প্রথম দিকে প্রতি সপ্তাহে দুটি করে পরে একটি করে সেইকলাম লেখার কাজ চালিয়েযান। এসময় নানা অনিয়মে শরীরে জেঁকে বসে অসুস্থতা।যেন এক চরম দুঃসময়ের কাল।নানা ঘাটের পানি খেয়ে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েআবার ১৯৮০ সালে চাকরি হয় 'ইত্তেফাক'-এ। সে চাকরি প্রায় ৩০ বছরের। বর্তমানেমহাদেব সাহা অনেকটাইগৃহী-সন্ন্যাসী। সকল কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেনিঃসঙ্গ সময় কাটাতেই বেশীপছন্দ করেন। এখন যার একমাত্র আশ্রয় পরমপ্রিয়াকবিতার কাছে।

তাঁর বাবা গদাধর সাহা বৃটিশ আমলে এন্ট্রাস পরীক্ষারসময় কলকাতায় গিয়ে জড়িয়েপড়েন রাজনীতির সাথে। তখন স্বদেশী আন্দোলনের যুগ।লেখাপড়া আর বিশেষ এগোয়নি।একসময় পৈত্রিক সম্পত্তি রক্ষার তাগিদে গদাধর সাহাকেফিরে আসতে হয় গ্রামেরবাড়িতে। কিন্তু এব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই উদাসীন।তাঁর মন পড়ে থাকত নাটক আরযাত্রার দিকে। যাত্রার বিবেক হিসাবে তাঁর গানেরগলা ছিল খুবই চমত্‍কার। মাবিরাজমোহিনী স্কুল পাশ করা গৃহিনী। কিন্তু সমস্তরামায়ন আর মহাভারতটায় ছিলোতাঁর ঠোঁটের আগায়। প্রতিদিন বিকেলেইরামায়ন-মহাভারত পাঠের আসর বসত মাহাদেবসাহাদের বাড়ির আঙ্গিনায়। পাড়ার মহিলারাই হতো সেআসরের শ্রোতা। বিরাজমোহিনীরগানের গলাটিও ছিল ভারী সুন্দর। তিনি নিজে গানলিখে সুর করে শুনাতেন। কবিতাওলিখতেন। বৃহত্তর পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামের এমনউদার আর সংস্কৃতিমনা পরিবারে১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট মহাদেব সাহা জন্মগ্রহণ করেন।পিতামাতার একমাত্র সন্তানতিনি। সেই আমলেই তাঁর বাবা কোলকাতা থেকে ডাকযোগেআনাতেন 'লোকসেবক', ইংরেজীঅর্ধ সাপ্তাহিক 'অমৃতবাজার', মাসিক 'বসুমতি' ইত্যাদিপত্রিকা। মহাদেব সাহারপরিবারটি পূর্ব পুরুষদের আমল থেকেই ছিল ছোটখাটভূস্বামী।

সাহিত্যের পালাবদলে বাংলা কবিতার শ্বাশত রূপটিকেমহাদেব সাহা স্বব্যঞ্জনায় তুলেধরেছেন তাঁর ৫৯টি কাব্যগ্রন্থে। এই প্রধান কবিগ্রন্থাগারে প্রথম সূচিবদ্ধ হন১৯৭২-এ। 'এই গৃহ এই সন্ন্যাস' কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।শিশু-কিশোরদের জন্য লেখাকবিতার বই ছাড়াও লিখেছেন ভ্রমণ কাহিনী, আত্মজীবনী, সমালোচনাসহ নানা ধরনেররচনাও। সব মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৮১।

স্বাধীন বাংলার প্রসব বেদনায় তখন কাতর পূর্বপাকিস্তান। রাজপথে তখন গনগনে আগুন।ছাত্র-যুবক-নারী-পেশাজীবী সবার মুখেই তখন 'জয়বাংলা'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, '৬৯-এর ৬দফা, ছাত্রদের ১১দফা এসবেইতখন বাংলা মগ্ন। মগ্নকবিতাও। সিকান্দার আবু জাফরের 'সমকাল', আবদুল্লাহআবু সায়ীদের 'কন্ঠস্বর', 'সংবাদের সাময়িকী' এসব আড্ডায় খুব অনায়াসেই ঢুকেগেলেন মহাদেব সাহা।নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির, হুমায়ুনআজাদ, রফিক আজাদ বন্ধু হয়েগেলেন। ঢাকার সদরঘাট, রমনা পার্ক, রমনা রেস্তোরারমতন নির্জনতম স্থানগুলোতেবন্ধুরা মিলে আড্ডা জমান। হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ- এদেরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেনমহাদেব সাহা। বন্ধুদেরঅনেকের সাথে জীবনাচরণে পার্থক্য থাকলেও আদর্শেরকারণে একে অপরের যেন হরিহরআত্মা। বন্ধুতা, আড্ডা, ঘুরে বেড়ানো, চাকরি সবমিলিয়ে যেন নিজের ভেতরে কবিতারফল্গুধারা বয়ে যায়। সেই টান আজো অনবরত মহাদেবসাহাকে নিমজ্জিত করে রেখেছেকবিতার গহিন অতলে।

এর মধ্যেই আসে একাত্তরের কালো রাত্রি, ২৫ মার্চ।তখন থাকতেন ১১৩ নং আজিমপুররোডের একটি বাসায়৷ মেসবাড়ি। সারারাত নিজের ঘরেবসে প্রত্যক্ষ করেন পাকিস্তানিহানাদার বাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট'-এর বর্বরতা।২৬ মার্চ প্রথমে বেরিয়েইচলে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বন্ধু কবিআবুল হাসান তখন সেখানেভর্তি। সেখানেই দেখেন জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতাকে। তখনওজীবন প্রদীপ নেভেনি তাঁর।রক্তাক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রত্যক্ষ করেন ঢাকাশহরের সমস্ত বর্বরতা। সমস্ত শহরজুড়ে তখন কারফিউ। এর মধ্যেই চেষ্টা করেন ঢাকা থেকেবের হবার কিন্তু পারেননি।অবশেষে ২৭ মার্চে ঢাকা থেকে চলে যান নিজেরগ্রামের বাড়িতে। সেখানে গিয়েস্থানীয়ভাবে তরুণদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করারচেষ্টা করেন। কিন্তু সেইগ্রামে ২৫ এপ্রিল আক্রমণ করে পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী। পরে জুন মাসের দিকেআসাম হয়ে পরিবারসহ চলে যান কোলকাতায়। সেখানেগিয়ে যুক্ত হন 'জয়বাংলা' পত্রিকাঅফিসে, কাজ করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও।স্ক্রীপ্ট লেখা, কবিতা আবৃত্তিইত্যাদি কাজ করেন কোলকাতায়। যুগান্তর, আনন্দবাজারসহনানা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিকরেন। বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের বাংলাদেশ ওমুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অবহিত করারকাজ করতেন সেসময় মহাদেব সাহা।

১৩ ডিসেম্বর সাতক্ষীরায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকাওড়ে। ভারত থেকে কবি, সাংবাদিকদের একটি দল সেদিন সাতক্ষীরায় আসেসরেজমিন পরিদর্শনে। নীরেন্দ্রনাথচক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দেরদলে সেদিন মহাদেব সাহাওছিলেন। স্বাধীন বাংলার মাটিতে প্রথম স্পর্শ আজওশিহরণের মতো মনে হয় কবিমহাদেব সাহার কাছে। একে মনে করেন জীবনের দুর্লভঅক্ষয় স্মৃতি।

স্বাধীনতার পরপরই মুখোমুখি হন দুঃসহ বেদনার। কবিবন্ধু হুমায়ুন কবির ১৯৭২ সালে আরআবুল হাসান ১৯৭৫ সালে চলে যান লোকান্তরে। দেশজুড়েতখন দুর্ভিক্ষাবস্থা। প্রবল হতেথাকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির হুঙ্কার। যেনস্বাধীনতার স্বাদ পাওয়ার আগেইস্বপ্নগুলো মিলিয়ে যাচ্ছে হাওয়ায়। আটকে যাচ্ছে নানাচোরাবালিতে। কোনোকিছু বুঝেউঠার আগেই ঘটে যায় নৃশংসতম 'রক্তাক্ত আগস্ট'বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।শুরু হয় স্বাধীন বাংলার পিছন দিকে হাঁটা। রাজপথেজলপাই রঙের গাড়িনামে।নিরাপদ নয় তখন জেলখানাও। বাকস্বাধীনতা মানেবন্দুকের নল। দেশ ও জাতির গভীরক্রান্তিকালে মহাদেব সাহার কবিতায় তখন উচ্চারিত হয়দ্রোহ আর প্রতিবাদ। জীবনেরঝুঁকি নিয়েও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তখন কবিতাপ্রকাশ করেন 'সংবাদ', 'সমকাল'সহবিভিন্ন পত্রিকায়। বন্ধু, অভিভাবক আর আত্মীয়-স্বজনেরাএতো ক্ষুব্ধ হতে মানা করেনতাঁকে। কিন্তু কে ঠেকিয়ে রাখে ঘৃণার উদগার। 'আরোএকজন', 'আলস্য প্রহর', 'ভোরেরপ্রসঙ্গ', 'কফিন কাহিনী', 'দেশপ্রেম' প্রভৃতি কবিতায়সেই স্বাক্ষরই রয়েছে।

চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর
একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির।
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমসত্ম নদীর উত্‍স হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে রঙীন
হাতের আঙ্গুলগুলি আরক্ত করবী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!

মহাদেব সাহার কবিতা যেন মানব-স্পর্শী সুখ-দুঃখগাঁথার এক অবিরাম উপাখ্যান।তথাকথিত 'শিল্পের জন্য শিল্প'র তরিকা থেকে তাঁরঅবস্থান অনেক দূরে। যেন স্থিতধি, নিজের ভিতরে বুনে চলা সমাজেরই এক কথন নিয়েকাটিয়ে দিয়েছেন সারাটা বেলা।আদর্শ তাঁর পিছু ছাড়েনি৷ '৮০-র দশকে সরাসরিকমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হন। ১৯৮৭সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠন ও আন্দোলনেও পালনকরেন অগ্রণী ভূমিকা। যুক্ত হনউদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাথেও। কবিতার জন্য ১৯৮৩সালে পুরষ্কার পান বাংলাএকাডেমীর। পুরষ্কারের সমস্ত অর্থ তখন তুলে দেনকমিউনিস্ট পার্টির হাতে।

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক মনস্কতা মহাদেবসাহাকে টেনে আনে মাটি আরমানুষের কাছাকাছি। তাঁর কবিতার শব্দনির্বাচন, ধ্বনি, চিত্রকল্প সবকিছুই যেনমৌমাছির মতো গুঞ্জরণ তোলে মানুষের উত্‍সবে। নিজেকেও নিজের কবিতাকে দাঁড়করিয়ে দেন অপরিহার্য সংখ্যাগরিষ্ঠদেরই অংশ হিসেবে।বাংলা কবিতার মানবতারূপীএক বিশাল মহীরুহের একটি পাতা যেন মহাদেব সাহারকবিতা। চিলির প্রখ্যাত কবিপাবলো নেরুদার মতো যার স্থির বিশ্বাস ও আস্থা, 'আমাদের কালে একজন কবির দায়থাকবে নির্জনতা এবং জনতা উভয়ের প্রতি।'

মানুষের ভিড়ে মানুষ লুকিয়ে থাকে
গাছের আড়ালে গাছ,
আকাশ লুকায় ছোট্ট নদীর বাঁকে
জলের গভীরে মাছ;
পাতার আড়ালে লুকায় বনের ফুল
ফুলের আড়ালে কাঁটা,
মেঘের আড়ালে চাঁদের হুলস্থূল
সাগরে জোয়ার ভাটা।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

জন্ম : কবি মহাদেব সাহার জন্ম বাংলা ১৩৫১ সালের২০ শ্রাবণ, ইংরেজি, ১৯৪৪সনের ৫ আগস্ট বৃহত্তর পাবনা জেলার ধানঘড়া গ্রামে৷পিতা গদাধর সাহা, মাতাবিরাজমোহিনী৷ পিতামাতার একমাত্র সন্তান।

শিক্ষা : শিক্ষাজীবনের শুরু কালীতলা প্রাথমিক বালিকাবিদ্যালয়ে। ১৯৬১ সালে ধুনটহাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করেন। ঢাকা কলেজে ১ বছরপড়ে শারীরিক অসুস্থতারকারণে বগুড়া কলেজে গিয়ে পুনরায় ভর্তি হন। সেখানথেকে ১৯৬৪ সালেইন্টারমিডিয়েট, সেখান থেকেই বাংলায় সম্মানসহস্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৮সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ.ডিগ্রি অর্জন করে ১৯৬৯ সালেইংরেজি বিভাগে পুনরায় ভর্তি হন। কিন্তু পড়া শেষকরেননি।

পরিবার : স্ত্রী নীলা সাহা, দুইপুত্র তীর্থ সাহা ওসৌধ সাহা।

পুরস্কার : বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৮৩), রেখাচিত্রম সম্মাননা-কলকাতা (১৯৯৪), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫), জেবুন্নেসা-মাহাবুবউল্লাহ পুরস্কার (১৯৯৪), বগুড়ালেখকচক্র পুরস্কার (১৯৯৭), একুশে পদক (২০০১), খালেদদাদ চৌধূরী স্মৃতি পুরস্কার (২০০২), কবি সুকান্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), বঙ্গবন্ধু পুরস্কার- কলকাতা (২০০৫), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (২০০৮)।

ভ্রমণ : জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সোভিয়েতইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ।

প্রকাশিত বইয়ের তালিকা :

মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থসমূহ-
এই গৃহ এই সন্ন্যাস, মানব এসেছি কাছে, চাই বিষঅমরতা, কী সুন্দর অন্ধ, তোমার পায়ের শব্দ, ধুলোমাটিরমানুষ, ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস, লাজুক লিরিক, আমি ছিন্নভিন্ন, মানুষ বড়ো ক্রন্দন জানেনা, প্রথম পয়ার, কোথা সেই প্রেম, কোথা সে বিদ্রোহ, অস্তমিত কালের গৌরব, আমূল বদলে দাও আমার জীবন, একা হয়ে যাও, যদুবংশ ধ্বংসের আগে, কোথায় যাই, কারকাছে যাই, সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া, এসো তুমিপুরাণের পাখি, বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ, বিষাদ ছুঁয়েছেআজ মনভাল নেই, তোমার জন্য অন্তমিল, আকাশেরআদ্যোপান্ত, ভুলি নাই তোমাকে রুমাল, তুমিই অনন্তউত্‍স, কেউ ভালবাসে না, কাকে এই মনের কথা বলি, অন্তহীন নৃত্যেরমহড়া, একবার নিজের কাছে যাই, পাতার ঘোমটা পরাবাড়ি, মন কেন কাঁদে, এ বড়ো আনন্দ এ বড়ো বেদনা, স্বপ্নে আঁকি সুন্দরের মুখ, ভালোবাসি হে বিরহীবাঁশি, বহুদিন ভালোবাসাহীন, কে তুমি বিষন্ন ফুল, অপরূপ অশ্রুজল, কোনখানে কোনো একদিন, কেন সুন্দরব্যথিত এতো, ভালোবেসে ছুঁয়েছি আকাশ, অনেক দিনেরবিষাদ আছে মনে, সব দুঃখ ভুলে যাই প্রেমের গৌরবে, ভালোবাসা, প্রিয় ঝড়াপাতা, কেন মোহে, কেনবা বিরহে, শূন্যতাআমার সঙ্গী, আমার ভিতরে যতো অন্ধকার, আমার ভিতরেযতো আলো, তবু স্বপ্ন দেখি, সোনালী ডানারমেঘ, পৃথিবী তোমাকে আমি ভালোবাসি, কে পেয়েছে সবসুখ, সবটুকু মধু, শুকনো পাতার স্বপ্নগাঁথা, দুঃসময়েরসঙ্গে হেঁটে যাই, দুঃখ কোন শেষ কথা নয়, ভালোবাসাকেন এতো আলো অন্ধকারময়, লাজুক লিরিক-২, দূরবংশীধ্বনি, অর্ধেকডুবেছি প্রেমে, অর্ধেক আধারে, কালো মেঘের ওপারেপূর্ণিমা, সন্ধ্যার লিরিক ও অন্য

Rationale
UploaderRaihan Ahamed