Golden Bangladesh
Eminent People - আবুল ফজল

Pictureআবুল ফজল
Nameআবুল ফজল
DistrictChittagong
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeসাহিত্য
Life Style

"আমি বাংলা লিখতে শুরু করি ছাত্রাবস্থায়ইন্টারমিডিয়েট ক্লাশ থেকেই কিন্তু অত্যন্ত গোপনে।যাতে জানাজানি না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতাঅবলম্বন করতে আমি কসুর করিনি। তবুও একবার অঘটন ঘটেগেল। তখন কি একটা লেখা আমার 'সওগাত'-এ বের হওয়ারপর বাবার পরিচিত স্থানীয় হাইস্কুলের জনৈক শিক্ষকলেখাটি পড়ে খুব খুশি হন, খুশির চোটে, হয়তো শুনেবাবাও খুশি হবেন মনে করে, তিনি খবরটি বাবাকেওজানান। কিন্তু ফল হল হিতে বিপরীত। শুনে বাবা অত্যন্তবিরক্ত হলেন। আরবি-ফার্সি বিদ্যায় আমার অনাগ্রহ ওঅনগ্রসরতায় বাবা এর মধ্যে আমার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধেপ্রায় নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন এবং এ কারণে আমার উপরছিলেন অত্যন্ত নাখোশ। বাপ-দাদার পদাংক অনুসরণ করেআমিও ভালো আলেম হই গোড়া থেকে এ ছিল তাঁর ইচ্ছা ওসংকল্প।বাবা তখন চট্টগ্রাম জুমা মসজিদের ইমাম। সারা শহরেইমাম সাহেব নামে পরিচিত আপামর জনসাধারণের সামনেসাধুতা ও পরহেজগারির এক উজ্জ্বল প্রতীক। এহেন ইমামসাহেবের ছেলে বাংলা মাসিকে বাংলা লেখা ছাপাবে এশুধু অকল্পনীয় নয় বাবার কাছে প্রায় ধর্মদ্রোহীতারইকাছাকাছি। উক্ত ভদ্রলোক আমার লেখা সম্বন্ধে খবরদিয়ে চলে যাওয়ার পর দুর্ভাগ্যবশত কি একটা জরুরিব্যাপারে আমাকে বাবার সামনে যেতে হল। আমাকেদেখেই আমার আপাদমস্তক একবার দেখে নিলেন তিনি।দেখলাম তাঁর গম্ভীর মুখ আরো গম্ভীর হয়ে গেল। ভিতরেরউত্তেজনায় চোখমুখ প্রদীপ্ত। হঠাৎ ক্রুদ্ধ স্বরে ফেটে পড়লেন : তুমি নাকি মাসিকপত্রে কি লিখেছ?
প্রশ্নটা এতই আকস্মিক যে, আমি প্রায় হতভম্ব। তাঁররক্তচক্ষু তখনো আমার মুখের উপর।
অগত্যা কাঁচুমাচু মুখে আমতা আমতা করলাম: না তো।
: এইমাত্র কবির সাহেব বলে গেলেন সওগাত নাকি একমাসিক কাগজে তোমার কি এক বাংলা লেখা ছাপাহয়েছে?
আমি প্রায় আকাশ থেকে পড়ার মুখ করে বল্লাম: আমারলেখা? কাগজে ছাপা হয়েছে! মাস্টার সাহেব হয়তো ভুলকরেছেন। এক এক কথার পর এক একবার ঢোক গিল্লাম।
: তিনিতো পরিষ্কার বলে গেলেন আপনার ছেলে আবুলফজলের লেখা। এবার তাঁর গলায় রাগের সঙ্গে বিস্ময়েরওযোগ ঘটল। হঠাৎ আমার বুদ্ধির গোড়ায় যেন বিদ্যুৎ চমকেউঠল। মুহূর্তে দেখতে পেলাম পলায়নের ফাঁক। ফিরেপেলাম আত্মবিশ্বাস আর মনের জোর। কিছুটা জোর গলায়বল্লাম: আমার নাম তো মোহাম্মদ আবুল ফজল। ও অন্য কোনআবুল ফজল হতে পারে।উত্তরটা এতই যুক্তিসঙ্গত যে বাবার কাছেও তাঅবিশ্বাস্য বা অসমীচীন মনে হলো না।
রাগ পড়ে যাওয়ার পর বাবা সেদিন আমাকে শুধু এউপদেশটুকু দিয়েই রেহাই দিয়েছিলেন: লিখতেই যদিচাও, আরবি-ফারসিতে না পারো, উর্দুতে লিখতে চেষ্টাকর"
(রেখাচিত্র-আবুল ফজল, পৃষ্ঠা-১৩)

উপরের কথাগুলো বলেছেন বরেণ্য সাহিত্যিক আবুল ফজল।লেখা সম্পর্কে বাবার দেয়া উপদেশ তাঁর জীবনে ব্যর্থহয়েছে। কারণ বাবার উপদেশ মতো উর্দূতে লেখেননিতিনি। লিখেছেন বাংলায়। আর সেকারণে সেই বয়সথেকেই বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিরন্তর লিখে গেছেনতিনি। তাঁর প্রথম বই প্রকাশের পূর্বেই বাবা মারাযান। ফলে সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিত এদেশেরঅন্যতম সাহিত্যিক আবুল ফজল যে তাঁরই ছেলে মোহাম্মদআবুল ফজল একথা জানার সৌভাগ্য হয়নি তাঁর।

১৯০৩ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায়বত্রিশ মাইল দক্ষিণে এক অখ্যাত অজপাড়াগাঁ কেঁওচিয়ায়আবুল ফজল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের জন্য তাঁরজন্মটা ছিল বাড়তি আনন্দের। কারণ বাবা-মার ঘরেতিনিই প্রথম ছেলে হয়ে জন্মেছেন। পরবর্তীতে দেখাগেল ছেলে হিসেবে তিনি যে শুধু প্রথম তা নয়, তিনিইশেষ। কারণ তাঁর পরে আর কোন ছেলে জন্মগ্রহণ করেননি।

একরকম গোঁড়ামি পরিবেশেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবংবেড়ে ওঠেন। তবে এ গোঁড়ামি শুধুমাত্র ধর্মের ক্ষেত্রেতথা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমিত ছিল।এছাড়া অন্য সব ব্যাপারে তাঁদের পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গিছিল উদার। পরিচিত ও প্রতিবেশী হিন্দুদের সঙ্গে তাঁরবাবার আন্তরিকতা ও সম্প্রীতি ছিল উল্লেখ করার মতো।কিন্তু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের গোঁড়ামি ও তারবাড়াবাড়ি শৈশব থেকেই তাঁর মনে একটা তীব্রপ্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করেছিল।

গ্রামে থাকার কারণে আবুল ফজলের ছেলেবেলা কিছুটাবেপরোয়াভাবেই কেটেছে। বাবা শহরে থাকতেন। মারসাথে তাঁরা তিন ভাই-বোন গ্রামে থাকতেন। তিনিএকমাত্র ছেলে হওয়ায় তাঁর মুরুব্বি ছিলেন তিনি নিজেই।শাসন করার কেউ না থাকায় সারাদিন টো টো করে ঘুরেবেড়াতেন। তাঁদের ঘরটা ছিল পুকুর পাড়ে। গরমের দিনেঐ পুকুরেই সারাদিন পড়ে থাকতেন। পুকুরের এপার থেকেওপার সাঁতার কাটতেন সারাবেলা। মা শত ডাক দিয়েওতাঁকে পুকুর থেকে তুলতে পারতেন না। চাষাবাদ নাথাকায় তাঁদের বাড়িতে গরু ছাগল ছিল না। তবেসমবয়সীদের সাথে গরু চরাতে মাঠে যেতেন। তাদেরসঙ্গে সারা বিকেলটা ডাংগুলি খেলে সারা শরীরে কাদামেখে সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেন। তাঁদের এলাকায় গ্রাম্যউৎসবের এক অপরিহার্য অঙ্গ ছিল বলি বা কুস্তিখেলা।চৈত্র-বৈশাখ মাসে গ্রামে গ্রামে এর সাড়া পড়ে যেত।ছেলেবেলায় সমবয়সীদের সঙ্গে সাত আট মাইল দূরেবলিখেলা দেখতে চলে যেতেন। একটু বড় হয়ে ওঠার পরদূর দূর গ্রামে যেতেন যাত্রা পালা আর কবির গানশুনতে। সারা রাত জেগে চোখ দু'টা প্রায় জবাফুলের মতোলাল করে যখন বাড়ি ফিরতেন তখন বেলা হয়ে যেত।

তাঁর বাবা ছিলেন আলেম। শুধু তিনি নন, তাঁর বাবাঅর্থাৎ আবুল ফজলের দাদাও ছিলেন আলেম। তাঁরা ইংরেজিবাংলার ধার ধারতেন না, আরবি-ফারসি-উর্দুর চর্চাকরতেন। মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও বাংলা ভাষাকেতাঁরা খুব সুনজরে দেখতেন না। সামান্য ঘরোয়া চিঠিপত্রআর দলিল দস্তাবিজের বাইরে চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাকেতাঁরাযোগ্য মনে করতেন না। এই আবহাওয়া ও পরিবেশসে যুগের অধিকাংশ মুসলিম পরিবারেছিল।

বাবা তাঁর নাম রেখেছিলেন মোহাম্মদ আবুল ফজল। কিন্তুআবুল ফজল নামেই তিনি লেখালেখি করেছেন। বাবাকে নাজানিয়ে বাংলা লেখা চালিয়ে যাওয়া এবং সংক্ষিপ্তনামের পক্ষপাতী হওয়ায় তিনি বাবার দেয়া নাম থেকেমোহাম্মদ শব্দটি বাদ দিয়েছেন।

ঘরে একজন মিয়াজি রেখে প্রথমে তাঁকে আমপারা পড়ানোরচেষ্টা করা হয়। কিন্তু মিয়াজিকে তিনি কখনও আমলদিতেন না। মিয়াজি এলে তিনি বন্ধুদের সাথে খেলতেযেতেন। যে দেউড়ি (বাইরের ঘর) ঘরে মিয়াজি পড়াতেনতা একদিন পুড়ে য়ায়। এটি পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথেমিয়াজির চাকরি আর তাঁরপড়ার সমাপ্তি ঘটে। এরপরতিনি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। এটিই ছিলতাঁর প্রথম ও আদি স্কুল। এখানে অল্প কিছুদিন পড়ার পরবাবার সাথে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।

এখানে আসার পর প্রথমে তাঁর বাবার বাসার কাছাকাছিনন্দন কাননে এক হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলে তাঁকেভর্তি করে দেয়া হয়। মাদ্রাসা সেশন শুরু হতে দেরিছিল বলে সাময়িকভাবে তাঁকে ঐ স্কুলে ভর্তি করা হয়।পরে ১৯১৩/১৪ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মাদ্রাসায়দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেয়া হয়। সুুউচ্চ পাহাড়েরচূড়ার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে মাদ্রাসাটি অবস্থিতছিল। পূর্ব আর দক্ষিণ দিকে তাকালে দেখা যায় কর্ণফুলিনদী এঁকে বেঁকে বয়ে চলেছে। পশ্চিম আর উত্তর দিকেতাকালে যতদূর চোখ যায় দেখা যায় শুধু পাহাড় আরপাহাড় যা সবুজে সবুজে একাকার হয়ে দূর আকাশের সঙ্গেমিশে গেছে।

এ মাদ্রাসাটি ছিল সাবেকী মাদ্রাসা। কিন্তু বছর পারনা হতেই এক সরকারি নির্দেশে এই সাবেকী মাদ্রাসারাতারাতি খোল বদলিয়ে হয়ে গেল নিউ স্কীম মাদ্রাসা।এ মাদ্রাসারই বর্তমান নাম চট্টগ্রাম ইসলামিকইন্টারমিডিয়েট কলেজ। স্কীম মাদ্রাসা হওয়ায়পাঠ্যতালিকায় আমূল পরিবর্তন ঘটল। সম্পূর্ণ বাদ পড়লোফার্সী। শরিয়াৎ বা দীনয়াৎ অংশও ছাঁটাই হলো। আরসেসব জায়গায় স্থান পেলো কিছু কিছু ইংরেজি, বাংলা, অংক আর হাল আমলের ইতিহাস, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়েরছিটে ফোঁটা। মাদ্রাসার সাবেকী পাঠ্যতালিকার সঙ্গেএ যুগের হাই্ স্কুলের পাঠ্যতালিকার সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরীকরা হলো নতুন একটা শিক্ষা ব্যবস্থা। মাদ্রাসা শিক্ষারভেতরে আধুনিক শিক্ষার কিছুটা আলো-হাওয়া ঢোকার পথকরে দেয়াই ছিল এ নতুন শিক্ষা রীতির উদ্দেশ্য।

নিউ স্কিম মাদ্রাসাতে বাংলা খুব বেশি পড়ানো হত না।তবে অনেকগুলো মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা মাদ্রাসায়নেয়া হত আর কেনা হত লাইব্রেরির জন্য দেদার বাংলাবই। ফলে পত্রপত্রিকা ও বাইরের বই পড়ার বড় একটিসুযোগ তিনি সেখানে পেয়েছিলেন। আর এ সুযোগেরপুরোপুরি সদ্ব্যবহার তিনি করেছিলেন। অল্প বয়স থেকেইপড়ার ক্ষুধা বিশেষ করে বাংলা বই পড়ার ক্ষুধা তাঁকেপেয়ে বসেছিল। তবে বাবার সঙ্গে যতদিন ছিলেন ততদিনবাংলা বই ও মাসিক লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে হত। বাবারঅবস্থা বিশেষ স্বচ্ছল ছিল না বলে তাঁকে বেশিদিনবাবার সঙ্গে থাকতে হয়নি। পঞ্চম শ্রেণী থেকেই তিনিজায়গীর থাকা শুরু করেন। জায়গীর মানে থাকা-খাওয়াফ্রি বিনিময়ে গৃহকর্তার দু'একটি বংশধরকে আমপারা বাঅ আ পড়াতে হতো। আর হয়তো মাঝে মাঝে হাঁস-মুরগিজবাই করে দিতে হতো। সেসময় জায়গীর প্রথার ব্যাপকপ্রচলন ছিল।

চন্দনপুরার এক বাড়িতে তিনি প্রথমে জায়গীর ছিলেন।ষষ্ঠ শ্রেণীতে ওঠার পর চাট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির 'মীর এহায়া' বাড়িতে জায়গীর থাকেন। তাঁর বাবাসঙ্গে করে পৌঁছে দিলেন কাজীর দেউড়ির 'কাজী বাড়ি' যার পুরোনো নাম 'মীর এহায়া বাড়ি'পরবর্তীতে তিনিএ মহল্লারই স্থায়ী বাসিন্দা হন।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলামের যখন আবির্ভাব হয় তখনআবুল ফজল অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি রুদ্ধ নিশ্বাসেপড়লেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর 'হেনা', সওগাতে প্রকাশিত তাঁর 'বাউন্ডেলেরআত্মকাহিনী' আর মোসলেম ভারতে প্রকাশিত 'বাঁধনহারা' লেখাগুলো। এক একটা লেখা কতবার যে পড়েছেনতার কোন হিসেবে নেই।

১৯২২ সালে তিনি যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন মাত্রকয়েক মাসের ব্যবধানেই বের হল নজরুলের 'ব্যথার দান' 'অগ্নিবীণা'তিনি তখন জায়গীর থাকেন, হাতেতেমন কোন টাকা-পয়সা নেই। তবুও অর্ডার দিয়ে কলকাতাথেকে পার্সেলেই বই দু'টা আনালেন। যেদিন পার্সেলএসে পৌঁছল সেদিন তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। পার্সেলটিহাতে নিয়ে তাঁর মনে হয়েছিল- তিনি সব থেকে আলাদা, তিনি বিশিষ্ট। তাঁর সঙ্গীরা কেউ কখনও অমন পার্সেলআনেননি। কলকাতা থেকে ভি.পি.পি.-তে অমনভাবে বইআনাবার খেয়াল বা সাহস সেদিন কয়জনের ছিল?

১৯২২ সালে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফাইনাল দেওয়ারঅনুমতি পেয়েছেন। তখন ষোল বছরের কম হলে কেউম্যাট্রিক পরীক্ষা দিতে পারতেন না, আর আঠারো বছরেরবেশি হলে বৃত্তি পেতেন না। ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফর্মপূরণ করতে গিয়ে দেখা গেল তাঁর বয়স ষোল বছরের অনেককম। এ বিভ্রাটের কারণ হলো- যাঁর সঙ্গে তিনিমাদ্রাসায় প্রথম ভর্তি হতে যান, তিনি তাঁর বাবাঅর্থ্যাৎ আবুল ফজলের বাবার সাথে কথা না বলে ভর্তিরফরমে তাঁর ইচ্ছা মতোই আবুল ফজলের জন্মের তারিখআন্দাজি বসিয়ে দিয়েছিলেন। তার ফলেই এ অঘটন ঘটে।টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেছেন অথচ পরীক্ষা দিতেপারবেন না। দেখা দিল সংকট। শিক্ষকরাও উদ্বিগ্নহলেন। আবুল ফজলের বয়স ষোল বা তার চেয়ে দু'এক মাসবেশি এ মর্মে একটা এফিডেভিট দিতে অধ্যক্ষ খানবাহাদুর মুসা সাহেব তাঁর বাবাকে অনুরোধ জানালেন।তাঁর বাবা একটি বইয়ের পাতায় তাঁর সব ভাই বোনেরজন্ম তারিখ লিখে রেখেছিলেন। তিনি সেখান থেকে আবুলফজলের জন্মতারিখটি দেখে তা জানিয়ে দিলেন মাদ্রাসাকর্তৃপক্ষকে। দেখা গেল সে হিসেবে তাঁর বয়স দাঁড়ায়উনিশ। ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার সময় স্বভাবতই আরোকয়েক মাস যাবে বেড়ে।

এ সমস্যার সমাধান করতে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকরা তাঁরবাবাকে অনুরোধ করলেন। তাঁর বয়স আরো কমিয়েএফিডেভিট দিতে। কারণ ভবিষ্যতে তাঁর চাকরি পেতেঅসুবিধা হবে আর ভাল ফলাফল করলে স্কলারশিপ পাওয়ারসম্ভাবনাও থাকবে না। তাঁর বাবা শুনে অত্যন্ত বিরক্তহলেন এবং গম্ভীর কণ্ঠে তা করতে শুধু অস্বীকার করলেননা, পরিষ্কার জানালেন, 'ছেলের চাকরি বা বৃত্তিরজন্য আমি মিথ্যা বলতে পারব না।'

তাঁরশিক্ষকদের আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো। খুবকম ছাত্রই সেবার প্রথম বিভাগে পাস করলেন। ফলেদ্বিতীয় বিভাগে পাস করেও তিনি বৃত্তি পাওয়ার কোটায়স্থান পেলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট বয়স সীমা পার হয়েযাওয়ায় তা আর পেলেন না তিনি।

১৯২৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করার পর তাঁর চট্টগ্রামেছাত্র জীবনেরও ইতি ঘটে।ম্যাট্রিক মানে ঢাকাইন্টারমিডিয়েট ও সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ডের হাইমাদ্রাসা পরীক্ষা। তখন চট্টগ্রামে ইসলামিকইন্টারমিডিয়েট ক্লাস খোলা হয়নি। তাই হাই মাদ্রাসাপাশ করার পর চট্টগ্রামের ছাত্রদের ঢাকায় যেতে হত।১৯২৫ সালে ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকেইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ইন্টামিডিয়েটের বেলায়ওএকই ঘটনা ঘটল। বয়স বেশি হওয়ার কারণে এবারও বৃত্তিপাওয়ার হকদার হয়েও তা পেলেন না তিনি। চাকরিরক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল । বি.টি. পাস করে যখন বেরহলেন তখন বয়স পঁচিশ পেরিয়ে গেছে। তাই বি.টি. পাসকরার পর যে চাকরি পাওয়ার কথা তা তিনিপাননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে বি.এ. পাস করেন।এরপর বি.এল. পড়ে উকিল হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।বি.এল. পড়তে তেমন অসুবিধা নেই, দিনের বেলায়ছোটখাটো একটা চাকরি করে সন্ধ্যায় ল' ক্লাসে হাজিরাদিলেই হলো। তাই ল' পড়ার ইচ্ছা তাঁর মনে প্রায়দুর্দমনীয় হয়ে উঠল।

ভয়ে ভয়ে তাঁর সংকল্পের কথা বাবাকে জানালেন। তিনিশুনে খুবই রেগে গেলেন। প্রায় মারমুখো হয়ে বললেন: 'এ জন্যেই গোড়া থেকে আমি তোমার ইংরেজি পড়ারবিরোধী ছিলাম, সারাজীবন মিথ্যার ব্যবসা করার জন্যতোমার পেছনে আমি এতগুলো টাকা খরচ করিনি।' তাঁরমনে বদ্ধমূল ধারণা ছিল- উকিল হলেই মিথ্যা বলতে হয়।আবুল ফজলকে চুপ থাকতে দেখে পুনরায় তিনি বললেন: 'নিজের মক্কেলকে চোর-ডাকাত খুনি জেনেও যে উকিল শুধুটাকার লোভে তাকে সমর্থন করে থাকে, আমি তোমাকেতেমন উকিল বানাতে পারব না'কিছুটা শান্ত হওয়ারপর বললেন: 'আমি চাই তুমি মাস্টার হও, শিক্ষার চেয়েভালো পেশা আর নেই'

কিন্তু আইন পড়ার অদম্য আগ্রহের কারণে বাবার কথাকানে তুললেন না তিনি। বাড়ি গিয়ে তাঁর মার কাছথেকে সমান্য কিছু টাকা-পয়সা নিলেন এবং খোরাকিরকিছু ধান বিক্রি করে উকিল হওয়ার আশায় একদিন গোপনেকলকাতার ট্রেনে চেপে বসলেন। তাঁর ধারণা ছিলএকমাত্র পুত্রের জেদের কাছে তাঁর বাবা নিশ্চয়ই নতিস্বীকার করবেন। কিন্তু কিছুতেই তিনি নোয়ালেন না।তিনি তাঁর কোন খোঁজ-খবর নিলেন না। তাঁর দুরবস্থারকথা জানিয়ে মাফ চেয়ে, অনুনয় বিনয় করে অনেক চিঠিলিখলেন আবুল ফজল। কিন্তু বাবার কাছ থেকে কোন উত্তরইপেলেন না। প্রায় সাত আট মাসের মতো তিনি ল' কলেজেপড়াশুনা করেন। এ কয়মাস এখানে ওখানে চাকরি করে, এর ওর বাসায় থেকে, জায়গীর আর টিউশনি করে কোনরকমে কাটালেন। এসময় তিনি সওগাত অফিসে চাকরিনেন। হঠাৎ একদিন তিনি খবর পেলেন তাঁর বাবা খুবঅসুস্থ। খবর পেয়ে তাঁকে দেখার জন্য তিনি বাড়িতেএলেন। বাবার পাশে দাঁড়াতেই রোগশয্যা থেকে তিনিবললেন- 'ওকালতি পড়ো না। আমি চাই তুমি শিক্ষক হও, এর চেয়ে ভালো পেশা আর নেই'এবার আবুল ফজলনোয়ালেন। ল' পড়ার সংকল্প ছেড়ে দিলেন চিরকালেরজন্য।

একটা বছর নষ্ট হওয়ার পর বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী শিক্ষকহওয়ার সংকল্প করলেন তিনি। পাকা শিক্ষক হওয়ার জন্যবি.টি. ডিগ্রি অপরিহার্য। তাই ১৯২৯ সালে বি.টি.পড়ার জন্য ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ভর্তি হলেন।১৯২৯ সালেই তাঁর বাবা মারা গেলেন। বি. টি. পাসকরার পর ১৯৩১ সালে চট্টগ্রাম ফিরে এলেন।

চট্টগ্রাম আসার পর সেখানকার কলেজিয়েট স্কুলেদ্বিতীয় মৌলবী হিসেবে দিন কুড়ি চাকরি করেন। এরপরতিনি চাট্টগ্রাম সরকারী মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষকহিসেবে দুই মাস চাকরি করেন। এরপর চাট্টগ্রাম কাজেমআলী বেসরকারীহাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষকহিসেবে অস্থায়ীভাবে যোগ দেন।

১৯৩২ সালে চট্টগ্রাম শহরের কাজী বাড়ির মেয়েনূরজাহান বেগমের সঙ্গে ঘরোয়াভাবে আবুল ফজলের বিয়েহয়। কিন্তু নূরজাহান বেগম যখন সাত-আট মাসেরঅন্তঃসত্ত্বা তখন হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান।এরপর আবুল ফজল দ্বিতীয়বার বিয়ে করেনএবং এইস্ত্রীও এক ছেলে রেখে মারা যান। এরপর তিনিতৃতীয়বার বিয়ে করেন এবং এই ঘরে দুই ছেলে ও একমেয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই ঘরের এক ছেলে দেড় বছরবয়সে মারা যায়।

১৯৩৩ সালে আবুল ফজল খুলনা জেলা স্কুলে দ্বিতীয়পন্ডিতের পদে স্থায়ীভাবে যোগ দেন। ১৯৩৭ সালে খুলনাছেড়ে এসে তিনি চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে সহকারীইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশকরেন। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণনগর কলেজে লেকচারার হিসেবেযোগ দেন। ১৯৪৩ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম কলেজে। এইকলেজের কলেজ গভর্নিং বডির নির্বাচনে তিনি দাঁড়ানএবং জয়ী হন। ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে তাঁর মা মারাযান। দীর্ঘ সময় এই কলেজে চাকরি করার পর ১৯৫৯সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনিচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে এবংবাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্বপালন করেন।

ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় থেকেই তিনি লেখালেখি শুরুকরেন। আবুল ফজলের উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো হলো- 'রহস্যময়ী প্রকৃতি', 'প্রেম ও মৃত্যু', 'বিবর্তন', 'চোর', 'বিংশ শতাব্দী' প্রভৃতি। তাঁর উল্লেখযোগ্যউপন্যাসগুলো হলো- 'রাঙ্গাপ্রভাত', 'চৌচির', 'জীবনপথের যাত্রী', 'মাটির পৃথিবী', 'বিচিত্র কথা', 'সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন' প্রভৃতি।

তাঁর রচিত 'চৌচির', 'মাটির পৃথিবী' আর 'বিচিত্রকথা' নামের তিনটি বই ১৯৪০ সালে তিনি রবীন্দ্রনাথঠাকুরের নামে, শান্তিনিকেতনের ঠিকানায়পাঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হওয়া সত্বেও তখননিজের হাতে এক দীর্ঘপত্র তাঁকে লিখেছিলেন।

১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর 'রাঙ্গাপ্রভাত' বইটিরাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে পাঠ্যহয়। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত বিভিন্ন কলেজে যাঁরাবইটি পড়াতেন সেসব অধ্যাপকদের মধ্যে কেউ কেউ বইটিরপ্রশংসা করে তাঁকে চিঠি লিখেছেন।

১৯৬৩ সালের ৭ ডিসেম্বরের 'আজাদ'-এ জনৈক লেখক 'জাতীয় আদর্শের বিরোধিতা : রাঙ্গাপ্রভাত'-এ নামেএক প্রবন্ধ লিখে আবুল ফজলকে পাকিস্তান বিরোধী ওইসলাম বিরোধী বলে উল্লেখ করেন।

বইটি ছয় বছর ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সক্লাসে পড়ানো হয়। বইটিতে জাতীয় আদর্শ বা ধর্মবিরোধীকোন কথা থাকলে তা ছাত্র ও অধ্যাপকদেরচোখে পড়ত। 'আজাদ'-এ প্রকাশিত লেখাটির উদ্দেশ্য ছিলগ্রন্থের লেখকের কিছু ক্ষতিসাধন করে কিঞ্চিৎ আত্মতৃপ্তিলাভ। 'আজাদ'-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটির কর্তৃকা (কাটিংস) কেবা কারা প্রদেশের স্বরাষ্ট্র বিভাগ থেকেরাউয়ালপিন্ডি প্রেসিডেন্ট দফতর পর্যন্ত সর্বত্রপাঠিয়েছিলেন। ফলে পরের বছর থেকে রাজশাহীবিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা থেকে বইটি বাদপড়ে।

১৯৪৮-৪৯ সালে তিনি সংকলন করেছিলেন 'সাহিত্যচয়নিকা' নামে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীর উপযোগী দুটিসাহিত্য বই। পাঠ্যবই হিসেবে ঐ দুটি বইও টেক্সট্ বুককমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছিল। তাঁর এ দু'টা সংকলনপাঠ্য বই হিসেবে খুব জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।

১৯৪৯ সালে তিনি কোরান শরীফ ভালো করে বুঝে ইংরেজীঅনুবাদের মাধ্যমে অধ্যয়ন করেছিলেন এবং পরবর্তীতে 'কোরানের বাণী' নামক একটি বই প্রকাশ করেন। ডক্টরআবদুল্লা সোহরওয়ার্দীর'Sayings of Muhammed'নামের বইটির সংকলিত ৫০০ হাদিস এবং অন্যান্য বইথেকে আরও৫০০ হাদিস সংগ্রহ করে মোট ১০০০ হাদিস দিয়ে 'হাদিসের বাণী' নামে কোরানের বাণীর পরিপূরক হিসেবেআর একটি বই সংকলন করেন তিনি। ব্যাকরণের একটি বইওলিখেছেন তিনি।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলো। সামরিক শাসনজারির অনেক আগে 'সমকাল' নামক একটি মাসিকপত্রিকায় তিনি 'সাহিত্যের সংকট' নামে এক প্রবন্ধলিখে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু লেখাটিপ্রকাশিত হলো সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর। কিছুদিনপর দেখা গেলো সরকার সমকালের ঐ সংখ্যাটি বাজেয়াপ্তকরেছে। কেন এবং কোন লেখার জন্য এই সংখ্যাটিবাজেয়াপ্ত করা হলো ঘোষণায় তার কোন উল্লেখ নেই।তবে সবাই বুঝলো আবুল ফজলের লেখাটির কারণে এইসংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। স্বয়ং সম্পাদকও তাঁকেতাই বলেছেন।

এভাবেই লেখালেখির মাধ্যমে তিনি সবসময় সত্য ওন্যায়ের কথা বলেছেন এবং করেছেন অন্যায়ের প্রতিবাদফলে তাঁকে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তুপিছপা হননি তিনি, বরং সদর্পে চালিয়ে গেছেন তাঁরলেখালেখি।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেওয়া হয়েছে বাংলাএকাডেমি পুরস্কার, প্রেসিডেন্ট পুরস্কার, রাষ্ট্রীয়সাহিত্য পুরস্কার, সমকাল পুরস্কার এবং সম্মানসূচকডক্টরেট ডিগ্রি।

১৯৮৩ সালের মে মাসে আবুল ফজল মৃত্যুবরণ করেন।

  www.gunijan.org.bd