Golden Bangladesh
Eminent People - রফিকুন নবী

Pictureরফিকুন নবী
Nameরফিকুন নবী
DistrictNawabganj
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeপার্ফরমিং আর্ট
Life Style

রফিকুন নবী  

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝিতে স্কুলপড়ুয়া এক বালক হাতে পেল যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত মাসিক রম্য-ম্যাগাজিন 'ম্যাড' ম্যাগাজিনের কার্টুনগুলি বালকের নজর কাড়ে। একই সময়ে কিছু ভারতীয় পত্রিকার চিত্রাঙ্কন দেখেও সে মুগ্ধ হয়। মাসিক ম্যাগাজিন আর পত্রিকা-এই দুয়ের মাধ্যমেই কার্টুনের সাথে প্রথম পরিচয় হয় তাঁর। সেগুলি সম্পর্কে জানার আগ্রহটা বেড়ে চলল দিনে দিনে। শুরু হল সেগুলি সংগ্রহ করা। নিতান্তই শখ মেটাতে সে ভর্তি হল ঢাকার আর্ট কলেজে। এবার শুরু নিজের আঁকা। শখ করে ছবি আঁকতে শুরু করা সেদিনের সেই বালকটিই আজকের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায় জীবনের প্রথম কার্টুনটি আঁকেন তিনি। কার্টুনটি ছিল ভিক্ষুকদের উপরে। বিষয় দারিদ্র্য। লক্ষ্য ছিল ভিক্ষুকদের ব্যবহার করে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের অবস্থানটা তুলে ধরা। জীবনের প্রথম আঁকা সে কার্টুনটি কোথাও প্রকাশিত না হলেও আগ্রহ কমেনি এতটুকু।

কার্টুনের প্রতি আগ্রহটা আরও বেশি জোরাল হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝিতে, বিভিন্ন যুব সংগঠন, বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের কার্টুন পোস্টার আঁকার আহ্বানে। তত্‍কালীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে পোস্টার আঁকার অনুরোধ করত তারা। তখন সদ্য পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেছেন রফিকুন নবী। ২১শে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিশাল আকারের ব্যানারে কার্টুন আঁকেন। গণজমায়েতে ব্যবহৃত হত তাঁর আঁকা এইসব অসংখ্য কার্টুন ব্যানার। কিন্তু সরকারি চাকুরে হওয়ায় ঐসব কার্টুনে নিজের প্রকৃত নাম স্বাক্ষর করা ছিল অসম্ভব। আবার একেবারে আলাদা কোন নামও নিজের কাছেই কেমন অস্বস্তি লাগছিল। তাই সেই পোস্টারগুলিতে নিজের প্রকৃত নামটিকেই সংক্ষিপ্ত করে তিনি লিখলেন 'রনবী'। এই রনবীই পরে তৈরি করেন সর্বাপেক্ষা বেশি আলোচিত ও জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র 'টোকাই'। রনবী পৌঁছে যান সব মানুষের হৃদয়ের কাছে।

চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী অথবা কার্টুনিস্ট রনবী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ২৮ নভেম্বর, রাজশাহী বিভাগের চাঁপাই নওয়াবগঞ্জ জেলায়। রফিকুন নবীর মাতুল ও পৈতৃক দুই পরিবারই ছিল সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। গোবরাতলা মহানন্দার তীর ঘেঁষে যে গ্রামটি, সেটিই ছিল তাঁর মাতুলালয়। পৈত্রিক ভিটে ছত্রাজিতপুর, শিবগঞ্জ উপজেলায়। মা আনোয়ারা বেগম ছিলেন ছোটখাট জমিদার পরিবারের সন্তান। পিতা রশীদুন নবী ও পিতামহ মহিউদ্দীন আহমেদ দু'জনই ছিলেন পুলিশ অফিসার। রফিকুন নবীর পিতা রশীদুন নবীর ইচ্ছে ছিল শিল্পী হবেন। তত্‍কালীন কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়ার জন্য রশীদুন নবী তাঁর পিতা মহিউদ্দিন আহমেদের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। কিন্তু পিতা মহিউদ্দীনের অনুমতি মেলেনি। রাগ করে বাড়ি থেকে বের হয়ে ভাস্কর দেবীপ্রসাদ রায়চৌধুরীর কাছে যান রশীদুন নবী। তাঁর কাছে শেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতার মত পুলিশের পেশাক গ্রহণ করলেও শিল্পী হওয়ার আগ্রহটা কখনও হারাননি। শখ করে ছবি আঁকতেন তিনি। কথাবার্তা, আচার-আচরণে তাঁর অন্তরলোকের শিল্পীকেই খুঁজে পাওয়া যেত। নিজের অতৃপ্ত মনকে তৃপ্ত করতে ছেলে রফিকুন নবীকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন আর্ট কলেজে। আর অবসরকালীন জীবনে মাটি দিয়ে অনেক প্রতিকৃতিমূলক মডেলিং করেছেন।

পুলিশ অফিসার বাবার বদলির চাকুরির সুবাদে রফিকুন নবীর বাল্য ও কৈশোরকাল কেটেছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকা দেখার সুযোগটা তিনি পেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় থিতু হন বাবা। পুরান ঢাকাতেই কৈশোর ও যৌবনের অনেকটা সময় কাটে রফিকুন নবীর। ১৯৫০-এর মাঝামাঝিতে স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পুরান ঢাকার পোগোজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৫৯ সালে সম্পূর্ণ পিতার ইচ্ছায় ঢাকার সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন তিনি। এখানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান এবং পরে আরও কতিপয় খ্যাতিমান দিকপালের সান্নিধ্যে থেকে পড়াশোনা করেন। আর্ট কলেজে প্রথম বর্ষে থাকতে নিজের আঁকা ছবি প্রথম বিক্রি করেন ১৫ টাকায়। স্থানীয় সংবাদপত্রে রেখাচিত্র এঁকে এবং বুক কভার ইলাস্ট্রেশন করে পরিচিতি লাভ করেন দ্বিতীয় বর্ষেই। ১৯৬২ সালে এশিয়া ফাউন্ডেশনের বৃত্তি লাভ করেন তিনি। '৬৪ সালে স্নাতক পাশ করেন। ফল প্রকাশের পরের দিনই প্রথিতযশা শিল্পী ও শিক্ষক অধ্যাপক জয়নুল আবেদিন ছাত্র রফিকুন নবীকে চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালেন। একান্তে ডেকে নিয়ে আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিতে বলেন তাঁকে। রফিকুন নবী সে সময়ে ঢাকার প্রথম সারির পত্রিকাগুলিতে নিয়মিত কাজ করতেন। নিয়মিত কার্টুন আঁকতেন সাপ্তাহিক 'পূর্বদেশ' পত্রিকায় কবি আবদুল গনি হাজারির কলাম 'কাল পেঁচার ডায়েরী'-তে। সব মিলিয়ে মাসিক বেতন ২৭৫ টাকা। আর আর্ট কলেজের শিক্ষকের বেতন তখন ছিল ১০ টাকার একটি বাত্‍সরিক ইনক্রিমেন্টসহ মাসিক ১৮০ টাকা। জয়নুল আবেদিন তাঁর ছাত্রকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, প্রতিষ্ঠান বড় হলে বেতন বাড়বে। পরের দিন আবার তাঁর বাবা রশীদুন নবীকে ডেকেও একই অনুরোধ করলেন জয়নুল আবেদিন। পিতা জানালেন জয়নুল আবেদিনের মত একজন সম্মানীয় ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের চিন্তা করাও উচিত্‍ হবে না। তবে ছাত্রদের সামাল দেওয়ার বিষয়টি ভেবে কিছুটা ঘাবড়েও গিয়েছিলেন রফিকুন নবী। নিজেকে কখনও শিক্ষক হিসেবে চিন্তাও করেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকা আর্ট কলেজের শিক্ষক হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি। আর্ট কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের নিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়।

১৯৭১ সাল। শুরু হলো যুদ্ধ। রফিকুন নবী প্রথমে ভাবলেন যুদ্ধে যাবেন। কিন্তু গেরিলা বন্ধুরা পরামর্শ দিলেন, শহরে কয়েকজনের থাকা প্রয়োজন। তাই যুদ্ধে না গিয়ে তিনি রয়ে গেলেন ঢাকায়। ঢাকায় থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ, কাপড় ও খাদ্য সংগ্রহ করা শুরু করলেন। পুরান ঢাকার নারিন্দায় তাঁর বাসাটিতে চলত গোপন মিটিংগুলি। বাংলাদেশ জন্মের পর নবী আবার মনোনিবেশ করেন শিক্ষকতায়। একইসাথে আঁকার জগতে। বছরখানেক পরে শিক্ষকদের জন্য একটি বৃত্তি এলো গ্রীসে গিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করার। সকলেই ধরে নিয়েছিলেন বৃত্তিটা এসেছে রফিকুন নবীর জন্যই। যদিও তিনি আবেদনও করেননি। ততোদিনে ১৯৭২-এ সংসার শুরু করেছেন তিনি। সদ্য পিতা হয়েছেন। কিছুতেই চাচ্ছিলেন না বৃত্তিটা গ্রহণ করতে। তবুও পরিবার এবং সহকর্মীদের পরামর্শে রফিকুন নবী পাড়ি জমালেন গ্রীসে। ১৯৭৩ সালে গ্রীক সরকারের পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন বৃত্তি নিয়ে তিনি ভর্তি হলেন গ্রীসের এথেন্স স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ। পড়াশোনা করলেন প্রিন্ট মেকিং-এর ওপর। গ্রীসের মানুষ তখন সাইপ্রাসের দখল নিতে তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তিন বছর কাটল হোমার, সক্রেটিস ও সফোক্লিসের দেশ গ্রীসে। ১৯৭৬ সালে দেশে ফিরে আসেন তিনি। শিক্ষক থেকে ধীরে ধীরে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপকের পদে অধিষ্ঠিত হন। পরে চারুকলা ইন্সটিটিউটের পরিচালক হন। ২০০৮ সালে নিযুক্ত হন নবগঠিত চারুকলা অনুষদের ডীন।

১৯৬৯ সালের গনআন্দোলনে মুখর রাজপথ। তত্‍কালীন সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে মিছিলগুলির প্রথম সারিতে থাকত পথের শিশুরা। পরিচয়হীন, অতি দরিদ্র আট-দশ বছরের এই পথ-শিশুরা হরতালে গাড়ির চাকার হাওয়া ছাড়ত, ২১শে ফেব্রুয়ারি এলে ইংরেজি-আরবিতে লেখা সাইনবোর্ড ভাঙত। তাদের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন রফিকুন নবী। একই সময়ে তাঁর বাসার পাশেই দেখেন আরেকটি শিশু। রনবীর ভাষায়, 'আট-ন বছরের একটা ছেলে বসে থাকত। আমার বাসার ঠিক উল্টোদিকের টিনের বাসাটার এক চিলতে বারান্দায় মনের সুখে গড়াগড়ি দিত সারাদিন। পরনে চেক লুঙ্গি। মোটা পেটটায় কষে বাঁধা। মাথায় ছোট করে ছাঁটা খাড়া খাড়া চুল। ওর মা বিভিন্ন বাসায় কাজ করত। ... টিনের বাড়ির বারান্দাটার পাশেই রাস্তার ধারে কাক আর কুকুরের খাদ্য সম্ভারে ভরা ট্যাপ খাওয়া টিনের একটা ডাস্টবিন ছিল। মাঝে মাঝে ডাস্টবিন ঘেঁটে কিছু কাগজপত্র, ভাঙা কাঁচ বা লোহা লক্কড় খুঁজে পেলে জমা করে রাখত বারান্দার কোণে।' পাড়ার লোকদের তামাশার প্রশ্নগুলিতে নির্ভেজাল, বুদ্ধিদীপ্ত ও মজার উত্তর দিত সে। তখনই রফিকুন নবী প্রথম ভাবেন টোকাইয়ের কথা। মোক্কা নামের ঐ শিশুটিকেই তাঁর কল্পনার টোকাইয়ের মডেল করেন। একদিন হঠাত্‍ করেই হারিয়ে গেল সেই ছেলেটি। কিন্তু তার মুখের একটা ছাপ পড়ে ছিল রনবীর মনে। ঐ মুখটাকেই খুঁজতেন অকারণে। '৭১-এর ২৫ মার্চের কালরাত্রির হত্যাযজ্ঞের পর ২৭ মার্চ কার্ফু্ উঠলে রনবী দেখেন গুলিস্তানের উল্টোদিকের দেয়ালের অপর পারে টাল দিয়ে রাখা অসংখ্য লাশ। পাশের রেললাইনের বস্তিবাসীদের লাশ। কিন্তু তাদের মধ্যে শিশুরাই যে বেশি! দু'বছর আগের সেই ছেলেটি আবার উঁকি দিল মনের কোণে। এরপর '৭৬-এ বিদেশ থেকে ফিরে আবাস গেড়েছেন নতুন পাড়ায়। একদিন বিকেলে বাসার সামনের মাঠে ছেঁড়া একটা বস্তা ঘাড়ে আট-ন' বছরের একটা ছেলের দেখা মিলল। চমকে ওঠেন রনবী! যেন ৭ বছর আগের সেই পেটমোটা ছেলেটিই আবার ফিরে এসেছে। সেদিনই ওকে কিছু আস্কারা দিলেন তিনি। ফলে প্রায় প্রতিদিনই আসা-যাওয়া করতে লাগল সে। তাকে দেখলেই যেচে কথা বলতেন রনবী। আর নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে মজার মজার কথা বলত ছেলেটি। তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হলো '৬৯এর সেই ভাবনার। এবার নাম ঠিক করার পালা। এমন একটি নাম যা সামগ্রিকভাবে সব পথশিশুকেই নির্দেশ করবে। মোক্কা, টোকা মিয়া, এরপর টোকন, টোকাইন্যা। কিন্তু সবগুলি নামই কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয় রনবীর কাছে। অবশেষে টোকাই। প্রথম ভাবনার দীর্ঘ ৮ বছর পর রনবীর আঁকার জগতে জন্ম নিল নতুন এক অধ্যায়- 'টোকাই''৭৮-এ শুরু করা কার্টুনে রনবী টোকাইয়ের বয়স রেখেছেন আট। শিল্পীর কল্পনায় '৭১-এ বেঁচে যাওয়া পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন পথের শিশুই 'টোকাই'

'টোকাই' শিরোনামে প্রথম স্ট্রিপ কার্টুনটি ছাপা হয় বিচিত্রার প্রারম্ভিক সংখ্যায় ১৯৭৮ সালের ১৭ মে। প্রথম কার্টুনে টোকাই একজন বড় কর্মকর্তা। 

Rationale
UploaderRaihan Ahamed