Golden Bangladesh
বাগেরহাট জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

বাগেরহাট জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ :

প্রাকৃতিক শোভায় সুশোভিত বাগেরহাট জেলায় রয়েছে বহু দৃষ্টিনন্দন স্থান। এসব স্থান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা উপস্থাপন করা হল-

ষাট গম্বুজ মসজিদ

 

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই তাই এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিলো সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে খান--জাহান নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না ধারণা করা হয় তিনি ১৫শ শতাব্দীতে এটি নির্মাণ করেন মসজিদটি বহু বছর ধরে বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিলো পাথরগুলো আনা হয়েছিলো রাজমহল থেকে এটি বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটির মধ্যে অবস্থিত; বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে

মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় · ফুট পুরু

ইতিহাস

সুলতান নসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন খানজাহান বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ হয় তুঘলকি জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট

বহির্ভাগ

মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি বিরাট আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড় উত্তর দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি করে দরজা মসজিদের কোণে ৪টি মিনার আছে এগুলোর নকশা গোলাকার এবং এরা উপরের দিকে সরু হয়ে গেছে এদের কার্ণিশের কাছে বলয়াকার ব্যান্ড চূঁড়ায় গোলাকার গম্বুজ আছে মিনারগুলোর উচ্চতা, ছাদের কার্নিশের চেয়ে বেশি সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিঁড়ি আছে এবং এখান থেকে আযান দেবার ব্যবস্থা ছিলো এদের একটির নাম রওশন কোঠা, অপরটির নাম আন্ধার কোঠা মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে এগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে সারিতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ আছে প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো, শুধু ৫টি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে এই ৬০টি স্তম্ভ চারপাশের দেয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে গম্বুজ মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ (৬০ গম্বুজ) মসজিদ হলেও এখানে গম্বুজ মোটেও ৬০টি নয়, গম্বুজ, ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি পূর্ব দেয়ালের মাঝের দরজা পশ্চিম দেয়ালের মাঝের মিহরাবের মধ্যবর্তি সারিতে যে সাতটি গম্বুজ সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের মত বাকি ৭০টি গম্বুজ আধা গোলাকার

অভ্যন্তরভাগ

মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দেয়ালে ১০টি মিহরাব আছে। মাঝের মিহরাবটি আকারে বড় এবং কারুকার্যমন্ডিত। মিহরাবের দক্ষিণে ৫টি উত্তরে ৪টি মিহরাব আছে। শুধু মাঝের মিহরাবের ঠিক পরের জায়গাটিতে উত্তর পাশে যেখানে ১টি মিহরাব থাকার কথা সেখানে আছে ১টি ছোট দরজা। কারো কারো মতে, খান--জাহান এই মসজিদটিকে নামাযের কাজ ছাড়াও দরবার ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন, আর এই দরজাটি ছিলো দরবার ঘরের প্রবেশ পথ। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদটি মাদ্রাসা হিসেবেও ব্যবহৃত হত

সুন্দরবন

 

সুন্দরবন সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনভূমি হিসেবে অখন্ড বন যা বিশ্বে সর্ববৃহৎ অববাহিকার সমুদ্রমূখী সীমানা এই বনভূমি গঙ্গা ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় অবস্থিত এবং বাংলাদেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিস্তৃত ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায় এর বাংলাদেশ ভারতীয় অংশ একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিরূপের অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সূচিতে ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে যথাক্রমে সুন্দরবন সুন্দরবন জাতীয় পার্ক নামে সুন্দরবনকে জালের মত জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক স্রোতধারা, কাদা চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ছোট ছোট দ্বীপ মোট বনভূমির ৩১. শতাংশ, অর্থাৎ ,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলের এলাকা বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত জরিপ মোতাবেক ৫০০ বাঘ ৩০,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায় ১৯৯২ সালের ২১শে মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়

নামকরণ

বাংলায় "সুন্দরবন"-এর আক্ষরিক অর্থ "সুন্দর জঙ্গল" বা "সুন্দর বনভূমি" সুন্দরী গাছ থেকে সুন্দরবনের নামকরণ হয়ে থাকতে পারে, যা সেখানে প্রচুর জন্মায়। অন্যান্য সম্ভাব্য ব্যাখ্যা এরকম হতে পারে যে, এর নামকরণ হয়তো হয়েছে "সমুদ্র বন" বা "চন্দ্র-বান্ধে (বাঁধে)" (প্রাচীন আদিবাসী) থেকে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় যে সুন্দরী গাছ গাছ থেকেই সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে

ইতিহাস

মুঘল আমলে (১২০৩-১৫৩৮) স্থানীয় এক রাজা পুরো সুন্দরবনের ইজারা নেন। ঐতিহাসিক আইনী পরিবর্তনগুলোয় কাঙ্ক্ষিত যেসব মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্বাবধানের অধীনে আসা। ১৭৫৭ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীর এর কাছ থেকে স্বত্বাধিকার পাওয়ার পরপরই সুন্দরবন এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। বনাঞ্চলটি সাংগঠনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভারতের তৎকালীন বাংলা প্রদেশে বন বিভাগ স্থাপনের পর থেকে

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুণ ছিল। বনের উপর মানুষের অধিক চাপ ক্রমান্বয়ে এর আয়তন সংকুচিত করেছে। ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সুন্দরবনের স্বত্ত্বাধীকার অর্জন করে। এল. টি হজেয ১৮২৯ সালে সুন্দরবনের প্রথম জরীপ কার্য পরিচালনা করেন। ১৮৭৮ সালে সমগ্র সুন্দরবন এলাকাকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং ১৮৭৯ সালে সমগ্র সুন্দরবনের দায় দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়। সুন্দরবনের প্রথম বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নাম M. U. Green তিনি ১৮৮৪ সালে সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় সুন্দরবনের ,০১৭ বর্গ কিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে পড়ে। যা বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় .% এবং সমগ্র বনভূমির প্রায় ৪৪%

সুন্দরবনের উপর প্রথম বন ব্যবস্থাপনা বিভাগের আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৯ সালে। ১৯৬৫ সালের বন আইন (ধারা ) মোতাবেক, সুন্দরবনের একটি বড় অংশকে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় ১৮৭৫-৭৬ সালে। পরবর্তী বছরের মধ্যেই বাকি অংশও সংরক্ষিত বনভূমির স্বীকৃতি পায়। এর ফলে দূরবর্তী বেসামরিক জেলা প্রশাসনের কর্তৃত্ব থেকে তা চলে যায় বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। পরবর্তীতে ১৮৭৯ সালে বন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনিক একক হিসেবে বন বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সদর দপ্তর ছিল খুলনায় সুন্দরবনের জন্য ১৮৯৩-৯৮ সময়কালে প্রথম বন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণিত হয়

১৯১১ সালে সুন্দরবনকে ট্র্যাক্ট আফ ওয়াস্ট ল্যান্ড হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়, যা না তো কখনো জরিপ করা হয়েছে আর না তো কোনদিন শুমারীর আধীনে এসেছে। তখন হুগলী নদীর মোহনা থেকে মেঘনা নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় ১৬৫ মাইল (২৬৬ কি.মি.) এলাকা জুড়ে এর সীমানা নির্ধারিত হয়। একই সাথে চব্বিশ পরগনা , খুলনা বাকেরগঞ্জ এই তিনটি জেলা অনুযায়ী এর আন্তঃসীমা নির্ধারণ করা হয়। জলাধারসহ পুরো এলাকার আয়তন হিসেব করা হয় ,৫২৬ বর্গমাইল (১৬,৯০২ কি.মি) জলবহুল সুন্দর বন ছিল বাঘ অন্যান্য বন্য জন্তুতে পরিপূর্ণ। ফলে জরিপ করার প্রচেষ্টা খুব একটা সফল হতে পারেনি। সুন্দরবনের নামকরণ হয়েছে খুব সম্ভবত এর প্রধাণ বিশেষ গাছ সুন্দরীর (Heritiera fomes) নাম থেকেই। থেকে পাওয়া শক্ত কাঠ নৌকা, আসবাবপত্র সহ বিভিন্ন জিনিস তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবন সর্বত্রই নদী, খাল, খাঁড়ি দ্বারা বিভক্ত, যাদের মধ্যে কয়েকটি স্টিমার স্থানীয় নৌকা উভয়ের চলাচল উপযোগী নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হত কলকাতা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য

হযরত খানজাহান আলী (রঃ) তাঁর মাজার

 

হযরত খানজাহান (রঃ) এর মাজারগাত্রে উৎকীর্ণ শিলালিপি পাঠ করে তাঁর কিছুটা পরিচয়ের সূত্র পাওয়া যায়। কিন্তু এ সাধকের প্রকৃত নাম ও বিসত্মারিত পরিচয় আজও সঠিকভাবে জানা যায়নি। উক্ত শিলালিপিতে তাঁর নাম পরিচয়“ খানে আযম খানজাহান” ও “উলুঘ খানহাজান”লেখা আছে। শিলালিপিতে আরবী ও ফারর্সী ভাষায় তাঁর মৃত্যু তারিখ ৮৬৩ হিজরী ২৬ জিলহজ্ব বুধবার (মোতাবেক ১৪৫৯ সালের ২৩ অক্টোবর মতামতরে ২৪ অক্টোবর) উলেস্নখ আছে। “উলুঘ ” তুর্কী শব্দ এবং তা পারিবারিক উপাধি । এ থেকে ধারণা করা যায় তিনি উলুঘ নামক কোন এক তুর্কী পরিবারের সমতান । কোন কোন লেখকের মতে তিনি পারস্য মতামতরে আরব দেশ থেকে দিলস্নী হয়ে এ দেশে আসেন । তুর্ক- আফগান আমলে সেনাপতির সম্মানিত উপাধী ছিল খানে আযম । এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি একজন সেনা নায়কও ছিলেন এবং “খানে আযম খানজাহান” উপাধিতে তাঁকে ভূষিত করা হয়েছিল । এ মহান সেনা নায়ক ও সাধক তাঁর নিজ পরিচয় সম্বন্ধে কিছু লিখে রেখে যাননি। লোক পরম্পরায় তাঁকে সবাই খানজাহান আলী (রঃ) নামেই চিনে এসেছে।  

তাঁর ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবন সম্বন্ধেও খুব বেশী কিছু জানা যায় না যতদুর জানা যায় তিনি সুখী দাম্পত্য জীবন যাপন করেন এবং তাঁর এক বা একাধিক স্ত্রী ছিল। তবে তিনি নিঃসমত্মান ছিলেন। গবেষকগণ অনুমান করেন তিনি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্-এর সমসাময়িক এবং সম্ভবতঃ তিনি গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সেনানায়ক ছিলেন। সুলতানের প্রতিনিধিরূপে তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে বাগেরহাট অঞ্চলে বিশাল জনপদ সৃষ্টি করেন এবং রাজ্য বিসত্মার করে শাসন কাজ চালাতে থাকেন। সে জন্যই তিনি অঞ্চলের নামকরণ করেনখলিফাত--আবাদ খানজাহান (রঃ) এমন এক মহাপুরম্নষ ছিলেন যাঁর মহতী গুনাবলীর দ্বারা বাগেরহাটসহ সমগ্র ভাটি অঞ্চল উপকৃত ধন্য হয়েছে। কথিত আছে মহাপুরম্নষ মানব প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যশোরের বারোবাজার থেকে শুরম্ন করে সমগ্র ভাটি অঞ্চল জুড়ে ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ ৩৬০টি দীঘি খনন করেছিলেন। মুসলমানদের প্রথম আবাদকৃত অঞ্চলে উপাসনার জন্য মসজিদগুলি এবং নোনা পানির দেশ ভাটি অঞ্চলে পানীয় জলের দীঘিগুলি আপামর জনগণের কাছে খোদার আশীর্বাদের মতই প্রতিভাত হয়েছিল। আরও কথিত আছে, দেশে আগমনের সময় তাঁর সাথে যে ৩৬০জন আউলিয়া এসেছিলেন সম্ভবতঃ তাঁদের সংখ্যার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তিনি ৩৬০টি মসজিদ নির্মাণ ৩৬০টি দীঘি খনন করেছিলেন। প্রথমে শাসকরূপে জীবন শুরম্ন করলেও পরবর্তীতে ধর্ম চিমত্মা জনসেবাই ছিল তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র। স্থানীয় জনসাধারণের কাছে তিনি ছিলেন এক অলৌকিক ক্ষমতাবান মহাপুরম্নষ দুঃস্থ মানুষের মুখে ক্ষুধার অন্ন বিতরণ, জলকষ্ট নিবারণের জন্য  অসংখ্য দীঘি খনন, রাসত্মাঘাট নির্মাণ,হাট-বাজার স্থাপন, মানুষের ধর্মীয় উপাসনার জন্য অপূর্ব স্থাপত্য সুষমামন্ডিত অগণিত মসজিদ নির্মাণ প্রভৃতি অসংখ্য কীর্তিরাজি কালের শত ভ্রম্নকুটি উপেক্ষা করে আজও সৃষ্টিকর্তা মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসার বাণী বহন করে চলেছে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের বিসত্মীর্ণ জনপদের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ঘরে ঘরে 

খাঞ্জেলী দীঘির উত্তর পাড়ে এক উচ্চ ভূমিতে তাঁর সমাধি সৌধ নির্মিত। সমাধি সৌধটি বর্গাকৃতি, এর আয়তন ৪২ফুট X৪২ ফুট এবং প্রাচীরের উচ্চতা ২৫ফুট, এর ছাদে একটি গম্বুজ আছে। সমাধি সৌধের ভিতর একটি প্রসত্মর নির্মিত বেদিতে হযরত খানজাহান (রঃ)এর মাজার অবস্থিত দরগাহ বা সমাধি সৌধের সহাপত্য শিল্প অনেকটা ষাটগুম্বজের ন্যায়। শিলালিপিতে মৃত্যু তারিখ, দাফন তারিখ ছাড়াও আলস্নাহর নাম,কোরআন শরিফের কয়েকটি সূরা এবং তাঁর উপর আলস্নাহর শামিত্ম বর্ষিত হোক ইত্যাদি লিপিবদ্ধ আছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে হাজার হাজার ভক্ত তাঁর রম্নহানী দোয়া লাভের আশায় মাজার জিয়ারত করতে আসেন। এছাড়া প্রতি বছর ২৫ অগ্রহায়ণ মহান সাধকের মাজার প্রাঙ্গনে বার্ষিক ওরশ মোবারক এবং চৈত্র মাসের প্রথম পূর্ণিমায় বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে এক বিরাট মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ওরশ মেলায় দূর-দূরামত্ম থেকে হাজার হাজার ভক্ত শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মাজারে সমবেত হন

খাঞ্জেলী দীঘি

হযরত খানজাহান (রঃ) এর মাজারের দক্ষিণ দিকে আয়তনে প্রায় ২০০ বিঘা জমি জুড়ে দীঘি অবস্থিত এই দীঘির নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন কিংবদমিত্ম প্রচলিত আছে কেউ কেউ বলেন বুদ্ধ ঠাকুরের মুর্তি প্রাপ্তির জন্য এর নাম হয়ঠাকুর দীঘি অন্য মতে খানজাহানকে দেশীয় হিন্দুগণ ভক্তিভরেঠাকুরবলতো এবং তাঁরই বিশেষ তত্ত্বাবধানে দীঘি খনন করা হয় বলে তাদের ভক্তিভাজন ঠাকুরের নামানুসারে ঠাকুর দীঘি বলা হতো আবার কেউ কেউ বলেন পীর আলী মোহাম্মদ তাহের খাজাহানের প্রিয়তম বন্ধু ছিলেন তিনি পূর্বে ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন এবং তাঁর নাম ছিল শ্রী গোবিন্দ লাল রায় খানজাহান তাঁকে আদর করেঠাকুরবলে সম্বোধন করতেন তাঁরই স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি দীঘির নামঠাকুর দীঘিরেখেছিলেন তাঁর মাজার খানজাহান (রঃ) মাজার সংলগ্ন পশ্চিমে অবস্থিত

দীঘির প্রধান ঘাটটি প্রশসত্ম সুন্দর। মহিলাদের জন্য আলাদা ঘাট আছে। দীঘিতে কালা পাহাড় ধলা পাহাড় নামক কুমিরের বংশধররা আজও জীবিত এবং ডাকলে আসে। দীঘির পানি সুপেয় অনেকে রোগপীড়া থেকে নিরাময়ের জন্য দীঘির পানি পান করেন এবং দীঘিতে গোসল করে

বাগেরহাট জাদুঘর

 

পঞ্চদশ শতকে গড়ে ওঠা খলিফাতাবাদ শহরের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য সংরÿ উপস্থাপনের জন্য ১৯৭৩ সালে সরকারের আমত্মর্জাতিক আবেদনের প্রেÿÿতে ইউনেস্কো বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে সংরÿ সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৪ সালে ৫২০ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে একটি জাদুঘর নির্মিত হয়। জাদুঘরটি ২০০১ সালের সেপ্টেমবর মাসে উন্মুক্ত করা হয় এবং যাটগম্বুজ মসজিদ প্রত্নসহল জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য প্রবেশমূল্য দেশী দর্শকদের জন্য ১০.০০(দশ) টাকা এবং বিদেশী দর্শকদের জন্য ১০০.০০ (একশত) টাকা ধার্য করা আছে

অযোধ্যা মঠ/কোদলা মঠ

 

পুরাতন বাগেরহাট-রূপসা সড়কে অবস্থিত যাত্রাপুর বাজার হতে প্রায় কিলোমিটার দূরে প্রাচীন ভৈরব নদীর পূর্ব তীরে কোদলা গ্রামে অযোধ্যা মঠ অবস্থিত। তলদেশে বর্গাকারে নির্মিত মঠের প্রত্যেক বাহু বাহিরের দিকে ২৭র্-৮র্র্র্ দীর্ঘ। ভিতরের প্রকোষ্ঠের মাপ ১০র্-৫র্র্র্ X১০র্-৫র্র্র্ ইটের তৈরী প্রাচীর গুলি ফুট ½ ইঞ্চি প্রশসত্ম। মঠে ব্যবহৃত ইটগুলির আয়তন ইঞ্চি X ইঞ্চি X ইঞ্চি। পালিশ করা লাল ইটগুলি অতি উচ্চমানের। মঠটির উচ্চতা ভূমি হতে প্রায় ৬৪ ফুট ইঞ্চি। মঠের বিশেষ আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে এর বাইরের অলঙ্করণ। উড়িষ্যা অঞ্চলে খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দী পর্যমত্ম যে স্টাইলে মন্দির নির্মাণ পদ্ধতি দেখা যায়। তার প্রভাব মঠে আছে বলে ধারণা করা হয়। কবে কার দ্বারা  মঠ নির্মিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ণীত হয়নি। তবে মঠের গায়ে খুদিত রয়েছে-

এই ক্ষয়প্রাপ্ত পংক্তিমালার যতদূর পাঠোদ্ধার করা যায় তা থেকে অনুমিত হয় যে, তারকের (ব্রক্ষ্ম) প্রাসাদ লাভের উদ্দেশ্যে মঠ খুব সম্ভবত একজন ব্রাক্ষ্মণ (শর্মনা) কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এর পাশাপাশি জনশ্রুতি আছে যে, কারো চিতাভস্মের উপর মঠ নির্মিত হয়েছিল। প্রবাদ রাজা প্রতাপাদিত্য কর্তৃক তাঁর সভাপন্ডিত ‘‘অবিলম্ব সরস্বতীর’’ স্মৃতিস্তম্ভ রূপে মঠটি নির্মিত হয়। পোড়ামাটির অলংকরণে নির্মিত মধ্যযুগীয় মন্দিরটি স্থাপত্য শিল্পের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

এ ছাড়াও উল্লেখযোগ্য স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে-

  1. মংলা বন্দর
  2. রেজা খোদা মসজিদ
  3. জিন্দা পীর মসজিদ
  4. ঠান্ডা পীর মসজিদ
  5. সিংগাইর মসজিদ
  6. বিবি বেগুনি মসজিদ
  7. চুনাখোলা মসজিদ
  8. নয় গম্বুজ মসজিদ
  9. কোদাল মঠ
  10. রণবিজয়পুর মসজিদ
  11. দশ গম্বুজ মসজিদ
  12. সুন্দরবন এর করমজল

তথ্যসূত্র :

http://www.bagerhat.gov.bd  

http://bn.wikipedia.org