Golden Bangladesh
মৌলভীবাজার জেলা

[গোল্ডেন বাংলাদেশ দেশের 64 জেলার ইতিহাস সহ প্রত্যেক জেলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করতে বদ্ধ পরিকর। তাই প্রত্যেক জেলার সদস্যদের নিজ জেলার তথ্য আপলোড করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। তথ্য আপলোড কারীর নাম তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হবে। তাই দেরি না করে নিজ জেলার গৌরবময় ইতিহাস সংযোজন করে সাইটটিকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।]   

মৌলভীবাজার জেলার পটভূমি :

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার মৌলভীবাজার জেলা। এ জেলার আয়তন ২৭৯৯ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে সিলেট জেলা, দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে হবিগঞ্জ জেলা।

প্রাচীন ইতিহাস: বহুপূর্ব থেকেই মৌলভীবাজার তথা সিলেট অঞ্চল পবিত্র ভূমি হিসাবে পরিচিত। রামায়ন ও মহাভারত এর মত উল্লেখযোগ্য মহাকাব্যে এ অঞ্চলের উল্লেথ রয়েছে। মৌলভীবাজার অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বাশেংর কিছু অংশ ছাড়া বাকি সবটুকুই কামরূপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

মোগল আমল: মোগল আমলে বর্তমান মৌলভীবাজার অঞ্চল মোগল সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে এক যুদ্ধে ইটা রাজ্যের রাজা সুবিদ নারায়নের মৃত্যুর পর ইটারাজ্যের সমূহভুমি ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে পাঠান বীর খাজা ওসমানেরঅধিকারে আসে। ১৬১২ সালে সিলেটের অধিকর্তা মোঘল সেনাপতি ইসলামখানের আক্রমনের পূর্ব পর্যন্ত ইটা রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন খাজা ওসমান।

সুলতানি আমল: বর্তমান সিলেট অঞ্চল বাংলার সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহের (১৩০১-১৬২২) সময় মুসলমানদের অধিকারে আসে। আরবের ইয়েমেন থেকে আগত প্রখ্যাত দরবেশ হযরত শাহজালাল(রঃ)এর সিলেট আগমনের পর তাঁর সঙ্গীসাথীদের মধ্যে অন্যতম হযরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা(রঃ) ইসলাম প্রচারের জন্য মৌলভীবাজার অঞ্চলে আসেন। তিনি বাগদাদের অধিবাসী ছিলেন। মৌলভীবাজার শহরে তার মাজার রয়েছে।

বৃটিশ আমল: ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর পরই এদেশে ইংরেজ শাসন প্রবর্তিত হয়। বৃটিশ সরকার ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ীবন্দোবস্ত প্রথা চালু করে এবং তালুকভিত্তিক জমিদার ও মিরাসদার শ্রেণী সৃষ্টি করে তাদের উপর এদেশের মানুষের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের ভার অর্পণ করে। জমিদার, মিরাসদাররা অবিবেচকের মতসাধারণ প্রজারকাছ থেকে খাজনা আদায় শুরু করে। এর ফলে ইংরেজ কর্তৃক এ দেশবাসীকে শোষনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ইংরেজদের শোষন ও শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবে স্বাধীনতার প্রথম চেতনা প্রকাশে ঐতিহাসিক সিপাহী বিপ্লব সংঘটনে মৌলভীবাজার অঞ্চলের সিপাহীদের অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৮৫৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের ‘লাতু’নামক স্থানের নিকটে একদল বিদ্রোহী সেনা ইংরেজদের মুখোমুখি হয়।

নামকরণ: কথিত আছে যে, সৈয়দ শাহ্‌ মোস্তফা (র:) এর ভাতুষ্পুত্র হযরত ইয়াছিন (র:)এর উত্তর পুরুষ মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ মনু নদীর তীরে ১৮১০খ্রিষ্টাব্দে যে বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাজারটি কালক্রমে প্রসিদ্ধিলাভ করে। ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে ১ এপ্রিল মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাজারটিকে কেন্দ্র করে ২৬টি পরগনা নিয়ে দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ শ্রীহট্ট বা সাউথ সিলেট নামের বদলে এ মহকুমার নাম মৌলভীবাজার রাখা হয়। ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার মহকুমাটি জেলায় উন্নীত হয়।

জেলার ঐতিহ্য :

মৌলভীবাজার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে একটি ঐতিহ্য মন্ডিত জেলা। দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতিতে এ জেলার গুরুত্ব অপরিসীম।আকর্ষণীয় অনন্য বৈশিষ্টের কারণে মৌলভীবাজার জেলা পর্যটন শিল্পের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মৌলভীবাজার জেলায় রয়েছে বৈচিত্র্যময় পরিবেশ, চা বাগান সমূহের দৃষ্টি নন্দন দৃশ্য এবং মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। আদিবাসীদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, অভ্যন্তরীণ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্য সমাহারে এ জেলাটি অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। এ ভিন্নতা ছাড়াও মৌলভীবাজার জেলার অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে হযরত শাহ মোস্তফা (র:) এর মাজার শরীফ, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ, পৃথিমপাশা নবাববাড়ী, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনষ্টিটিউট, মনু ব্যারেজ, মাধবপুর চা-বাগান লেক, মনিপুরী পল্লী, প্রাকৃতিক গ্যাস ট্রান্সমিশন প্লান্ট, কমলা/লেবু/আনারস বাগান ইত্যাদি।

পাহাড়, টিলা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, হাওড়/বাওড়/বিল, ঝর্ণা, নদ-নদী পরিবেষ্টিত এবং জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ এ জেলা ইকো ট্যুরিজমের (Eco-Tourism)জন্য খুবই উপযোগী। এ কারণে এখানে প্রতি বছর বহু সংখ্যক দেশী-বিদেশী পর্যটক ভ্রমণ করেন। কিন্ত পর্যটকদের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আবাসন, বিনোদন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণে পর্যটকগণ অনেকক্ষেত্রে নিরাশ হন। এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সহজেই এ জেলাকে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য আরো উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়। এ লক্ষ্যে বিনোদনের ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা, কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মনিপুরী পল্লী, খাসিয়া পল্লী, বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওড় এবং চা বাগানসহ অন্যান্য দর্শনীয় স্থানকে সম্পৃক্ত করে একটি প্যাকেজ তৈরী করা সম্ভব হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এ জেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। [চলবে....]

তথ্যসূত্র : http://www.moulvibazar.gov.bd