Golden Bangladesh
গাইবান্ধা জেলার পটভূমি

[গোল্ডেন বাংলাদেশ দেশের 64 জেলার ইতিহাস সহ প্রত্যেক জেলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংযোজনের মাধ্যমে সেবা প্রদান করতে বদ্ধ পরিকর। তাই প্রত্যেক জেলার সদস্যদের নিজ জেলার তথ্য আপলোড করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। তথ্য আপলোড কারীর নাম তথ্যসূত্রে উল্লেখ করা হবে। তাই দেরি না করে নিজ জেলার গৌরবময় ইতিহাস সংযোজন করে সাইটটিকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।]   

জেলার পটভূমি

আদিকথা ও নামকরণ

বৌদ্ধ, হিন্দু, মোঘল, পাঠান আমলসহ ইংরেজ শাসনামলের স্মৃতি বিজড়িত আমাদের এই গাইবান্ধা জেলা। বিভিন্ন শাসনামলে নানা সংগ্রাম-বিদ্রোহ এ অঞ্চলে সংঘটিত হয়েছে। গাইবান্ধা আদিতে কেমন ছিল সে বিষটি প্রথমে আলোচনা করা দরকার। বিভিন্ন সুত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য  এব্যাপারে বেশ কিছু ধারনা দেয়। গাইবান্ধা জেলার মুল ভুখন্ড নদীর তলদেশে ছিল এবং কালক্রমে যা নদীবাহিত পলিতে ভরাট হয় এবং এতদঞ্চলে সংঘঠিত একটি শক্তিশালী ভুমিকম্পের ফলে নদী তলদেশের উত্থান ঘটে এবং স্থলভূমিতে পরিণত হয়। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদী বাহিত পলি মাটি দিয়েই গড়ে উঠেছে আজকের গাইবান্ধা।

হারুণ-উর-রশিদ প্রণীত, ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘জিওগ্রাফি অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এ ব্যাপারে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে যে, ‘‘১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং ১৮৯৮ সালের শক্তিশালী ভূমিকম্পের ফলে বৃহত্তর রংপুর ও বগুড়া অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতির যথেষ্ঠ পরিবর্তন ঘটে। তিস্তা নদীর গতি পথ পরিবর্তন, দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট ও গাইবান্ধার তুলশীঘাটের মধ্যবর্তী ১৫ মাইলের বিস্তীর্ণ নদী ভরাট হয়ে যাওয়া এবং করতোয়া, ঘাঘট ও কাটাখালীর মত ছোট ছোট নদীর উৎপত্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জিওগ্রাফি অব বাংলাদেশের এ তথ্য থেকে গাইবান্ধার আদি অঞ্চল যে নদ-নদীতে পরিপুর্ণ ছিল তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। এ প্রসংগে বগুড়া জেলার ইতিহাস গ্রন্থে লেখা হয়েছে যে, ‘৬৪২ খৃষ্টাব্ধে বিশ্বখ্যাত চীনাপরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ যখন পৌন্ড্র বর্ধন (বগুড়ার মহাস্থানের সাবেক নাম) এলাকা থেকে পুর্ব উত্তরে কামরুপে যান সে সময় তাকে একটি বিরাট নদী অতিক্রম করতে হয়েছিল’’। হিউয়েন সাঙ এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে জানান যায় যে, বর্তমান গাইবান্ধা জেলা শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকা সপ্তম শতাব্দীতে নদীগর্ভে ছিল। কেন না পৌন্ড্র বর্ধন থেকে কামরুপ যাওযার যে নদী পথের কথা হিউয়েন সাঙ এর বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, সে পথ গাইবান্ধা জেলার উপর দিয়েই পড়ে। গাইবান্ধা যে আদিতে নিন্মাঞ্চল ছিল এর স্বপক্ষে আরো সে সকল তথ্য পাওয়া যায় তাতেও এর সত্যতা মেলে। এ ব্যাপরে এ্যানসিয়েন্ট পলিটিক্যাল ডিভিশন অব ইন্ডিয়া এর বরাত দিয়ে পাবনা জেলার ইতিহাস এ বর্ণিত হয়েছে ‘খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দিতে টলেমী তার বিখ্যাত জ্যোতিবির্দ্যা গ্রন্থে এতদঞ্চলের অনেক তথ্য পরিবেশন করেছেন। সেই সময় বাংলাদেশে স্থলভাগ অনেক কম ছিল। প্রাচীন মানচিত্রের উত্তরে মহাস্থানগড় (পৌন্ডবর্ধন) দক্ষিণ পুর্বে বিক্রমপুর (ঢাকা) আর চট্টগ্রাম দেখা যায়। পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর মধ্যস্থ অঞ্চলে কোন স্থান দেখা যায় না। এছাড়া উক্তগ্রন্থের মানচিত্রে যে এলাকাটিতে জলাভyুম এবং বিশাল নদী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাতে রাজশাহী বিভাগের পাবনা জেলার সাথে সংশ্লিষ্ট চলন বিল, বগুড়া জেলার ধুনট, সারিয়াকান্দি, গাবতলী, সোনাতলা এলাকাসহ গাইবান্ধা জেলার অধিকাংশ স্থলভাগ অন্তর্ভুক্ত হয়।

এসব তথ্য থেকে ধারনা করা যায় যে গাইবান্ধার অধিকাংশ এলাকা আদিতে জলাশয় ছিল। এছাড়া একতার সত্যতা প্রমাণের আরো যে দু’টি যুক্তি রয়েছে তার একটি হচ্ছে, জেলার বর্তমান শহর এলাকাসহ পাশ্ববর্তী অনেক এলাকাতেই কুপ, নলকুপ কিংবা পুকুর খননকালে যে কালো কাদামাটি দৃষ্টি গোচর হয়, সেই কাদামাটির ধরণ অনেকটা নদী তলদেশের মাটির মত। অপর যে যুক্তিটি এতদঞ্চলের জলাশয়ের বিষয়টিকে যুক্তিগ্রাহ্যা করে তুলতে সহায়ক ভূমিকা রাখে তা হচ্ছে, জেলর প্রবীণ লোকজন তাদের পিতামহ প্রপিতামহদের বক্তব্যের সুত্র ধরে যে তথ্য উপস্থাপন করেন তাতে জেলার আদিতে জলাশয়ের আধিক্য এবংস্থলভাগের স্বল্পতার কথারই প্রমাণ মেলে।

বর্তমান গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ থানা এলাকার পুর্বাংশসহ সমগ্র জেলার মাটিরে ধরণ হচ্ছে নদীবাহিত পলিমাটি। নদীবাহিত পলিমাটি দ্বারা কালক্রমে ভরাট হয়ে যাওয়া নিম্নভূমি এবং ভুমিকম্পের ফলে গড়ে উঠা স্থলভূমিতেই যে গাইবান্ধা জেলা গড়ে উঠেছে সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়। এ ব্যাপারে যে জনশ্রুতি রয়েছে, তা থেকেও এ ধারনার যথার্থতা মেলে। জনশ্রুতি রয়েছে যে আদিতে তিস্তামুখ ঘাট এর অবস্থান ছিল তুলশীঘাটের কাছে। সেখান থেকে জামালপুর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বিশাল নদী। অপরদিকে গোড়াঘাট পর্যন্ত ১৮ মাইল দুরত্বের চলাচল ছিল একমাত্র নদীপথে। বলা হয়ে থাকে ভূমিকম্পের ফলে তুলশীঘাট ও দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থানার নদীপথটি ভরাট হয়ে স্থলভাবে পরিণত হয়েছে। এখানে একটি বিষয়ে কিছুটা যুক্তির ছোঁয়া পাওযা যায়। সেটা হচ্ছে আমরা এখন রেলওয়ের যেফেরী ঘাটকে তিস্তামুখ ঘাট হিসাবে আখ্যায়িত করছি তা প্রকৃতপক্ষে তিস্তা নদীর মখ নয়, বরং যমুনা নদীতে অবস্থিত। রেলের ফেরীঘাটের তিস্তা মুখ ঘাট নামকরণে একথার প্রমাণ মেলে যেতিস্তা নদী যেখানে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছিল সেখানে রেলফেরীঘাট স্থাপিত ছিল বলেই ঘাটের নামতিস্তা মুখ ঘাট রাখা হয়েছিল। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর গতিপথ যে পরিবর্তিত হয়েছে তা নদীর বর্তমান অবস্থান থেকে প্রমাণিত হয়। এ প্রসংগে আরেকটি তথ্য বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট। দিনাজপুরের ইতিহাস গ্রন্থে মোশাররফ হোসেন উল্লেখ করেছেন যে, ১৮০৭ খৃষ্টাব্দের শুরুতে করতোয়া নদী বিরাট রাজা ও রাজা ভগদত্তের সীমানা নির্ধারক নদী ছিল বলে ঐতিহাসিক বুকানন তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এ তথ্য থেকে ধারণা করা যায় করতোয়া অত্যন্ত বিশাল নদী ছিল। এ নদী গাইবান্ধা ঐতিহাসিক বিরাট এলাকা থেকে কামরুপের রাজা ভগদত্তের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে ঐ তথ্যে বলা হয়েছে। আদিকালের কামরুপ এলাকা ধরা হয় আসাম থেকে ময়মনসিংহ জেলা পর্যন্ত। এ থেকেই গাইবান্ধা জেলার ভূখন্ডের কোন অস্তিত্ব ধরা পড়ে না।

মোঘল সম্রাট আকবরের সভা পন্ডিত আবুল ফজল প্রণীত ‘আইন-ই-আকবরী’ নামক গ্রন্থে আকবরের শাসন পদ্ধতি ছাড়াও তাঁর শাসনমালে রাজ্যের সীমানা এবং মহালসমুহের বিবরণ পাওয়া যায়। আই-ই-আকবরী গ্রন্থে ঘোড়াঘাট সরকারের আওতাধীন যে ৮৪টি মহলের বিবরণ রয়েছে তাতে গাইবান্ধা নামে কোন মহালের নাম নেই। অবশ্য সেখানে নামান্তরে বালকা (বেলকা), বালাশবাড়ী (পলাশবাড়ী), তুলশীঘাট, সা-ঘাট (সাঘাটা), বেরী ঘোড়াঘাট, কাটাবাড়ি আলগাঁ ইত্যাদি নাম দেখা যায়। এ থেকে বলা যায় ষোড়শ শতাব্দীতেও গাইবান্ধা কোন উল্লেখযোগ্য ভুকন্ড হিসাবে পরিগণিত হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীরও আগে থেকে ঘোড়াঘাট ছিল একটি উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক কেন্দ্র।

আদি ভবানীগঞ্জ থেকে গাইবান্ধা:ইংরেজি গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস তার শাসনামলে রংপুর জেলা কালেক্টরেটের আওতায় ১৮৯৩ সালে ২৪ টি থানা প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান গাইবান্ধা এলাকায় সে সময় ৩টি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৭৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানা এবং ১৮৮ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে সাদুল্যাপুর থানা গঠিত হয়। দু’টি থানাই প্রতিষ্ঠিত হয় ইদ্রাকপুর পরগনায়। অপর থানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে পাতিলাদহ পরগনায় ৯৩ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে, ভবানীগঞ্জ মৌজায় ভবানীগঞ্জ থানা নামে। রংপুরের কালেক্টর ই-জি গ্লেজিযার এর ১৮৭৩ সালের রিপোর্টে এই তথ্য উল্লেখিত হয়েছে। উক্ত রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে যে, রংপুর জেলার সদর থেকে সাদুল্যাপুর থানার দুরত্ব ছিল ৩৮ মাইল, গোবিন্দগঞ্জ ৫৬ মাইল এবং ভবানীগঞ্জের দুরত্ব ছিল ৫৪ মাইল।

ইংরেজ শাসনামলে এতদঞ্চলে সংঘটিত সন্ন্যাস বিদ্রোহ, ফকির মজনু শাহ, দেবী চৌধুরানী, ভবানী পাঠকসহ নানা বিদ্যোহীরা তাদের তৎপরতা চালাতেন মুলত: ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীপথে। তদুপরি গাইবান্ধার পাশ্ববর্তী তুলশীঘাটের সাথে সিপাহী বিদ্রোহের কিছুটা সংযোগ ছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়। রতনলাল চক্রবর্তী রচিত বাংলাদেশে সিপাহী বিদ্রোহ’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে যে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় একদল বিদ্রোহী সিপাহী রংপুরের দিকে এগিয়ে আসছে খবর পেয়ে রংপুর ট্রেজারীর সম্পদ রক্ষার্থে তৎকালীন কালেক্টর ম্যাকডোনাল্ড ট্রেজারীর সমুদয় মালামাল ঘোড়ার বহরে করে ৪০ মাইল দুরে তুলশীঘাটের গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে রাখেন। তখন তুলশীঘাট নামক স্থানটি ঘর তুলশী গাছসহ বিভিন্ন গাছ-গাছালিতে পরিপুর্ণ ঘন জঙ্গল ছিল। আর তুলশী গাছের আধিক্যের কারণেই স্থানটির নাম হয়েছিল তুলশীঘাট। রংপুর জেলা থেকে এই সব এলাকার বিদ্রোহীদের তৎপরতা বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। সেজন্য প্রশাসনিক কারণে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীর ঘেষে ভবানীগঞ্জ থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে এই ভবানীগঞ্জ থানাতেই এতদঞ্চলের মধ্যে প্রথম ফৌজদারী শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ১৮৫৮ সালের ২৭ শে ভবানীগঞ্জ নামে এক মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাদুল্যাপুর ও ভবানীগঞ্জ থানা নিয়ে যাত্রা শুরু হয় মহুকুমা ভবানীগঞ্জের। ১৮২১ সালের ১৩ এপ্রিল গোবিন্দগঞ্জ থানা পাশ্ববর্তী বগুড়া জেলা অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ১৮৭১ সালের ১২ ই আগস্ট গোবিন্দগঞ্জ থানা বগুড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভবানীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়। পর্যায়ক্রমে সাঘাটা, ফুলছড়ি, পলাশবাড়ী এবং সর্বশেষে ১৮৭০ সালে সুন্দরগঞ্জ থানা ভাবানীগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৮৭২ সালের প্রথম দিক থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর পুর্বপাড় জুড়ে ভবানীগঞ্জ মহকুমা এলাকায় ব্যাপক নদী ভাংগন শুরু হয় এবং মহকুমা শহর স্থানান্তরিত করা একান্ত অপরিহর্য হয়ে পড়ে। অন্যদিকে রেললাইন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হলে যোগাযোগের সুবিধার্থে রেল লাইনের কাছাকাছি ভবানীগঞ্জ মহকুমা শহর স্থানান্তরের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

ভবানীগঞ্জ মহকুমা পাতিলাদহ পরগনায় স্থাপিত হলেও মহকুমার পশ্চিমাংশ অর্থাৎ বর্তমান গাইবান্ধা শহর এলাকা ছিল বাহারবন্দ পরগনায় এবং এই দুই এলাকা ছিল দুইজন প্রতিদ্বন্দি জমিদারের আওতাধীন। ভবানীগঞ্জ মহকুমায় ফৌজদারী শাসন ব্যবস্থার আওতায় মহকুমা সদরে ভবানীগঞ্জের জমিদারের এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ফৌজদারী আদালত। নদী ভাংগান মারাত্মক আকার ধারণ করায় ১৮৭৫ সালের শেষ দিকে পাতিলাদহ পরগনার ভবানীগঞ্জ মৌজা থেকে ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে রাজা বিরাটের কথিত গো-শালা ও গো-চরনভুমি হিসাবে পরিচিত গাইবান্ধা নামকস্থানে মহকুমা সদর স্থানান্তর করা হয়।

ভবানীগঞ্জে মহকুমা থাকাকালীন সেখানে প্রশাসনিক সদর দপ্তর, ডাকঘর, ফৌজদারী আদালত, জেলখানা এবং হাসপাতাল থাকলেও দেওয়ানী আদালত সে সময়ে ছিল মুক্তিপুর পরগনাধীন বাদিখালীতে। ভবানীগঞ্জ মহকুমা সদর থেকে বাদিয়াখালীর দুরত্ব ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ১০ কিলোমিটার। পাতিলাদহ এবং মুক্তিপুর পরগনার দুই জমিদারের আভিজাত্যের লড়াইয়ের কারণেই মহকুমা সদর থেকে এতদুরে দেওয়ানী আদালত প্রতিষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। ভবানীগঞ্জ মহকুমা সদর এলাকা ছিল মুলত: এই অঞ্চলের তিন জমিদারের জমিদারীতে। ভবানীগঞ্জসহ পাতিলাসহ পরগণাভুক্ত এলাকা ছিল ঠাকুর পরিবারের জমিদারীতে। বলা হয়ে থাকে এই ঠাকুর পরিবারের প্রসন্ন ঠাকুর ছিলেন কবি রবীন্দ্রণাত ঠাকুর পরিবারের শরীক। পাবনা জেলার কুঠিবাড়ী যেমন ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদে জমিদারী, তেমনি এই পাতিলাদহ পরগনার জমিদারী লাভ করেন প্রসন্ন ঠাকুরের পরিবার। অন্যদিকে বাহারবন্দ পরগনার অংশটি ছিল কাশিম বাজারের কৃষ্ণ নাথের স্ত্রী মহারানী স্বর্ণময়ীর আওতাধীন জমিদার মনীন্দ্র নন্দীর জমিদারীতে। আর মুক্তিপুর পরগণার অংশটুকু ছিল থানসিংহপুরের জমিদার লাহিড়ী পরিবারের অধীন। তাই ভবানীগঞ্জে ঠাকুর পরিবারের জমিদারীতে মহকুমা সদরসহ ফৌজদারী কোর্ট স্থাপিত হলে থানসিংহপুরের জমিদার ইংরেজ সরকারের সাথে যোগাযোগ করে দেওয়ানী আদালতটি তাদের জমিদারী এলাকা মুক্তিপুর পরগনাধীন বাদিয়াখালীতে স্থাপন করেন।

১৮৭৫ সালে নদী ভাঙ্গন কবলিত ভবানীগঞ্জ এলাকা থেকে মহকুমা সদর যখন গাইবান্ধা নামক স্থানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখনভবানীগঞ্জের জমিদার ঠাকুর পরিবার এবং থানসিংপুরের জমিদার লাহিড়ী পরিবারের মধ্যে চরম দ্বন্দ্বের সৃস্টি হয়। উভয় জমিাদর তাদের নিজ নজি জমিদারীতে নতুন মহকুমা সদর স্থাপনের প্রচেষ্টা চালান।

কিন্তু সে সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবি এবং করনীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্যোগে ১৮৭৫ সালে মহারানী স্বর্ণময়ীর দান করা বাহারবন্দ পরগণার গাইবান্ধা নামক স্থানে মহকূমার নতূন প্রশাসনিক ভবন ও আদালত ভবন প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাদীয়াখালী থেকে দেওয়ানী আদলত নব-নির্মিত প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তরিত হয় । এদিকে ভবানীগঞ্জ মৌজাটি ব্রক্ষপুত্রের ভাংগনে বিলীন হতে শুরু করলে মহকূমার নাম পরিবর্তন করে গাইবান্ধা মহকূমা নামকরন করা হয়। তবে মহুকূমার নাম পরিবর্তন এর ক্ষেত্রেও তিন জমিদারের আভিজাত্যের লড়াই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে বলে অনেকেই মনে করেন ।

নতুন নামে, নতুন স্থানে গাইবান্ধ। মহকুমার গোড়াপত্তন হবার পর শহরাঞ্চল গড়ে উঠতে শুরু করে। ১৯০১ সালে গাইবান্ধা মহকুমা শহর এলাকার আয়তন ছিল ২-৩৩ বর্গমাইল এবং শহরের লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ১,৬৩৫ জন। গাইবান্ধা শহরের গোড়া পত্তনের পর ধীরে ধীরে জনসংখা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ১৯২৪ সালে শহর এলাকার জনসংখ্য। বেড়ে দাড়াঁয় ৮ হাজারে । ১৮৭৫ সালে মহকূমা শহর ভবানীগঞ্জ থেকে গাইবান্ধায় স্থানান্তরের সময় মহকুমা প্রশাসক ছিলেন দেলওয়ার হোসেন। আশির দশকে মহকূমা গুলোতে জেলায় রুপান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে ১৯৮৪ সালের ১৫ ই ফেব্রুযারী গাইবান্ধা মহকূমাও জেলায় রুপান্তরিত হয়।

বর্ধন কূঠি প্রসংগ:গাইবান্ধার ইতিহাসের সাথে গোবিন্দগঞ্জের বর্ধনকূঠি রাজবংশের সমৃদ্ধ ইতিহাস আলোচনা করা একান্ত অপরিহার্য। ইদ্রাকপুর পরগনা ছিল এতদঞ্চলের মধ্যে এক বিশাল পরগণা। এই পরগণার সদর দপ্তর ছিল গোবিন্দগঙের বর্ধন কুঠিতে। চতুর্দশ শতকের গোড়ার দিকে রাজা নারায়ণ ছিলেন দেব বংশীয় এবং নিরাজগঞ্জের তাড়াশের জমিদার বংশের লোক । রংপুরের কালেকটর গুডল্যাড সাহেবের ১৭৮১ সালের ইদ্রাকপুর সম্পর্কিত রিপোর্ট থেকে জানা যায় রাজেন্দ্র নারায়ণ থেকে আর্যাবর পর্যন্ত ১৪ জন জমিদার বা রাজা বর্ধনকূঠির শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তারপর আর্যাবরের পুত্র রাজা ভগবান এবং তার পুত্র রাজা মনোহর বর্ধন কুঠিয় দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।  রাজা মনোহন নাবালক পুত্র রঘুনাথকে রেখে মৃত্যূবরণ  করলে বাংলার সুরেদার শাহ সুজার আমলে মধুসিংহ নামে পার্শ্ববতী এক জমিদার বর্ধনকুঠির পাচঁ আনা অংশ দখল করে নেন। পরে ১৬৬৯ সালে মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব মধুসিংহকে উচ্ছেদ করে রঘুনথকে জমিদারী ফরমান দেন। আওরঙ্গজেবের এই সনদ মোতাবেক রংপুর মাহীগঞ্জ, স্বরুপপুর (রংপুর-সৈয়দপুরের মধ্যবর্তি স্থান) এবং দিনাজপুর  জেলার পলাদশী নামের পরগনা গোবিন্দগঞ্জের এই বর্ধনকূঠির আওতায় আসে। ১৯৪৭ সালে ইতিহাস খ্যাত বর্ধন কূঠির সর্বশেষ রাজা শৈলেশ চন্দ্র ভারতে চলে যান। বর্ধন কূঠিরে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্তসাগর, দূধসাগর, সরোবর নামের বিশাল ধ্বংসাবশেষ, গোবিন্দগঞ্জ ডিগ্রী কলেজ এলাকায় এখনও বিদ্যমান রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় সংরক্ষণের অভাবে এবং কলেজ কতৃক ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ বিনষ্ট করে নতুন ভবন নির্মাণ করায় অতীতের স্মৃতির ঐতিহাসিক চিহ্ন সমূহ এখন বিলুপ্ত প্রায়।

গাইবান্ধা নামকরণ প্রসংগঃজেলা শহরের বর্তমান অবস্থানের গাইবান্ধা নামকরণ ঠিক কবে নাগান হয়েছে তার সঠিক তথ্য এখনও পাওয়া যায় নি।  তবে রংপূরের কালেকক্টর ইজি, গ্লেজিয়ার ১৮৭৩ সালে যে রিপোর্ট প্রণয়ন করেছিলেন সেই রিপোর্ট গাইবান্ধা নামটি ইংরাজীতে লেখা হয়েছে এণঊইঅঘউঅ এবং সেই এণঊইঅঘউঅ  এর অবস্থান হিসেউেল্লেখ করা হয়েছে ঘাঘট পাড়ের কথা। এই ঘাটটই যে ঘাঘট নদী সেটা বলা যায়। রংপুরের গ্লেজিয়ার সাহেবের পূর্বে কালেকটর ছিলেন জেমস রেনেল। তার প্রণীত রেনেল জার্নালস থেকে জানা যায় ১৭৯৩ সালে উত্তর বঙ্গে  পুনভাব, ধরলা, তিস্তা, মানস এবং ঘাঘট খাল নৌ পরিবহনে সহায়ক ছিল। লেখা হয়েছে ঘাঘট খালে জানুয়ারী মাসেই বিরাট বিরাট নৌকা চলাচল করতো। জেমস রেনেল এবং ইজি গ্লেজিয়ার দুজন কালেক্টরের রিপোর্টেই অবশ্য ঘাঘটকে খাল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিক থেকে বোঝা যায় ঘাঘট নদী ১৭৯৩ সালেও সে সময়ের নদী গুলোর  চাইতে ছোট আকৃতির ছিল বলেই ঘাঘটকে খাল হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার এই তথ্য থেকে আরেকটা বিষয় বলা যায় যে, ১৭৯৩ সালেও মানস নদী ছিল। ঘাঘট নদীর মতই। অপর যে বিষয়টি এই দুটি তথ্য থেকে অবহিত হওয়া যায়, তা ১৭৯৩ সালে গাইবান্ধা নামটি উল্লেখযোগ্য ছিল না। ১৮৭৩ সালে ইজি গ্লেজিয়ার তার রিপোর্টে গাইবান্ধা নামটি উল্লেখ করেন । সম্ভবতঃ ১৭৯৩ সালের আগে ঘাঘট নদীর তীরবতী এই স্থানটি একটি পতিত ভূখভ এবং গোচারণ ভূমি হিসাবে ব্যবহৃত হতো। জনবসতি ছিল না বলেই রংপুরের কালেক্টদের রিপোর্টে গাইবান্ধা নামটি ১৮৭৩ সালের আগে উল্লিখিত হয়নি।

গাইবান্ধার নামকরণ সম্পর্কে দুটি কিংবদন্তী প্রচলিত আছো একঢি কিংবদন্তীতে বলা হয়েছে, পাচ হাজার বছর আগে মৎস্য দেশের রাজা বিরাটের রাজধানী ছিল গাইবান্ধার গোবিন্দগজ থানা এলাকায়। মহাভারতের কাহীনি বলা হয়েছে এই রাজা বিরাটের রাজসভায় পঞ্চ পান্ডবের দ্রৌপদীসহ ছদ্মবেশে তদের ১২ বছর নির্বাসনের পরবতী ১ বছর অজ্ঞাত বাস করেছে। অজ্ঞাত বাসকালে যুধিষ্টির কঙক নামে বিরাট রাজর পাশা খেলার সাথী হয়েছিলেন। আর ভীমের দায়িত্ব ছিল পাচকের কাজ করা এবং তার ছদ্মনাম ছিল বল্লভ। বিরাট রাজার মেয়ে রাজকন্যা। উত্তমার নাচ, গান ও বাদ্যযন্ত্র শিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অর্জুন বৃহন্নলা ছদ্মনামে। গোশালার দায়িত্বে ছিলেন সহদেব তন্তীপাল নামে এবং অশ্বশালার দায়িত্বে ছিলেন নকূল, তার ছন্দনাম ছিল গ্রন্থিক। আর বিরাট রাজার রানী সুদেষ্ণার গৃহপরিচারিকা হয়েছিলেন সৌরিনদ্রী নামে রৌপদী। বলা হয়ে থাকে এই বিরাট রাজার গো-ধনের কোন তুলনা ছিল না। তার গাভীর সংখ্যা ছিল ষাট হাজার। মাঝে মাঝে ডাকাতরা এসে বিরাট রাজার গাভী লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতো। সে জন্য বিরাট রাজা একটি বিশাল পতিত প্রান্তরে গো-শালা স্থাপন করেন। গো-শালাটি সুরক্ষিত এবং গাভীর খাদ্য ও পানির সংস্থান নিশ্চিত করতে। নদী তীরবর্তী ঘেসো জমিতে স্থাপন করা হয়। সেই নির্দিষ্ট স্থানে গাভীগুলোকে বেঁধে রাখা হতো। প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে এই গাভী বেঁধে রাখার স্থান থেকে এতদঞ্চলের কথ্য ভাষা অনুসারে এলাকার নাম হয়েছে গাইবাঁধা এবং কালক্রমে তা গাইবান্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে।

গাইবান্ধা নামকরন সম্পর্কে ভিন্ন মতও রয়েছে। কারণ গাইবান্ধা জেলার সাথে রাজা বিরাটের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে আজও প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থান যেমন হাতীবান্ধা, বগবান্ধা, চেংড়াবান্ধা, মহিষবান্ধা ইত্যাদি নামে জায়গা থাকায় মনে হয় গাইবান্ধা  নামটি খুব বেশী পুরানো নয়। রাজা বিরাটের সাথে সম্পর্ক থাক বা  না থাক গাইবান্ধা নামটি  যে গাভীর প্রাচুর্য এবং গাভী বেঁধে রাখার ব্যাপার থেকে এসেছে সে কথা ধারণা করা যায়। তবে মহাভারতের সেই রাজা বিরাট যে গাইবান্ধার রাজা বিরাট তার পক্ষেও উল্লেখযোগ্য কিছু যুক্তি রয়েছে। এ প্রসংগে মনূসংহিতার সংস্কৃত শ্লোকে বলা হয়েছে (মনূ ৭/১৯০)।

‘‘কুরুক্ষেত্রাংসচ মৎস্যাংসচ পঞ্চামান, শুরেসেন জান দীর্ঘণ লঘূংশ্চৈব নরামু গ্রীনীকেষু যোধয়েৎ’’ এই শ্লোগানটিতে বলা হয়েছে যে মৎস্যাদি দেশের লোকেরাই রণক্ষেত্রে অগ্রগামী হয়ে যুদ্ধ করত। মহাভারতের বিরাট পর্বে  যে মৎপীদেশের কথা বলা হয়েছে এবং বিশ্ব কোষের অষ্টাদশ ভাগের ৬৯০ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত মনুরবচন অনুসারে রাজা বিরাটকে মৎস্যদেশ অর্থাৎ মাছ প্রধাণ এবং নদীমাতৃক দেশ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেদিক থেকে এই উপমহাদেশের নদীমাতৃক এবং মাছ প্রধান এলাকা বলতে বাংলাদেশের এই অঞ্চলকেই বুঝায়। নরেন্দ্রবসু প্রণীত বিশ্ব কোষের অষ্টাদশ খন্ডে রাজা বিরাট সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে ‘‘ঁবরেন্দ্র খন্ডের মধ্যবতী উক্ত বিরাট নামক প্রাচীন জনপদ গাইবান্ধার অন্তর্গত গোবিন্দগজ থানার করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে ৬ মাইল দুরে অবস্থিত। উক্ত বিরাট ঘোড়াঘাটের আলীগাও পরগণার অন্তর্গত। খৃষ্টীয় দশম শতাব্দীতে ঢাকা নগরিতে বাংলার রাজধানী স্থাপিত হলে ঘোড়াঘাটের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে থাকে এবং সমৃদ্ধ জনপদ ক্রমে নিবিড় অরণ্যে পরিণত হয়। এই সময় বিরাট নামক স্থানে প্রভাবশালী রাজার প্রাসাদ ছিল। এখনে যে সকল ইটের স্ত্তপ দেখা যায় সেটি দেখে মনে হয় রাজধানীটি চতূর্দিকে একেবার ক্ষূদ্রপরিখা বেষ্টিত হবার পর আরেকটি বৃহৎ পরিখা বেষ্টিত ছিল এবং নগরীর মধ্যে ছিল অনেক ভলো ছোট বড় জলাশয়।

রাজা বিরাট প্রসংগে মোশাররফ হোসেন প্রণীত ‘দিনাজপুরের ইতিহাস’ গ্রন্থের ১০ পৃষ্টায় ঐতিহাসিক বুকাননের উদ্বৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘১৮০৭ সালে করতোয়া নদী রাজা ভগদত্ত এবং বিরাট রাজার রাজ্যের অভিন্ন সীমানায় ছিল। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী রাজা ভগদত্ত কমরুপের রাজা ছিলেন। সেই সময় বিরাট রাজার দেশ মৎস্যদেশ নামে পরিচিত ছিল। নদীসমুহ মৎস্যবহুল হওয়ার জন্য এই নামকরণ করা হয়েছিল বলে ধারনা করা যায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বিরাট রাজা পান্ডবদেরপক্ষ অবলম্বন করেন এবং পুত্রসহ নিহত হন। ‘‘ হিন্দু পঞ্জিকা’’ মতে খৃষ্টপুর্ব ৩২০০ অব্দে এই যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। মহাভারতের বর্ণনানুসারে জানা যায় এই যুদ্ধের পুর্বে মৎস্যদেশের সাথে পান্ডবদের যোগযোগ ছিল।

উল্লিখিত তথ্য গাইবান্ধার রাজা বিরাটের প্রাচীনত্ব এবং মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এবং পঞ্চ পান্ডবদের এখানে অবস্থানের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে। এছাড়া ১২৬৮ সালে প্রকাশিত কালীকমলা শর্মা রচিত ‘‘বগুড়া মেতীহাস বৃত্তান্ত’’ নামক গ্রন্থের ৪র্থ অধ্যায়ে মহা ভারতের সেই মৎস্যদেশ সম্পর্কে উল্লেখ আছে ‘‘ মৎস্যদেশের নামের পরিবর্তন লইয়া এই ক্ষণে এই স্থানে জেলা সংস্থাপিত হইয়াছে। উত্তর সীমা রংপুর জেলা, দক্ষিণ-পুর্ব সীমা দিনাজপুর জেলা। বগুড়া হইতে ১৮ ক্রোশ অন্তর ঘোড়াঘাট থানার দক্ষিণে ৩ ক্রোশ দুরে ৫/৬ ক্রোশ বিস্তীর্ণ অতি প্রাচীণ অরণ্যানী মধ্যে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল। তৎপর পুত্র ও পৌত্রগণ ঐস্থানে রাজ্য করিলে পর ১১৫৩ অবন্দে যে মহাপ্লাবন হয় তাহাতে বিরাটের বংশ ও কীর্তি একেবারেই ধ্বংস হইয়া যাওয়ার পর ক্রমেক্রমে ঐ স্থান মহারণ্য হইয়া উঠিল। যখন এ দেশের আদ্যপান্ত তাবৎ লোকেই ঐ স্থাকে বিরাটের রাজধানী বলিয়া আসিতেছে। আর কীচক ও ভীমের কীর্তি যখন ঐ স্থানে অনতিদুরেই আছে আর মৎস্যদেশ যখন বিরাট রাজার রাজ্য ছিল, ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য কোন স্থানকে মৎস্য দেশ বলেনা তাখন ঐ স্থানে বিরাট রাজার রাজধানী ছিল তার অন্যথা প্রমাণ করে না। অতএব একথা বলা যায় বিরাট এলাকাটি অত্যন্ত প্রাচীন। এই প্রাচীন এলাকাটি কালীকমল শর্ম্মার মতে ১১৫৩ অব্দের মহাপ্লাবনে প্লাবিত হয়ে নদীগর্ভে তলিয়ে যায় এবং প্রাকৃতিক কারণে আবার তা নদীতলদেশ থেকে উত্থিত হয়। তবে রাজা বিরাটের গোচারণ ভূমির সাথে গাইবান্ধা নামকরণের সম্পর্ক যদি নাই থাকবে তবে রাজা বিরাটের এই কিংবদন্তীটি লোকমুখে এত ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলোই বা কেন? যুক্তিহীন বা ভিত্তিহীন কোন বিষয়ের এত ব্যাপক প্রচার কোনক্রমেই সম্ভব নয় বলে ধারণা করা যায়। সুতরাং আমরা বলতে পারি গাই (গরু/গাভী) বাঁধা থেকে এলাকার নামকরণ হয়েছে গাইবান্ধা। তবে এই গাইবান্ধার ব্যাপারটি রাজা বিরাটের না হয়ে জমিদার ভগদত্তের গোয়ালঘর বা গো-শালার নামানুসারে এলাকর নাম ‘‘ গাইবান্ধা’’ হয়েছে বলেও মনে করা হয়।

তথ্যসূত্র : http://www.gaibandha.gov.bd