Golden Bangladesh
সৌরচালিত হেলিকপ্টার

সৌরচালিত হেলিকপ্টার

ডিসকভারি চ্যানেল বলছে, বিশ্বের প্রথম সৌরচালিত হেলিকপ্টার। আর এই ‘সোলারকপ্টার’ উদ্ভাবনী দলের পুরোভাগে ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হাসান শহীদ। লন্ডন থেকে বিস্তারিত জানাচ্ছেন উজ্জ্বল দাশ
লন্ডন, ইংল্যান্ড। ২০১৩ সালের মার্চ মাসের ঘটনা। কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে অভিনব এক পরীক্ষার প্রথম দিন। জ্বলে উঠেছে গবেষণাগারের হ্যালোজেন বাতি। সবার মধ্যে টান টান উত্তেজনা। কী হয় দেখার। ঘুরতে শুরু করল সোলারকপ্টারের চারটি পাখা। সব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উড়তে শুরু করে সোলারকপ্টার!
হাসান শহীদের মন্তব্য, ‘সেদিনের অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না।’ হ্যাঁ, পুরোপুরি সৌরচালিত হেলিকপ্টারের প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নের দিনটা ছিল এ রকমই উত্তেজনাপূর্ণ। আর এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে কাজ করে যাওয়া কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী হাসান শহীদ। কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের কামরায় বসে সোলারকপ্টার প্রকল্পের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হাসান শহীদ শোনাচ্ছিলেন এর শুরুর গল্প। 

স্বপ্নের উড়োযান
হাসান শহীদ বলছিলেন, হেলিকপ্টার নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে গবেষণা করছি, সেখান থেকেই সৌরচালিত হেলিকপ্টারের ভাবনা মাথায় আসে। সৌরচালিত বিমান ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে, তাহলে হেলিকপ্টার নয় কেন? আশা ছিল, সাধারণ হেলিকপ্টারের যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা আমরা জয় করতে পারব।
২০১১ সালে হাসান শহীদের তত্ত্বাবধানে ইরাকি ছাত্র আলী আবিদালী সোলার হেলিকপ্টার নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। মডেল সোলার হেলিকপ্টারটি কোনো সমস্যা ছাড়াই আকাশে উড়তে সক্ষম হয়। সহজে এর গতি নিয়ন্ত্রণও করা যেত। কিন্তু সমস্যা ছিল শুধু সৌরশক্তির মাধ্যমে এটি চলতে পারত না, ব্যাটারির সহায়তা নিতেই হতো।
হাসান শহীদ বলছিলেন, ‘এরপর শুরু করি সবাই মিলে কাজ, সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছার সাধনা। চ্যালেঞ্জ ছিল ব্যাটারি বা অন্য কোনো জ্বালানি ছাড়া শুধু সৌরশক্তি দিয়ে হেলিকপ্টার চালানো। এদিকে আরও উন্নয়ন ঘটাতে সোলার হেলিকপ্টার প্রকল্প মাস্টার্স পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। উদ্ভাবক দলে যোগ দেন আরও ছয়জন ছাত্র। আমার সঙ্গে সহতত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আসেন অধ্যাপক অ্যান্টোনিও মুনজিয়া।’
এই উদ্ভাবক দলের ধ্যানজ্ঞান বলতে গেলে ছিল একটাই। শুধু সূর্যের আলো দিয়ে হেলিকপ্টার ওড়ানো। গবেষণা আর কম্পিউটারে ডিজাইন চলতে থাকে একসঙ্গে।
‘রোমাঞ্চকর একটা সময় পার করছিলাম আমরা। ভেবে দেখুন সফল হলেই তা হবে বিশ্বের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির জন্য যুগান্তকারী এক পদক্ষেপ।’ শহীদ বলছিলেন।
কাজের অগ্রগতি, সমস্যার খুঁটিনাটি এবং উত্তরণের উপায় খোঁজার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে অভিযান। হালকা, মজবুত আর কম শক্তি ব্যয়—এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে চূড়ান্ত হয় ডিজাইনটি। পাঁচ মাসের অক্লান্ত চেষ্টায় তৈরি হয় এক কেজির কম ওজনের স্বপ্নের সৌরচালিত হেলিকপ্টার, যার নাম ঠিক হয় সোলারকপ্টার।
সোলারকপ্টারটি ওড়ার ক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য তৈরি করা হয় হ্যালোজেন ল্যাম্পের সমন্বয়ে তৈরি সান সিমিউলেটর। দূরনিয়ন্ত্রকের (রিমোট কন্ট্রোল) মাধ্যমে অপারেশন শুরু করতেই ঘুরতে থাকে হেলিকপ্টারের চারটি পাখা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওপরে উঠে আসে সোলারকপ্টার!
সোলারকপ্টারের বাহ্যিক আদল মোটেও আমাদের চেনা হেলিকপ্টারের মতো নয়। হাসান শহীদ ব্যাপারটা বোঝালেন সহজ করে। গতানুগতিক হেলিকপ্টারে সাধারণত প্রপেলার বা পাখা থাকে দুটি। একটি ওপরে এবং অন্যটি লেজের দিকে অথবা দুটিই ওপরের দিকে। সোলারকপ্টারে কেন্দ্র থেকে সমান দূরত্বে চার কোনায় প্রপেলার রয়েছে চারটি। এ ধরনের হেলিকপ্টারকে বলা হয় কোয়াডরোটর বা কোয়াডকপ্টার। সূর্য থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ শক্তি পাওয়া নিশ্চিত করতেই সোলার হেলিকপ্টারের এই ভিন্ন গঠন। ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আসবে সোলার হেলিকপ্টারের ডিজাইনে।
গিজম্যাগ, ডিজাইনবুমসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি নামকরা প্রযুক্তিবিষয়ক ম্যাগাজিনে সোলারকপ্টারের খবর প্রকাশিত হয়। বিশ্বখ্যাত ডিসকভারি চ্যানেলের ‘ডেইলি প্লানেট শো’ অনুষ্ঠানে সোলারকপ্টারের ওপর প্রচারিত হয় একটি প্রতিবেদন। সেখানে সোলারকপ্টারকে ‘বিশ্বের প্রথম সৌরচালিত হেলিকপ্টার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

দ্য সোলারকপ্টার টিম

সোলারকপ্টার দলের একেকজন ভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। যেমন: সৌরশক্তির বর্তমান অবস্থা এবং সোলারকপ্টারের জন্য কী ধরনের সোলার সেল ব্যবহার করা যেতে পারে তা নিয়ে গবেষণা করেছেন শাকির আহমেদ, আকার ও কাঠামো নিয়ে গবেষণা করেছেন কাজিমিরেজ ওজোওদা। সোলারকপ্টারের জন্য কী ধরনের উপাদান ব্যবহার উপযোগী হবে সে গবেষণার দায়িত্ব ছিল জিবরান আহমেদের ওপর। আলী আবিদালী কাজ করেছেন সোলার প্যানেল তৈরি এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
সোলার হেলিকপ্টার উদ্ভাবনী দলের অন্যতম সদস্য শাকির আহমেদ একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তিনি বলছিলেন, ‘একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে আমরা প্রকল্পের পুরো সময়টা পার করেছি। আমাদের প্রকল্পের মূল তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন হাসান শহীদ। তাঁর নেতৃত্বে আমরা গবেষণায় সফল হই।’
মুঠোফোনে কথা হয় দলের আরেক সদস্য জিবরান আহমেদের সঙ্গে। সোলারকপ্টার টিমের পক্ষ থেকে জিবরান ডিসকভারি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। জিবরান বলেন, ‘প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা আর সমস্যার সমাধানের চেষ্টা ছিল পুরো দলের। আশা করছি, ধীরে ধীরে আমাদের গবেষণা আরও পূর্ণতা পাবে। ড. হাসান আমাদের সাহস দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন।’

আমার আমি
বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জের ছেলে হাসান শহীদ। ছোটবেলা থেকেই খুব চটপটে। এটা-সেটা যন্ত্রপাতি ভেঙে পরীক্ষা করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের কর্ম। তবে বড় হয়ে শহীদ ভালো কিছু করবেন, সেই বিশ্বাস ছিল গ্রামের সবার! বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতে দুই পরীক্ষাতেই মেধাতালিকার ওপরের দিকে জায়গা ছিল তাঁর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অ্যাপ্লায়েড ফিজিকস, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম।
১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড ইউনিভার্সিটিতে পাড়ি জমান শহীদ। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল রোবটের হাত নিয়ন্ত্রণ। ২০০১ সালে পিএইচডি শেষ করে কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন হাসান শহীদ। এখন জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে রোবটিকস অ্যান্ড কন্ট্রোল, স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগে গবেষণা করছেন। সম্প্রতি ব্রিটেনের ১০০ প্রভাবশালী বাংলাদেশির (ব্রিটিশ বাংলাদেশি পাওয়ার অ্যান্ড ইন্সপিরেশন) তালিকায় উঠে এসেছে তাঁর নাম।
আপাত রসহীন বিষয় নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকা হাসান শহীদ একেবারেই রোবটিক নন। ব্রনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি গবেষণারত সহধর্মিণী মাহমুদা ফেরদৌসী জানালেন, তাঁর স্বামী কাজের বাইরে অন্য মানুষ। দুজনই গবেষক হওয়ায় তাঁদের বোঝাপড়াটা ভালো। তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়ে নুয়াইমা খুবই উচ্ছ্বসিত বাবার হেলিকপ্টার নিয়ে!
ব্যস্ততার মধ্যেই চলে বিজ্ঞান ও সমসাময়িক বিষয়ে লেখালেখির কাজ। সময় প্রকাশন থেকে ২০০৭ সালে তাঁর বই এলিয়েন: সম্ভাবনা ও সন্ধান এবং ২০০৮ সালে মহাবিস্ময়ের মহাকাশ প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ডের স্প্রিংগার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে যৌথভাবে লেখা তাঁর বই প্যারালাল কম্পিউটিং ফর রিয়েল-টাইম সিগন্যাল প্রসেসিং অ্যান্ড কন্ট্রোল।
হাসান শহীদ জানালেন তাঁর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কথা। নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এমন ক্যাপসুল রোবট তৈরি করতে চান তিনি। সোলারকপ্টারের মতো এ বিষয়ে তাঁর অন্য একটি মাস্টার্স পর্যায়ের প্রকল্প রয়েছে। এই ক্যাপসুল রোবট প্রকল্প এরই মধ্যে কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
হাসান শহীদ বিশ্বাস করেন, বিপুল সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম খুবই মেধাবী, তাঁদের দিয়ে অনেক অসম্ভবই সম্ভব হতে পারে।

কী কাজে লাগবে সোলারকপ্টার?

হাসান শহীদ বলছিলেন, ক্যামেরা এবং জিপিএস সিস্টেমের মতো ভার নিয়ে শুধু সূর্যের আলোর শক্তিতে সোলারকপ্টার ওড়ানোই তাঁদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। এটি সম্ভব হলে অপরাধ দমন, উদ্ধারকাজ, গোয়েন্দাবিষয়ক পর্যবেক্ষণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এসব কাজে আসবে সোলারকপ্টার। সুন্দরবনের মতো বড় বন বা সাহারার মতো মরুভূমিতে জীবজন্তুর বিচরণ পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ—এসব কাজে ব্যবহার করা যাবে। নির্মাণ খরচ কম হওয়ায় সোলারকপ্টারের চাহিদা বাড়বে দিন দিন। এমনও আশা করা হচ্ছে, একদিন গতানুগতিক চেহারার উড়োজাহাজের জায়গা নিতে পারে সৌরচালিত এই উড়োযান।

তথ্যসূত্র : প্রথম আলো