Golden Bangladesh
রাঙ্গামাটি জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

রাঙ্গামাটি জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নয়নাভিরাম হ্রদ আর প্রকৃতির রূপসীকন্যা রাঙ্গামাটি

শ্যামল দেব বর্মা
ঢাকা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রাতের শ্যামলী পরিবহন বাসে চড়ে রাঙ্গামাটির অভিমুখে যাত্রা করলাম। বাসের ভেতরে চলন্ত অবস্থায় জানালার পাশ দিয়ে শীতের ঠাণ্ডা বাতাস প্রবেশ করছে। ঠাণ্ডা থেকে রক্ষা পেতে শরীরে চাদর মুড়িয়ে নিলাম। ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি ৩৩৮ কি.মি. দূরে। মাঝে মধ্যে দুই চোখে ঘুম চলে আসে। তখন মনকে বুঝালাম যদি ঘুমিয়ে পড়ি তাহলে রাতের দৃশ্য হয়তো আর দেখতে পারব না। বাসের হর্ন মনে হচ্ছিল ঘুমের বিপরীতে। বাস কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে কিছুক্ষণ বিরতি দেয়ার পর আবার ছাড়ে রাঙ্গামাটির উদ্দেশে। চট্টগ্রামের পরে পাহাড়ের কাছে বাস থেকে রাস্তার ডানে-বামে রাঙ্গামাটি জেলার প্রবেশমুখে গেট দেখতে পেলাম। গেট দেখে আরও আগ্রহ বাড়ল রাঙ্গামাটি উপভোগ করার। গেট থেকে শুরু হল আঁকা-বাঁকা পাহাড়ি রাস্তা। রাতে জ্যোৎøার আলোয় সারা পাহাড়ের অরণ্য আলোকিত হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হল গাড়ি থেকে নেমে বন-পাহাড়কে মনভরে দেখার। রাতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই অভাবনীয়। যেতে যেতে পাহাড়ের প্রকৃতির গর্ভে হ্রদের জল দেখে লোভ আর সামলাতে পারিনি। আমাদের বাস রিজার্ভ বাজারে গিয়ে থামল, তখন ভোর রাত। রিজার্ভ বাজারে অসংখ্য হোটেল রয়েছে। আমি একটিতে উঠে পড়লাম। ভোরে উঠে হাঁটতে হাঁটতে রিজার্ভ বাজারমুখে শহীদ মিনারের পাশে দাঁড়িয়ে, পূর্ব দিকে তাকিয়ে হ্রদের জল আর বন পাহাড়ের নয়নাভিরাম প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য ও পাহাড়ে সূর্যের আবির্ভাব হওয়ার দৃশ্যটা আমাকে মুগ্ধ করল। শহীদ মিনারের পাশ থেকে সকালে হাঁটতে হাঁটতে ডিসি বাংলো উদ্যানে কিছুক্ষণ বসে হ্রদ ও পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করি। দৃষ্টিনন্দন পাহাড় অরণ্য আর হ্রদের দৃশ্যগুলো দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ডিসি বাংলো উদ্যানে প্রবেশের বাম পাশে একটি বিশাল আকৃতির চাপালিশ গাছ দেখে আশ্চর্য হলাম। এত বড় চাপালিশ গাছ কয়েকটি বন ঘুরেও চোখে পড়েনি। গাছের গায়ে বয়স ৩০০ বছর লেখা রয়েছে।
ডিসি বাংলো উদ্যান থেকে রিজার্ভ বাজারে ফিরে এসে সকালে নাস্তা করে রাঙ্গামাটির কয়েকজন আদিবাসী বন্ধুদের সঙ্গে পর্যটনে অটোরিকশা নিয়ে গেলাম। রাঙ্গামাটির হ্রদটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম হ্রদ। এর আয়তন ৭২৫ বর্গকি.মি.। ১৯৬০ সালে কাপ্তাই এ বিদ্যুৎ উৎপন্ন কেন্দ্র হিসেবে এ হ্রদটি নির্মাণ করা হয়েছে।
ঝুলন্ত সেতু বাস্তবে দেখা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। ঝুলন্ত সেতুর পাশে কিছুক্ষণ থেকে আমরা ইঞ্জিন বোট ভাড়া করে জলপথে রওয়ানা হলাম শুভলং জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে। স্বচ্ছ টলটলে পানির দৃশ্য আর রোদের আলোয় পানি ঝিকিমিকি করছে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা মনোরম পানির মধ্য দিয়ে শুভলং জলপ্রপাতে পৌঁছলাম। শীতের শুষ্কতায় জলপ্রপাত শুষ্ক ও রুক্ষ। তবে শুভলং জলপ্রপাতের দৃশ্যগুলো মন ভুলানোর মতো। শুভলং জলপ্রপাত থেকে ফিরে এলাম রাঙ্গামাটি শহরে। সন্ধ্যায় বনরূপা, তবলছড়ি ও রিজার্ভ বাজারে বেড়াতে নামলাম। সেখানে স্থানীয় আদিবাসীদের তাঁতে বোনা কাপড় নিজেদের জন্য কিনে নিলাম। রাঙ্গামটি শহর দেখতে খুবই সুন্দর । শহরের চারপাশে হ্রদের পানি আর পানি। তবে রাঙ্গামাটি শহরে কোন রিকশা নেই, আছে রিকশার বিকল্প সিএনজি। অল্প কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়ালে সিএনজি পাবেন। পরের দিন সকালে
নাস্তা ছেড়ে রাঙ্গামাটির রোমাঞ্চকর প্রিয় ও শৌখিন ফটোগ্রাফার রাজীব ত্রিপুরার সঙ্গে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে তার মোটরমাইকেলে চড়ে আমি ও রাজিব ত্রিপুরা বেড়াতে নামলাম। রাস্তার চারপাশে হ্রদের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ও আদিবাসীদের জুম চাষের দৃশ্য উপভোগ করার মতো। কাপ্তাই বাজারের কাছাকাছি গিয়ে আমরা ফিরে এলাম রাঙ্গামাটি শহরে।
হ্রদের জল আর পাহাড় অরণ্যেও অপার সৌন্দর্যের কোল ঘেঁষে রয়েছে প্রকৃতির রূপসী কন্যা রাঙ্গামটির রূপবৈচিত্র্য। নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করে রাতের বাসে ফিরে এলাম ঢাকায়। যারা এ অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাখেলা দেখতে চান বা উপভোগ করতে চান বা স্মৃতির পাতায় এই অপরূপ দৃশ্য বাঁধিয়ে রাখতে চান তারা দেরি না করে ঘুরে আসুন রাঙ্গামাটি।
কিভাবে যাবেন : ঢাকা সায়েদাবাদ থেকে রাঙ্গামাটি অভিমুখে অনেকগুলো গাড়ী যায়। চট্টগ্রাম বিআরটিসি বাস ও অক্সিজেন মোড় থেকে বাসে রাঙ্গামাটি যেতে পারেন। ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটির ভাড়া ৫৫০ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে রাঙ্গামাটি বাস ভাড়া ১০০ টাকা। থাকা-খাওয়ার জন্য অসংখ্য হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে। যে কোন একটিতে থাকতে পারেন খাবারও খেয়ে নিতে পারেন।

স্বপ্নের কাপ্তাই

মনির হোসেন
প্রায় ২৮ বছর আগের কথা। চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই যাচ্ছি। চন্দ্রঘোনা-লিচুবাগান-বরইছড়ি
পেরিয়ে উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তার বাঁ পাশে ঘন গাছে ভর্তি ছোট ছোট পাহাড়, ডানপাশে খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী; যেন কখনও কখনও মনে হয় রাস্তা আর নদীতীর একটাই। নদীর ওপারে আবারও ঘন বন, পাহাড়। রাস্তায় কোলাহল নেই, চারদিক শান্ত, নিরিবিলি। দেশের একমাত্র পানিবিদ্যুত্ কেন্দ্রের ছোট্ট এই শহরে প্রবেশের পর আরেক দৃশ্য। একদিকে কর্মব্যস্ত বাজার-জেটিঘাট-বিদ্যুেকন্দ্র-হ্রদ থেকে নদীতে মালামাল পারাপারের রোপওয়ে, অন্যদিকে ঘন সেগুন বনের ভেতর দিয়ে নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে যাওয়ার এক অসাধারণ নয়নাভিরাম রাস্তা। গাছে গাছে পাখপাখালির গান আর হালকা বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। এ তো স্বর্গ! স্কুল পেরিয়ে সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া তরুণের চোখে প্রথম দেখাতেই কাপ্তাইয়ের সঙ্গে প্রেম।
দীর্ঘদিন শুধু একটাই স্বপ্ন দেখে চলেছি। সেই সুনসান নীরব রাস্তার পাশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ছোট্ট একটা ঘর হবে, সেখানে বসে শুনব নদীর স্রোতের গান। কখনও পাখির গান শুনতে চাইলে ঢুকে পড়ব রাস্তার পাশের পাহাড়ি বনে। কখনওবা নদী পার হয়ে ঢুকে পড়ব গহিন বনে, গাছের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাব বহুদূর। বিকেলে নৌকা নিয়ে নেমে পড়ব হ্রদে, ভেসে বেড়াব ইচ্ছেমতো। আর বর্ষাকাল? সে তো আরও স্বপ্নময়! শ্রাবণের অঝোর ধারায় বৃষ্টির দিন বনের ভেতর কোনো ছোট্ট কুটিরের বারান্দায় বসে শুনব সেগুন পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার গান। হাতে থাকবে ধূমায়িত কফির পেয়ালা। সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। মাঝে-মাঝে দুয়েক দিনের জন্য কাপ্তাই গেছি, সেই প্রেম আরও বেড়েছে, তবে স্থায়ী পরিণয়ে রূপ পায়নি। কারণ মানুষের হাতের ছোঁয়ায় কাপ্তাই আরও রূপবতী হয়ে উঠেছে। আমি নিশ্চিত, সেখানে গেলে আপনিও কাপ্তাইয়ের প্রেমে পড়বেন।
কা প্তা ই
একে তো চট্টগ্রামের খুব কাছে, তার ওপর
ছোট্ট একটা উপজেলা শহর। তাই কাপ্তাইয়ে রাতে থাকার জন্য ভালো কোনো হোটেল নেই। তাই থাকতে চাইলে বনবিভাগ, বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থা, বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড, চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিল বা স্থানীয় প্রশাসনের রেস্টহাউসগুলোর কোনো একটিতে থাকার ব্যবস্থা করতে পারলে ভালো হয়। এজন্য ঢাকা থেকে অনুমতি নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে ভালো।
কাপ্তাই যাবেন কীভাবে? ঢাকা থেকে এস
আলম, শ্যামলী, মডার্ন ও ডলফিন পরিবহনের বাস সরাসরি কাপ্তাই যায়। ভাড়া নেবে ৪২০ টাকা। আর চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে ১৫ মিনিট পরপর ছেড়ে যায় কাপ্তাইয়ের লোকাল ও বিরতিহীন বাস। শাহ আমানত বিরতিহীন সার্ভিসে ভাড়া নেবে ৫০ টাকা।
সময় লাগবে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিলে চন্দ্রঘোনার পর বরইছড়ি পার হলেই আপনাকে স্বাগত জানাবে বনবিভাগের জাতীয় উদ্যান। রাস্তার দুই পাশে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে এই উদ্যানে আছে অবকাশযাপন আর বেড়ানোর অনেক উপাদান। ভারত উপমহাদেশে সোয়াশ বছর আগে প্রাকৃতিক বনে প্রথম পরিকল্পিতভাবে যেসব গাছ লাগানো হয়েছিল সেসবেরই কিছু এখনও দেখতে পাবেন কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে। এখানে আছে হরিণ, হাতি, বানর, বনবেড়ালসহ হরেক রকম বুনো প্রাণী। আছে নানা প্রজাতির পাখি। বনবিভাগ এখানে গড়ে তুলেছে পিকনিক স্পট, রেস্টহাউস।
জাতীয় উদ্যানের বাইরে রিভারভিউ পার্ক, গিরিনন্দিনী পিকনিক স্পট এবং প্রশান্তি পিকনিক ও অবসর বিনোদন স্পট। অবকাশের জন্য এই স্পটে আছে দুটি কটেজ, তবে রাতে থাকার ব্যবস্থা নেই।
এসবের পাশাপাশি নৌবাহিনী এবং বনশিল্প উন্নয়ন সংস্থাও পিকনিক স্পট গড়ে তুলেছে। প্যানোরামা ঝুম রেস্তোরাঁ গড়ে তুলেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। এখানে গাছের ওপর তৈরি করা পাখির ঘর
টুনি দেখে শিশুরা আনন্দ পাবে। আরও আছে অবকাশের জন্য কয়েকটি কটেজ।
কাপ্তাই গেলে অবশ্যই দেখবেন হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে মালামাল পার করার ছোট্ট
রোপওয়ে। বাঁধ দেওয়ার ফলে হ্রদ থেকে কোনো নৌযানই নদীতে যেতে পারে না। তাই রাস্তার ওপর দিয়ে রোপওয়ের মতো ক্রেনে হ্রদ থেকে ছোট ছোট নৌকা, বাঁশের ভেলা বা কাঠের গুঁড়ি নদীতে নেওয়া হয়।
দেশের একমাত্র পানিবিদ্যুত্ কেন্দ্রটি দেখতে চাইলে আপনাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি নিতে হবে। দু-একজন গেলে হয়তো বিদ্যুেকন্দ্রের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও এ অনুমতি পেতে পারেন। তবে এই বিদ্যুেকন্দ্রের
ট্রেডমার্ক হিসেবে টাকার ওপর যে স্লুইসগেটের ছবি দেখেন তার ওপর ওঠার অনুমতি পাবেন না। অবশ্য কখনও কখনও বিদ্যুেকন্দ্রের চিফ সিকিউরিটি অফিসারের মন নরম হলে সেই সুযোগও পেয়ে যেতে পারেন। কাপ্তাইয়ের পাশেই চিত্মরমে আছে বৌদ্ধমন্দির। সেটিও দেখে আসুন।
কাপ্তাইয়ে রাত না কাটিয়ে জেলা শহর রাঙামাটিতেও চলে যেতে পারেন, বিশেষ করে হ্রদের পাড় ঘেঁষে তৈরি হওয়া সড়ক দিয়ে। এ আরেক নয়নাভিরাম রাস্তা। চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে কাপ্তাই থেকে এক ঘণ্টায় চলে যাবেন রাঙামাটি। বিশাল কাপ্তাই হ্রদের টলটলে পানি থেকে মাঝেমধ্যেই ভেসে ওঠা ছোট ছোট দ্বীপ-পাহাড় দেখতে দেখতেও রাঙামাটি যেতে পারেন। কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে লঞ্চ বা ট্রলারে রাঙামাটি দুই ঘণ্টার পথ। রাঙামাটি গিয়ে কী দেখবেন? সেকথা অন্য একদিন।

রাঙামাটির পথে পথে

 

বেনু ভূষণ দাশ
প্রোগ্রামটি ছিল ডব্লিউএইও
র। আমি এক্সিকিউটিভ মনোনীত হলাম। আমার দায়িত্ব দুটি টিমকে সুপারভাইজড করা। বিকাল ৪টা ৫০ মিনিটে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে ননস্টপ সুবর্ণ এক্সপ্রেসে চেপে বসলাম। চট্টগ্রামের উদ্দেশে। রাত কাটিয়ে ভোরে বিআরটিসি কাউন্টারে উপস্থিত হলাম। টিকিট নিয়ে বাসে চড়ে বসলাম রাঙামাটির উদ্দেশে। এক ঘণ্টার মধ্যে চোখে পড়ল রাউজানের সুলতানপুর। আমার জন্য সুলতানপুর গ্রামটি অন্যরকম গুরুত্ব বহন করে। থাক সে প্রসঙ্গ। সেটা না হয় অন্য একদিন বলা যাবে। সকাল ৯টায় রাঙামাটির মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন পুরাতন বাস স্টেশনে পৌঁছলাম। সেখান থেতে টেক্সিতে সোজা মোটেল পর্যটন। ভোরের রাঙামাটির উজ্জ্বল সূর্যালোকে নৈসর্গিক রূপ দেখে আমার ভাষা রহিত হল। মনের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো এক্সিলেন্ট
রাঙামাটি মোটেল ও ঝুলন্ত সেতু :  রাঙামাটি শহরের শেষপ্রান্তে হ্রদের ওপর গড়ে উঠেছে পর্যটন কেন্দ্র। পর্যটন মোটেল পেরুলেই ঝুলন্ত সেতু। ঝুলন্ত সেতুতে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে দৃশ্যমান লেকের অবারিত জলরাশি ও দূরের উঁচু-নিচু পাহাড়ের আকাশছোঁয়া বৃক্ষরাজি। পর্যটন কর্পোরেশন ১৯৭৮ সালে মূল মোটেলটি নির্মাণ করে।
৮৬ সালে মোটেলের আধুনিক অডিটোরিয়াম ও ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করেন। ঝুলন্ত  সেতুটি ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ, ৮ ফুট প্রশস্ত এবং উভয় পাশে টানা তার দ্বারা বেষ্টিত। সেতুটির কারণেই  মোটেলের গুরুত্ব ও আকর্ষণ অনেকগুণ বেড়ে গেছে। দিনবদলের সঙ্গে সঙ্গে সেতুটি সিম্বল অব রাঙামাটি হিসেবে রূপ নিয়েছে। এখানে আরও রয়েছে কটেজ, পার্ক, পিকনিট স্পট, স্পিড বোট ও সাম্পান টাইপের নৌযান।
রাজবন বিহার : পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় তীর্থস্থান রাঙামাটির ঐতিহ্যবাহী রাজবন বিহার। চাকমারা অবশ্য বিহার বা মন্দিরকে কিয়াং বলে থাকে। এটি মূলত আমাদের  দেশের একটি প্রধানতম বৌদ্ধবিহার হিসেবে পরিচিত। রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের রাজবাড়ির পাশেই এর অবস্থান। ১৯৭৬ সালে রাজবন বিহার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থাবির (বনভান্তে) অধ্যক্ষরূপে বিরাজিত। ৩৩.৫ একর  বিস্তৃত বিহার এলাকায় ৪টি মন্দির, ভিক্ষুদের ভাবনা কেন্দ্র, বেইনঘর, তাবতিংশ স্বর্গ, বিশ্রামাগার ও হাসপাতাল রয়েছে। প্রতিবছর বিহারে কঠিন চিবরদান অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে যা দেশের আর কোন বৌদ্ধধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিরল।
শুভলং জলপ্রপাত : রাঙামাটির শুভলং জলপ্রপাত সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব সৃষ্টি। পাহাড়ি ঝরনার শীতল জলধারা শুধু মনুষ্যকুলকে কেন পাখি কুলকেও দুর্বিনীত আকর্ষণে আকর্ষিত করে। শুভলং ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব নৈসর্গিক সৃষ্টি। শুভলং ঝরনা ৩০০ ফুট উঁচু থেকে  বর্ষাকালে জল ধারার অবিরাম পতনে সৃষ্ট ধ্বনিসমেত। শুভলং ঝরনা রাঙামাটির বরকল উপজেলায় অবস্থিত। কালিট্যাং তুগ এই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। যার উচ্চতা প্রায় ১৮৭০ ফুট। এই শৃঙ্গের পাদমূলে বরকল উপজেলা কমপ্লেক্স অবস্থিত। এই পর্বতশৃঙ্গ হতে রাঙামাটি জেলা সদর এবং ভারতের মিজোরাম রাজ্যটি দৃষ্টিগোচর হয়। শুভলং ঝরনা ভিজিট করতে হলে রাঙামাটি সদরের তবলতৃড়ি বাজার থেকে নৌযানে ২ ঘণ্টায় সরাসরি শুভলং যেতে পারেন।

রাইক্ষ্যংয়ের উজান বেয়ে পানছড়ি

কাপ্তাই থকে ফারুয়া
গত মাসের শেষ ছুটিটায় অনেকের মতো আমিও ঢাকা ছেড়েছিলাম ৩ দিনের জন্য, যাত্রা রাঙামাটি। এটাই আমার প্রথম রাঙামাটি যাওয়া। তবে সাধারণত সবাই রাঙামাটির যেদিকটায় বেড়াতে যায় আমরা বিটিইএফ-এর দলটা সেদিকে না গিয়ে একটু অন্যদিকে গেলাম। ঢাকা থেকে বাস ছিল রাত ১২টায়। স্থান আরামবাগ। সকালে সরাসরি পৌঁছলাম রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে। ওখানে নেমে নাস্তা শেষে একটা ইঞ্জিন নৌকা নিলাম। সাধারণত আমাদের অধিকাংশ ট্যুরে দলটা বড় হওয়ায় বেশ কষ্ট করে যেতে হতো। কিন্তু এবার নৌকা বড়, আর আমরা মাত্র ১৩ জন। বেশ আরামেই হাত-পা ছড়িয়ে আমাদের মূল যাত্রা শুরু করলাম। এই ট্যুরে আমার সঙ্গে ছিল আমার নতুন কেনা ক্যাননের ৭০-২০০এল লেন্স। জানি, এই পাহাড়ি ট্যুরে ল্যান্ডস্কেপ তুলবে সবাই। ভালোও লাগবে ল্যান্ডস্কেপ। কিন্তু আমি তুলে নিলাম আমার নতুন টেলি লেন্স, কারণ দুটো এক নতুন লেন্সটার পারফরমেন্স পরীক্ষা করা আর দুই অন্যরকম কিছু ছবি তোলা। আর তাছাড়া পোর্ট্রেট তুলতে আমার সবসময়ই ভালো লাগে। ভালো লাগে, মানুষ আর তাদের অনুভূতিগুলো তুলে নিয়ে আসতে। যাই হোক, আমি লেগে গেলাম আমার ক্যামেরা আর নতুন লেন্স নিয়ে।
রাতে আমরা পৌঁছলাম ফারুয়া বাজারে। ওখানে একটা হোটেলে খেয়ে নিয়ে নৌকাতেই ঘুম।
ফারুয়া থেকে পানছড়ি
সকাল থেকে আকাশ অন্ধকার করা মেঘ নিয়ে আমাদের দ্বিতীয় দিনের শুরু। আমাদের নৌকা তখন ফারুয়া বাজারের ঘাটে। আমরা কয়েকজন নামলাম সকালের বাজারটা একটু ঘুরে দেখতে। ওইদিন ছিল ফারুয়া বাজারের হাট। সকাল থেকেই তাই মানুষের বেশ আনাগোনা। নদীতে মাছ ধরাও চলছিল তখন। এসব দেখতে দেখতেই শুরু হয়ে গেল ঝুম বৃষ্টি। ক্যামেরাটা বাঁচানোর জন্যই দ্রুত ঢুকে পড়লাম একটা দোকানে। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ?
বৃষ্টি কমার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না। শেষে রেইনকোটে ক্যামেরার ব্যাগটা জড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজে কোনওভাবে ফিরলাম নৌকায়। কিন্তু আমাদের মাঝি তার নৌকা নিয়ে আর সামনের দিকে এগুতে রাজি না। মাঝির মতে, এখন সামনের দিকে পানি কম, নৌকার প্রপেলর নদীর নিচে লেগে ভেঙে যেতে পারে। সুতরাং আমরা ছোট নৌকার খোঁজ শুরু করলাম। কিন্তু এই বৃষ্টিতে কিছুই পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই অপেক্ষা করে থাকতে হল বৃষ্টি থামার। সকালের নাস্তাটা সেরে নিলাম এর ফাঁকে ফারুয়া বাজারে। দুপুরের দিকে বৃষ্টি খানিকটা কমে এলে আমরা একটা ছোট নৌকা রাজি করাতে পারলাম। যখন ছোট নৌকার জন্য খোঁজাখুঁজি চলছে তার মধ্যেই আমরা ঘুরে এলাম ফারুয়া বাজারের ওপারের বৌদ্ধ মন্দির থেকে। বাজারটাও ঘুরলাম আরও খানিকটা।
এবার যেহেতু নৌকাও ছোট, তাই নিজেদের একেবারে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ছাড়া বাকি সব জিনিসপত্র রেখে দিলাম বড় নৌকায়। কিন্তু সে ছোট নৌকায় উঠে বুঝলাম এ নৌকায় আমাদের সবার জায়গা হবে না। সুতরাং আবার আরেকটা নৌকা খোঁজা শুরু এবং অবশেষে মাঝ দুপুরে আমরা দুইটা ছোট নৌকাতে করে কিছু খাবার নিয়ে আরও সামনে এগিয়ে চললাম।
বিকালে আমরা পৌঁছলাম চ্যাংড়াছড়িতে। ওখানেই আমাদের রাত কাটানোর কথা। এদিকে গতকাল থেকে আমাদের কারওই ভালোভাবে গোসল হয়নি, পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি ভীষণ ঘোলা। তবে আমরা কয়েকজন বৃষ্টিতে খানিকটা গোসল সেরে নিয়েছি। শুনলাম আরেকটু এগুলে সামনেই পানছড়িতে ঝরনা আছে একটা। আমরা চ্যাংড়াছড়ি ছেড়ে তাই আরও সামনে এগুলাম পানছড়ির দিকে। পানছড়ির ঝরনাটা পেলাম তবে তা আহামরি কিছু না, পাহাড় বেয়ে কলের পানির মতো পানি পড়ছে। আমরা সবাই ওই ঝরনাতেই আরাম করে গোসল করে নিলাম।

ঝরনার খোঁজ এবং ফিরে আসা
আগের দিন শুনেছিলাম কাছেই একটা ঝরনা আছে। হেঁটে গেলে ৩-৪ ঘণ্টা লাগতে পারে। তাই খুব ভোর বেলাতেই উঠলাম শেষদিন। আজ ফিরে যাব, তাই ফিরে যাওয়ার তাড়াটাও ছিল।
সকালে চা খেয়েই রওনা দিয়ে দিলাম ঝরনার পথে, কখনও পাহাড়, কখনও ঝিরি পথ ধরে। যেতে যেতে ছবি তোলা চলছিল বরাবরের মতোই।
খানিকটা গিয়ে প্রথমে একটা ঝরনা পেলাম, যেটা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে। ঝরনাটা সুন্দর, কিন্তু ওটাতে আরাম করে ভেজার মতো ছিল না, তাই আরও সামনে এগুলাম। কিন্তু সামনে গিয়েও যেটা পেলাম সে ঝরনার পানি পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসেনি, কিন্তু তাতে পানি খুবই কম। আমাদের গাইড জানালো আরও কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিলে আমরা বড় একটা ঝরনার কাছে যেতে পারব। কিন্তু আমাদের ফেরার তাড়া থাকায় আর এগুনোর পরিকল্পনা বাদ দিলাম। ওখানের ঝিরিতেই নেমে গেলাম। ঝিরির জলে গা ডুবিয়ে  স্রোত টান অনুভব করতে করতে গোসলটা সেরে নিলাম ওখানে।
ফিরে এসে আমাদের তাড়াহুড়ো বেড়ে গেল অনেক। নিজেরাই নুডুলস রান্না করে খেয়ে রওনা দিয়ে দিলাম। এর মধ্যে আবার আকাশ কালো করে এলো বৃষ্টি। কেউ কেউ আরেক দফায় ভিজে নিল বৃষ্টিতে। অবশেষে বিদায় নিয়ে ফারুয়ার দিকে রওনা হলাম আমরা।
ফারুয়াতে আমাদের বড় নৌকাটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা ফারুয়া বাজারে উঠে খেয়ে নিলাম। তারপর আবার রওনা কাপ্তাইয়ের পথে। গানের দল বিকালের আলোতে আবার গান শুরু করে দিল, গানের সঙ্গে সন্ধ্যা মিলিয়ে আসছে আর আমরা বকের ডানায় ভর করে বিদায় জানালাম পাহাড়গুলোকে।


তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24