Golden Bangladesh
নেত্রকোণা জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নেত্রকোণা জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

রোয়াইলবাড়ি দূর্গ

রোয়াইলবাড়ি দূর্গ: বাংলার প্রাচীন শাসনকর্তাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যমন্ডিত এক ঐতিহাসিক স্থান। একসময় কত ঘটনাই না ঘটেছে এ দূর্গে। বাংলার সুলতান হুসেন শাহ, নছরত শাহ এবং ঈশা খাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর ঠক ঠক শব্দে কিভাবেই না কেঁপেছে এই রোয়াইলবাড়ির মাটি; সে ইতিহাস আজ পুরোপুরি জানা না গেলেও তাঁদের অহংকার ও শৌর্য-বীর্যের সাক্ষী হয়ে আজো ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে প্রাচীন দূর্গটি।

জানা গেছে রোয়াইল একটি আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থ ক্ষুদ্র অশ্বারোহী বাহিনী। সুতরাং রোয়াইলবাড়ি এর অর্থ দাঁড়ায় অশ্বারোহী বাহিনীর বাড়ি। কালক্রমে রোয়াইলবাড়ি এখন একটি পুরো গ্রাম এবং সমগ্র ইউনিয়নের নাম। নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। রোয়াইলবাড়ি দূর্গের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেতাই নদী। ঈশা খাঁর স্মৃতি বিজড়িত আরেক ঐতিহাসিক স্থান কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উজেলার জঙ্গলবাড়ি দূর্গও রোয়াইলবাড়ি থেকে খুব বেশী দূরে নয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ্ ১৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দে কামরূপের রাজা নিলাম্বরের বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড যুদ্ধ পরিচালনা করে কামরূপ রাজ্য দখল করেন। এরপর কিছুদিন তাঁর পুত্র নছরত শাহ্ কামরূপে শাসন করেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রতিপক্ষের আক্রমণের মুখে তিনি বিতাড়িত হন এবং এক পর্যায়ে কামরূপ থেকে পালিয়ে আসতে হয়। কথিত আছে, নছরত শাহ্ কামরূপ থেকে পালিয়ে পূর্ব ময়মনসিংহের (বর্তমান নেত্রকোণার) রোয়াইলবাড়িতে এসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তিনি এর নামকরণ করেন নছরত ও জিয়াল (কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে- নছরত আজিয়াল)। পরবর্তীতে তাঁর শাসন অন্তর্গত সমগ্র প্রদেশটিই (বৃহত্তর ময়মনসিংহ) নছরতশাহী পরগণা নামে পরিচিত হয় এবং আকবর শাহ্‌র সময় পর্যন্তও পরগণাটি এ নামেই পরিচিত ছিল। এরপর বাঙ্গালীর গৌরব, মসনদে আলী ঈশা খাঁ এ অঞ্চলে বিশাল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি ও নেত্রকোণার রোয়াইলবাড়ি দূর্গের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নেন। জানা গেছে রোয়াইলবাড়ি থেকে জঙ্গলবাড়ি পর্যন্ত যাতায়াতের একটি রাস্তাও ছিল, যা ধ্বংস হতে হতে কিছুদিন আগে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এদিকে ঈশা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পারিষদ দেওয়ান জালাল এখানকার আধিপত্য গ্রহণ করেন। তিনি রোয়াইলবাড়ি দূর্গের ব্যাপক সংস্কার এবং দূর্গের বহিরাঙ্গনে একটি সুরম্য মসজিদ নির্মাণ করেন। এটি মসজিদ- এ জালাল বা জালাল মসজিদ নামে পরিচিত ছিল।

এসব কিংবদন্তী ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী রোয়াইলবাড়ি দূর্গের বিস্তীর্ণ অংশ দুযুগ আগেও মাটির নীচে চাপা পড়া অবস্থায় ছিল। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে রোয়াইলবাড়ি দূর্গে খনন কাজ পরিচালনা করে। দীর্ঘ সময়ের এ খনন কাজে মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ। উদ্ধার করা হয়- ইটের দেয়ালবেষ্টিত দূর্গ, মূল প্রবেশদ্বার (সিংহদ্বার), বহুকক্ষবিশিষ্ট একাধিক ইমারতের চিহ্ন, সানবাঁধানো ঘাটসহ দুটি বড় পুকুর, দুটি পরিখা, বুরুজ ঢিবি বা উঁচু ইমারত (টাওয়ার), বারদুয়ারী ঢিবি, কবরস্থান, মসজিদ, মিহরাব, চওড়া প্রাচীর, লতাপাতা ও ফুলে-ফলে আঁকা রঙিন প্রলেপযুক্ত কারুকাজ, পোড়ামাটির অলংকৃত ইট, টালি, জ্যামিতিক মোটিফ, টেরাকোটা, বর্শা, প্রস্তরখন্ড এবং লোহা ও চিনামাটির তৈরি নানা ধরনের জিনিসপত্র।

প্রায় ৪৬ একর ভূমির উপর রোয়াইলবাড়ির প্রাচীন সুরক্ষিত এলাকাটি অবস্থিত। এর মোট আয়তন প্রায় ৫৩৩ X ৪২৬ মিটার। সমস্ত দূর্গ এলাকাটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। মূল দূর্গের পূর্বদিকের ইটের দেয়ালে রয়েছে সিংহদ্বার (লায়ন গেইট)। পুকুরদুটি রয়েছে দূর্গের সামনের অংশের পূর্বদিকে। সিংহদরজা বরাবর একটি উঁচু রাস্তা দ্বারা পুকুর দুটি বিচ্ছিন্ন করা ছিল। দক্ষিণ দিকের মাটির দেয়ালের দুপাশে ছিল দুটি পরিখা। আভ্যন্তরীণ পরিখাটি একটি নালার মাধ্যমে পুকুর দুটির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। দক্ষিণ দিকের পরিখাটি বেতাই নদী থেকে আসা নৌযানসমূহ নোঙ্গর করার জন্য ব্যবহৃত হতো বলে অনুমান করা হয়। ধারণা করা হয়, দূর্গের উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে বড় বড় পাথর খন্ড দিয়ে নির্মিত আরও দুটি প্রবেশ পথ ছিল। দূর্গের আভ্যন্তরীণ সুরক্ষিত এলাকার উত্তরাংশে রয়েছে একটি বুরুজ ঢিবি (উঁচু ইমারত বা টাওয়ার), একটি প্রবেশপথ ও কবরস্থান। বুরুজ ঢিবিটির পরিমাপ প্রায় ২৫ মিটার X ২১ মিটার X ৭ মিটার। এছাড়াও বুরুজ ঢিবির পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ, সমান্তরাল তিনটি দেয়াল, প্রবেশদ্বার, ওয়াচ টাওয়ার (পর্যবেক্ষণ চিলেকোঠা) ও চওড়া সিঁড়ি। খননের সময় পর্যন্ত দূর্গের অভ্যন্তরের উত্তর ও পূর্ব দিকের প্রবেশ দেয়াল দুটি সাদা, নীল, সবুজ ও বাদামী রংয়ের চকচকে টালি দিয়ে বিভিন্ন ফুল-ফল, লতাপাতা এবং দড়ির নকশায় সজ্জিত ছিল। এখন এগুলো শেওলা ও ঝোপ ঝাড়ে ঢেকে গেছে। বারোদুয়ারী ঢিবিটির অবস্থান সিংহ দরজার দক্ষিণ প্রান্তে। এলাকায় এটি বারো দরজার ইমারত নামে পরিচিত। খননের পর এখানে কারুকার্যমন্ডিত যে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়; ধারণা করা হয়- এটিই দেওয়ান জালাল নির্মিত মসজিদ-এ জালাল বা জালাল মসজিদ। জানা যায়, এ মসজিদের ১৫টি গম্বুজ ছিল। এছাড়া মসজিদের কাঠামোতে ছিল ১২টি দরজা, ৫টি খুতবা পাঠের মেহরাব (মিম্বর) এবং মার্বেল পাথরের তৈরি বিশাল কয়েকটি খিলান। মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় সাত মিটার চওড়া। এতে ঝিনুকচুন ও সুড়কির প্রলেপযুক্ত ইট ব্যবহার করা হয়। চমৎকার সূর্যমূখী ফুলের নকশায় পরিপূর্ণ ছিল এটির দেয়ালগুলো। দূর্গের দক্ষিণ দিকের খোলা ময়দানটিকে সৈন্যবাহিনীল প্যারেড গ্রাউন্ড হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়াও দূর্গের বিভিন্ন অংশে বেশ কয়েকটি ভবন বা ইমারতের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। কথিত আছে- এ দুর্গের একটি কবরে শুয়ে আছেন নেয়ামত বিবি। প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের মতে, রোয়াইলবাড়ি দুর্গের সমস্ত স্থাপনা সুলতানী আমলের স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত হলেও এর কারুকাজ ছিল অনেক বেশী নান্দনিক ও শিল্পসমৃদ্ধ।

দুর্গর ধ্বংসাবশেষের পাশের একটি স্থানে এলাকাবাসীর উদ্যোগে একটি মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়েছে। দুর্গ এলাকার বেতাই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছে রোয়াইলবাড়ি বাজার। ঐতিহাসিক স্থানটির প্রাচীন নিদর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হতে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু লোক আসেন এখানে। এএলাকাটি দেশের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটে পরিণত হতে পারে।

ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা থেকে বাস বা যে কোন ধরণের ছোটোখাটো যানবাহন নিয়ে পৌঁছা যায় রোয়াইলবাড়িতে। সেখানে গেলে অশ্বারোহী বাহিনীর সেই ঠক ঠক শব্দ আর কোনোদিনই শোনা যাবেনা যদিও, কিন্তু আপনার অন্তর্দৃষ্টি ঠিকই কিছুক্ষণের জন্য আপনাকে সুলতান- ঈশা খাঁ আমলের সেই হারানো দিনগুলোতে নিয়ে যাবে। এর সুদৃশ্য ইমারত, অপরূপ কারুকার্যখচিত পুরাকীর্তির ধ্বংসাবশেষ হাতছানি দিয়ে ডাকবে আপনাকে- আমাদের সবাইকে।

কিভাবে যাওয়া যায়: 

ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা থেকে বাস বা যে কোন ধরণের ছোটোখাটো যানবাহন নিয়ে পৌঁছা যায় রোয়াইলবাড়িতে। ঢাকা থেকে বাসযোগে নেত্রকোণা, নেত্রকোণা থেকে কেন্দুয়া। কেন্দুয়া পৌরসভা থেকে বাস/রিকসা/সিএনজি যোগে সাহিতপুর বাজার যেতে হবে। সেখান থেকে অটো/ইঞ্জিনচালিত যন্ত্র দিয়ে সরাসরি রোয়াইলবাড়ী বাজারে যাওয়া যায়। বাজার থেকে পায়ে হেটে বা রিক্সায় যাওয়া যায়।

নেত্র মেলে নেত্রকোনায়

রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে ১৫৯ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ জেলা লাগোয়া জেলা নেত্রকোনা। এর উত্তরে মেঘালয়ের গারো পাহাড়, দক্ষিণে কিশোরগঞ্জ জেলা, পূর্বে সুনামগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে ময়মনসিংহ জেলা। কংস, সোমেশ্বরী, মগরা, ধলা প্রভৃতি এ জেলার প্রধান নদী। নেত্রকোনার বিভিন্ন জয়গায় ভ্রমণ নিয়ে কড়চার এবারের বেড়ানো।

বিরিসিরি আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমি
জেলার দুর্গাপুর থানার বিরিসিরি ইউনিয়নে অবস্থিত আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমি। এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার নানান নিদর্শন সংরক্ষিত আছে এখানে। এখানে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় ক্ষুদে জনগোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

টংক আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ
১৯৪৬-৫০ সালে কমরেড মনি সিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত টঙ্ক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। আদিবাসী সাংস্কৃতিক একাডেমি থেকে কিছুটা সামনে শোমেশ্বরী নদী পার হয়ে কিছু দূর এগুলেই চোখে পড়বে এ স্মৃতিসৌধটি। বর্ষা মৌসুমে শোমেশ্বরী জলে পূর্ণ থাকলেও শীত মৌসুমে নদীটি পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর কমরেড মনি সিংহের মৃত্যু দিবসে এখানে তিন দিন ব্যাপী মনি মেলা নামে লোকজ মেলা বসে।

সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি
জেলার দুর্গাপুর উপজেলায় অবস্থিত সুসং দুর্গাপুরের জমিদার বাড়ি। সুসং দুর্গাপুরের সোমেশ্বর পঠকের বংশধররা এ বাড়িটি তৈরি করেছিলেন। বাংলা ১৩০৪ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে জমিদার বাড়িটি একেবারে ধ্বংস হয়ে গেলে তাদের বংশধররা এটি পুনর্নির্মাণ করেন। এ জমিদার বাড়িটি চারটি অংশে বিভক্ত। বড় বাড়ি, মেজ বাড়ি, আবু বাড়ি ও দুই আনি বাড়ি। জানা যায় ১২৮০ মতান্তরে ১৫৯৪ খ্রীস্টাব্দের কোনো এক সময়ে কামরূপ কামাখ্যা থেকে শোমেশ্বর পাঠক নামে এক ব্রাহ্মণ এ অঞ্চলে ভ্রমণে আসেন। এখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে থেকে যাবার পরিকল্পনা করেন। শোমেশ্বর পাঠক গারো রাজা বৈশ্যকে পরাজিত ও নিহত করে রাজ্য দখল করে নেন। সে সময়ে সুসং রাজ্যের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ছিল আদিবাসী, যাদের অধিকাংশই আবার গারো। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় তিনশ বছর তার বংশধররা এ অঞ্চলে জমিদারি করে।

সাধু যোসেফের ধর্মপল্লি
বিরিসিরি থেকে শোমেশ্বরী নদী পার হয়ে রিকশায় রানীখং গ্রাম। এখানে আছে সাধু যোসেফের ধর্মপল্লি। রানীখং গ্রামের এ ক্যাথলিক গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯১২ সালে।

রাশমণি স্মৃতিসৌধ
রানীখং থেকে বিজয়পুর পাহাড়ে যাবার পথে বহেরাতলীতে আছে হাজং মাতা রাশমনি স্মৃতিসৌধ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি সংঘটিত কৃষক ও টঙ্ক আন্দোলনের প্রথম শহীদ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের নেত্রী হাজং মাতা রাশমণির স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে রাশমণি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এখানে নির্মাণ করেছে রাশমণি স্মৃতিসৌধ।

বিজয়পুর পাহাড়
রাশমণি স্মৃতিসৌধ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে বিজয়পুরে আছে চীনা মাটির পাহাড়। এখান থেকে চীনা মাটি সংগ্রহের ফলে পাহাড়ের গায়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট ছোট পুকুরের মতো গভীর জলাধার। পাহাড়ের গায়ে স্বচ্ছ জলাধারগুলো দেখতে চমৎকার।

নেত্রকোনার হাওর
জেলার মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি, কলমাকান্দায় কম বেশি ৫৬ টি হাওর ও বিল আছে। শুস্ক মৌসুমে হাওরে চাষাবাদ হলেও বর্ষা মৌসুমে পানিতে পরিপূর্ণ থাকে। তখন এসব এলাকার একমাত্র বাহন হয় নৌকা। মোহনগঞ্জ শহর থেকে রিকশায় দিকলাকোনা গিয়ে এখানকার ডিঙ্গাপোতা হাওরে প্রবেশ করা যায়। এখান থেকে ইঞ্জিন নৌকায় করে হাওরের বিভিন্ন গ্রামে যাওয়া যায়। বর্ষাকালে হাওরের গ্রামগুলো একেকটি ছোট দ্বীপের মতো মনে হয়।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা মহাখালী বাস স্টেশন থেকে সরাসরি দুর্গাপুর যাবার বাস ছাড়ে। ভাড়া ১৮০-২০০ টাকা। নেত্রকোনা সদর থেকে দুর্গাপুর যাবার বাস সার্ভিস আছে। ঢাকা থেকে সরাসরি মোহনগঞ্জ যায় ঢাকার কমলাপুর থেকে বিআরটিসি ও মহাখালী থেকে নেত্র পরিবহন, রফ রফ পরিবহন, ইকোনো পরিবহনের বাস। ভাড়া ১৭০-১৮০ টাকা। ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ লোকাল ট্রেন থাকলেও তা সঠিক সময়ে চলাচল করে না।

কোথায় থাকবেন
দুর্গাপুরে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা হলো ইয়ূথ মেন খৃষ্টান অ্যাসোসিয়েশন বা ওয়াইএমসিএ-এর রেস্ট হাউস। এখানকার তিনজনের কক্ষের ভাড়া ২০০ টাকা এবং একজনের কক্ষের ভাড়া ১৫০। ফোন- ০১৭৩১০৩৯৭৬৯। এছাড়া এখানে ইয়ূথ ওমেন খৃষ্টান অ্যাসোসিয়েশন বা ওয়াইডব্লিউসিএ পরিচালিত আরেকটি রেস্ট হাউস আছে। ফোন- ০১৭১২০৪২৯১৬।

এছাড়া দুর্গাপুরে থাকার জন্য সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। উল্লেখযোগ্য দু-একটি হলো- স্বর্ণা গেস্ট হাউস, ফোন- ০১৭২৮৪৩৮৭১২। হোটেল সুসং, ফোন: ০১৯১৪৭৯১২৫৪। হোটেল গুলশান, ফোন- ০১৭১১১৫০৮০৭। এসব হোটেলে ১০০-৫০০ টাকায় থাকার ব্যবস্থা আছে। হাওর অঞ্চলে থাকার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই হাওর ভ্রমণে গেলে মোহনগঞ্জ থানা শহরে থাকতে হবে। এ শহরে থাকার জন্য নিম্নমানের কিছু হোটেল আছে। এরকম দু-একটি হোটেল হলো স্টেশন রোডে হোটেল শাপলা, ফোন: ০১৭১২১৩৭৬৫৯। স্টেশন রোডের আরেকটি হোটেল হলো হোটেল পাঠান, ফোন- ০১৯১৬৮৮৮৪৬০। এসব হোটেলের কক্ষ ভাড়া ৫০-১০০ টাকা।

বড়াইলের প্রান্তরে

মো. জাভেদ হাকিম
সরকারি ছুটি সামনে রেখে ভাবনা ছিল-মুঠো ফোনের রিং টোন বন্ধ করে, ঘরের দরজা লক করে সারাদিন ঘুমাব। কিন্তু কিসের ভাবনা আর হয় কি? ভ্রমণপিপাসু মন তা আর হতে দেয় না। ছুটির দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসে, ক্লান্ত দেহ-মন ততই চাঙ্গা হতে থাকে। উড়ন্ত মন উসখুস করতে থাকে দেশের কোন প্রান্তে ঠুঁ মারা যায়। স্বল্প সময়ে অল্প দূরত্বের অপরূপ প্রাকৃতিক নিদর্শন কি দেখা যায়? হঠাৎ মনে পড়ল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রানী নেত্রকোনার কথা। আমার এক আÍীয় থাকে। যেমনি মনে পড়া, তেমনি ফোন করা। এবং যাবার পরিকল্পনা। অনেকদিন দেখা হয়না। 
১ মে খুব ভোরে ড্রাইভারকে বললাম রেডি হও। ঘুম কাতুরে ড্রাইভারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ভেবেছিল আজ সে নাক ডেকে ঘুমাবে, তা আর হল না। ছুটছি নেত্রকোনার পথে। ময়মনসিংহ পার হওয়ার পর পথের দু
পাশে সবুজের প্রান্তর, কালো ধোঁয়ামুক্ত নীল আকাশ, বাতাসে ধানের ছড়ার ঢেউ  খেলানো মন-মাতানো দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম সকাল ১০-৩০ মিনিটের মধ্যে নেত্রকোনার চকপাড়া উপশহরে। বাড়িতে ঢুকতেই স্বাদের বউয়ার ঘ্রাণ।
ইতিমধ্যে সম্পর্কে ফুপাত বোন ৯ম শ্রেণীতে পড়
য়া বিফা অফার করল ভাইজান যাইবাইন আমরার বড়াইল (যাবেন আমাদের বড়াইল)। আমিও সাত-পাঁচ না ভেবে বললাম যাইবাম (যাব)। দুষ্টু বিফা খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারে। আঞ্চলিকতার টানে কথা বলে আমার সঙ্গে জোক করেছে। জিজ্ঞাসা করলাম কি আছে সেখানে? গিয়েই দেখ না!
বড়াইল যাত্রা
নেত্রকোনা শহরের উদীয়মান শিশু নৃত্যুশিল্পী বিফার সঙ্গে যাচ্ছি গাবড়াগাতি থানার অন্তর্গত কংস নদীর তীর বড়াইল। শহরের খুব কাছাকাছি তাই ড্রাইভারকে বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে হুড ছেঁড়া রিকশায় চড়ে যাচ্ছি, মাথার উপর সূর্য। তবুও আনন্দ, কিছু একটা দেখব। ছোট্ট একটা বাজারে এসে রিকশা থামল। মরুভূমির মতো তপ্ত বালু মাড়িয়ে নবনির্মিত ব্রিজের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। পশ্চিম দিকে তাকাতেই দেখি পাহাড়ের কাঁধে আকাশ যেন হেলান দিয়েছে ওই। পাহাড়ি কংস নদী, স্বচ্ছ টলটলে পানি। দু
তীরে শসা ক্ষেতের ছড়াছড়ি। ক্ষেত থেকে তাজা শসা তুলে খাওয়ার স্বাদ মনে থাকবে বহুদিন। এখনও ভারি যানবাহন চলাচল শুরু না হওয়ায় নিশ্চিন্ত মনে ব্রিজের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত হেঁটে বেড়ানো যায়। বড়াইলের অপরূপ নিসর্গময় প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যটন শিল্পে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। বিশেষ করে কংস নদীকে মনে হয়েছে কোন বিখ্যাত চিত্রকরের স্বযতেœ আঁকা দরদী ছবি। বড়াইলকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি এবার মেদনি গ্রামে।
মেদনি গ্রাম
বিফাদের গ্রামের বাড়ি এখানে। সুন্দর, পরিপাটি গ্রামের মেঠো পথ। ছনের ও মাটির ঘর দেখে মনে হয়েছে আবহমান বাংলার চিরায়িত রূপ সম্ভবত এই গ্রামের বাসিন্দারাই ধারণ করে আছে। খালের পাশে বিলুপ্ত প্রজাতির কালিম পাশির পদচারণা, দূর থেকে মনে হয় ময়ূরী তার পেখম মেলে ধরবে। কচি ডাবের পানি আর কাঁচা আমের ভর্তা আহা... আহা... আহা... আহা। পুরো গ্রামটি দেখে মনে হয়েছে কাঁচা আমের বৃষ্টি ঝরছে। ধন্যবাদ বিফা। কৌতুক করে বললাম, পরীক্ষা শেষে ঢাকামে ঘুমনে আনা। ফ্যান্টাসি কিংডম ঘুরানে, লেকে যাওঙ্গা। বলার সময় ভেবেছিলাম কথার মাথামণ্ডু কিছুই বুঝবে না। ভুল ভাঙল আমার, তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এখন সবাই এগিয়ে।
আরও যা দেখবেন
নেত্রকোনা জেলায় চারদিনের সময় নিয়ে ভ্রমণে গেলে দেখতে পাবেন দুর্গাপুরের বিজয়পুর গ্রামে চিনামাটির পাহাড়, কমলা রানীর দিঘি, গাড়, হাজং আদিবাসীদের বসতভিটা, মহনগঞ্জের বিশাল বিশাল হাওর, সঙ্গে তাজা মাছের স্বাদ, ইতিহাস খ্যাত মহুয়ার গ্রাম মনদ। শহরের বড় বাজারে অবস্থিত হযরত সূফী আঃ জব্বার (রহ.) প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক জামে মসজিদ। শতবর্ষী বটবৃক্ষের পাশে খেলাফত স্টোরে বস্তে সূফী সাহেবের শাহজাদা মৌলভী আবদুর রকিব সাহেব দীনি দাওয়াত দেন। প্রাচীন বিশালাকার দিঘি। দিঘির জলে আপন ছবি দেখে সাঁতার কাটতে ইচ্ছে করবে। আরও রয়েছে মণি সিংহের স্মৃতিসৌধ, রানী কং, বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি।
যাতায়াত
ঢাকা মহাখালী থেকে নেত্রকোনার বাস সকাল হতে রাত্র পর্যন্ত ছেড়ে যায়। শহরে থাকার মতো বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে।

দেবো তোমায় শালুক পাতার নাও

ফারজানা ইয়াসমিন মৌমি
ঐশী আমাদের ডেকেছিল... ঐশী তা জানতো না। হাওর আমাদের ডেকেছিল... হাওর কি জানতো? ঐশীর গান আর হাওরের অপরূপ রূপ বৈভব, বিপুল বিস্তার আমাদের প্রাণের সুতায় টান দিয়েছিল; এতটা টান আমরাও জানতাম না।
শরতের শুরুতে একদিন সকালে ভাটিবাংলার দুয়ার নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ থেকে আমাদের ট্রলার ছাড়ল হাওরের উদ্দেশে। ট্রলারটির যাত্রী ধারণ ক্ষমতা ২০০ জনের। আমাদের ৩০ জনের একটি ছোট্ট দল। তার মাঝে ১৮ জনই শিশু-কিশোর। ফলে একটি স্বাচ্ছন্দ্য নৌবিহার। শান্ত সুন্দর আলো বাতাাস-আবহাওয়া। একটি সাহিত্য বাসর হচ্ছে হাওরের মাঝে। আছেন কবি রইস মনরম, কবি কামরুল হাসান, কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ, কবি রফিক হাসান আর  কবি ফরিদ আহমদ দুলাল। তাদের নিয়েই শুরু আমাদের ভ্রমণযাত্রা।
ছাড়লাম নাও হাওরে, গাও সবাই প্রাণ খুলে গাওরে...
কংশ নদ বেয়ে মোহনগঞ্জ থেকে বেরিয়ে ধরমপাশাকে পাশে রেখে মধুপুর। মধুপুর পার হতেই শুরু হল হাওর-ধারাম। ধারাম বিল বিস্তারে, বৈচিত্র্যে, বৈভবে বিশাল হাওর। তারপর ধানকুনিয়া, পাকনা আর হালির হাওর।
বিশাল ট্রলারের ছাদের দীঘল দুই পাশে বেঞ্চ পাতা। মাঝখানে বিস্তর ফাঁকা জায়গা। ফলে কয়েকজন মা ব্যতিত কবিরাসহ শিশু-কিশোররা ছাদ থেকে কেউই নামতে চায় না। যথেষ্ট রোদ থাকা সত্ত্বেও কেউ ছাদের নিচে আসতে নারাজ। রোদ ঝলমল উপরের নীল আকাশটিই বুঝি ছাদ। নীলে... দূরে দূরে ছোপ ছোপ সাদা মেঘ। কবিতার বই যেন! নীর মলাটে শুভ্র বলাকার ঝাঁক, গন্তব্যবিহীন উড়াল। ট্রলার ক্রমে হাওরের ভেতরের মাঝ বরাবর যাচ্ছে। বিপুল জলরাশি ধু ধু জল আর জল, দিগন্ত ছুঁয়ে আছে। কোন দিকে দূরের গাঁগুলো যেন একেকটি সবুজ রেখা। উত্তর দিক থেকে নীল ঈশারায় ডাকছে মেঘালয় পাহাড়। শিশুরা গানে কবিতায় কলরবে উল্লসিত উচ্ছ্বসিত। সঙ্গে কবিরাও। ট্রলার চলছে, একটু ধীরে চালাতে বলা হলÑ ধীরে ধীরে চলছে ট্রলার...
ট্রলারের ছাদ থেকে হাওরে লাফিয়ে পড়লেন কবি জাহাঙ্গীর ফিরোজ। পেছন পেছন ফরিদ আহমদ দুলাল, রফিক হাসান। তাদের বয়স তখন ৫০-৬০ নাকি ১৬-১৭? লাফিয়ে পড়ল কয়েকটি কিশোর তরুণও। কাজেই বন্ধ করতে হল ট্রলারের স্টার্ট-ইঞ্জিন। সাঁতারকাটা একই সঙ্গে হাসতে থাকা কবিদের পেটে হাওরের কিছু জলও ঢুকেছিল। দশ মিনিট... পনের মিনিট... জল থেকে এবার ট্রলারে ওঠার পালা। ২০০ জন যাত্রী ধারণের ট্রলারের বাতা (পাশের কিনার) অনেকটা উঁচুতে। তাহলে! অনেক চেষ্টা করে তারা অবশেষে নৌকায় ওঠলেন... তোলা হল। সবাই কাহিল। 
ধারাম, ধানকুনিয়া, পাকনা, হালির হাওর, আর সানুয়া, ডাকুয়া হাওর দ্বারা বেষ্টিত জামালগঞ্জ উপজেলা সদর। কাছেই কালনী নদীর পাড়ে গানের পাখি ভাটির কুমার শাহ আবদুল করিমের বাড়ি।
হাওর ছেড়ে এবার সুরমা নদী। সুরমা বেয়ে বিকেলে জামালগঞ্জ শহরটিতে পৌঁছলাম।
ধারাম হাওরের রুই মাছ, সঙ্গে আরও স্বাদু ব্যঞ্জনে আদরে খাওয়া-দাওয়া সারা হল। সন্ধ্যায় উপজেলা মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। কবিদের চেয়ে শিশুরাই সুযোগ পেল বেশি।
রাতে রেস্ট হাউস, গেস্ট হাউসে, ট্রলারের ছাদে আরও গান, আরও কবিতা, ছড়া... জলোয়া বাতাসের ছোঁয়ায় কেউ কেউ ঘুমপরীর দেশে।
পরদিন ফিরে আসার পালা। বিদায়ের সেই পুরনো আবেগ নতুন মাত্রায় সবাইকে কাতর করল। সুরমা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়াল সাথী, ঐশী, প্রদীপ, প্রিয়সহ অনেকে। ট্রলার ছাড়ল। জলে-স্থলে অনেকের চোখে বুঝি হাওরেরই টলমল জল।
বলতেই হচ্ছে, ফেরার দিনও সেই কবিরা হাওরের বুকে লাফিয়ে পড়েছিলেন।
আবার কবে দেখা হবে হাওর...?
এমন একটি সুর বাতাসে বাজতে থাকল।

বিরিশিরি-দুগট্টাপুর-বিজয়পুর

রামশংকর দেবনাথ
পাহাড় ছুঁবেন? না-কি প্রকৃতি? মন চাইলে ছুঁতে পারেন দুটোই।
পরিযায়ী পাখিরা আসা-যাওয়া করছে সব সময় আপনারই পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে।পাখায় নানা রঙের বর্ণালি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রজাপতি আর পাখির ডানামেলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে, কেটে যাবে আপনার সময়।
বসন্তের এই পড়ন্ত বেলায় একটু সময় করে বেরিয়ে পড়
ন মন উদাস করা দামাল হাওয়া যেখানে সদ্যজাত কচি কচি কিশলয় ছাপিয়ে মাদার, পলাশ অথবা শিমুলের লাল থকথকে ডানায় ভর করে ঝরনার দুকূল প্লাবিত করে, ভোরের সূর্যটা যেখানে আবির রং ছড়িয়ে উঁকি দেয়। পাহাড়ি নদী সুমেশ্বরীর অববাহিকায় নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে বসবাসরত মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি এবং খনিজ সম্পদের অফুরন্ত ভাণ্ডারের স্বগর্বে কালের কাল অতিক্রম করছে সে অঞ্চল।
শহরের যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে, মনকে সবুজ-সতেজ প্রকৃতির অফুরন্ত ছোঁয়া দিতে আপনার স্বপ্নভূমি-উপজাতি অধ্যুষিত নেত্রকোনার বিরিশিরি দুর্গাপুর বিজয়পুর। পাশেই আকাশের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। দেখে মনে হবে আকাশের নীলের সঙ্গে মিতালীতে মেতেছে। আপনাকে দেখে হাতছানি দেবে আদিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়শ্রেণী। সবুজ সুনীল আঁকাবাঁকা পথে যতই অগ্রসর হবেন নৈস্বর্গিক সৌন্দর্যে ততই মুগ্ধ হবেন। আকাশে-বাতাসে থুরি, পহাড়ে-বাতাসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ভড়কে যাবেন না।
পাহাড়ে শীত এখনও মরেনি তাই মোটা কাপড় সঙ্গে রাখবেন। ভাগ্য ভাল হলে পাহাড়ের রোদ মেঘের লুকোচুরি ক্যামেরাবন্দি করতে পারবেন। পথ চলতে চলতেই হরিণ, হাতি বা ময়ূরের দেখা পেয়ে যাবেন। গাছে গাছে হাজারও পাখির আস্তানা, পরিযায়ী পাখিরা আসা-যাওয়া করছে সব সময় আপনারই পাশ দিয়ে গা ঘেঁষে। পাখায় নানা রঙের বর্ণালি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রজাপতি আর পাখির ডানামেলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে, কেটে যাবে আপনার সময়। প্রাকৃতিক ভালোবাসায় ভসতে ভাসতে কখনও বর্ডার ক্রস করবেন না।
এখানে ছোটবড় অনেক পাহাড় আছে। যার সবগুলোই পাথুরে পাহাড়। এসব পাহাড়ের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে হাজার প্রজাতির বনজ ঔষধি গাছ। যেগুলোর ওপর নির্ভর করে টিকে আছে বাংলাদেশের বনজ ঔষধালয়। টিলা-পাহাড় ঘুরতে ঘুরতে, সেখানকার অধিবাসীদের আতিথ্য গ্রহণ করে আপনি বুঝতে পারবেন ওরা কত সহজ-সরল জীবনযাপন করে। গারো, হাজং, কোচ, হদি, ভালু ও কানাই প্রভৃতি উপজাতির বাস এ অঞ্চলে। ধর্মে-বর্ণে ওরা সম্পূর্ণ আলাদা। বেশিরভাগ গারো উপজাতি পাহাড়ে বসবাস করে। ওরা মাতৃতান্ত্রিক। আর সমতলে বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীর নাম হাজং। এরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করে। কৃষিই ওদের প্রধান জীবিকা। এদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবার। পাড়া-মহল্লা-গ্রাম-চাকলা-পরগনা এভাবে এদের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে হাজংরা খুবই সচেতন। হাতিখেদা আন্দোলন, টংক আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান অনেক। পরিবারের ছেলেমেয়ে সবাই ঘরে-বাইরে কাজ করে। এরা নিজেদের কাপড় নিজেরা তৈরি করে। এখন অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিচ্ছে। এদের হাতের তৈরি জিনিস (কাঠ, বেতের, বাঁশের) দেখার মতো। মহিলাদের পোশাক-পরিচ্ছদ সবচেয়ে আকর্ষক। ঝরনা বা নদীর ঘাটে একদল তরুণীকে নিমা বা ঘাঘরা পরা অবস্থায় পেয়েও যেতে পারেন স্নানরত। তারা বেশিরভাগই মাটির তৈরি ঘরে বসবাস করে। ঘরগুলো খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দেয়াল ও মেঝে কাদামাটি আর গোবরে লেপা হয়ে থাকে প্রতিদিন। নিজেরাই আঁকে চমৎকার দেয়াল চিত্র। তারা নিজেদের ভাষায়ই কথা বলে সব সময়। তবে আপনার পাশে বিশুদ্ধ বাংলায় ভাববিনিময় করবে। তাদের নিজস্ব বর্ণমালা না থাকলেও নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা থেমে থাকেনি। ছড়া-গান, কবিতা, প্রবাদ, ধাঁধা, এমনকি উপকথার ব্যাপক সমাহার রয়েছে এদের। সাহিত্য বিচারে যেগুলো লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। নিজস্ব সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সদা সচেষ্ট তারা।
আধুনিক সভ্যতার হাওয়া ওদের মাঝেও লেগেছে। ভোর বেলায় ফুটফুটে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে স্কুলে যায়। নেচেগেয়ে মাতিয়ে রাখে স্কুল প্রাঙ্গণ। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়, সচেতন নাগরিক হিসেবে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের দুটি কালচারাল একাডেমির একটি বিরিশিরিতে অবস্থিত। সুসং রাজার রাজবাড়ী, কমলা রানীর দীঘি, রানীখং পাহাড়ে ১৯১২ সালে সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত ক্যাথলিক গীর্জা ও টংক আন্দোলনের নারী নেত্রী হাজংমাতা রাশিমনির স্মৃতিসৌধ এ অঞ্চলে অবস্থিত।
টিলা পাহাড়ের ঝরনা ছাড়া এখানকার প্রাণদানকারী একমাত্র পাহাড়ি নদী সুমেশ্বরী। এর দু
পাশে সিলিকা বালুসমৃদ্ধ বিশাল চর, যা কিনা কাচ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। বালুচরে একদল মানুষ খোঁড়াখোঁড়ির কাজে ব্যস্ত। যারা বালুরাশির নিচ থেকে খুঁড়ে বের করছে কাঠ-পাথুরে কয়লা। এগুলোর ক্ষুদ্র আয়েই ওদের জীবিকা নির্বাহ। নদীর স্রোতে ভেসে যায় পাহাড়ি বড় বড় গাছ। কেউবা জাল ফেলে মাছ ধরে খরস্রোতা সুমেশ্বরীতে। সুবিস্তৃত মাঠে বাদাম, তরমুজ, মিষ্টি কুমড়ার চাষ। নারী-পুরুষ-শিশু কাজ করছে কাঠফাটা রোদে। বৈচিত্র্যে ভরা ওদের জীবন। দুর্গাপুরের অদূরেই বিজয়পুর। টিলা পাহাড়ে সমান ঘনবসতি। তবে এখানকার সবুজ টিলা পাহাড়গুলোর মাটি সাদা। শ্বেত মৃত্তিকা হিসেবে আমরা যাকে চিনি। দেশের সিরামিকস শিল্পের প্রধান উপাদান চীনামাটি, টাইলস ও বৈদ্যুতিক তারের ইন্সুলেশন ওয়ারের ব্যবহƒত কাঁচামাল সাদামাটির এ পাহাড়গুলো। বিভিন্ন সিরামক কোম্পানি লিজ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এগুলোর বুক চিরে বের করে আনছে অমূল্য সম্পদ যা থেকে তৈরি জিনিস দেশে-বিদেশে বিপুল চাহিদার দাবিদার।
সিনেমার সুটিং স্পট ছাড়াও দেশের বিভিন্ন পর্যটন কোম্পানি এগিয়ে এলে দুর্গাপুরে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারত। আর তাতে এ অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান হতো উন্নত। পাশাপাশি জেলার অর্থনীতির সমৃদ্ধতা ও সরকারি রাজস্বের আয় বৃদ্ধি পেত। যে যাই বলুক, আজই দলটাকে ভারি করে বেরিয়ে পড়
ন। মাত্র তিন দিনের ট্যুর। খরচপাতিও সীমিত। অরণ্যের আবহে বণ্যপ্রাণী আর পাহাড়ের সমাবেশ ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে বড়ই প্রিয়। যার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মন আনন্দে নেচে ওঠে। উপজাতিদের গ্রাম ভ্রমণ, পাহাড়ের সঙ্গে সখ্যতা শুধু এরকম নির্মল প্রকৃতির রাজ্যেই সম্ভব।
বিদেশ ভ্রমণে অজস্র টাকা খরচ না করে অল্প পয়সায়, স্বল্প সময়ে দেশটাকে আগে চিনুন, জানুন, দেখুন। যে কথা রূপসী বাংলার কবি বলে গেছেন
তেমরা যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পাড়ে রয়ে যাবো।
 
যেভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন
মহাখালী থেকে সরাসরি বাস যায় বিরিশিরি- সুসং দুর্গাপুর। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা। এছাড়া প্যাকেজ প্রোগ্রামে সরাসরি গাড়ি নিয়েও যেতে পারেন। দুর্গাপুরে অনেক আবাসিক হোটেল আছে যেগুলোর ভাড়া প্রতিদিন ২০০-৩০০ টাকা এবং সেবার মান উন্নত।

রাণীমাতা রাশমণি স্মৃতি সৌধ

উপজেলা পরিষদ হতে ছয় কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে চৌ-রাস্তা মোড়ে রাশমণি স্মৃতি সৌধ অবস্থিত। রাশমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী।

রাশমনি হাজং ছিলেন টংক ও কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেত্রীতিনি ১৮৯৮ সালে ধোবাউড়া উপজেলায় বেদীকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেনতিনি জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন১৯৪৬ সালে ৩১শে জানুয়ারী কুমদিনী হাজংকে বাচাতে গিয়ে মুখোমুখি সংগ্রামে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে বহেরাতলী গ্রামে তার সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজংসহ শহীদ হনরাশমনি ও সুরেন্দ্র হাজং টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদরাশমনির দায়ের আঘাতে দুজন ব্রিটিশ পুলিশ নিহত হয়এই বীর যোদ্ধার স্মরণে হাজংলতা রাশমনি মেমোরিয়াল ট্রাস্ট একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছেনপ্রতিবছর ৩১শে জানুয়ারী রাশমনি দিবস ও টংক শহীদ দিবস পালন করা হয়

কিভাবে যাওয়া যায়: 

ঢাকা থেকে বাস যোগে ময়মনসিংহ, ময়মনসিংহ ভায়া শ্যামগঞ্জ দুর্গাপুর অথবা ঢাকা থেকে বাসযোগে নেত্রকোণা, নেত্রকোণা থেকে দুর্গাপুর। সোমেশ্বরী নদী পাড় হয়ে রিক্সা বা হোন্ডায় অর্ধ কাচা-পাকা রাস্তা দিয়ে বহেড়াতলী রাশিমণি স্মৃতি সৌধে যাওয়া যায়।


তথ্যসূত্র : জেলা তথ্যবাতায়ন

           ট্যুরিস্ট গাইড 24