Golden Bangladesh
নওয়াবগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নওয়াবগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

ছোট সোনা মসজিদ
 

ছোট সোনামসজিদ সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন বলে আখ্যাত। এটি বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর কোয়াটার্স এর তাহখানা কমপ্লেক্স থেকে অর্ধ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে এবং কোতোয়ালী দরওয়াজা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বিশাল এক দিঘির দক্ষিণপাড়ের পশ্চিম অংশ জুড়ে এর অবস্থান। মসজিদের কিছু দূর পশ্চিমে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্তর কর্তৃক কয়েক বছর পূর্বে নির্মিত একটি আধুনিক দ্বিতল গেষ্ট হাউস রয়েছে। গেষ্ট হাউস ও মসজিদের মধ্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে একটি আধুনিক রাস্তা চলে গেছে। মনে হয় রাস্তাটি পুরনো আমলের এবং একসময় এটি কোতোয়ালী দরওয়াজা হয়ে দক্ষিণের শহরতলীর সঙ্গে গৌড়-লখনৌতির মূল শহরের সংযোগ স্থাপন করেছিল।
প্রধান প্রবেশ পথের উপরিভাগে স্থাপিত একটি শিলালিপি অনুযায়ী জনৈক মজলিস-ই-মাজালিস মজলিস মনসুর ওয়ালী মুহম্মদ বিন আলী কর্তৃক মসজিদটি নির্মিত হয়। শিলালিপিতে নির্মানের সঠিক তারিখ সম্বলিত অক্ষরগুলি মুছে গেছে। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এর নামের উল্লেখ থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, মসজিদটি তার রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোন এক সময় নির্মিত।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি

ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বরিশালের রহিমগঞ্জ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালের ৫ অক্টোবর কাকুলপাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীতে যোগদান করেন। নিষ্ঠার সাথে প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর ১৯৬৮ সালের ২ জুন কমিশন প্রাপ্ত হন। ছয় মাস চাকুরী করার পর তিনি রিসালপুরস্থ মিলিটারি কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং এ যোগদান করেন এবং সুদীর্ঘ ১৩ মাসের বেসিক কোর্সে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর সেখান হতে বোম্ব ডিসপোজাল কোর্স করেন এবং কোর অব ইঞ্জিনিয়ারস এর একজন সুদক্ষ অফিসার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনী যখন বাংলাদেশএক ধ্বংসযজ্ঞ ও পাশবিক অত্যাচারে লিপ্ত ছিল, তখন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর কারাকোরামের বন্ধুর পার্বত্য সীমান্ত রক্ষীদের দৃষ্টি এড়িয়ে শিয়ালকোট সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় এলাকায় প্রবেশ করেন। ভারত হতে পরে তিনি বাংলদেশ সীমান্তে পৌঁছেন। শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্দেশে রাজশাহী জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত এলাকার ৭ নম্বর সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসাবে কাজ করছিলেন। তার যোগ্য অধিনায়কত্বে মুক্তিবাহিনী এক চরম বিভীষিকারূপে হানাদার বাহিনীর সকল স্তরের সৈনিকদের মধ্যে মহাত্রাসের সঞ্চার করেছিল। সিংহ শক্তিতে বলিয়ান মুক্তিসেনারা ঝাপিয়ে পড়লে শত্রুদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিগুলো একের পর এক পতন ঘটতে থাকে। তাদের আক্রমণ এত প্রবল ও ত্রাস সৃষ্টিকারী ছিল যে, একবার একটি শত্রু লাইনের উপর হামলা চালাবার পূর্ব মুহুর্তে প্রায় সহস্রাধিক শত্রুসেনা প্রাণের ভয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ ছেড়ে চলে যান। ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মহানন্দা নদী অতিক্রম করে শত্রুসৈন্যদের ধ্বংস করার জন্য নবাবগঞ্জের দিকে অগ্রসর হন। ১৪ ডিসেম্বর তিনি শত্রুদের কঠিন ব্যুহ ভেদ করবার জন্য দুর্ভেদ্য অবস্থানগুলো ধ্বংস করছিলেন, যখন আর একটি মাত্র শত্রু অবস্থান বাকী রইল এমন সময় মুখোমুখি সংঘর্ষে বাংকার চার্জে শত্রুর বুলেটের আঘাতে বাংলার এই সূর্য সৈনিক শাহাদাৎ বরণ করলেন। দৃঢ় অথচ বজ্রশপথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে দুটি চোখ স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরীর মত সদা জাগ্রত থেকে ভবিষ্যতের স্বাধীন সোনালী বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছিল তা স্তিমিত হয়ে গেল।১৫ ডিসেম্বর শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ প্রাঙ্গনে আনা হয়। অসংখ্য স্বাধীনতা প্রেমিক জনগণ, ভক্ত মুক্তিযোদ্ধা, অগণিত মা-বোনের নয়ন জলের আর্শীবাদে সিক্ত করে তাকে এখানে সমাহিত করা হয়।

দারসবাড়ী মসজিদ

ছোট সোনামসজিদ ও কোতোয়ালী দরজার মধ্যবর্তী স্থানে ওমরপুরের সন্নিকটে দারসবাড়ী অবস্থিত। পুরুষানুক্রমে স্থানীয় জনসাধারণ এই স্থানকে দারসবাড়ী বলে থাকেন। বর্তমানে এই স্থান পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। দর্স অর্থ পাঠ। সম্ভবতঃ একসময় মসজিদ সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা ছিল এখানে। ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের সময় মুনশী এলাহী বখশ কর্তৃক আবিস্কৃত একটি আরবী শিলালিপি অনুযায়ী (লিপি-দৈর্ঘ্য ১১ ফুট ৩ ইঞ্চি, প্রস্থ ২ফুট ১ ইঞ্চি) ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে (হিজরী ৮৮৪) সুলতান শামস উদ্দীন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তাঁরই আদেশক্রমে এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইট নির্মিত এই মসজিদের অভ্যন্তরের আয়তক্ষেত্র দুই অংশে বিভক্ত। এর আয়তন ৯৯ ফুট ৫ ইঞ্চি, ৩৪ ফুট ৯ ইঞ্চি। পূর্ব পার্শ্বে একটি বারান্দা, যা ১০ ফুট ৭ ইঞ্চি। বারান্দার খিলানে ৭টি প্রস্ত্তর স্তম্ভের উপরের ৬টি ক্ষুদ্রাকৃতি গম্বুজ এবং মধ্যবর্তীটি অপেক্ষাকৃত বড় ছিল। উপরে ৯টি গম্বুজের চিহ্নাবশেষ রয়েছে উত্তর দক্ষিণে ৩টি করে জানালা ছিল। উত্তর পশ্চিম কোণে মহিলাদের নামাজের জন্য প্রস্তরস্তম্ভের উপরে একটি ছাদ ছিল। এর পরিচয় স্বরূপ এখনও একটি মেহরাব রয়েছে। এতদ্ব্যতীত পশ্চিম দেয়ালে পাশাপাশি ৩টি করে ৯টি কারুকার্য খচিত মেহরাব বর্তমান রয়েছে। এই মসজিদের চারপার্শ্বে দেয়াল ও কয়েকটি প্রস্তর স্তম্ভের মূলদেশ ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই । এ মসজিদটিও বাংলার প্রথম যুগের মুসলিম স্থাপত্যের কীর্তির একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এখানে প্রাপ্ত তোগরা অক্ষরে উৎকীর্ণ ইউসুফি শাহী লিপিটি এখন কোলকাতা যাদুঘরে রক্ষিত আছে। জেনারেল ক্যানিংহাম তার নিজের ভাষাতে একে দারসবাড়ী বা কলেজ বলেছেন। এ ঐতিহাসিক কীর্তির মাত্র কয়েকগজ দূরে ভারতীয় সীমান্ত।

কানসাটের জমিদার বাড়ী

শিবগঞ্জ উপজেলা কানসাট একটি প্রাচীন গ্রাম। এখানকার জমিদারদের আদিপুরুষ প্রথমত বগুড়া জেলার কড়ইঝাকৈর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। দস্যু সরদার পন্ডিতের অত্যাচারে তারা ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছাতে স্থানান্তরিত হন। পরে তারা নবাবগঞ্জের কানসাটে এসে স্থায়ী হন। সূর্য্যকান্ত, শশীকান্ত ও শীতাংশুকান্ত এই বংশের অধঃস্তন বংশক্রম। প্রজা সাধারণের জন্য এরা কিছু রেখে যেতে পারেননি। এরা মুসলিম বিদ্বেষী জমিদার হিসেবে কুখ্যাতি লাভ করেন। জমিদার কার্য ছাড়াও এরা হাতির বেচাকেনা করতেন। আসামে এদের একটি খেদা ছিল। এই জমিদার পরিবারে মুসলিম বিদ্বেষের বহু দৃষ্টান্ত এতদঞ্চলে বিদ্যমান। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় কাগজী পাড়ায় মুসলিম সম্প্রাদায়কে উচ্ছেদ করার ষড়যন্ত্রের ফলে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে এক দাঙ্গা-হাঙ্গামার সুত্রপাত হয়। ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে স্থানীয় শ্যামপুর চৌধুরী পরিবারের নেতৃত্বে বাজিতপুর গ্রামের আম্রকাননে প্রায় ১২টি ইউনিয়নের মুসলমান সম্প্রদায় একত্রিত হয়ে উক্ত ঘটনার জোর প্রতিবাদ জানায় এবং একটি মামলা দায়ের করে। এই মামলায় জমিদার শিতাংশু বাবু হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা অনুমান করে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়কে ডেকে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং সাময়িক বিপদ হতে রক্ষা পান।
প্রাচীনকালে এখানে কংসহাট্টা নামক রাজার বাড়ী ছিল বলে জানা যায়। তার নামানুসারেই স্থানটির নাম কানসাট হয়। আবার অনেকে এর অন্য প্রকার নামকণের কথাও বলে থাকেন।
কান+সাট= কানসাট। সাট অর্থ বন্ধ কর। বঙ্গ অধিকারী রানী স্বর্ণময়ীর রাজধানী ছিল নিকটস্থ পুখুরিয়া গ্রামে। পুখুরিয়া বাগদীপাড়ায় এখনও এর ধ্বংসাবেশেষ দেখা যায়। এই রানীর তোপকামানের শব্দে স্থানীয় লোকের কান বন্ধ করতে হতো। কানসাট নামের উৎপত্তি এভাবেই হয় বলে অনেকের ধারণা।

শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর মাজার

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে (গৌড়ের পূর্বাঞ্চলে) ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব যারা বহন করেছিলেন তাদের মধ্যে স্বনাম খ্যাত সাধক হযরত শাহ সৈয়দ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) অন্যতম। সুলতান শাহ সুজার রাজত্বকালে (১৬৩৯-১৬৬০ খ্রিঃ) তিনি দিল্লী প্রদেশের করোনিয়ার নামক স্থান থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে নানা স্থান ভ্রমন করে রাজমহলে এসে উপস্থিত হন। তার আগমনবার্তা জানতে পেরে শাহ সুজা তাকে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানান এবং তার নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। পরে তিনি গৌড়ের উপকন্ঠে (শিবগঞ্জ উপজেলার) ফিরোজপুরে স্থায়ীভাবে আস্তানা স্থাপন করেন। দীর্ঘদিন এতদঞ্চলে তিনি সুনামের সঙ্গে ইসলাম প্রচার করে ফিরোজপুরেই ১০৭৫ হিজরী (১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে) মতান্তরে ১০৮০ হিজরীতে (১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে) সমাধিস্থ হন। পারস্য দেশীয় একটি বিবরণীতে হযরত শাহ নেয়ামতউল্লাহ সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা হয়েছে। তিনি একজন জবরদস্ত আলেম ও আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন। ষোড়শ শতকের শ্রেষ্ঠ আওলিয়াগণের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তাহখানা প্রাসাদটি শাহ সুজা, শাহ নেয়ামতউল্লাহর বসবাসের জন্য প্রদান করেন। পরে তিনি সেখানে একটি ৩ গমবুজ মসজিদ নির্মান করেন এখনও তা অক্ষত অবস্থায় রয়েছে।
হযরত শাহ নেয়ামতউল্লাহ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বংশধর ও পুরুষানুক্রমিক ওলী ছিলেন। তিনি হাকিকাত ও মারেফাতের শ্রেষ্ঠ কামেল দরবেশ ছিলেন। তাঁর মত একজন ধর্মনিষ্ঠ আউলিয়া যাতে আজীবন নির্বিঘ্নে শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম ও মুসলমানের সেবা এবং রাজ্যের উন্নতি করতে পারেন -সেজন্য বাদশাহ আলমগীর মহিউদ্দিন আওরঙ্গজেব সুবায়ে বাঙলা সরকার জান্নাতাবাদে পরাগণে দারাশাকে ৫,০০০/- টাকা আয়ের সম্পত্তি তার ও তার বংশধরদের ভরণপোষণের জন্য দান করেন। তিনি প্রায় ৩৩ বছর এই সম্পত্তির আয় থেকে এই মসজিদ ও খানকার যাবতীয় খরচাদি নির্বাহ করে গেছেন। তার মৃত্যুর পরও অনেকদিন পর্যন্ত সম্পত্তির আয় হতে খানকা ও মসজিদের জন্য ব্যয় হতো।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফরমানটি নিম্নরূপঃ‘‘যেহেতু (সুলতানের) উদার ও ধার্মিক অন্তরে সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ এবং নবীর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত সাঈদদের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছা পূরণের অভিলাষ গভীরভাবে বদ্ধমূল, সেজন্য এই শুভ সময়ে সাঈদ ও আমীরবৃন্দের এবং যার হাকিকাত ও মারিফাতের (আধ্যাত্মিক জ্ঞান) সাথে সুপরিচিত, তাদের আশ্রয়স্থল শাহ নেয়ামতউল্লাহর প্রতি রাজকীয় দানশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে। কল্যাণ ও দয়ার আশ্রয় থেকে এই মর্মে একটি মহান ফরমান জারী করা হয়েছে যে, শরৎকালীন ফসলের শুরু থেকে বাংলা সুবার (প্রদেশ) জান্নাতাবাদ সরকারের দরসড়ক পরগানা থেকে ৫০০০/- টাকা তার বংশধরগণের ভরণপোষণের জন্য মঞ্জুর করা হলো। যাতে তিনি আরাম আয়েশে জীবন যাপন করতে পারেন এবং সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করতে পারেন। সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাগণ এই রাজকীয় আদেশ স্থায়ী বিবেচনা করবেন এবং সে পরগণার যে সব মৌজার আয় ৫,০০০/- টাকা সেগুলো তার নিকটে তার ভরণপোষণের নিমিত্তে হস্তান্তর করতে হবে। পরলোকগত সুলতানের এটি সাবেক ফরমান দ্বারা দরবেশকে যে মদদ-ই-মাশের (খরচ) মঞ্জুরী দেয়া হয়েছিল, উপরোক্ত অর্থ এর অতিরিক্ত বিবেচনা করতে হবে। ফরমানের মধ্যে উল্লেখ নেই এমন কিছু (অর্থাৎ মঞ্জুরী) বাতিল বলে গণ্য করতে হবে। মূল ফরমানটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই ফরমানটি যা রবিউস সানি ১০৭৭ হিজরীতে প্রতিপালিত হয়েছে বলে সম্রাটকে জানানো হয় এবং শাহজাহানের ১৬ই রবিউস সানি, ১০৪৩ হিজরী তারিখে পূর্বতন ফরমানটি এই উভয় ফরমানের সত্যায়িত অনুলিপি মালদহ কালেকটরেটে পাওয়া যায়। গৌড়ের ফিরোজপুরে যে, পতিত জমি সৈয়দ শাহ নেয়ামতউল্লাহ চাষের অধীনে এনেছিলেন এবং যার আয় থেকে তিনি সেখানে তার নির্মিত একটি মসজিদ ও খানকার ব্যয় নির্বাহ করতেন, পূর্বতন আদেশটি দ্বারা তার উপর যে কোন ধরণের কর আরোপে নিষিদ্ধ করা হয়। ফরমান দুটির তারিখ দৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, দরবেশ অন্তত ৩৩ বছর ফিরোজপুরে বসবাস করেন এবং তার মৃত্যুর তারিখ ১০৮০ হিজরী।

তিন গম্বুজ মসজিদ

শিবগঞ্জ উপজেলা ফিরোজপুরস্থিত শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহঃ) প্রতিষ্ঠিত তদীয় সমাধি সংশ্লিষ্ট তিন গম্বুজ মসজিদটি মোঘল যুগের একটি বিশিষ্ট কীর্তি। এতে ৩টি প্রবেশ পথ এবং ভেতরে ৩টি মেহরাব রয়েছে। মসজিদের ভেতর ও বাইরে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য কারুকার্য নেই। দেয়ালে কয়েকটি তাক আছে। স্থানীয় জনসাধারণ এই মসজিদে নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করে থাকেন। এই মসজিদ সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে সুলতান শাহ সুজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত দ্বিতল ইমারত মোঘল যুগের আর একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য কীর্তি। ইট নির্মিত ইমারতটি তোহাখানা নামে প্রসিদ্ধ। কথিত আছে বঙ্গ সুলতান শাহ সুজা তাঁর মোরশেদ হযরত শাহ নেয়ামতউল্লাহর উদ্দেশ্যে (রাজত্বকাল ১৬৩৯-৫৮ খ্রিঃ) শীতকালীন বাসের জন্য ফিরোজপুর তাপনিয়ন্ত্রণ ইমারত হিসেবে এ ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। সময়ে সময়ে শাহ সুজাও এখানে এসে বাস করতেন। এর দৈর্ঘ্য উত্তর দক্ষিণে ১১৬ ফুট ও প্রস্থে ৩৮ ফুট। এতে ছোট বড় অনেক কামরা ও উভয় পার্শ্বে বারান্দা ছিল।
জনশ্রুতি আছে যে-শাহ সুজা যখন ফিরোজপুরে মোরশেদ শাহ নেয়ামতউল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসতেন তখন উক্ত ইমারতের মধ্যবর্তী সুপ্রশস্ত কামরাটিতে বাস করতেন। গৌড়ের প্রাচীন কীর্তির মধ্যে এই শ্রেণীর ইমরাত এই একটিই পরিলক্ষিত হয়। কড়িকাঠের উপর খোয়া ঢালাই করে যার ছাদ ও কোঠা জমাট করা হয়েছিল। উল্লেখিত মসজিদ ও তাহখানার নিকটস্থ সরোবর দাফেউল বালাহর তীরে অবস্থিত। এই দুই ইমারত হতে দুইটি সিড়ি সরোবরের তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্বতীর হতে এই ইমারত দুটোর দৃশ্যাবলী খুবই মনোরম।

খঞ্জনদীঘির মসজিদ

দারসবাড়ী মসজিদের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বল্লাল সেন খননকৃত বালিয়া দীঘির দক্ষিণ পাড় ঘেঁষে পূর্বদিকে কিছুদূর গিয়ে চোখে পড়ে খঞ্জনদীঘির মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। একটি প্রাচীন জলাশয়ের পাশেই এ ধ্বংসাবশেষটি অবস্থিত। খঞ্চনদীঘির মসজিদটি অনেকের নিকট খনিয়াদীঘির মসজিদ নামে পরিচিত। আবার অনেকে একে রাজবিবি মসজিদও বলে থাকেন। বহুকাল ধরে মসজিদটি জঙ্গলের ভেতর পড়েছিল। কিছুকাল আগে জঙ্গল কমে গেলে মসজিদটি মানুষের চোখে পড়ে। কিন্তু ইতোমধ্যে মসজিদটি প্রায় শেষ অবস্থায় এসে পৌছেছিল।
প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ এখন এটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বর্তমানে মসজিদটির একটি মাত্র গম্বুজ ও দেয়ালের কিছু কিছু অংশ কোন রকমে টিকে আছে। এগুলোর অবস্থাও খুব জীর্ণ। পূর্বে এই মসজিদের আয়তন ছিল ৬২Í৪২ ফুট। গম্বুজটির নিচের ইমারত বর্গের আকারে তৈরী। এই বর্গের প্রত্যেক বাহু ২৮ ফুট লম্বা। এটি মাঝের গম্বুজ। বড় কামরার সামনের দিকে (পূর্ব) একটি বারান্দা ছিল। ইটের তৈরী এ মসজিদের বাইরে সুন্দর কারুকাজ করা ছিল। যার নমুনা খুব সামান্য হলেও রয়েছে। খঞ্চনদীঘির মসজিদ কখন নির্মিত হয়েছিল এবং কে নির্মাণ করেছিলেন সে সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে মসজিদ তৈরীর নমুনা দেখে পন্ডিতেরা অনুমান করেন যে এটি পনেরো শতকে নির্মিত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24

            জেলা তথ্যবাতায়ন