Golden Bangladesh
নরসিংদী জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নরসিংদী জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

ড্রিমল্যান্ড হলিডে পার্ক

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে তাঁতশিল্পে সমৃদ্ধ নরসিংদী সদর উপজেলার চৈতাব নামক স্থানে গড়ে উঠেছে বিনোদনের এক স্বর্গরাজ্য। এখানে জলকামান, ওয়াটার আম্ব্রেলা, রাজহংস, রেইনবো ওয়াটার, ঐতিহাসিক টাইটানিকসদৃশ জাহাজ, যা অর্ধডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে। যার মধ্যে আছে প্রতি ৫ মিনিট পরপর পানির ফোয়ারায় গা ভাসিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা। আরও রয়েছে ড্রাইভিং টিউব, যাতে আপনি অনায়াসে পানির তোড়ে ভেসে যাবেন। এর সঙ্গে রয়েছে পানির ছন্দে বাজানো মিউজিক, আপনাকে মুহূর্তের মধ্যে করবে রোমাঞ্চিত ও শিহরিত। পার্কে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ, আছে নয়নাভিরাম ক্যানেল। যেখানে ফাইটার ৮ বোট চালিয়ে আপনি অনায়াসে ঘুরে বেড়াতে পারবেন। আরও রয়েছে সাউন্ড সিস্টেম ও সার্বক্ষণিক সুরের মূর্ছনা, রকিং হর্স অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়ে শিশুরা চলে যাবে স্বপ্নপুরীর দেশে। আরও রয়েছে নাগেক ক্যাসেল। যেখানে শিশুরা সারাক্ষণ লম্ফঝম্প করে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। এয়ার বাইসাইকেল, যা বাংলাদেশের পার্কের জন্য এক নতুন সংযোজন। এতে বসে দুজন মানুষ অনায়াসে নিজ ইচ্ছায় প্যাডেল চালিয়ে পার্কের ওপর দিয়ে বেড়াতে পারবে। অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ইমু পাখি এ পার্কের অন্যতম আকর্ষণ। মায়াবী স্পটে কৃত্রিম জলজ প্রাণীর পিঠে চড়ে পৌঁছে যাবেন রূপকথার মৎস্যকন্যা মায়াবী দানবের দেশে। কিন্তু এখানে পৌঁছতে আপনাকে সাহসী হতে হবে। কৃত্রিম অভয়ারণ্য অর্থাৎ হরিণ, কুমির, অজগরসহ বিভিন্ন প্রাণীর সমাহার থাকছে এখানে। এছাড়া ক্যানেলের চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াতে সুপ্রশন্ত ফুটপাত এবং কুঁড়েঘরে বসে বিশ্রাম নেয়ার সুব্যবস্থা, রাতযাপনের জন্য রয়েছে ডুপ্লেক্স বাংলো প্যাটার্নের কটেজ। যার মধ্যে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ সপরিবারে থাকার সুব্যবস্থা। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার লাইভ ফিশ ক্রয় করে নিজে তৈরি করে বার-বি-কিউ খাবার সুবিধা। পার্কটিতে সার্বক্ষণিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা ও সরকার প্রদত্ত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীর তত্ত্বাবধানে সুশৃংখল নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গাড়ি পার্কিয়ের বিশাল জায়গা, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজস্ব কটেজে থাকার ব্যবস্থা ও সুবিশাল বাংলো। যেখানে সিঙ্গেল ও ডবলসহ সপরিবারে পূর্ণ বাংলো ভাড়ার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসম্মত ঘরোয়া পরিবেশে খাবারের ব্যবস্থা, যা অত্যাধুনিক ফুডকোর্টে বসেই খাওয়া যাবে। রয়েছে কফি হাউস। পার্কে শিশু-কিশোরদের জন্য বেশ কয়েকটি রাইড রয়েছে ফ্রি। আছে সুবিশাল লেক। যেখানে অনায়াসে হংসরাজ প্যাডেল বোটে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া এখানে রয়েছে সুবিশাল দুটি পিকনিক স্পট। এক থেকে দেড় হাজার লোক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ সারাদিন পিকনিকের সুযোগ পাবে। পার্কটির ভেতরে আপন মহিমায় শোভাবর্ধন করে দাঁড়িয়ে স্থান করে নিয়েছে দেশী-বিদেশী নানা প্রজাতির সব প্রাকৃতিক পাছপালা।

নাসিরনগর যেতে যেতে

মোঃ জাভেদ হাকিম
বন্ধুদের নিয়ে দলবেঁধে ভ্রমণের পাশাপাশি পরিবার নিয়েও ভ্রমণে যেতে ভালোবাসি। তেমনি এক সকালে স্ত্রী, কন্যাকে নিয়ে ছুট দিলাম সোনাইমুড়ী পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। এলাকাটি নরসিংদী জেলার শিবপুর থানার অন্তর্গত। লালমাটি ঘেরা বৃহদাকার বিভিন্ন বৃক্ষে সমৃদ্ধ সোনাইমুড়ী। ফাগুনের আগুনঝরা গরমেও হিম হিম ঠাণ্ডা। মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায় নির্মল বাতাসে। ঢাকার পাশেই নয়নাভিরাম সোনাইমুড়ী। নজরকাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চারদিকে সবুজের সমারোহ, চেনা-অজানা পাখির কল-কাকলি দেহ-মনে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। শিশুদের জন্যও রয়েছে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা। বড়দের সহযোগিতা ছাড়া শিশুরা নিজে টিলার ওপরে উঠতে পেরে যারপরনাই আনন্দিত, উচ্ছ্বসিত। এবার ভৈরবের চণ্ডিবের এলাকার হক মঞ্জিলে যাওয়ার পালা। অনুমতিক্রমে প্রবেশ করা সম্ভব। মঞ্জিলের কর্তা বিভিন্ন ফল ও ফুলগাছ সাজিয়েছেন, কৃত্রিমতাকে পাশ কাটিয়ে সম্পূর্ণ প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। যার কারণে সারাক্ষণই পাখির ডাকে পরিবেশ মুখরিত থাকে। নির্দয় শিকারী থেকে শতভাগ মুক্ত বাসা বেঁধে থাকা পাখিকুল। পড়ন্ত বিকালের ঝিরঝির বাতাসে জলপাই গাছের নিচে বসে কোকিলের মিষ্টি কণ্ঠের কুহু কুহু ডাক কখনও ভোলার নয়। ইচ্ছে হলে গাছ থেকে পেড়ে নানা ফলের তাজা স্বাদ নেয়া সম্ভব। বিশেষ করে মালাইওয়ালা ডাবের তুলনাই হয় না। কালের পরিক্রমায় ফিরে আসবে বসন্ত আবার ছুটে যাব সদলবলে হক মঞ্জিলে। মনের গহীনে এই বাসনাই পুষে রাখলাম আগামী ফাগুন পর্যন্ত। পাখির কিচিরমিচিরে খুব সকালে ঘুম ভাঙল। ফ্রেশ হয়ে ছুট দিলাম ভৈরব ব্রিজের নিচে। ভৈরববাসীর জন্য এটি অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। মেঘনা পাড়ের বাতাস, টলটলে পানি, কিছুক্ষণের জন্য আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম শৈশবের স্মৃতিতে। ছলাৎ ছলাৎ পানির শব্দে টনক ফিরে এলো, আমার জš§ভূমি পুরান ঢাকার বাদমতলীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদীর আজ কি বেহাল দশা! মেঘনা নদীর পানিতে হাত-মুখ ভিজিয়ে বুড়িগঙ্গার পুনঃজীবন কামনা করে অগ্রসর হলাম ব্রিজের অপর প্রান্তে অবস্থিত আশুগঞ্জ সার কারখানার দিকে। ইতিমধ্যে যোগ দিল আমার দুই বন্ধু, পূর্বপরিচিত এক কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য থাকায় ভেতরে প্রবেশ করে দেখা হল, জানা হল, কিভাবে সার, বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপন্ন হয়। খোলা আকাশের নিচে শত শত ইউরিয়া সারের বস্তা পড়ে থাকতে দেখে কিঞ্চিৎ মনটা উদাস হল। তবে সার যেন বিনষ্ট না হয়, সেই জন্য ছিল রক্ষণাবেক্ষণকারীদের আপ্রাণ চেষ্টা। বন্ধু শামিমের অনুসন্ধানী প্রশ্নে দায়িত্বশীলরা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়েছেন, সেই সঙ্গে আমিও বিব্রত। তবে ওর ওপর সব রাগ মিলিয়ে গিয়েছিল, যখন অনির্ধারিত ভ্রমণ বি-বাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার পথে। ওয়াও! কি সুন্দর দৃশ্য? এ পথে না এলে হয়তো ভ্রমণের সার্থকতা পূর্ণ হতো না। দোস্ত তোকে ধন্যবাদ, তবে কোথাও গিয়ে কাউকে অবান্তর প্রশ্ন করাও ঠিক নয়। সমর্থন দিল চন্দন। ভুল বুঝতে পেরে মাথা নোয়াল। আমাদের গাড়ি পার্কিং করলাম বেইলি ব্রিজের ওপর। দু
পাশে বিস্তীর্ণ জলরাশি, মাঝে পিচঢালা নতুন রাস্তা। মাথার ওপর খোলা নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা, দৃষ্টির শেষসীমায় সবুজের মেলা, জলে মাছের লম্পঝম্প, সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য সবকিছু মিলিয়ে নাসিরনগর ভ্রমণের জন্য এক অনিন্দ্য সুন্দর এলাকা। ঢাকা থেকে নাসিরনগর যেতে যেতে পথে আরও অনেক কিছুই দেখা হল। এবারের ভ্রমণে নতুন সঙ্গী ছিল মিষ্টি মেয়ে লিমা, দুষ্টের শিরোমণি আলেয়া, গোবেচারা মমিন, ঈষাণ, সাইফ ও সর্বকনিষ্ঠ বাসিতাহ। ভ্রমণপিপাসুদের প্রতি তাই প্রশ্ন ্আসে দেরি কেন? চটজলদি সবকিছু গুছিয়ে বের হয়ে যাওয়া যায়।
খরচ সহনীয়, সুবিধা হবে মাইক্রো নিয়ে গেলে।

ঢাকা টু নরসিংদী

জিয়াউল জিয়া
প্রত্যেক ঈদের ছুটিতেই আমরা নারায়ণগঞ্জের বন্ধুরা মিলে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। আর এ ভ্রমণের সমন্বয়ের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে আমাদের বন্ধু ইশতিয়াক আহমেদ। এবারের ঈদে সে দেশের বাইরে ভ্রমণে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো। আমরা তার আগ্রহে সাড়া দিয়ে বললাম, আসলেই এদেশের অনেকটাই তো দেখা শেষ। বিদেশের কোথাও গেলে একটু ভ্যারিয়েশন পেতাম। কিন্তু রাতে বাসায় গিয়ে যখন দেখলাম পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ তখন আমার দেশপ্রেম বেড়ে গেল। ভাবলাম, কেন আমরা দেশের বাইরে গিয়ে সেদেশের পর্যটন শিল্পকে বিকশিত করব? অনেকেই আবার সাত দিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পারল না। যে কারণে বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনায় ব্যাপক
ভেটো পড়ল। ইশতিয়াক আর দ্বিতীয় কোন পরিকল্পনার কথা প্রকাশ না করে ঈদের পর দিন রাতে আমাদের মায়া ত্যাগ করে ভুটানের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ ত্যাগ করলেন। আমরা সমন্বয়কের অভাবে কোথাও যেতে না পেরে ঘরের মধ্যেই ঈদের ছুটি উপভোগ করলাম। ইশতিয়াক দেশে ফিরেই মিটিং কল করলো। সেই মিটিংয়ে সে জ্বালাময়ী এক বক্তৃতা দিলো যার সারমর্ম হল ঈদের ছুটিতে ঘুরতে যাওয়া আমাদের বন্ধুত্বের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে দেয়া যায় না। যেহেতু সবার অফিস শুরু হয়ে গেছে সেহেতু আমরা ঢাকার কাছাকাছি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার চিন্তা করলাম। যাতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গিয়ে আবার ওই দিনই ফিরে আসা যায়। ঠিক করলাম আমরা নরসিংদী যাব তাঁতিদের জীবনযাপন দেখতে। কিন্তু সব মিলিয়ে হচ্ছিলনা। একদিন সুযোগ পাওয়া গেলা নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে একটি বেসরকারী পার্কে। ড্রিম হলিডে পার্ক। আমরাও আমন্ত্রিত।   আমি আর ইশতিয়াক পরে বাসে যাবো। কমলাপুর বিআরটিসি বাস কাউন্টারে যেতেই সাগর নামের এক দাড়িওয়ালা লোক ইশতিয়াককে বুকে জড়িয়ে ধরল। সে জানতে চাইল আমরা কোথায় যাব? নরসিংদী যাব জেনে সে আমাদের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গাড়িতে উঠে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল।
সাগর বিআরটিসিতে চাকরি করে বিধায় সে আমাদের এ ব্যবস্থা করে দিতে পারল। যার ফলে ইশতিয়াকের অনুরোধে সেও আমাদের ভ্রমণ সঙ্গী হল। আনন্দিত হলাম সাগর যাচ্ছে। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম, যে অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। সাগরের কথার তোড়ে এসির শান্তি মুহূর্তের মধ্যেই অশান্তিতে পরিণত হল। বাসের ড্রাইভার সুপারভাইজার এমনকি যাত্রীরাও তার চিৎকার চেচামেচি হাসাহাসিতে অস্থির। এর খাবার খেয়ে ফেলে। আরেকজনের পত্রিকা ছিনিয়ে নেয় সব মিলিয়ে দিয়ে মোটামুটি বাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে ফেলে। সাগরকে নিয়ে বললে অনেক বলা যাবে কিন্তু এতটুকুই এখানে বলে রাখি যে, ও অনবরত কথা বলে। ইশতিয়াক বিষয়টার সঙ্গে পূর্ব পরিচিত বিধায় সে উপভোগ করলেও আমার প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। এসব নিয়েই আমরা এক সময় আমরা পার্কে নামলাম।
ততক্ষণে শাওনদের গাড়ি চলে এসেছে। বাইরে প্রচণ্ড গরম। ভেতরে ঢুকেই আবিষ্কার করলাম সেখানে একটি সুইমিং পুল রয়েছে। যেখানে গানের তালে তালে নাচছে এবং গোসল করছে নানা বয়সী ছেলেমেয়ে। আমি, ইশতিয়াক, মিজান এবং মানিক নামলাম না। শাওন পন্টি গং ব্যাপক আনন্দে শরীর জুড়াতে লাগল। আমরা তার পাশেই ক্যাফেটেরিয়াতে বসে কফি খেতে খেতে সেই আনন্দ প্রত্যক্ষ করছিলাম। ওদের গোসল শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা স্পিডবোটে চড়ে ঘুরলাম। পার্কের পরিবেশ ভালোই লাগলো। পার্কের কর্নধার প্রবীর সাহা আমাদের তদারকি করলেন।  সময়টা বেশ আনন্দেই কেটে গেল।
ততক্ষণে আঁধার নেমে এসেছে। এবার ফেরার পালা। নরসিংদী যেতে সময় লাগে এক ঘণ্টা দশ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা। বাস ভাড়া ৬০ টাকা। দেখার মতো কি আছে জানতে চাইলে বলব, অবশ্যই ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের মানুষ আছে সেখানে, আছে তাঁতপল্লী আর বিনোদনের জন্য ড্রীম হলিডে পার্ক। এরপর সবাই একসঙ্গে নারায়ণগঞ্জে ফিরে এলাম। ফেরার পথে ইশতিয়াককে এত সুন্দর একটা ভ্রমণ আয়োজনের জন্য ধন্যবাদের পাশাপাশি বন্ধুদের ফেলে ভুটান ভ্রমণের জন্য সামান্য ভর্ৎসনাও জানানো হল। এরপর যার যার বাসার উদ্দেশে রওনা।

রাজা নরসিংহের নরসিংদী

নরসিংদী বাংলাদেশের একটি সুপ্রাচীন সমৃদ্ধ জেলা । এবং তাঁতবস্ত্রের জন্য বিখ্যাত জনপদ।  শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদীর রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল অবদান। নরসিংদী জেলার আয়তন ১ হাজার ১৪০ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। উপজেলা আছে ৬টি। উপজেলাগুলো হলো নরসিংদী সদর, বেলাবো, মনোহরদী, পলাশ, রায়পুরা ও শিবপুর। প্রধান নদীগুলো হচ্ছে : মেঘনা, আড়িয়াল খাঁ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, হাঁড়ীধোয়া, শীতলক্ষ্যা ও কলাগাছিয়া। নরসিংদীর উত্তরে কিশোরগঞ্জ, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পূর্বে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ এবং পশ্চিমে গাজীপুর জেলা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নরসিংদী ৩ নং সেক্টরের অধীনে ছিল।

নরসিংদী শহরের নামকরণের ইতিহাস
হাবসী শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সোনারগাঁও অঞ্চলের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে শীতলক্ষ্যার তীরে হিন্দু জমিদার ধনপদ সিংহ রাজা খেতাব গ্রহণ করেন। রাজা ধনপদ সিংহের পুত্র নরসিংহী বাবার জমিদারির সীমা বৃদ্ধি করে প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে, নগর নরসিংহপুর নামে একটি ছোট্ট শহর প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের আবাসিক স্থান তৈরি করেন। বর্তমানে পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামটিই সেই শহর। ধারণা করা হয়, রাজা নরসিংহের নাম থেকেই নরসিংদী নামকরণ হয়েছে। নরসিংদীর সঙ্গে দী শব্দটির একটি ব্যাখ্যা আছে। আসলে প্রাচীনকালে শব্দটি ছিল ডিহি। সংস্কৃত ভাষায় ডিহি শব্দের অর্থ হলো ডাঙা। নরসিংদী একটি উঁচু অঞ্চল। সেই কারণেই স্বভাবতই এর নাম ছিল নরসিংহ ডিহি। পরবর্তীতে সাধারণের মুখে মুখে এর নাম হয়েছে নরসিংদী। বর্তমান সময়ে হ বিলুপ্ত হয়ে নাম হয়েছে নরসিংদী।

সারা বাংলাদেশের মতো নরসিংদীতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি
১৯৭১-এ সেনাবাহিনী তাণ্ডব চালিয়েছে। হত্যা করেছে ছাত্র, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিকামী নিরীহ মানুষ। এ জেলায় আছে অনেক বধ্যভূমি। তবে সেসব স্মৃতি এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। ঠিক তেমনই একটি স্মৃতি দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে নরসিংদী শহর থেকে ২ কিলোমিটার দক্ষিণে তারাবো সড়কের খাটেহারা সেতুতে।

এই সেতুতে যে কতজন মানুষ হত্যা করা হয়েছে তা আজ আর বলা সম্ভব নয়। তবে যুদ্ধ শেষে সেতুর আশপাশ থেকে উদ্ধার করা মাথার খুলি, কংকাল, জামাকাপড়, শাড়ি-চুড়ি-চুল দেখে এর সংখ্যা যে বেশ বড় রকমের তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

১৯৭১-এর ২৮ আগস্ট সকালে বর্বর পাকিস্তানি সেনারা নরসিংদী মহাবিদ্যালয়ে ঢুকে সরজকুমার নাথ, শিক্ষক রাধাগোবিন্দ সাহাসহ ২৭/২৮ জনকে ধরে নিয়ে আসে। হায়েনারা ওইদিন রাতের আঁধারে সবাইকে পাঁচদোনা সেতুর ওপর দাঁড় করে গুলি করে হত্যা করে। সেই স্মৃতি চিহ্ন নিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর এখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে পাঁচদোনা সেতু।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাঁচদোনা মোড়ে রয়েছে অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ ভাস্কর্য। ২০০৭ সালে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অর্থায়নে জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীন ও এহসানুল আহসান খান মিঠুর নকশায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ ভাস্কর্যে ফুটে উঠেছে বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস।

পাঁচদোনা মোড়ের পাশেই রয়েছে পাঁচদোনা ইউনিয়ন ভূমি অফিস। আর সেখানে রয়েছে একটি মঠ। ইচ্ছে করলে ঘুরে-ফিরে দেখতে পারেন মঠটি।

১৮৩৫ সালে গিরিশচন্দ্র সেন এই পাঁচদোনায় জন্মগ্রহণ করেন। সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি গুরু কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহে তিনি ইসলামী সাহিত্য সাধনা শুরু করেন এবং ১৮৮৬ সালে প্রথম পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ সম্পন্ন করেন। বাংলা সাহিত্যে এটাই তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ধর্ম সম্পর্কে জানার আগ্রহ, চারিত্রিক উদারতা এবং সত্যবাদিতার জন্য গিরিশচন্দ্র সব মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। বলা চলে তিনি ছিলেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের প্রতীক। তাই সকলে তাকে ভাই গিরিশচন্দ্র নামেই ডাকত। ১৯১০ সালে গিরিশচন্দ্র সেনের কর্মময় জীবনের অবসান হয়।

উয়ারী বটেশ্বর

এই দুই জায়গা একদা ছিল রাজধানী। প্রাচীন আমলেই গড়ে উঠেছিল উয়ারি বটেশ্বর। যুদ্ধরাজ বম্বেট শক্তিমান গ্রিকবীর আলেকজান্ডার যে জাতির ভয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন সে জাতির বসবাস ছিল এই দুই গ্রামেই। সেই জাতির নাম গঙ্গারিডি। নরসিংদীতেই ছিল তাদের বসবাস। উয়ারি বটেশ্বরে আড়াই হাজার বছরের প্রতœনিদর্শন আবিষ্কারের কাহিনী একটি জনপদের অস্তিত্বের কথা প্রমাণ করে দেয়। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তী উয়ারী দুর্গনগরীকেই এই জনপদের রাজধানী মনে করেন। এখানে পাওয়া গেছে প্রাচীন দূর্গনগরী, বন্দর, রাস্তা, র্পাশ্বরাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, পাথরের পুঁতি, মুদ্রাভান্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা যা নরসিংদী জেলা সদর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে বেলাব উপজেলার আমলার ইউনিয়নে উয়ারী বটেশ্বরে অবস্থিত। উয়ারি বটেশ্বরে পাওয়া গেছে স্বল্প মূল্যবান পাথরের গুটিকা, কাচের গুটিকা, রৌদ্রমুদ্রা, উচ্চমাত্রায় টিনমিশ্রিত ব্রোঞ্জ নির্মিত নবযুক্ত পাত্র। উত্তরভারতীয় মসৃণ কালো মৃৎপাত্র প্রভৃতি নির্দশনগুলোকে প্রতœতাত্ত্বিকরা খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক র্পযন্ত সীমায় ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধানণা করেছেন। উয়ারী গ্রামে একটি অস্থায়ী জাদুঘর প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা অথবা সিলেট থেকে সড়কপথে রওনা দিলে আপনি মরজাল বাসস্ট্যান্ডে নেমে যাবেন। মরজাল থেকে ৪ কি. মি. দূরে উয়ারী বটেশ্বর। এ পথে রিকশা নিয়ে আসা যাবে।

মনোহরদী উপজেলা সদর থেকে কয়েক মাইল দূরে গেলে বনাঞ্চল দেখতে পাবেন। এখানে বানরসহ নানান জাতের বন্যপ্রাণী বসবাস। এছাড়া রঘুনাথ মন্দির ঘুরে দেখুন। এটি খুবই আকর্ষনীয়।

নরসিংদী যেভাবে যাবেন
ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের কাঁচপুর ব্রিজ পার হয়ে বামে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে একটু এগুলেই নরসিংদী। ঢাকা থেকে নরসিংদীর দূরত্ব মাত্র ৫৪ কিলোমিটার। গুলিস্তান, সায়েদাবাদ ও আব্দুল্লাহপুর থেকে নরসিংদীর বাস পাওয়া যায়। বিভিন্ন পরিবহন ৫ মিনিট পর পর নরসিংদী যাচ্ছে। যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। ভাড়া ৬০ টাকার  মতো। ট্রেনেও নরসিংদী যেতে পারবেন। ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে নরসিংদী যেতে ট্রেনে সময় লাগে ১ ঘণ্টার মতো, ভাড়া ৩০ টাকা।

যেখানে থাকবেন
নরসিংদী সকালে এসে ঘুরেফিরে রাতে ফেরত যেতে পারবেন। শহরে থাকা-খাওয়ার বেশ কয়েকটি ভালো হোটেল আছে, আছে নরসিংদী শহরে ডাকবাংলোও, রয়েছে হোটেল।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24