Golden Bangladesh
নারায়নগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নারায়নগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

রাসেল পার্ক

যানজট না থাকলে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে মাত্র আধাঘন্টার পথ। রূপগঞ্জ উপজেলা সদরের মাহমুদাবাদে এলে পৌছে যাবেন মনোমুগ্ধকর রাসেল পার্কে। সবুজ স্নিগ্ধ গ্রামীণ নিসর্গের পটভূমিতে জৈনক রাসেল ভূইয়া গড়ে তুলেছেন মনোরম এই বিনোদন কেন্দ্রর। তিনি নেই তবু তার স্মৃতি আগলে রেখেছে এ পার্কটি। উপজেলা সদর থেকে  চমৎকার পথ চলে গেছে রাসেল পার্ক পর্যন্ত। দুপাশে সবুজের ঘন সমারোহ, দিগন্তপ্রসারী ফসলের মাঠ পেরিয়ে খানিক দূর এগুতেই পৌছে যাবেন গন্তব্যে। বছর দশেক আগেও এলাকাটির আলাদা কোন বৈশিষ্ট ছিলনা। ছিল কিছু হাজামজা ডোবা আর ধানক্ষেত। বর্তমানে পার্কটির কারনে এখন এটি একটি ব্যস্ত পর্যটন নগরী। এটিই এখন সারা দেশে রাসেল পার্ক নামে পরিচিত। পার্কে রয়েছে একটি মিনি চিড়িয়াখানা। হরিণ, ভাল্লুক, হনুমান, ময়ুর, বানর, সাপ, বেজি থেকে শুরু করে অসংখ্য পশু পাখি রয়েছে এই চিড়িয়াখানায়।  এছাড়াও সারা পার্ক জুড়ে শোভা পাচ্ছে কংক্রিটের তৈরি বাঘ, ঘোড়া, হাতি,আছে সবুজ ঘাঁসে মুখ গুঁজে থাকা চিত্রা হরিনের দল।
পার্কের এক পাশে রয়েছে গজারী বন। সারিবদ্ধ সবুজের এই সমারোহ পার্কে পিকনিকে আসা দূরদুরান্তের দর্শনার্থীদের একটি পছন্দের স্থান। এ ছাড়া রয়েছে ঘাটবাঁধা পুস্পপুকুর। এ ছাড়া জিবন্ত হাসের ছুটাছুটিতো চোখে পরবেই। পুকুরের দু
ধারে দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে ঝুলন্ত ২টি শেড। এখানে বসে পুকুর আর পুরো পার্কের নিসর্গ শোভা উপভোগের চমৎকার ব্যবস্তা করা হয়েছে। পাশেই আছে শুটিং স্পট। আছে প্রসাধনের ব্যবস্থা সম্বলিত ড্রেসিং রুম। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হলে বিশ্রামের জন্য রয়েছে সুসজ্জিত কটেজ। আহারের জন্য রয়েছে পার্কের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট ও ফাস্ট ফুডের দোকান। আছে পিকনিক পার্টির জন্য বিশাল ডাইনিং হল। এখানে রাত যাপনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। যারা রাত যাপন করতে চান তাঁরা পার্কের রেষ্ট হাউজে থাকতে পারেন। দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে পার্কে রয়েছে কৃত্রিম লেকে নৌবিহারের ব্যবস্থা। স্লিপার লাগানো সুসজ্জিত নৌকা রয়েছে বেশ কয়েকটি। আর আছে বিশাল গোলাপ বাগান। পুরো পার্কটি সাজানো হয়েছে হাজারো দেশী-বিদেশী ফুল দিয়ে।

পন্ড গার্ডেন পার্ক

শীতলক্ষা নদীর পূর্বতীরবর্তী রূপগঞ্জের চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশে কাঞ্চন সেতুর ধার ঘেষে গড়ে উঠেছে একটি চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র। বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ পার্কটি ইতো মধ্যেই ভ্রমনপিপাসুদের নজর কেড়েছে। গ্রামীণ নৈসর্গে গড়া বিশাল এ পার্কটিতে বিনোদনের জন্য রয়েছে নানা আয়োজন। পুকুরের মাঝখানে ফোয়ারা আর ভাসমান সেতু দর্শনার্থীদের নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করবে। পুকুর থেকে তাজা মাছ ধরে পরিবেশনের ব্যবস্থাও আছে এখানে। এখানে আছে ১৬ সিটের সুপার চেয়ার, শিশুদের জন্য রয়েছে ইঞ্জিন ট্রেন, আনন্দ ঘুর্ণন, হেলিকপ্টার,ব্যাটারি গাড়ী,স্লিপার, দোলনা, ঢেকি ইত্যাদি। পার্ক জুড়ে চোখে পরবে চিত্রা হরিন, বানর আর পাখিদের ছুটাছুটি। আছে হরেক রকমের জীবিত মাছ নিয়ে সাজানো ফিস মিউজিয়াম। ১শ থেকে ৫ শ জন পর্যন্ত পিকনিক করতে পারেন এখানে। খাবার জন্য রয়েছে দ্বিতল ডাইনিং হল। আছে বাবুর্চি, ডেক-হাড়িপাতিলের ব্যবস্থা। পিকনিকে আসা লোকদের জন্য রয়েছে খেলাধুলার বিশেষ ব্যবস্থা। এখানে যে খেলাগুলোতে অংশগ্রহন করে নিজেরা আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি সঙ্গীদের মনোরঞ্জন করতে পারেন তাহলো মিউজিক্যাল চেয়ার, মিউজিক্যাল পিলো রানিং, রশি টানাটানি, বাস্কেট, ভলি, ব্যাডমিন্টন, হাড়ি-ভাঙ্গা ইত্যাদি। পার্কটিতে পর্যাপ্ত পরিমানে পানিয়জল, বিদ্যুৎ ও টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। আছে ফাস্টফুডের দোকান। আছে গাড়ি পাকিংয়ের ব্যবস্থা। এখানে এলে ফোয়ারা, ভাসমান সেতু, বিশাল ফুলের বাগান আপনাকে সত্যিই মুগ্ধ করবে। পার্কের দর্শনার্থী বিশ্রামাগারের দ্বীতিয় তলার খোলামেলা বাড়ান্দায় বসে ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন। কোলাহলমুক্ত এই স্থানটির মনোরম পরিবেশ আপনার মনকে আনন্দে মাতিয়ে তুলবে।

জিন্দা পার্ক

রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের জিন্দা গ্রামে বিশাল এলাকার উপর গড়ে তোলা হয়েছে জিন্দা নামের এই পার্কটি। অপস নামে একটি সামাজিক সংগঠনের অর্থায়নে এ পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। টিলা আর লেক বেষ্টিত এ পার্কের ভেতরে  আছে দ্বি- পুকুর। লেকে নৌকায় চড়ে ভ্রমনের সুযোগ। পার্কের ভেতরেই রয়েছে মার্কেট সেখানে সব ধরনের কেনাকাটা করতে পারে দর্শনার্থীরা। আছে লাইব্রেরী, ক্যান্টিন, প্রাণী জগত। পার্কের ৫০ ভাগ জুড়ে আছে লেক। লেকের পাড়ে ফুলের বাগানে নিরিবিরি চুটিয়ে আড্ডা দেবার মত জায়গা রয়েছে। এখানকার লাভ লেক প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য আকর্ষনীয় স্থান। পুরো পার্কে পুকুর লেক ছাড়া রয়েছে ঘন সবুজ অরণ্যে ঘেরা ছোট বড় টিলা। পার্কে আছে বাংলো, রেস্টুরেন্ট,স্লিপার,দোলনা। আছে সবুজ ঘাষে ঢাকা শিশুদের খেলার মাঠ। লেকময় ঘুরে বেড়ানোর জন্য ১০ টি নৌকা রয়েছে। আছে চিকিৎসার জন্য ফ্রি ক্লিনিক। নিরাপত্তা ও সেবার জন্য রয়েছে একঝাক তরুন তরুনী। যারা সর্বক্ষন দর্শনার্থীদের সেবায় নিয়োজিত। শুটিং ও পিকনিকের এক অনন্য স্থান জিন্দা পার্ক । রূপগঞ্জের জিন্দা গ্রামের ৫ প্রতিভাবান কিশোর এক যুগ আগে জিন্দা গ্রামকে আদর্শ গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষে অপস নামে এক সেবামূলক সামাজিক সমিতি চালু করে। এই কিশোররা স্বপ্ন দেখেনি স্বর্নকমল বানানোর; স্বপ্ন দেখেনি বিদেশে পাড়ি জমানোর। তারা স্বপ্ন দেখেছে হতদরিদ্র মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের। তাদের স্বপ্ন ছিল একটাই অজোগাঁ জিন্দাকে আদর্শ মডেল গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তাদের সে স্বপ্ন আজ সত্যি হয়েছে। জিন্দা আজ রূপগঞ্জের মডেল গ্রাম হিসেবে ¯ী^কৃতি পেয়েছে। পাশাপাশি জিন্দা পার্কের কারনে জিন্দার সুনাম ছড়িয়ে পরেছে সারা দেশে।

এছাড়া যেতে পারেন ইউসুফগঞ্জ উপশহর এলাকায়। বিশাল এলাকা জুড়ে ছোট ছোট টিলা, সমতল ভূমি, শালবন,কাঠাল বাগান। সব মিলিয়ে কি বিচিত্র এখানকার রূপ। প্রাকৃতিক এ সৌন্দর্যে নিঃসন্দেহে আপনি অভিভূত হবেন। মনে হবে অসংখ্য বোটানিক্যাল গার্ডেনের জন্ম যেন এ এলাকায়। আর তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়ায় রযেছে আগেকার দিনের রাজাবাদশা,জমিদার ও সওদাগরদের মতো প্রায় ১৫টি বজরা ও ময়ূরপঙ্খি নৌকা। এগুলো দিয়ে শান্ত শীতলক্ষা নদীতে দিনভর ভ্রমর করতে পারবেন। যেতে পারেন কাঞ্চনের মশারি পল্লী কিংবা নোয়াপাড়ার জামদানী পল্লীতে। এখানকার কারিগরদের তৈরী কাজ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সব মিলিয়ে এই শীতে ১ দিনের জন্য সময় করে বেড়িয়ে পরতে পারেন রূপগঞ্জের উদ্দেশ্যে । রূপগঞ্জের রূপ আপনাকে সত্যিই মুগ্ধ করবে।

বিজয়ের স্মৃতিতে জড়ানো নারায়ণগঞ্জ

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত ইতিহাস-ঐতিহ্য অর্জনে কোন দিক থেকে কমতি নেই নারায়ণগঞ্জের। এ কারণে প্রাচীনকাল থেকে বহির্বিশ্বের কাছে নারায়ণগঞ্জের ব্যাপক পরিচিত রয়েছে। দেশের সংকট মুহূর্তের সময় এ মহানগরীর বাসিন্দারা কখনও পিছিয়ে থাকেনি। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ৬ দফা কর্মসূচি, ৬৬-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, সর্বশেষ ৭১-এর দেশমাতৃকার সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জবাসী ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। ৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিকে ধরে রাখতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে একাধিক স্মৃতিস্তম্ভ।

বক্তাবলী স্তম্ভ : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ২৯ নভেম্বর পাক হানাদার বাহিনী বক্তাবলী ইউনিয়নে হানা দিয়ে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেন। এ সময় ১৩৯ জন শহীদ হন। তাদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল।

মাসদাইর প্রতিরোধ স্তম্ভ : ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাক হানাদার বাহিনী যখন নারায়ণগঞ্জে প্রবেশের চেষ্টা চালায় তখন নারায়ণগঞ্জবাসী সর্বপ্রথম মাসদাইর কবরস্থান এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে ছিল। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে গাছের টুকরো ফেলে পাক হানাদারদের বাধা প্রদান করে। এ স্মৃতিকে ধরে রাখতে এখানে নির্মাণ করা হয় প্রতিরোধ স্তম্ভ।

চাষাঢ়া চত্বরে বিজয় স্তম্ভ : স্বাধীনতা সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জবাসী ব্যাপক ভূমিকা রাখার কারণে প্রথমে বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। বিজয় স্তম্ভে রাখা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের একটি নামের তালিকা। বিগত বছরগুলোতে এখানে নামে মাত্র বিজয় স্তম্ভ থাকলেও বিগত জোট সরকারের সময়ে এর পূর্ণতা লাভ করে।

মেট্রো চত্বরে বিজয় উল্লাস : স্বাধীনতা সংগ্রাম শেষে মুক্তিযোদ্ধারা এখানে পতাকা হাতে নিয়ে যে উল্লাস প্রকাশ করেছে সেভাবে এ স্তম্ভটি নির্মাণ করা হয়।

আইইটি স্কুল মোড়ে শ্রেষ্ঠ সন্তান : এখানেও একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ স্তম্ভটি তৈরি করা হয়েছে।
ডিআইটি চত্ব¡রে ফিরে দেখা ৭১ : মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বীর সন্তানরা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে, সেভাবে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা (যেটি এখন নগরভবন) এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেছে।

দেওভোগ আখড়ার মোড় স্তম্ভ : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য দেওভোগ আখড়ার মোড় এলাকায় একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মুক্তিযুদ্ধের তালিকা খচিত স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়।

ঢাকার কাছেই সুন্দর স্থাপত্য 

ফারুখ আহমেদ
জজবাড়ি মোটরসাইকেল থামিয়ে মাটিতে পা রাখতেই ঝোড়ো হাওয়া যেন আমার ওপর লাফিয়ে পড়ল। প্রবল বৈশাখ যেন তার দাপট দেখিয়ে গেল। এভাবেই প্রকৃতির অভ্যর্থনা পেলাম কলাকোপায়।
সামনে খেলারাম দাতা নির্মিত বিগ্রহ মন্দির। জলদস্যু থেকে দাতায় পরিণত হয়েছেন খেলারাম। তাঁর অনেক কীর্তিকলাপ ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কলাকোপা গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে আছে। লক্ষ্মীনারায়ণ বিগ্রহ মন্দিরটি তাঁর অমর কীর্তি। আমরা মন্দিরের ভেতর ঢুকলাম।
ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ইছামতীর তীরে কলাকোপা-বান্দুরার অবস্থান। ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশাল এক ভান্ডার কলাকোপা-বান্দুরা। উনিশ শতকেও এখানে জমিদারদের বসতি ছিল। প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ গ্রাম এই কলাকোপা-বান্দুরা। যা ছিল একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের তীর্থস্থান। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্যও চোখ জুড়ানো। যার প্রাণ ইছামতী নদী।
এখানে দেখার আছে অনেক কিছু। কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়ি বা জমিদার ব্রজেন সাহার ব্রজ নিকেতন, যা এখন জজবাড়ি নামে খ্যাত; ব্যবসায়ী রাধানাথ সাহার বাড়ি, শ্রীযুক্ত বাবু লোকনাথ সাহার বাড়ি, যার খ্যাতি মঠবাড়ি বা তেলিবাড়ি নামে; মধু বাবুর পাইন্নাবাড়ি, পোদ্দারবাড়ি, কালীবাড়ি এবং কলাকোপার কাছে সামসাবাদ তাঁতপল্লি, এর একটু দূরে আলানপুর তাঁতপল্লি। এ ছাড়া আছে হলিক্রস স্কুল এবং জপমালা রানির গির্জা, এর বাইরেও অনেক পুরোনো ভবন ও মঠ চোখে পড়বে কলাকোপা-বান্দুরায়।
নবাবগঞ্জ চৌরাস্তায় মহাকবি কায়কোবাদ চত্বর থেকে একটি সড়ক সোজা কলাকোপা চলে গেছে। অন্য সড়কটি একটু বামে কলাকোপা হয়ে বান্দুরার পথ ধরেছে। বামের এই পথ ধরে একটু সামনে এগোলেই একটি ভাঙা মন্দিরের দেখা মিলবে। এর পেছনে কোকিলপেয়ারী জমিদারবাড়ি। সামনের ভাঙা মন্দিরের মতোই ভগ্ন দশা তার। কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থেকে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে চলেছে। তার পাশেই জমিদার ব্রজেন সাহার ব্রজ নিকেতন। আশির দশকের পর একটি বিচারক পরিবার এখানে বসবাস করতে শুরু করলে ব্রজ নিকেতন জজবাড়ি নাম গ্রহণ করে। জজবাড়ি এখন কলাকোপার প্রাণ। রাস্তার এক পাশে বাড়ি। অন্য পাশে দোকান, বাজার, চাআড্ডা কত কী! তবে খুব একটা জমজমাট এখনো হয়ে ওঠেনি। জজবাড়িতে প্রচুর গাছগাছালির সমারোহ। গাছের ফাঁকে ঘুরে বেড়ায় চিত্রা হরিণ।
এ বাড়ির পাশের রাস্তাটি চলে গেছে আনসার ও ভিডিপির ক্যাম্পের দিকে। এখানে যে বাড়িতে ২৯ আনসার ব্যাটালিয়নের বসবাস, তা তেলিবাড়ি নামে খ্যাত। অনেকে একে বলে মঠবাড়ি। শোনা যায়, বাড়ির একদা মালিক বাবু লোকনাথ তেল বিক্রি করে ধনী হয়েছিলেন। তাই বাড়ির এমন নাম হয়েছে। এখানে তিন-চারটি বাড়ি আছে। ইছামতীর তীরে তেলিদের বিশাল দুটি মহল সত্যি অসাধারণ! তেলিবাড়ি থেকে সামনে ইছামতীর তীর ধরে একটু সামনে এগোলে যে ইমারতগুলো চোখে পড়বে, তার প্রথমটি পাইন্নাবাড়ি। এই বাড়ির তিন মালিকের অন্যতম মধু বাবু পান বিক্রি করে ধনী হওয়ার জন্যই বাড়িটির এমন নামকরণ।
কলাকোপা-বান্দুরায় ইছামতীর তীরে রোমান স্থাপত্যশৈলীর আরেক নিদর্শন রাধানাথ সাহার বাড়ি। বাড়িটির বয়স প্রায় ২০০ বছর। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বাড়িতে লুটপাট চলে, বাড়িটিও ভাঙচুর হয়। বাড়ির প্রধান ফটক ধরে ভেতরে ঢুকলে সামনে পড়বে বিশাল উঠোন। মাঝে জলাধার, আর তুলসী মঞ্চ। পাশেই পুজোর জন্য নির্দিষ্ট স্থান। বাড়ির মালিক রাধানাথ সাহা চাল ও সুপারির ব্যবসা করতেন। ভারতের মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত তার ব্যবসার পরিধি ছিল।
এবার রাধানাথ সাহার বাড়ি পেছনে ফেলে একটু সামনে এগিয়ে যাই। সেখানেই চোখে পড়ে খেলারামের সেই বিখ্যাত বিগ্রহ মন্দিরটি। পাশেই বিশাল পুকুর। প্রচলিত আছে, মাকে বাঁচাতে খেলারাম দাতা এই পুকুরে নেমেছিলেন। আর উঠে আসেননি। এলাকাবাসীর এখনো বিশ্বাস, খেলারাম একদিন ঠিকই ফিরে আসবেন, সঙ্গে নিয়ে আসবেন গঙ্গা নদীকে।

এবার বান্দুরায়
ফুলতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু সামনে এগোলেই নবাবগঞ্জের বান্দুরা গ্রাম। প্রথমেই চোখে পড়বে হলিক্রস স্কুল। আরেকটু সামনে এগোলে বিশাল মাঠ পেরিয়ে পাওয়া গেল জপমালা রানির গির্জা। ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই গির্জাটি গথিক শিল্পকর্মের অনন্য নিদর্শন। পুরো গির্জাটি হলুদ বর্ণের সুন্দর কারুকাজে ভরা। প্রার্থনা কক্ষ, সমাধিস্থলসহ সব দেখে মন ভরে যাবে। গির্জার সামনেই জপমালা দেবীর নামাঙ্কিত ফলক তাঁর স্মৃতি ধরে রেখেছে। ফেরার পথে সময় থাকলে তাঁতপল্লি ঘুরে আসতে পারেন। কলাকোপা-বান্দুরায় থাকার মতো ভালো হোটেল নেই। তাই সন্ধ্যার আগেই ঢাকার বাস ধরা ভালো। তবে বাড়ি ফেরার সময় বান্দুরার বাসুদেব সাহার মিষ্টান্ন ভান্ডার ঘুরে আসতে ভুল করবেন না।

কীভাবে যাবেন
কলাকোপা-বান্দুরায় দিনে এসে দিনেই ঢাকায় ফেরা যায়। এ জন্য সকালেই রওনা হওয়া দরকার। গুলিস্তান, বাবুবাজার, কেরানীগঞ্জ, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী থেকে সরাসরি বান্দুরার বাস সার্ভিস আছে। তবে দলবেঁধে মাইক্রোবাস নিয়ে গেলে দারুণ একটা পিকনিক করা যাবে।


তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24