Golden Bangladesh
নওগাঁ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নওগাঁ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নওগাঁ জেলা পরিষদ পার্ক

স্থানীয় ভাষ্যমতে বৃটিশ আমলে ১৯২০ সালে নওগাঁ শহরের প্রাণকেন্দ্র নওগাঁ জেলা পরিষদ পার্কটি প্রতিষ্ঠিত হয় । পার্কটি নওগাঁ মৌজার আর এস ৯ নং খতিয়ানে ৮৮১, ৮৮২, ৮৮৩, ৮৮৪, ৮৮৫, ৮৮৬ ও ৮৭ নং দাগে মোট ২.৪৬ একর এরিয়া নিয়ে গঠিত । জেলা পরিষদ, নওগাঁ পার্কের দায়িত্বে রয়েছেন । গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন উপ সচিব; যিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ নওগাঁর পদে অলংকৃত করে আছেন ।

দর্শনীয় বিষয়ঃ
পার্কের ভিতরে ১.২০ একর বিশিষ্ট একটি পুকুর রয়েছে। যার চতুর্পার্শ্বে নারিকেল গাছ ও অন্যান্য গাছ রয়েছে। পুকুরে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রয়েছে। পুকুরটি খুবই গভীর । পার্কের অভ্যন্তরে দুটি রাস্তা পুরুষ ও মহিলাদের হাঁটার জন্য পৃথকভাবে তৈরী করা আছে। পার্কের অভ্যন্তরীণ ২টি রাস্তা আছে। ভিতরের রাস্তা দ্রুত হেটে অতিক্রম করতে ৩ মিনিট এবং বাহিরের রাস্তার অতিক্রম করতে ৪ মিনিট সময় লাগে। বাহিরের রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৪১৫ ফুট।

পার্কের ভিতরটি বিভিন্ন ফুলগাছ, পাতাবাহার, হুইপিং দেবদারুসহ অনেক মূল্যবান গাছ সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য সজ্জিত রয়েছে। পার্কে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, অশোক, অর্জূন, মেহগিনি, কাঞ্চন ঝাউ, পান্থপাদপ, হরতকি, বহেরা ও নারিকেলসহ অন্যান্য গাছ রয়েছে। তাছাড়া মৌসূমে রোপিত গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, সিলভিয়া, রংগন,ভারবেনা, পপি, জিনিয়া, কসমস, কালেনডোলা, এন্টিহামসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ চাষ হয়ে থাকে । নওগাঁ শহরের সর্ব¯তরের জনগণ মানসিক ও শারিরিক প্রশান্তির জন্য জেলা পরিষদ, নওগাঁর পার্কটি অত্যন্ত যুগোপুযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ।

পার্কের ভিতরে একটি অফিস কক্ষও রয়েছে। পার্কের দক্ষিণ পূর্ব কোনে একটি ব্যয়ামাগার রয়েছে। মানুষের বসার জন্য ৫ টি ছাতা রয়েছে। তাছাড়া ৪৯ টি বসার সিট রয়েছে। ছোট শিশুদের বিনোদনের জন্য ১৩ টি দোলনা, ৩টি ঢেঁকি ও ১ টি ঝুলন্ত মই ¯হাপন করা (চালু) আছে। জনগণের জন্য ৩টি শৌচাগার রয়েছে। পার্কের দৈনন্দিন সুষ্ঠু ব্যব¯হাপনার জন্য পার্ক সুপারভাইজার ১ জন, মালি ৪ জন ও নৈশ প্রহরী ২ জন নিয়োজিত রয়েছেন। পার্কটি ভোর ৬.০০ টা থেকে রাত ৯.০০ টা পর্যন্ত জনসাধারণের বিনোদন ও চলাচলের জন্য খোলা থাকে ।

পার্কের ভিতরে পূর্ব - উত্তর কোনে একটি পাঠাগার রয়েছে। পাঠাগারে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে ও নিয়মিত দৈনিক পত্রিকাও রাখা হয়। পাঠাগার দেখাশুনার জন্য একজন লাইব্রেরীয়ান রয়েছে। গ্রীষ¥কালীন সময়ে বিকাল ৫.০০ টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং শীতকালীন সময়ে বিকাল ৪.০০ টা থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত লাইব্রেরী খোলা থাকে।

দিব্যক জয়স্তম্ভ

নওগাঁ জেলার একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন পত্নীতলা থানার দিবর দীঘির মাঝখানে অবস্থিত দিব্যক জয়স্তম্ভ। এ দীঘি স্থানীয় জনগণের কাছে কর্মকারের জলাশয় নামে পরিচিত। দীঘিটি ৪০/৫০ বিঘা বা অর্ধ বর্গমাইল জমির উপর অবস্থিত এবং গোলাকার। দিবর দীঘির মধ্যখানে অবস্থিত আটকোণ বিশিষ্ট গ্রানাইট  পাথরের এত বড় স্তম্ভ বাংলাদেশে বিরল।

এ স্তম্ভের মোট উচ্চতা ৩১ ফুট ৮ ইঞ্চি। পানির নিচের অংশ ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি এবং পানির উপরের অংশ ২৫ ফুট % ইঞ্চি। এর ব্যাস ১০ ফুট ৪ ইঞ্চি; প্রতিটি কোণের পরিধি ১ ফুট সাড়ে ৩ইঞ্চি। এর স্তম্ভে কোন লিপি নে। সত্মম্ভের উপরিভাগ খাঁজ কাটা অলঙ্করণ দ্বারা সুশোভিত। দীনেশ চন্দ্র সেন ‘বৃহৎ বঙ্গে’ উলে­খ করেছেন ‘কৈবর্ত রাজ ভীমের খুল­ পিতামহ দিবেবাক দ্বিতীয় মহীপালকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করিয়া বিজয়োল­াসে যে স্তম্ভ উত্থাপিত করিয়াছিলেন তাহা এখনও রাজশাহী জেলার এক দীঘির উপরে মস্তক উত্তোলন করিয়া বিদ্যমান।’ অন্যমতে, দিব্যকের রাজত্বকালে পাল যুবরাজ রামপাল বরেন্দ্র বরেন্দ্র উদ্ধারের চেষ্টা করে দিব্যকের নিকট পরাজিত হন। দিব্যক এই সাফল্যের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে দীঘি মধ্যস্থিত এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেন। আরো মত আছে যে ভীম এ স্তম্ভটি নির্মাণ করেন এবং পিতৃব্য দিব্যকের স্মৃতি রক্ষার্থে স্তম্ভটি তার নামে উৎসর্গ করেন।

দিবরদীঘি যাওয়ার ব্যবস্থা:
নওগাঁ বালুডাংগা বাস টার্মিনাল হতে সরাসরি বাসযোগে ঐতিহাসিক দিবরদীঘি যাওয়া যায়। আনুমানিক দূরত্ব ৫০ কিঃমিঃ বাসভাড়া- ৫০- ৬০/-টাকা ।
থাকার ব্যবস্থা- জনসাধারণের জন্য দিবরদিঘি থাকার কোন ব্যবস্থা নেই । দিনে যেয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে অথবা উপজেলা সদর/জেলা সদরে থাকা যাবে; তবে ভি আই পি দের থাকার জন্য সাধারণ একটি রেস্টহাউজ আছে ।

সোমপুর বিহার/পাহাড়পুর

নওগাঁ জেলার সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর বিহার। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সোমপুর বিহার ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। ইংরেজ প্রত্নতাত্ত্বিক বুকানন হামিলটন যখন পূর্ব ভারতে জরিপ কাজ পরিচালনা করেন (১৮০৭-১৮১২) তখন তিনি পাহাড়পুরের এই সূতপকে বৌদ্ধ বিহার বলে অনুমান করেন। ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যমত্ম এর খনন কাজ চলে। খনন কালে মাটির একটি সিল থেকে জানা যায় যে, এটি সোমপুর বিহার। পাল রাজবংশের রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১) অষ্টম শতকের শেষ দিকে এ বিহার নির্মাণ করেন। সোমপুর বিহার এশিয়া মহাদেশের মধ্যে বৃহত্তম বিহার। এর দৈর্ঘ্য পূর্ব-পশ্চিমে ৯১৯ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে ৯২২ ফুট। মূল ভবনে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ১৭৭টি কক্ষ ছিল। ৮০০ জন ভিক্ষুর বাসপোযোগী ছিল। এ বিহারে ১২৫নং কক্ষে মাটির পাত্রে খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনামলের রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। কোন সাধক বা ধর্ম প্রচারক মুদ্রাগুলি এখানে এনেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। পিরামিড আকৃতির এ মঠের উচ্চতা ৭০ ফুট। ১টি শূন্যগর্ভ চতুস্কোণ কক্ষকে কেন্দ্র করে এর অন্যান্য সংযোজনীসমূহ গড়ে ওঠেছে। সমগ্র বিহারটি প্রাচীর বেষ্টিত। এর প্রবেশ পথ এবং মূল ভবনে ওঠার সিঁড়ি ছিল উত্তর দিকে। সোমপুর বিহারে বাস করতেন মহাপন্ডিতাচার্য বোধিভদ্র। আচার্য অতীশ দীপঙ্কর কিছু কাল এই বিহারে বাস করেন। তাঁর গুরু রত্নাকর শামিত্ম সোমপুর বিহারের মহাস্থবির ছিলেন। সোমপুর বিহারে অবস্থান করতেন প্রাচীন চর্যাগীতিকার কাহ্নপা ও তাঁর গুরু জলন্দরী পা ওরওফ হাড়ি পা।

পাহাড়পুর নওগাঁ জেলা এবং বদলগাছী থানার অধীনস্থ পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ন প্রত্নস্থল। পাকা সড়কের মাধ্যমে গ্রামটির নিকটস্থ রেল স্টেশন জামালগঞ্জ, জেলা শহর নওগাঁ এবং জয়পুরহাট শহরের সংগে যোগাযোগ রক্ষিত হচ্ছে। এ প্রত্নস্থল উত্তরবঙ্গের প­াবনভূমিতে অবস্থিত। বিস্তীর্ণ একটানা সমভূমির মাঝে এক সুউচ্চ (পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে প্রায় ২৪ মিটার উঁচু) প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ স্বভাবতই একে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। স্থানীয়ভাবে পাহাড় নামে পরিচিত লাভকারী এ ধ্বংসাবশেষের অবস্থান থেকে পাহাড়পুর নামের উৎপত্তি হয়েছে। পূর্বভারতে জরিপ কাজ পরিচালনাকালে ১৮০৭ থেকে ১৮১২ সালের মধ্যে বুকানন হ্যামিল্টন সর্ব প্রথম প্রত্নস্থলটি পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে ওয়েস্টম্যাকট পাহাড়পুর পরিভ্রমণে আসেন। স্যার আলেকজান্ডার ১৮৭৯ সালে এ স্থা্ান পরিদর্শন করেন। তিনি এ ঢিভিতে ব্যাপক আকারে খনন করতে চেয়েছিলেন। কিন্ত এ জমির মালিক বলিহারের জমিদার কর্তৃক তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন। ফলে বিহার এলাকায় সামান্য অংশে এবং কেন্দ্রিয় ঢিভির শীর্ষভাবে সীমিত আকারে খননের কাজ চালিয়েই তাঁকে সন্তোষ্ট করতে হয়। শেষোক্ত এলাকায় তিনি চার পাশে উদ্গত অংশযুক্ত ২২ ফুট বর্গাকার একটি ইমারত আবিষ্কার করেন। প্রত্নস্থলটি ১৯০৯ সালে পুরাকীর্তি আইনের আত্ততায় ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ কর্তৃক ১৯১৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়। (ভূমি নকশা, পাহাড়পুর)।

পাহাড়পুর যাওয়ার ব্যবস্থা:
নওগাঁ বালুডাংগা বাস টার্মিনাল হতে সরাসরি বাসযোগে ঐতিহাসিক পাহাড়পুরে যাওয়া যায় । আনুমানিক দূরত্ব আনুমানিক ৩২ কিঃমিঃ বাসভাড়া- ৩০- ৪০ টাকা
থাকার ব্যবস্থা- জনসাধারণের জন্য পাহাড়পুরে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই । দিনে যেয়ে দিনেই ফিরে আসতে হবে অথবা উপজেলা সদর/জেলা সদরে থাকা যাবে; তবে ভি আই পি দের থাকার জন্য নিকটে রেস্টহাউস আছে ।

জগদ্দল মহাবিহার

মু. হাসান শাহ্রিয়ার
জগদ্দল পাথর প্রবাদটির সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু এ নামের কোনও পাথর বা জায়গা আদতেই আছে কি? এসব তথ্য সরেজমিনে জানতে হলে আপনাকে যেতে হবে নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার জগদ্দল গ্রামে। অল্প খরচে স্বল্প সময়ে বেড়িয়ে আসার বেশ সুন্দর একটি জায়গা
জগদ্দল মহাবিহার
বাংলার চার শতাব্দীব্যাপী গৌরবময় রাজত্বকাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজারা তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিভিন্ন রকম বৌদ্ধ মন্দির, মঠ ও স্তূপ নির্মাণ করেছিলেন। ধারণা করা হয় রাজা রামপাল প্রায় ৫০টি স্বয়ংসম্পূর্ণ বৃহদায়তন ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। পাল রাজাদের নির্মিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বরেন্দ্র  অঞ্চলের সোমপুর মহাবিহার, বিক্রমপুরের বিক্রমপুরী বিহার, মগধের বিশালায়তন বিক্রমশীলা মহাবিহার ও জগদ্দল মহাবিহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত রাজা
রামপাল (১০৭৭-১১২০) জগদ্দল মহাবিহার নির্মাণ করেন। 
নওগাঁ জেলার ধামইরহাট-জয়পুরহাট মহাসড়কের হরতিকডাঙ্গা বাজারের তিন কিলোমিটার উত্তরে, বাংলাদেশ-ভারতের কালুপাড়া সীমান্তের প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং ধামইরহাট থানা কার্যালয়ের ৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এই জগদ্দল মহাবিহারের অবস্থান। এ স্থান থেকে পাহাড়পুর ও হলুদ বিহার বৌদ্ধ মন্দিরের দূরত্ব ২৭ কিলোমিটারের মধ্যে।
যেসব প্রতœবস্তু উদ্ধার করা হয়েছে
সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর ১৯৮৩-৮৪ সালে এ এলাকায় প্রাথমিক জরিপ করে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে জগদ্দল গ্রামের বিশাল ঢিবিতে এক সংক্ষিপ্ত খননকার্য চালানো হয়। এ সময় এখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রতœবস্তু উৎকীর্ণ লিপিযুক্ত দুটি পাথরের স্তম্ভ, যা এ প্রতœস্থলের সময়কাল নির্ধারণে সহায়তা করে। এর একটি পাওয়া গেছে বিহারের পূর্বদিকের প্রবেশ পথের কাছে, অন্যটি দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে। পূর্বদিকের প্রবেশপথের কাছে প্রাপ্ত প্রথম স্তম্ভটির অষ্টকোণ দণ্ডের গায়ে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শাসকের প্রাচীন বাংলা হরফে এর লিপিকার গঙ্গাপুরের শ্রী মক্কড় নন্দীর নাম উৎকীর্ণ আছে। মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রাপ্ত প্রস্তুর-স্তম্ভটি এখনও উৎখান-খাদে অর্ধপ্রোথিত রয়েছে। এটিতেও একই সময়ের প্রাচীন বাংলা লিপিতে উৎকীর্ণ রয়েছে লিপিকার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত জনৈক শ্রী ভবদাসের নাম। শ্রী মক্কড় নন্দী ও শ্রী ভবদাস উভয়েই ছিলেন লিপিকার সম্প্রদায়ের লোক এবং সম্ভবত জগদ্দল কিংবা এর পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা। এখান থেকে ১৫০টিরও বেশি শিল্প নিদর্শন ও দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছে শিলালিপি, অলংকৃত ইট, মাটির তৈরি বিভিন্ন রকম পাত্র, পোড়ামাটির ফলক ও পোড়ামাটির তৈরি মানুষের মাথা, জপমালার পুঁতি, লোহার পেরেক, মসৃণ ও কর্তিত প্রস্তুরখণ্ড, প্রস্তুর-মূর্তি, একটি স্বর্ণপিণ্ড ইত্যাদি। তাছাড়া পশ্চিম দেয়ালের বাইরের অংশের অলংকরণ হিসেবে ব্যবহ
ƒত অনেকগুলো ফলক অবিকৃত অবস্থায় যথাস্থানে পাওয়া গেছে। এ ফলকগুলোতে হরিণ, পাখি, ধনুর্বিদ, দ্বাররক্ষী প্রভৃতির মূর্তি উৎকীর্ণ রয়েছে। এখানে প্রাপ্ত অলংকৃত ইটে রয়েছে পদ্মপাপড়ি, শিকল ও আঁকবাঁকা সর্পিল নকশা।
কী কী দেখবেন
রাস্তা থেকে মাটির ঢিবিটি দেখে বোঝার উপায় নেই, এটিই একসময়কার প্রবল পরাক্রমশালী পাল সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন। জগদ্দল বিহারটি বর্গকার, চারপাশের সমতল ভূমি থেকে এর গড় উচ্চতা ৫.৫ মিটার। ঢিবিটির মধ্যস্থলে রয়েছে একটি খাদ। এ বিহারে আছে সারি সারি আয়তকার কুঠুরি। এগুলোর প্রত্যেকটির পরিমাপ ৩.৫ী৩.৩ মিটার। এগুলো পাহাড়পুর বিহারের পূর্বদিকের পার্শ্ব-ইমারতের কক্ষগুলোর অনুরূপ, এ বিহারের কোণায় একটি বৃত্তাকার কুঠুরিও আছে। ঠিক মাঝ খানটায় ছিল মূল উপাসনালয়। এছাড়া জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা রকমের পাথরের কলাম। কোনোটি সম্পূর্ণ, কোনোটি অসম্পূর্ণ। সুন্দর কারুকার্যময় দরজার খিলান, প্রাচীন লিপি খোদাইকৃত কলাম, অর্ধসম্পূর্ণ মূর্তি দেখে মনে হবে যেন এক সমৃদ্ধ জনপদের লোকজন সবাই কাজকর্ম ফেলে রেখে হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। মূল বিহারটির আশপাশে আরও কিছু ঢিবি চোখে পড়ে; কিন্তু ওগুলো এখনও খননের অপেক্ষায় অযতেœ পড়ে আছে। একটু কষ্ট করে জগদ্দল বিহারের পাশে জগৎনগর গ্রামে গেলে দেখতে পাবেন সারি সারি তালগাছ ও বাঁশ ঝাড়ে ঘেরা
পাকুরাদিগমপাড়া নামের সাত একর ও আট একর আয়তনের বিশাল দুটি পুকুর। আরও চাইলে দেখে আসতে পাড়েন জগদ্দল গ্রামে অবস্থিত দেশের হাতে গোনা কয়েকটি আদিবাসী স্কুল এন্ড কলেজের একটি জগদ্দল আদিবাসী স্কুল এন্ড কলেজ; দেখে আসতে পারেন কালুপাড়া সীমান্তে ব্রিটিশদের স্থাপন করা সীমান্ত পিলার ও ভারতের তার কাটার বেড়া। হাতে সময় থাকলে জগদ্দল বিহারের আশপাশের গ্রাম ও সাঁওতাল পল্লীগুলোও ঘুরে আসতে পারেন। গ্রামগুলোতে দেখতে পাবেন গ্রামবাসীর মাটির দোতালা বাড়ি যা দেশের আর কোথাও তেমন দেখতে পাবেন না। মাটিকে সিমেন্ট আর বাঁশ ও তালগাছকে রড হিসেবে ব্যবহার করে বানানো এ বাড়িগুলো শীত-গ্রীষ্ম সবসময়ই বেশ আরামদায়ক। তাছাড়া বিশাল বিশাল মহীরূহে ছাওয়া ঠাণ্ডা সুশীতল প্রাকৃতিক পরিবেশ ও গ্রামের মানুষদের সহজ-সরল জীবন দেখে আপনি মুহূর্তের জন্য হলেও এক মায়াময় পরিবেশে হারিয়ে যাবেন।
যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া
জগদ্দল মহাবিহারটি দেখতে হলে ঢাকা থেকে আপনাকে যেতে হবে নওগাঁ জেলার ধামইরহাটে। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে প্রতিদিন ধামইরহাটের উদ্দেশে বাস ছাড়ে। ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। ধামইরহাট থেকে ভ্যানযোগে আপনাকে যেতে হবে জগদ্দল বিহারে। ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। সময় লাগবে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট। ধামইরহাটে কোনও আবাসিক হোটেল নেই। থাকতে হলে উঠতে হবে সরকারি ডাকবাংলোয়। ধামইরহাটে অনেক হোটেল থাকলেও খাবারের জন্য সেগুলো তেমন মানসম্মত নয়। তবে হোটেল
কাফে কিং এবং সরকার হোটেল মোটামুটি খাওয়া-দাওয়া করা যেতে পারে।
ধামইরহাট থেকে ঢাকা ফেরার পথে গাড়িগুলো ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ে সকাল ৯টা থেকে ১০টা এবং সন্ধ্যা ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে। আর হ্যাঁ, ধামইরহাট থেকে ফেরার পথে ধামইরহাটের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বালুশাহী খেতে ও নিতে ভুলবেন না কিন্তু।

কুশুম্বা মসজিদ

প্রাচীন ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে প্রথমেই উলেস্নখ করা যায় কৌশাম্বীর নাম। এর উলেস্নখ পাওয়া যায় খ্রিস্টাব্দ ১২শতকে রচিত রামচরিতের ভাষ্যে। কুশুম্বা মসজিদের পশ্চিম পাশে সোনাবিবির মসজিদ পর্যমত্ম ফাঁকা জায়গাতে প্রচুর প্রত্ন নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়।
তাছাড়া হিস্ট্রি অব বেঙ্গল ভলিউম: ১ এ প্রাচীন বাংলার একটি মানচিত্রে কৌশাম্বীর যে অবস্থান দেখানো হয়েছে তাতেও মনে হয় যে, বর্তমান কুশুম্বাই প্রাচীন কৌশাম্বী। এই নিদর্শনটি মান্দা উপজেলায় রাজশাহী মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। প্রাচীন মসজিদ এবং তৎসংলগ্ন বিশালাকৃতির দীঘি নিয়ে কুশুম্বা নামটি প্রচলিত। এখানে সব মৌসুমে পর্যটক ও সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের ভিড় জমে।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24