Golden Bangladesh
ময়মনসিংহ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

ময়মনসিংহ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

নজরুল স্মৃতির ত্রিশালে

রাজীব পাল রনি
মানুষ ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে অজানাকে জানার উদ্দেশে শহরের কোলাহল থেকে নির্জনতা পেতে। তাই বন্ধুরা মিলে গরমের ছুটিতে বেড়ানোর প্রস্তুতি নেই। আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে সিন্ধান্ত নিলাম আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে যাওয়ার। বন্ধুদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা তুলে তারিখ ঠিক করলাম। একটি মিনি বাস ভাড়া করে নির্দিষ্ট দিনে ঢাকা থেকে রওনা হলাম। সেদিন ছিল শুক্রবার। সকাল ৮টায় আমাদের বাস ছাড়ল। বাসের জানালা দিয়ে দেখি মেঘলা আকাশে সোনালি সূর্য উঁকিঝুঁকি মারছে। সেদিন পরিবেশটা খুব সুন্দর ছিল, প্রফুল্ল মন নিয়ে এগিয়ে চলছি। ত্রিশালে পিকনিকে যাওয়া আজকের নয়, দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল ১১০ কিলোমিটারের পথ। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কেউ কবিতা কেউ বা গান পরিবেশন করতে লাগলেন। বন্ধুদের মধ্যে রুপন, রাজু, সঞ্চিতা, ইশতিয়াক, তুষার, জসিম, কবির, জাহাঙ্গীর, কাউসার, পিয়স্তি, মুক্তা আমিসহ আরও অনেক বন্ধু আমাদের সঙ্গী ছিল। আসলে আমরা সবাই ছিলাম নজরুল প্রেমিক। কবির ভাষায় বলা যায়
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে, মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর, টগবগিয়ে খুন হাসে, আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। ঘণ্টা দুই পর প্রত্যাশিত সেই ত্রিশালে এসে পৌঁছি। তখন সকাল ১০টা। উল্লসিত মন নিয়ে সবাই এক এক করে গাড়ি থেকে নেমে পড়ি। আমরা প্রথমে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্য বিদ্যাপীঠ সাবেক দরিরামপুর উচ্চবিদ্যালয় বর্তমান নজরুল একাডেমি নামে খ্যাত, সেখানে প্রবেশ করি। নজরুল এ স্কুলে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়াশোনা করেছেন। নজরুল যে দুটি শ্রেণীকক্ষে পড়তে বসতেন, তার একটির সামনে মর্মর পাথরে খোদাই করে রাখা হয়েছে কবির নিজ হাতের লেখা আমি এক পাড়াগেঁয়ে স্কুল পালান ছেলে, তার ওপর পেটেডুবুরি নামিয়ে দিলেও অক্ষর খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্কুলের হেড মাস্টারের চেহারা মনে করতেই আমার আজও জলতেষ্টা পেয়ে যায়। অল্প কিছু এগিয়ে গেলে সামনে নজরুল ডাকবাংলো। এর সঙ্গেই নজরুল মঞ্চ, যেখানে কবি নজরুলের জš§জয়ন্তি ১৯৬৪ সাল থেকে প্রতিবছর পালিত হয়ে আসছে। মঞ্চের পশ্চিম দিকে পাথরে লিখা কবি নজরুলের সংক্ষিপ্ত জীবনী খোদাই করে দেয়া আছে। তা পড়ে আমরা নজরুল সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য পেলাম। তারপর  আমরা সবাই মিলে অল্প কিছুক্ষণ পায়ে হেঁটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নামাপাড়ায় বটতলার কাছে এসে থামলাম। স্কুল পালিয়ে নামাপাড়া যে বট গাছের নিচে কবি নজরুল আপন মনে বাঁশিতে সুর তুলতেন। এই সেই বটগাছ আমাদের দেখিয়ে দিল বন্ধু রুপন। সেই গ্রাম, বটগাছ বন্ধু রুপনের খুব পরিচিত। কারণ রুপন আমাদের এ পিকনিকের আগে আরও দুবার এখানে এসেছে। কিন্তু বটগাছ দেখে আমরা তো অবাক। সত্যিই কি আমরা নজরুল বটবৃক্ষে? সঞ্চিতা আÍহারা হয়ে বলল। এদিকে  বন্ধু জসিম বলল, আমার গায়ে একটি চিমটি কাটনা, আমি স্বপ্ন দেখছি না তো! আমরা তাদের কথা শুনে পুলকিত হই। তারপর আমরা বটগাছের চারদিকে গোল করে বসলাম। তখন খাড়া দুপুর। এখানেই দুপুরের খাবারটা সেরে নিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এ বৃক্ষের পাশেই দেশের প্রথম ও একমাত্র সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। ঘুরতে ঘুরতে আমরা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলাম বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে। এ বাড়িতে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে কিছু দুর্লভ ছবি যুদ্ধফেরত নজরুলের ছবি, তিন বন্ধু অধ্যাপক হেমন্ত সরদার, হাবীবুল্লাহ বাহার ও নজরুলের ছবি। চুরুলিয়া যে গৃহে নজরুল জš§গ্রহণ করেন সে ছবি, কৃষ্ণনগরে-নজরুল পরিবার; নজরুলের কোলে শিশুপুত্র বুলবুল, কবি পতœী-প্রমিলার ছবি, বংশীবাদনরত নজরুল, ধ্যানমগ্ন কবি, হাবিলদার বেশে নজরুল ২১ বছর বয়সে, সঙ্গীত স্রষ্টা নজরুল, কিশোর বয়সে ও মধ্য বয়সে নজরুলের ছবি এখানে রয়েছে। এছাড়া গ্রামোফোন, বৈদ্যুতিক এলপি রেকর্ডারসহ আরও অনেক কিছু দেখে এখান থেকে রওনা হয়ে যাই কাজির শিমলায় দারোগা বাড়ি। বিচুতিয়া থেকে কাজির শিমলা দারোগা বাড়ি ২০ মিনিটের পথ। কাজির শিমলা দারোগা বাড়ি যেখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ দেশে প্রথম পদার্পণ ঘটেছিল। কিশোর নজরুলের সু-কুমার চেহারা, নম্র স্বভাব ও প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে কাজী রফিজউল্লাহ দারোগা ১৯১৪ সালে আসানসোলের রুটির দোকান থেকে কিশোর কবি নজরুলকে কাজির শিমলায় নিজ গ্রামে নিয়ে আসেন। প্রথমে এই দারোগা বাড়িতেই অস্থান করেন কবি। এখানে রয়েছে দোতলাবিশিষ্ট নজরুল পাঠাগার ভবন। এই পাঠাগারে কবিতা ও গানের বই রয়েছে। এ বাড়িতে আছে কবির ব্যবহƒত খাট। কবির প্রিয় পুকুর ঘাটটি, যেটি শান দিয়ে বাঁধানো। দেখতে খুবই সুন্দর। দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল অত্যাচারিত, শোষিত শ্রেণী বৈষম্য পীড়িত মানুষকে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ চেতনায় তার লেখা বল বীর উন্নত মমশির, যে দিন উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, আমি সেই দিন হব শান্ত, বল বীর উন্নত মমশির কবিতার লাইনগুলো হঠাৎ চোখে পড়ল, পশ্চিম আকাশের সূর্য ঢলে পড়েছে। এবার বিদায়ের পালা। কিন্তু মন যেন ত্রিশালকে বিদায় দিতে চাইছে না। তবুও যেতে তো হবে, তাই আমরা সবাই বাসে করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম। আমরা নজরুলের টানে গিয়েছিলাম ত্রিশালে। ত্রশাল ভ্রমণে স্মৃতি মনের গহিনে থাকবে আমাদের চিরকাল।

পরিচিত নদী অপরিচিত পাহাড়ি গ্রাম

লুৎফর হাসান
বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছেলে হয়েও আমার জানা ছিল না, আমাদের অঞ্চলের একেবারে উত্তর অংশে কি অপার সৌন্দর্য আছে। সারাবেলা যাকে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। প্রতিনিয়ত অনেকেই সেখানে যাচ্ছে আর প্রকৃতির উদারতায় মিলেমিশে একাকার হয়ে ঘরে ফিরছে সীমাহীন ভালোলাগা নিয়ে। অবশেষে নিজেকে অপরাধীর তালিকা থেকে মুছে ফেলার উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা ছেড়ে বের হলাম সেই মুগ্ধতার মায়াজালে বাঁধা পড়তে। রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে নেত্রকোনাগামী একটি বাসের টিকিট করলাম। আমি, রনি, সোয়েব আর ফিরোজ মিলে রওয়ানা হলাম সুসং দুর্গাপুরের উদ্দেশে। ময়মনসিংহ পর্যন্ত যেতেই রাত হয়ে গেল। তারপরও অন্ধকারকে সঙ্গী করেই বাস এগুতে লাগল। দেড় ঘণ্টা পর একটা ভাঙা ব্রিজের গোড়ায় বাসটা থেমে গেল। এরপর আর বাসে যাওয়া যাবে না। তাহলে উপায়? উপায়টা সাজানোই আছে। দুর্গাপুর অঞ্চলের যুবকদের কর্মসংস্থানের একটি পথ। ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালকের পেছনে দুইজন আরামেই বসা যায়। তবে কতটা আরামে এ মোটরসাইকেল ভ্রমণ শেষ হয় বুঝলাম ব্রিজটা পার হতেই। পৃথিবীর অন্যতম কঠিন যোগাযাগ ব্যবস্থা এ দুর্গাপুরের পথেই। আঁকাবাঁকা এবড়োথেবড়ো পথ। ইট বিছানো পথের যেখানে-সেখানে গর্ত। মোটরসাইকেল চালক বিকল্প পথ খোঁজেন। কেমন সেই বিকল্প পথ? রাস্তা থেকে নেমে সদ্য ধানকাটা মাঠের ওপর দিয়ে যাত্রা। আহা। আর কতক্ষণ পর আমাদের গন্তব্য? বাসে গেলে পৌঁছে যেতাম চল্লিশ মিনিটেই। মোটরসাইকেল চালক বললেন,
এই তো, এসে গেছি। অবশ্য তার এ কথাটা এরই মধ্যে অনেকবারই শুনেছি। এবার সত্যিই চলে এলাম। রাত ১০টা বাজে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলেও শোয়েব আর ফিরোজ একটুও ক্লান্ত নয়। তারা দুজন নাকি কখনই ক্লান্ত হয় না। রনি অবশ্য চনমনে ভাব দেখায়, তবে একটু হেলান দেয়ার মতো কোন অবলম্বন পেলেই হল! ঘুমে বিভোর হয়ে যায়। ডাকবাংলোতে বড় একটা রুম পেয়ে গেলাম। টানা এক সপ্তাহ থাকব। আজ খেয়েদেয়ে একটা ঘুম দেব এটাই পরিকল্পনায় ছিল। আসলে বেড়াতে গেলে সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়। যার যার মতো আমরা ফ্রেশ হলাম। তারপর স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। হরেক পদের বাহারি সব তরকারি দিয়ে ভোজন পর্ব শেষ হওয়ার পর বিল এসেছে জনপ্রতি মাত্র পঞ্চাশ টাকা। অবাক হওয়ার প্রথম পর্বের সঙ্গে পরিচিত হলাম। খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে ফিরব ভাবছিলাম। শোয়েব আর ফিরোজ গো ধরল নদীর পাড়ে যাবে। হেঁটে গেলে দুমিনিটের পথ। আমরা নদীর ঘাটে গেলাম। খা খা জোসনা ভরা রাত। ঝকঝকে সোমেশ্বরীর রূপ যেন উছলে পড়ছে। সেই অপরূপ সৌন্দর্যের শরীর ছেনে দেখার তাড়নায় ঘাট থেকে একটা নৌকা ভাড়া করলাম। ঘণ্টায় পঞ্চাশ টাকা। কোথায় যাব? কোন উদ্দেশ্য নেই। নৌকা চলছে। রাত এখন ১২টা। এ মধ্যরাতে সোমেশ্বরীর বুকে ছোট্ট একটা নৌকায় মাঝির সঙ্গে আমরা চার বিদগ্ধ যুবক। নদী আর জোসনার মাখামাখি আরও বেশি ব্যক্তিগত করে নেয়ার প্রলোভনে মাঝিকে বললাম নেমে যেতে। মাঝি এক কথাতেই সায় দিল। আরেকটা নৌকায় সে চলে গেল ঘাটে। এখানকার মানুষেরা বড় বেশি সহজ, বড় বেশি সরল, মানুষের প্রতি মানুষের পরম মমতা বড় বেশি আঁঠালো। মাঝি চলে যাওয়ার পর নৌকার বৈঠা অথবা লগি দুটোই হাতের কাছে রেখে দিলাম। সোমেশ্বরী হঠাৎ হঠাৎ বাতাসের দোলায় দুলে উঠছে, দুলে উঠছে স্বচ্ছ জলের আয়নায় ভরা পূর্ণিমার থলথলে চাঁদ। গলা ছেড়ে আমরা গান গাইছি। আবোল-তাবোল বকছি, হাসছি, কাঁদছি। চিৎকার করছি। এমন নিস্তব্ধ নদী এ জনমে আর যে দেখিনি। জোসনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে দূর পাহাড়ের গায়ে। উঁচু উঁচু পাহাড়কে মেঘের মতোই লাগছিল। পাহাড়টি খুব কাছেই। আগামীকাল আমরা ওই পাহাড়ের কাছে যাব। এখন এ আবেগের মায়াজাল ছিঁড়ে আমাদের বাংলোতে ফিরতে হবে। আমরা ফিরে এলাম। রাতের জোসনায় যে সোমেশ্বরীকে দেখে এসেছি, দিনের আলোয় তাকে দেখব বলে আমরা ঘুমোতে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা রওয়ানা হলাম। এবার সোমেশ্বরীর বুক চষে আমরা যাব পাহাড়ের দিকে। আমাদের সঙ্গী হল আকাশ নামের এক অপরিচিত লোক। আকাশ কথা বলে কম। তবে তার অভিজ্ঞতার প্রমাণ পেতে লাগলাম আস্তে আস্তে। বাংলাদেশের সব ধরনের আদিবাসীদের ভাষা তার আয়ত্বে। রুপালী আর নীলাভ এ দুই রঙের মিশেল এ সোমেশ্বরী নদী। এমন একটি নদী দেখেছিলাম জাফলংয়ে। তাছাড়া নদীমাতৃক এ দেশে আর কোন নদীর রঙ এমন দেখিনি। নীল নীল জলরাশি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমরা একটি অপরিচিত জায়গায় চলে এলাম। আকাশকে প্রশ্ন করলে ধমক খেতে হয়। আমরা সাইনবোর্ড খুঁজতে লাগলাম। অবশেষে আমাদের অনুসন্ধানী ভাব দেখে আকাশ নিজে থেকেই বলল, জায়গাটার নাম বাদামবাড়ি। এটা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এলাকা। আকাশকে অনুসরণ করতে করতে আমরা নাকি বিডিআর ক্যাম্পকে ফাঁকি দিয়ে এসেছি। উঁচুনিচু পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে একটি জনপদে পৌঁছে গেছি। কোথায় এলাম? আকাশ কোন কথা বলে না। আদিবাসী এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম এ জায়গার নাম কী? সে বাংলা বোঝে না। একটু পরে টের পেলাম। বাংলাদেশের সীমানা ছেড়ে মেঘালয়ের অনেকটা ভেতরে নিয়ে এসেছে আকাশ নামের এ ধূর্ত লোকটি। আমি ফিরে যেতে উদ্যত হতেই শোয়েব, ফিরোজ আর রনির সঙ্গে মোটামুটি একটা ঝগড়াই বেধে গেল। তাদের কথা ঢুকে যখন পড়েছি, কিছুক্ষণ বিচরণ করতে দোষ কী? উঁচু উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে একটু-আধটু সমতল। সেই সমতলে ধানক্ষেত। আর ধানক্ষেত পাহারা দেয়ার জন্য টং। পাগলা হাতির অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য এ টং বানানো হয়েছে। অবৈধভাবে এ সৌন্দর্যমণ্ডিত জায়গায় বিচরণ করতে করতে একবার মনে হল, বিপদ হতে পারে। এবার ফিরে যাওয়াটাই ভালো। হাতে-পায়ে ধরে ফিরোজ আর শোয়েবকে রাজি করালাম, তখন সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। পাহাড়ের পাড়ায় পাড়ায় মাটির পিদিম জ্বলে উঠছে, আকাশের পিছু আমরা হাঁটছি। আবারও কোন এক অচেনা-অজানা পাহাড়ের ফাঁক-ফোকর দিয়ে রাস্তা বের করে বাংলাদেশের গণ্ডিতে নিয়ে এল আকাশ। এভাবে কাউকে অনুসরণ করা উচিত হয়নি। এভাবে অপরিচিত কারও সঙ্গে হুট করে কোথাও যাওয়া কোনভাবেই ঠিক না। তবুও সবার মতো আমিও মনে মনে আকাশকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। এ ভবঘুরে মানুষটিকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলাম বলেই অখ্যাত অথচ অপরূপ সৌন্দর্যে মোড়ানো একটি পাহাড়ি গ্রাম নিজের চোখে দেখে এসেছি। হয়তো আবার সোমেশ্বরীতে যাওয়া হবে, কিন্তু কখনই কি ওই পাহাড়ের ছোট্ট গ্রামটিতে যেতে পারব? গাদা গাদা প্রশ্নেরা ভাবনার জগৎ ভারী করে দেয়। প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। কেবল চোখের সামনে ভেসে ওঠে সোমেশ্বরীর ওপারের উঁচু উঁচু পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সেই হাজংদের গ্রাম। যেখানে শোয়েব রেখে আসে তার পছন্দ করা পাহাড়ি মেয়েটিকে, ফিরোজ আর রনি রেখে আসে আমার প্রতি তাদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ। আর আমি রেখে এসেছি উদার আকাশের মতো, বাউণ্ডুলে অথচ নিঃস্বার্থ একজন ভালো মানুষকে। আকাশ তুমি ভালো থেক। ভালো থাকুক তোমার পাহাড়ের হাজংয়েরা।

কড়ইতলীতে দূর পাহাড়ের হাতছানি

সালেক খোকন
শাপলাবাজার মোড় পার হতেই ভাগ হয়ে যায় রাস্তাটি। পাল্টে যায় চারপাশের দৃশ্য । রাস্তার ওপাশে দূরে বড় বড় পাহাড়। দৃষ্টির দুই পরতেই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। একটির পেছনে আরেকটি। যেন একটি আরেকটির ছায়া। সব পাহাড় আকাশমুখী। কোন কোনটিকে ঘন মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে। সেখানে মেঘের সঙ্গে পাহাড়ের যেন মিতালী চলছে। কোন কোন পাহাড়ে ঝুম বৃষ্টি। আবার মেঘের ফাঁক বুঝে এক রাশ রোদের আলো এসে পড়েছে কোনও কোনওটিতে। এক পাহাড়ে যখন বৃষ্টি, অন্যগুলোতে তখন রোদ। এভাবে প্রতিদিন পাহাড়ের গায়ে চলে রোদবৃষ্টির খেলা। কেউ কেউ ভাবতে পারে এটি নিশ্চয়ই পার্বত্য জেলার নয়নাভিরাম কোনও স্থান হবে। কিন্তু এ সব ধারণাকে তুড়ি বাজিয়ে উড়িয়ে দেয়া যায় যদি কেউ চলে আসে হালুয়াঘাটের কড়ইতলীতে।
পাহাড় ভালো লাগা থেকে সুনীল বলেছিলেন, পাহাড় কিনবেন।  সে রকম ইচ্ছা করার দুঃসাধ্য না থাকলেও দূর পাহাড়ের ধারে যেতে কার না ভালো লাগে? পাহাড় দেখার আনন্দ পেতে কাকডাকা এক ভোরে ব্যস্ত ঢাকা থেকে চলে আসি পাহাড়ের পাদদেশের শহর হালুয়াঘাটে। খবর পেয়ে সঙ্গী হয় দুই বন্ধু। সোহরাব আর মৃদুল।
ঢাকার খুব কাছের জেলা ময়মনসিংহ। এ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলাকে ঘিরে রেখেছে মেঘালয়ের মেঘছোঁয়া বড় বড় সব পাহাড়। মুক্ত আকাশে এখান থেকেই দেখা যায় তুরা পাহাড়টিও।
নামটি কেন হালুয়াঘাট? উত্তর জানতে দৃষ্টি ফেরাতে হবে বেশ পেছনের দিকে। ১৬৫০-১৭০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ের কথা। তখন দর্শা নামক নদীর ঘাট হয়ে নৌপথে এ অঞ্চলের সব ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। হালুয়া অর্থ চাষী। হাল চাষীরা নানা কাজে এ ঘাট ব্যবহার করত বলেই এর নাম হয়েছে হালুয়াঘাট। অর্থ দাঁড়ায় হালুয়াদের ঘাট। আবার অনেকেরই এ বিষয়ে মত একেবারে ভিন্ন।  ঘাটটি হালুয়া নামক ব্যক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল বলেই নাকি এর নাম হয়েছে হালুয়াঘাট। নাম নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে কিন্তু কোন মতভেদ নেই।
হালুয়াঘাটে যখন পৌঁছি সময় তখন সকাল সাড়ে ৯টা। একটি রিকশায় চেপে আমরা চলে আসি বাজারের শেষ প্রান্তের হোটেল । হোটেল বয় রাসেল বেশ চটপটে। র্হ র্হ করে বলতে থাকে হালুয়াঘাটের কিছু জায়গার নাম। সূর্যপুর, পানিহাতা আর কড়ইতলী। এ জায়গাগুলো থেকেই মেঘালয়ের সব পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে কাছের জায়গাটি কড়ইতলী। কড়ইতলী বিজিবি ক্যাম্পের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে শেরপুরের দিকে। আর অন্যটি সূর্যপুর হয়ে ধোবাউড়া উপজেলায়। এ দীর্ঘ রাস্তার একপাশের মেঘালয় সীমান্তে ছায়ার মতো ঘিরে আছে শুধুই পাহাড়। পাহাড় থেকে সীমানা অতিক্রম করে মাঝে মধ্যে দলভেদে নেমে আসে হাতি কিংবা মায়াবী হরিণ। গল্পের মতো এরকম তথ্যে আমরা ঠিক থাকতে পারি না। রওনা দেয়ার প্রস্তুতি নেই। ঠিক সে সময় রাসেল জানালো কড়ইতলীতে মিলবে না কোন দোকানপাট। অগত্যা অসময়েই খেতে হবে দুপুরের খাবার। রাসেলের কাছ থেকে জেনে নেই খাবার হোটেলের ঠিকানাটি।
বাজারের ভেতর বেশ কয়েকটি হোটেল। কিন্তু সেগুলো ফেলে আমরা চলে আসি থানার পাশে জসিমের ছোট্ট হোটেলটিতে। খানিকটা ঘরোয়া ঢঙের ছোট্ট হোটেলটিতে মেলে হাঁসের মাংস। বাড়ির স্বাদের রান্নায় খেয়ে নেই ঝটপট। খাওয়া শেষে পান চিবুতে চিবুতে দুটি রিকশায় রওনা হই কড়ইতলীর উদ্দেশে।
কড়ইতলী গ্রামটি গোবরাকুড়া ইউনিয়নে, হালুয়াঘাট শহর থেকে মাত্র ৭ কিমি ভেতরে।  রিকশার প্যাডেল ঘুরতেই বাজারকে পেছনে ফেলে আমরা উত্তরদিকে এগুতে থাকি। যতই সামনে যাচ্ছি ততই যেন ভালোলাগা সব দৃশ্য আমাদের ঘিরে ধরছে। রাস্তার দু
দিকে ধান ক্ষেতের ফাঁকে ফাঁকে নানা জাতের সবুজ গাছ। কোথাও তাল গাছ, কোথাও বা খেজুর। কোথাও বীজতলার টিয়া রঙ, কোথাওবা সবুজে সবুজ ধানক্ষেত। এভাবে ছবির পরে ছবি ফেলে আমরা সামনে এগুই। একটি জায়গাতে অন্যরকম এক গন্ধ। রিকশাওয়ালা জানাল এটি পাট পচা গন্ধ। তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশের ডোবার মধ্যে জনাকয়েক কৃষক পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছে। অন্য একটি জায়গায় এসে আমরা রিকশা থামাই। রাস্তার পাশে ধান ক্ষেতে জমেছে হাঁটু অবধি বৃষ্টির পানি। লম্বা লম্বা পা নিয়ে সে পানিতে নিঃশব্দে মাছ ধরছে  এক ঝাঁক পাহাড়ি বক। সবুজের বুকে সাদা বক। কি যে অদ্ভুত! মনে হচ্ছিল সবুজ আঁচলে কোন শিল্পী যেন ভালোবাসার তুলি দিয়ে সাদা আঁচড় বসিয়ে দিয়েছে। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা হয়ে আমরা চলে আসি শাপলাবাজার মোড়ে। মোড়ের দুদিকে চলে গেছে রাস্তার দুটি অংশ। একটি গেছে অনেক দূরে দৃষ্টিসীমার ওপারে, সবুজ প্রান্তরে। ঠেকেছে একেবারে সূর্যপুর বাজারে গিয়ে। আমরা ওপাশটায় এগোই না। মোড় থেকে বামদিকে কড়ইতলীর রাস্তা। আমাদের রিকশাটি এগোয় সে পথে। কড়ইতলীর দিকে যতই এগুচ্ছি ততই আমাদের দৃষ্টি যেন স্থির হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, কোন স্বপ্নময় দেশে যেন আমরা চলে এসেছি। স্বর্গীয় পরশ নিয়ে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে চারপাশে। দৃষ্টির সামনে পাহাড়গুলো যেন আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গায়ে গায়ে লাগানো উঁচু-নিচু সব পাহাড়।
মৃদুলের এসএলআরের শব্দ যেন থামছেই না। রাস্তার পাশেই ফসলের মাঠ। গোটা মাঠেই ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত গারো নারীরা। একজন গারো নারীর সঙ্গে কথা হয় আমাদের। নাম জানাল, বন্যা রংমা। এ সম্প্রদায়ের আদিবাসীদের বিশ্বাস নারীর হাতে রোপিত গাছ থেকে অধিক ফসল মিলে। তাই হাঁটু অবধি কাদায় নেমে আশীর্বাদের পরশ দিয়ে চারা রোপণ করছে তারা। পাহাড় দেখতে দেখতে আবিষ্কার করি মাঠের পাশে একটি ছোট্ট খালের। তার ওপরে বাঁশ বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি সাঁকো বিশেষ। এ পথেই যাতায়াত করে আদিবাসী আর বাঙালিরা। কথা হয় কিরিত তিছিম নামের এক গারো যুবকের সঙ্গে। সে জানাল, খাল মনে হলেও এটি আসলে পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি ছোট্ট নদী। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের জলরাশি নিয়ে এটি আছড়ে পড়ে কংস নদীর বুকে। আর সে সময় ভেসে যায় দু
পাড়ের লোকালয়। আমাদের চোখের সামনেই পাহাড় থেকে উড়ে আসে বকের ঝাঁক। বকের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ দেখি দূর পাহাড়ে মেঘ ঝরছে। খানিক পরেই বাতাসের ধাক্কায় মেঘ যেন ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। আমরা পিছু হটি। সে সুযোগে এক পসলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয় আমাদের শরীরটাকে। ভেজা শরীরে পাহাড়ের দিকে তাকাতে দেখি অন্য দৃশ্য। গোটা পাহাড়ে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া উড়ছে। মনে হচ্ছে, পাহাড়ের বুকে যেন কষ্টের আগুন লেগেছে। স্থানীয়রা জানলো প্রচণ্ড গরমের পর অল্প বৃষ্টি হলেই পাহাড়ে এ রকম ধোঁয়ার মতো বাষ্প ওঠে। এখান থেকেই দেখা যায়, মেঘে ঢাকা তুরা পাহাড়টি। কিন্তু সবাই জানাল সে দৃশ্য দেখতে আসতে হবে শরতে।
এখানে ক্ষণে ক্ষণে বদলায় দূর পাহাড়ের রূপ। কড়ইতলীতে বসে আমরা সেগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখি। বিকাল হতেই নানা ঢঙের মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। নানা জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে গারো নারীরা।  আমরাও মিশে যাই কড়ইতলীর মানুষের মাঝে। মজে যাই দূর পাহাড়ের হাতছানিতে।

সুনিপুণ কারুকার্যের অনন্তসাগর পাড়

মোঃ রইছ উদ্দিন
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধিস্থল আর বারো জমিদারের সুনিপুণ কারুকার্যে নির্মিত প্রাচীন ভবন, গোলপুকুর, বৃত্তাকার দ্বীপ, অনন্তসাগর, চিমুরানীর দীঘি, খাজা উসমান খাঁর কেল্লা, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.) মাজার, দৃষ্টিনন্দন গৌরীপুর রাজেন্দ্র  কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি কলেজ, পামবীথি সড়ক, ঐতিহাসিক রামগোপালপুর জমিদারের সিংহ দরজা, যুগলবাড়ী, শান বাঁধানো ঘাট, বোকাইনগরের শাহী মসজিদসহ সবুজ-শ্যামল ছায়া ঘেরা বিলুপ্ত প্রজাতির বৃক্ষরাজিকে এক নজর দেখতে ঘুরে আসুন গৌরীপুর।
ময়মনসিংহ ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গৌরীপুর লজ থেকেই দেখতে শুরু করতে পারেন গৌরীপুরকে। এরপর ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুরের উদ্দেশে বাসযোগে রওনা হতে ময়মনসিংহ ব্রিজ থেকে বাসে চড়
ন বা ময়মনসিংহ  রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও আসতে পারেন। রামগোপালপুর পাওয়ারী জগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর রঙিন কাচের প্রাসাদ, কৃষ্ণমন্দির ও প্রাসাদের সুড়ঙ্গপথ আপনাকে মুগ্ধ করবে। একটু এগিয়েই দেখতে পাবেন ঐতিহাসিক সিংহ দরজা। তখন ডানে-বামে, সামনে-পেছনে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট আর শতবর্ষী দুটি গাছ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে।
এরপরেই ভবানীপুরের জমিদার জ্যোতিষ চন্দীর পুকুরের উপরে রানী øান করতেন। রহস্যজনক পুকুরটি আজ বিলীন। তবে এর চিহ্নটুকু দেখে এগিয়ে চলুন বোকাইনগর খাজা উসমান খাঁর কেল্লা, সম্রাট আলমগীরের আমলে নির্মিত শাহী মসজিদ আর হজরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া (রহ.) মাজার দেখতে। শাহ মারুফ (রহ.) মাজার ও কালীবাড়ির প্রাচীন মঠ আপনাকে আকৃষ্ট করবে। এরপরেই চলে যেতে পারেন বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধিস্থল মাওহা ইউনিয়নের কুমড়ি গ্রামে। সখিনার সমাধিস্থলে যেখানে কুন্দকুসুম গাছগুলো এখনো ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। এগাছগুলো বীরাঙ্গনা সখিনার স্বামী ফিরোজ খাঁর হাতে রোপিত বলে অনেকের মতবাদ। বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধিস্থলে তোরণের পূর্বপাশে সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটুকুতে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। একটু এগিয়েই দেখুন তাজপুরের কেল্লা, চিমুরানীর দীঘিÑ যার অস্তিত্ব শুধু এখন বিশালাকার সবুজ ধান ক্ষেত। কালের আবর্তে এটিও চলে গেছে ব্যক্তিমালিকানায়।
আবারও পথচলা গৌরীপুরের শহরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি কলেজ যেখানে দেখতে পাবেন কৃষ্টপুরের জমিদার সুরেন্দ্র  প্রাসাদ লাহিড়ীর দৃষ্টিনন্দন বাড়ির ভবন, পূজা মন্দির। একটু এগিয়েই দেখতে পাবেন ফরাসি স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত জমিদার ধীরেন্দ্র কান্ত লাহিড়ীর এক গম্বুজের সুদৃশ্য টিনের গোলঘরটি যা প্রাচীন ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেবে। আর এ ঘরের সামনেই সুবিশাল পুকুরের স্বচ্ছ পানি সুবজ ছায়া ঘেরা আর দক্ষিণা বাতাস আপনাকে হয়তো বসতে বলবে। তবে এখানে বর্তমানে পুলিশের এএসপি সার্কেল ও সহকারী কমিশনারের কার্যালয় থাকায় আপনার নিরাপত্তায় ত্র
টি হবে না। এর একটু সামনেই বাগানবাড়ি দুর্গা মন্দিরের সঙ্গে কৃষ্ণমন্দির ঘুরে আসতে পারেন। এরপরেই চলে যেতে পারেন গৌরীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের  পেছনের অংশে। বিশাল আকৃতির এক গম্বুজের জোড়া ভগ্ন শিব মন্দির ও কালী মন্দিরের ঐতিহাসিক কাঠামো দেখার জন্য। পাশেই গৌরীপুর থানা যেখানে রয়েছে বিরল প্রজাতির বৃক্ষরাজি। চলে যেতে পারেন সুউচ্চ পামগাছের সারি, জোড়াপুকুরের ঘাট, গোলপুকুর, বৃত্তাকার দ্বীপ ও জোড়া আমগাছ। একনজর দেখতে পারেন উপজেলা পরিষদের ভেতরে দেয়াল ঘেঁষে একটি পরগাছা বট কিভাবে একটি পাম গাছকে গলা টিপে হত্যা করেছে। যা আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে। দ্বীপ ঘেঁষা একটি গাছ যাকে বৃক্ষপ্রেমিক বা গবেষণাবিদরা এখনও নাম বলতে পারে, সেই অচিন বৃক্ষটি দেখুন।
জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর নিজ বাড়িতে বর্তমানে মহিলা ডিগ্রি কলেজ, গৌরীপুর প্রেস ক্লাব, নাট্য মন্দিরের সঙ্গে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন প্রাচীন দুর্গামন্দিরটিকে। তবে প্রেস ক্লাবের ভবনের সামনে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা প্রস্তুত রাখুন। কেন না প্রেস ক্লাবের ভবনটি জমিদারের শাসন আমলের রঙে আবারও সেজেছে।
সুউচ্চ পামগাছের সারির শেষ প্রান্তে দেখে যেতে পারেন জমিদারের নাট্যমঞ্চটি। যা বর্তমানে ঝলমল সিনেমা হল। জমিদার ব্রজেন্দ্র  কিশোর রায় চৌধুরী তার পিতা রাজেন্দ্র  কিশোর রায় চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন রাজেন্দ্র  কিশোর উচ্চ বিদ্যালয়। ইংরেজি ই-আকৃতির লাল রঙের সুনিপুণ কারুকার্যে নির্মিত ভবনের সামনে ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর স্ত্রীর প্রেম স্মৃতিকে অমর করে রাখতে অনন্তসাগর নামে একটি বৃহৎ পুকুর খনন করেন। এছাড়াও গৌরীপুর পৌর শহরের প্রথম মসজিদ পূর্বদাপুনিয়া জামে মসজিদ ও গুজিখাঁ গ্রামে অবস্থিত কেরামতিয়া মসজিদটিও দেখে যেতে পারেন।
কিভাবে আসবেন : ঢাকা থেকে সরাসরি গৌরীপুরের উদ্দেশে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস ছাড়ে সকাল ১১টায়, দুপুর ২টা ও বিকাল ৫টায়। এছাড়াও আপনি ময়মনসিংহ পর্যন্ত যেকোন যানবাহনে এসে ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের সন্নিকটে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাস যোগে গৌরীপুর আসতে পারেন। গেট লক ভাড়া ২০ টাকা, লোকাল বাসের ভাড়া ১৮ টাকা। ময়মনসিংহ  রেলস্টেশন থেকে ট্রেনেও আসতে পারেন। ভাড়া মাত্র ৬ টাকা। চট্টগ্রাম থেকে নাসিরাবাদ ট্রেন ছাড়ে বিকাল ৪টায়।
কোথায় থাকবেন : উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঙ্গে যোগাযোগ করলে ডাকবাংলো, পৌর মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পৌর অতিথিশালায় থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। মধ্যবাজারস্থ হোটেল রাজগৌরীপুর, রেলওয়ে স্টেশনে হোটেল সানি বর্ডিংয়েও থাকতে পারেন।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24