Golden Bangladesh
মৌলভীবাজার জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

মৌলভীবাজার জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

বাইক্কা বিল 


রাজীব পাল রনী
হাতে খুব বেশি সময় নেই। বুকের ভেতর বাজছে বিদায়ের সুর। রাতের গাড়িতেই ঢাকায় ফিরতে হবে। আবার সেই লোহা-লক্কড়ের শহরে আটপৌরে নাগরিক জীবন। যেতে তো হবেই; ইচ্ছা না করলেও। অথচ মনটা কেমন যেন উড়
উড় করছে। পুরো বিকালটা হাতে। ইচ্ছা করছে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে। সুশ্রী শ্রীমঙ্গলের অনেক কিছুই তো দেখা হল। লাওয়াছড়া, মাধবপুর লেক, চা বাগান, রাবার বাগান। তবু কিছু কি বাকি রয়ে গেল? তখনই মনে পড়ল বাইক্কা বিলের কথা। গাইড জানাল, খুব বেশি দূর যেতে হবে না। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ১৭-১৮ কিলো পথ মাইক্রোবাসে যেতে হবে। সব কিছু দেখে সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসা যাবে। ব্যস! আর সময় নষ্ট না করে সবাই মিলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম।
মাছ ও পাখির অভয়াশ্রম এ বাইক্কা বিল। ঢাকা থেকে ২০০ কিমি. উত্তর-পূর্বে মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত শহর শ্রীমঙ্গল। এ শহরের ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে হাইল হাওর। এর পূর্বদিকে ১০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ অভয়াশ্রমটি। মার্কিন সাহায্য সংস্থা ইউএসএইডের সাহায্য এবং স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এ অভয়াশ্রমই ঐতিহাসিকভাবে দেশীয় মাছের বংশ বিস্তারে প্রথম এলাকা। শহর ছাড়িয়ে গাড়ি নামল কাঁচা রাস্তায়। এবড়োথেবড়ো পথে গাড়ি চলছিল হেলেদুলে। পেছনের ছিটে বসে প্রায়ই লাফিয়ে উঠছিলাম। কিন্তু নির্জন পথের সৌন্দর্যও কম ছিল না। পড়ন্ত বিকালে জেলেরা ফিরছিল মাছ নিয়ে। কী মাছ ধরেছেন জানতে চাইলে এক জেলে খলুইয়ের ঢাকনা সরিয়ে দেখাল চিতল, টাকি আর তেলাপিয়া মাছ। দিন শেষে কিছু রোজগারের প্রত্যাশায় তার ঠোঁটের এক চিলতে হাসি বিকালের কমলা রঙের রোদের মতোই সুন্দর লাগছিল। হাওরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সবুজ কচুরিপানার ভেতরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বেগুনিরঙা ফুলদের। হাওর হচ্ছে এমন একটি এলাকা যা দুটি নদী প্রবাহ এলাকার মাঝের নিচু প্লাবন ভূমি। এ অঞ্চল বর্ষায় সম্পূর্ণ প্লাবিত হলেও শীতে আবার শুকিয়ে যায়। গাড়ি থেকে নামতে হল বেশ খানিকটা দূরেই। যান্ত্রিক শব্দ যাতে নির্জনতা ভঙ্গ না করে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। হাওরের ভেজা জলাভূমিতে পা রাখতেই দৃষ্টি কেড়ে নিল বাহারি পদ্ম ও শাপলা ফুল। হঠাৎই ডানা ঝাঁপটিয়ে আকাশে উড়াল দিল এক ঝাঁক পাখি। দূরে গোল পদ্মপাতা আর গোলাপি পদ্ম ও সাদা শাপলার ভিড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি যেন হাতছানি দিয়ে ডাক দিল। নাহ্! এ সৌন্দর্য কি দূর থেকে দেখা যায়! আমরা ডিঙি নৌকায় উঠলাম মাছ, পাখিদের কাছে যাব বলে। নৌকায় ভেসে যেতে যেতে আমরা দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে ল্যাঞ্জা হাঁস, গিরিয়া হাঁস, ভুতিহাঁস, পাতি সরালি, দাপটে সাঁতার কাটছে রাজ সরালি। এছাড়াও আছে পানকৌরি, কানি বক, সাদা বক, নীল সুন্দর কালিম, টিটি ও ঈগল। আছে শামুকভাঙা পাখির দল। তবে মুশকিল হচ্ছে কাছে গেলেই পাখিগুলো উড়ে পালায়। ফিরতে ফিরতে দেখছিলাম মাছ নির্ভয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বংশ বিস্তারের জন্য নানারকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। মা মাছ যাতে নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারে সে জন্য পানির ভেতর সিমেন্টের মোটা পাইপ বসানো আছে। বিলের ভেতর কত রকম যে জলজ উদ্ভিদ। নানারকম পাখির বিষ্টার কারণে এগুলো দ্রুত বাড়তে থাকে। আর সেগুলোই খেয়ে বাড়তে থাকে তৃনভোজি পাখি ও মাছ।
নৌকা পাড়ে ভিড়তেই চোখে পড়ল কাদা-মাটিতে বেড়ে ওঠা ঘাস-জঙ্গলের ভেতর সোনার নাকফুলের মতো উঁকি দিয়েছে ছোট্ট গোল গোল হলুদ ফুল। বিলের পাড়েই নির্মাণ করা হয়েছে একটি উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। দর্শনার্থীরা সেখানে উঠে পাখি দেখে থাকে। বিলের রক্ষণাবেক্ষণকারী মিন্নত আলী আমাদের নিয়ে উঠলেন টাওয়ারে। ওপরে দুটি দূরবীন আছে। যার একটা এরই মধ্যে বিকল হয়ে আছে। টাওয়ারের ওপরের উঠে বিলটাকে আরও সুন্দরভাবে দেখা গেল। উঁচু থেকে হাওর অঞ্চলের অনেকটাই দেখা যায়। মিন্নত আলীর কাছে জানা গেল, মানুষের কোলাহলে এবং নানারকম কর্মকাণ্ডে কমে গিয়েছিল হাওরের অতিথি পাখি। কিন্তু অভয়াশ্রম করার পর সেইসব পাখি আবার ফিরতে শুরু করেছে। বিলের পাশের হিজল-করোচের বনে বাসা বেঁধে বাচ্চা দিতে শুরু করেছে মুখচেনা পাখিরা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই পাখির কিচির-মিচিরে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো এলাকা। কাগজে এর আগে বহুবার ছবি দেখেছি বাইক্কা বিলের পাখিদের। বর্ণনাও পড়েছি। অথচ নিজে চোখে দেখার অনুভূতি যেন একেবারেই অন্যরকম। একবার গেলে বুঝবেন, প্রকৃতি আমাদের কতটা উজ্জ্বীবিত করে। কর্মব্যস্ততার অবসরে একটা দিন না হয় কাটিয়ে গেলেন মাছের সঙ্গে, পাখিদের সঙ্গে। পাখির গান শুনতে শুনতে বন্য ফুলের গন্ধে মেতে উঠতে উঠতে মনে হবে জীবনটা এত সুন্দর!

  হাকালুকি হাওর

বাংলাদেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত। এ হাওরের আয়তন প্রায় ২০,৪০০ হেক্টর। বর্ষাকালে বিস্তৃত জলরাশি এ হাওরের রূপ ঠিক যেন ভাসমান সাগর। আদিগন্তু বিস্তৃত জলরাশি। জলের মাঝে মাঝে দুই-একটি বর্ষীয়ান হিজল, তমাল বৃক্ষ। অথচ শীতকালে বিস্তৃত এই হাওর ধু-ধু সবুজপ্রান্তর, কোথাও বা ধান ক্ষেত এবং খানাখন্দ নিচু ভূমিতে প্রায় ২৩৬টি বিলের সমষ্টি। হাকালুকি হাওর মাছের জন্য প্রসিদ্ধ। হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের সংরক্ষিত জলাভূমি। শীত মৌসুমে এশিয়ার উত্তরাংশের সাইবেরিয়া থেকে প্রায় ২৫ প্রজাতির হাঁস এবং জলচর নানা পাখি পরিযায়ী হয়ে আসে। এছাড়া স্থানীয় প্রায় ১০০ প্রজাতির পাখি সারাবছর এখানে দেখা মেলে। এই হাওর অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। মৎস সম্পদ এবং জলজ প্রাণী-উদ্ভিদের জীববৈচিত্র্য এককথায়  আসাধারণ। ধু-ধু প্রান্তরের এই চারণভূমি ও বিলগুলো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং পরিযায়ী পাখির কলকাকলি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটককে দুর্বার আকর্ষণে রোমাঞ্চের হাতছানি দেয়। হাকালুকি হাওরে পরিযায়ী হাঁসের মধ্যে চখাচখী, রাজসরালী, গরাদমাথা রাজহাঁস, ধলাবেলে হাঁস, গাডওয়াল, ইউরেসীয় সিথীহাঁস, টিকিহাঁস, পাতিহাঁস ম্যার্গেঞ্জার প্রভৃতির দেখা মেলে। দেশি প্রজাতির মধ্যে বেগুনি কালেম, পানমুরসী, পাতিকুট, ডাহুক, ইউরেশীয় মুরগি চ্যাগা, ল্যাঞ্জা চ্যাগা, রাঙ্গাচ্যাগা, জলাপিপি, ময়ূরলেজা পিপি, পাতি জিরিয়া,  হাট্টিটি, ভূবনচিল, শঙ্খচিল, বিলুপ্ত প্রায় কুড়াল ঈগল, বড়খোঁপা ডুবুরি, ছোট পানকৌড়ি, খয়রা বক, ধূসর বক, শামুক খোল প্রভৃতি পাখি অন্যতম। হাকালুকি হাওরে অনেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। চিতল, আইড়, বাউশ, পাবদা, মাগুর, শিং, কৈ প্রভৃতি মাছ এখানে রয়েছে। জলজ উদ্ভিদের মধ্যে বিলুপ্ত প্রায় মাকনা হাওর অঞ্চলের পুটি, হিঙ্গাজুর, হাওয়া প্রভৃতি বিলে যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। এছাড়া শাপলা, শালুক, পদ্ম প্রভৃতি জলজ উদ্ভিদ ও আশাব্যঞ্জকহারে এখানে রয়েছে। এ হাওর সংরক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি বিল ৩ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে। ফলে মৎস সম্পদ আহরণের জন্য পানি সেচে ফেলার কারণে জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ দারুণভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ে। পালাক্রমে বিলগুলোতে মাছ ধরা হয়। যেসব বিলে মাছ ধরা হয় না সেসব বিল পাখি ও জলজ উদ্ভিদের জন্য মনোরম আবাসস্থলে পরিণত হয়। ২০০৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রয়ারি মাসে এ হাওরের পুট বিল, হাওয়া বিল, হিঙ্গাজুর, জল্লার বিল, মালাম প্রভৃতি বিলে মাছধরা বন্ধ থাকায় চমৎকার জীববৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়েছে।

হাকালুকি হাওর ভ্রমণের সেরা সময় : নভেম্বর থেকে ফেব্রয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময় হাওর ভ্রমণের জন্য সেরা। এসময় এখানে প্রচুর সংখ্যায় পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে চারদিক মুখর থাকে। জলজ উদ্ভিদ, মাছপ্রেমীদের জন্য এটা সেরা মৌসুম।
আবাসন : হাওর এলাকায় বিল ইজারাদারদের দোচালা কুটিরগুলোয় দু
চারজন পর্যটক থাকার জন্য চমৎকার। তবে অবশ্যই বিলমালিকের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। সবচেয়ে ভালো হয় বিল এলাকায় তাঁবু ফেলে রাত্রি যাপন। জোছনা রাতে তাঁবুতে যাপন, পাখি পর্যবেক্ষণ যে কোনও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় পর্যটককে বিমোহিত করবে।
আহার : সঙ্গে আনা চাল-জলের রেশন হাওর এলাকার শ্রমজীবী মানুষকে সামান্য কিছু টাকা দিলে পছন্দ মতো টাটকা মাছের ঝোলের তরকারি দিয়ে তা পরিবেশন করবে অথবা ওদের সঙ্গেও সুস্বাদু খাবার শেয়ার করা যাবে অনায়াসে। এখানকার বাথানে গরু-মহিষের দুধও খুব সস্তায় পাওয়া যায়। সঙ্গে হালকা চা, নাশতা, বিস্কুট, পাউরুটি নিলে খুব ভালো হয়।
যাতায়াত : ঢাকা থেকে ট্রেনে অথবা বাসে কুলাউড়া শহর থেকে রিকশা যোগে পছন্দমতো বিলের নিকটমতো গ্রাম অতঃপর ট্রেকিং। ঢাকা থেকে কুলাউড়া ট্রেনভ্রমণে খরচ শ্রেণীভেদে ১৩০ থেকে ৪৫০ টাকা। এসি বাস নেপচুন (ফোন ৭১০১৯৫১, ৯১২৩০৯২), শ্যামলী পরিবহণ (ফোন ৭১০১৭২৫) ভাড়া যথাক্রমে ৩৫০ টাকা এবং ৩০০ টাকা। কুলাউড়া শহর থেকে অটোরিকশা ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং রিকশা ভাড়া ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকার মধ্যে।
সঙ্গে যা নিতে হবে : ভালো বড় ব্যাকপ্যাক, তাঁবু, ম্যাট, এয়ার পিলো, রেইন কোট, শীতের উপযোগী জ্যাকেট, গামছা, কাদা-পানিতে চলন উপযোগী রাবারের নাগরা জুতা, পাখি পর্যবেক্ষণের জন্য বাইনোকুলার, ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যাটারি, মেমরিকার্ড, শুকনো খাবার, চা, চিনি দুই-একদিনের জন্য রেশন, প্রাথমিক ওষুধ-চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদি।

  পরিকুণ্ড জলপ্রপাত

কল্যাণ প্রসূন
মাধবকুন্ডের পাশে পরীকুন্ড জলপ্রপাত টানবে সবাইবে ঈদের ছুটিতে অনেকে বেড়াতে যান। বেড়ানোর জায়গাটা যদি প্রকৃতির খুব কাছাকাছি হয়, তবে তো কথাই নেই।
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত কমবেশি সবারই চেনা। তবে এর কাছেই যে আরেকটি জলপ্রপাত আছে, সেটা কি দেখা হয়েছে? স্থানীয় মানুষের কাছে এর নাম পরিকুণ্ড। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই জায়গাটি টানবে সবাইকে। মাধবকুণ্ডের চেয়ে পরিকুণ্ড কিছুটা নির্জন। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় ছেয়ে আছে এর চারপাশ। প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু থেকে পাথরের খাড়া পাহাড় বেয়ে শোঁ শোঁ শব্দ করে জলধারা নিচে আছড়ে পড়ছে। নিচে বিছানো ছোট-বড় পাথর গড়িয়ে স্রোতধারা একটি বড় ছড়ায় মিশে গেছে। বড় একটি পাথরে বসে আনমনে খুব কাছ থেকেই জলপ্রপাতের নৈসর্গিক দৃশ্য উপভোগ করা যেতে পারে। ইচ্ছা করলে স্বচ্ছ পানির ছড়ায় ভালোমতো গোসলও সেরে নেওয়া যায়।

ঈদের ছুটিতে যাঁরা মাধবকুণ্ডে বেড়াতে যেতে চান, তাঁরা চাইলেই পরিকুণ্ড দেখে আসতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ জানালেন, তিনি ডিজিটাল ক্যামেরা দিয়ে পর্যটকদের ছবি তুলে দেন। কেউ বললে পরিকুণ্ডে নিয়ে যান। পর্যটকেরা খুশি হয়ে যা দেন, তা-ই নেন। মাধবকুণ্ডের পর্যটন করপোরেশনের রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক রমিজ উদ্দিন ভূঁইয়া জানালেন, মাঝেমধ্যে পর্যটকদের অনেকে এসে পরিকুণ্ড যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে জানতে চান।
যেভাবে যাবেন পরিকুণ্ড

টিকিট কেটে প্রধান ফটক পেরিয়ে মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতের রাস্তা। হাঁটতে হাঁটতে সামনে গিয়ে হাতের বাঁ পাশে টিলার ওপর শিবমন্দির। এর ঠিক বিপরীতে রাস্তার সঙ্গে একটি নতুন পাকা সিঁড়ি তৈরি হয়েছে। ওই সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাধবকুণ্ডের মূল ছড়া। আর ওই ছড়াটির সোজাসুজি পাথর বিছানো ছড়া দিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটলেই পরিকুণ্ড। ভয়ের কারণ নেই। ছড়ায় শুধু পায়ের পাতাই ভিজবে। ভয়ের অবশ্য দু-একটা কারণ আছে। নিচে বিছানো পাথরগুলো কিন্তু বেশ পিচ্ছিল। শ্যাওলা জমে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাই পা ফেলতে হবে সাবধানে। মাধবকুণ্ড ও পরিকুণ্ড বেড়াতে এসে কাছাকাছি রাত্রিযাপনের জন্য জেলা পরিষদের দুই কক্ষের একটি বিশ্রামাগার আছে। সেটি কমপক্ষে সাত দিন আগে বুকিং দিতে হয়।

মাধবকুণ্ডের পথ অনেকেরই চেনা। আন্তনগর ট্রেনে ঢাকা থেকে সরাসরি কুলাউড়া জংশন রেলস্টেশনে নামতে হবে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে সরাসরি মাধবকুণ্ড পৌঁছাতে পারেন। ভাড়া নেবে তিন বা চার শ টাকা। কুলাউড়ায় নেমে বাসে করেও যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আপনাকে কাঁঠালতলী বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় মাধবকুণ্ড। দূরত্ব আট কিলোমিটার, ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। এ ছাড়া ঢাকা বা অন্য জায়গা থেকে সড়কপথে কাঁঠালতলী বাজার হয়ে মাধবকুণ্ডে পৌঁছানো যায়।

মাধবকুন্ড জলপ্রপাত

ইবনে আবদুর রহমান
দেশের প্রত্যেক অঞ্চল ভ্রমণ করা আমার মজ্জাগত হলেও ইতিপূর্বে কখনও সিলেট যাওয়া হয়ে ওঠেনি। মনের মধ্যে অনেকদিন ধরেই আশা ছিল সিলেটের পুণ্যভূমি ঘুরে আসার। কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠছিল না। হঠাৎ বন্ধু সাদীদ বলল, ভাইয়া চলেন কোথা থেকে ঘুরে আসি। আমি অর্থব্যয়ের ভাবনায় কিছুটা ইতস্তত করলে সাদীদই অভয় দিল, আমরা না হয় গরিবানা হালে বেড়িয়ে এলাম কোন ভালো দর্শনীয় স্থান। আমি ওকে স্থান ও তারিখ ঠিক করতে বলে টাকা গোছাতে লেগে গেলাম। অক্টোবরের শেষ দিকে মঙ্গলবার বেলা দুইটার জয়ন্তিকা উপবন ট্রেনে চড়ে বসলাম সিলেটের উদ্দেশে, টিকিট আগেই কাটা ছিল। সাদীদের প্রথম ট্রেন ভ্রমণ এবং আমারও বলা চলে প্রথমই। কারণ এর আগে আমি মাত্র দু
বার ট্রেনে চড়েছি। তো চরম পুলকিত শিহরণে ট্রেনে উঠলাম; না জানি কোনখানে না কোনখানে সিট পড়ে। কিন্তু না ভাগ্য ভালোই ট্রেনের ঠিক মাঝ বরাবর টেবিলযুক্ত সিট পেয়ে গেলাম। একই সঙ্গে সম্মুখ দৃষ্টিযুক্ত। আমরা দেখতে দেখতে চলতে থাকলাম। ট্রেনে শ্রীমঙ্গল পার হতেই সন্ধ্যা নেমে এলো। কুলাউড়া পেরিয়ে আরেকটি ঘাট তারপরই সিলেট। পৌঁছালাম রাত ১০টায়।
সিলেটে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত ছোট ভাই কয়েকজন থাকলেও কাউকেই আগেভাগে জানাইনি অযথা অন্যকে বিরক্ত করার ভয়ে। তাই প্লাটফর্ম থেকে নেমেই রেলওয়ে ভবনেই আবাসিক হোটেল পেয়ে থেকে যাই। হোটেলের মান মোটামুটি ভালো। পরদিন সকাল সকাল উঠে আমার একটি এলাকার ছোট ভাইকে ফোন দিলাম। ওর ঠিকানা বলে রিকশা নিয়ে ওর ওখানে চলে যেতে বলল চা খেতে। আমরা তাই করলাম। চা খেয়ে সিলেটে বেড়ানোর সংক্ষিপ্ত ছক এঁকে বিমানবন্দর ও চা বাগান দেখতে চলে গেলাম। তবে দুপুরে ওর বাসায় লাঞ্চের দাওয়াত নিতে ভুল হয়নি।

চা বাগানে
বিমানবন্দর ও আশপাশের টিলা ঘুরে ঘুরে একটি রিকশা নিয়ে চলে এলাম চা বাগানে। একটি টিলার চা বাগানে কয়েকজন নারী-পুরুষ পাতা কাটায় ব্যস্ত। সঙ্গে ছোট ছোট ছেলেমেয়েও আছে। আমাদের দেখেই নড়েচড়ে বসল। বিভিন্ন প্রশ্ন ও কথামালার মাঝে সাদীদের ক্যামেরা মোবাইল ø্যাপ নিয়ে চলল। আমি একজন শ্রমিক ও তার সহকারীকে নিয়ে ছবি তুলতে যাব এমন সময় দেখি পাশে একটি বারো তেরো বছরের মেয়ে।
আমরা ওকেও ছবির এরিয়ার মধ্যে আসতে বললে ও
আবার ছুবি তুলা লাগে নাকি বলে দূরে চলে গেল।

আকাক্সিক্ষত খাদ্য বিশেষ
ছোটবেলা থেকে বই পড়ে, পত্রিকার ভ্রমণ কাহিনী পড়ে কমলালেবু, আনারস ও চায়ের কথা বিশেষভাবে জেনেছি। তাই সিলেট গিয়ে এগুলো বেশি বেশি খেতে আগ্রহী হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যতই দেখেশুনে বেছে বেছে কমলালেবু অথবা আনারস খেলাম সবই হয়তোবা বেজায় টক অথবা একদম পানি পানি। তবে সিলেটের পানিফলগুলো বড়ই সুস্বাদু। একই সঙ্গে চায়ের স্বাদও কেমন যেন পানসে লাগল।

অসম্পূর্ণ মাধবকুণ্ড দর্শন
সিলেট শহর দেখতে দেখতে দুটি দিন লেগে গেল। পরদিন মাধবকুণ্ড দেখতে রওয়ানা দিলাম। পৌঁছলাম বিকেল ৪টায়। ঝরনা ও পাশে টিলার কিয়দংশ দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। টিকিট কাটার সময়ই জেনে গিয়েছি সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে গেইট বন্ধ করে দেয়া হবে। তাছাড়া সিলেটে আমাদের হোটেল বুক করা সুতরাং একরাশ অপূর্ণতা নিয়ে ঝরনার পানিতে না নেমেই চলে আসতে হয়েছে ওখান থেকে। তবে কোন ফাঁকে যেন সাদীদ ঠিকই ডুবিয়ে চুবিয়ে ওর আসা পূরণ করেছে; ওর মাথা ভেজা না দেখলে আমি তা বুঝতে পারতাম না।

শেষ কথা
সিলেট ভ্রমণ মূলত দু
একদিনের করা ঠিক না। অন্তত দশদিন সময় নিয়ে গেলে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নিজেকে মাখামাখি করা সম্ভব। অন্যথায় বুকভরা ব্যথা নিয়েই ফিরতে হবে ডেরায়।


উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান:

মাধবকৃন্ড ইকোপার্ক

বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক

হযরত শাহ মোস্তফা (র:) এর মাজার শরীফ

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ


তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24