Golden Bangladesh
মানিকগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

মানিকগঞ্জ জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

জমিদারের আয়নায় দেখি নিজের চেহারা 


আগে জুতো-চপ্পল পায়ে যে বাড়ির সামনে দিয়ে সাধারণ মানুষ হেঁটে যেতে পারত না, সে বাড়ির অন্দরমহলে আমরা দিব্যি ঢুকে পড়লাম জুতো পায়ে। ঘুরে বেড়ালাম সারা বাড়ি। অথচ সেজন্য আনন্দ অনুভব করলাম না। এর একটি কারণ হয়তো এইÑ আগে এ বাড়িতে থাকত জমিদার পরিবারের মানুষজন। আর এখন এ বাড়ির বাসিন্দা ইঁদুর, চিকা, চামচিকা, চড়ই পাখি আর কবুতর। বাড়িটি এখন আর আগের মতো জমিদারদের পায়ের আওয়াজে কেঁপে ওঠে না, রঙ্গমহলের নাচের তালে কিংবা নূপুরের তালে নেচে ওঠে না। আমার মতো দর্শনার্থীর নামে সাধারণ মানুষদের যারা এ বাড়িতে আসে, তারা দিনে এসে দিনেই চলে যায়। ঘুরে-ফিরে দেখে নির্জন বাড়িটি। কত উঁচু দালান, আগের দিনের দোতলা পুরনো বাড়ি এখনকার চারতলা বাড়ির সমান উঁচু। তার ওপর কত কারুকাজ। বাড়ির দেয়াল থেকে ইট ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ার পরও এ বাড়ির কারুকাজ চোখে পড়ে, অবাক করে। আমাদের ভ্রমণসঙ্গীদের একজন তো বলেই ফেললেনÑ কত দিনে নির্মাণ করেছে বাড়িটি। আগে তো এত ইঞ্জিনিয়ার-আর্কিটেক্ট ছিল না, নির্মাণ শ্রমিকও তো এত ছিল না। বাড়িটি কি দিয়ে বানানো? ইটের সঙ্গে কি সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে, নাকি ইট-চুন-সুরকি? সঠিক কোন তথ্যের ওপর নয়, নিজেদের মতামতের ওপর ভর করে আমরা একমত হলাম, বাড়িটি ইট-চুন-সুরকি দিয়েই নির্মিত। আমরা কেউই ইতিহাসের ছাত্র নই, প্রাচীন স্থাপনা ও মানুষ সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণাও নেই। যা জানি লোকমুখে শুনে, আর হয়তো দুএকটি বই পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে।
মানিকগঞ্জের বালিয়াটি উপজেলার এ বাড়ির নামÑ বালিয়াটি প্রাসাদ। ৫.৮৮ একর জমির ওপর জরাজীর্ণ দেহে দাঁড়ানো প্রাসাদটি। এ নিয়ে দু
বার আমি এ বাড়িতে গিয়েছি। প্রথমবার ১ মে, দ্বিতীয়বার ৫ মে। দুবার যাওয়ার কারণÑ প্রথমবার মানে ১ মে শ্রমিক দিবস, সরকারি ছুটির দিন। শুক্র ও শনিবার বাদে সরকারি সব ছুটির দিনেই বালিয়াটি প্রাসাদ বন্ধ থাকে। দারোয়ানকে বলে-কয়ে প্রাসাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলাম, ঘুরেও দেখেছি বাড়িটি। প্রদর্শন কক্ষ সিলগালা করে রাখা, তাই দেখা হল না। প্রদর্শন কক্ষে কী আছে, তা জানতেই দ্বিতীয়বার সরকারি খোলার দিনে বালিয়াটি প্রাসাদে। এক সপ্তাহের মধ্যে দুবার একটি বাড়িতে যাওয়া, বাড়ির ভেতরে দুদিন সারাদিন থাকার পরও ভ্রমণ আনন্দদায়ক। অন্যরা এর কী কারণ ব্যাখ্যা করবেন জানি না, আমার মনে হয়েছেÑ এ বাড়িতে কেউ যদি একা আসেন, খুব নিঃসঙ্গ অনুভব করবেন। নিঃসঙ্গ থাকার মধ্যেও যে বিশেষ আনন্দ অনুভূত হয়, তা জনকোলাহলের এ নগরের মানুষ ভালো অনুধাবন করতে পারবেন। প্রাসাদের ভেতর আপনাকে এতই নিঃসঙ্গ মনে হবে যে, নিঃসঙ্গতায় কান্নাও পেতে পারে। কান্না পেতে পারে আরও একটি কারণে, সেটি হচ্ছে ভয়। দিনের আলোতেও আপনি ভয়ে চমকে উঠতে পারেন এ প্রাসাদের ভেতরে। এমনকি আপনার পাশে হঠাৎ একজনের উপস্থিতি আপনাকে চমকে দিতে পারে, চমকে দিতে পারে একটি পাখির ডাকও। বাড়ির ভেতরের ইঁদুর, চিকা, চামচিকারা অন্ধকারে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে কিংবা খাবারের সন্ধানে ওঁৎ পেতে আছে। আপনার বা আপনাদের উপস্থিতিতে মানুষের গায়ের গন্ধ পেয়ে তারাও হয়তো ভয় পাবে। কিন্তু ভয়ে এসব নিরীহ প্রাণীদের দৌড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে আপনিও ভড়কে যাবেন। প্রাণীদের ডাক আপনাকে ভয়কাতুরে করবে কারণÑ নির্জন এ প্রাসাদে তাদের পদচারণা ছাড়া আর কারও রাজত্ব নেই। বিশাল জায়গাজুড়ে প্রাসাদের ভবনগুলো বিশাল উঁচু উঁচু। ইট ক্ষয়ে ক্ষয়ে পড়ছে। বাইরে আলো, ভেতরে অন্ধকার। জানালার ফাঁক দিয়ে আপনি ঘরের ভেতরে তাকাবেন, দেখবেন কাঠের সিঁড়িগুলো ভাঙা ভাঙা। ঘরের দরজা-জানালাগুলো ভাঙা ভাঙা। তাতে আবার তালা ঝুলছে। ভাঙা বাড়িতে ইটের ফাঁকে ফাঁকে সূর্যের আলো ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখবেন ভীতিকর এক পরিবেশ। প্রাসাদের পরিবেশ যে সত্যি ভয়ংকর তার একটি উদারণ দিই। ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে প্রথম দিন বাজি ধরেও এ প্রাসাদের দুটো ভবনের চিপা দিয়ে একা হেঁটে যেতে পারিনি আমি নিজেই। কিছুদূর যাওয়ার পরেই ভয়ে ফিরে এসেছিলাম। দ্বিতীয় দিন আমার এক ভ্রমণসঙ্গীকে ওই ভবন দুটোর মাঝখানে রেখে পেছন থেকে সরে গিয়েছিলাম। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে যাচ্ছিলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর পেছনে তাকিয়ে যখন দেখলেন আমি নেই, ভয়ে দিয়েছিলেন দৌড়। বিষয়টি এমনÑ আপনি জানবেন আপনার অন্য সঙ্গীরা আশপাশে আছে, তার পরও দিনের আলোয় আপনি এ ভবন দুটোর ফাঁক দিয়ে একা যেতে পারবেন না, নিজেকে যত সাহসী মানুষই মনে করেন। ভবনের ভেতরে গেলে কী পরিবেশ হবে আমরা অনুমান করতে পারব না, কারণ আমরা সে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারিনি। আমরা নিজেরা মশকরা করে এমন কথাও বলেছি, বাংলার সেরা সাহসী সন্তান কে তা পরীক্ষা করা যেতে পারে এ ভবনে। অর্থাৎ তাকে এ ভবনের ভেতরে একা ছেড়ে দিয়ে তার সাহস পরীক্ষা করা যেতে পারে। রাতের অন্ধকারে ছাড়তে হবে না, দিনের আলোতেও এ পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রথমবার বিচ্ছিন্নভাবে আমরা ঘোরাঘুরি করলাম প্রাসাদের ভেতরে-বাইরে। ছবি তুললাম ইচ্ছেমতো। সেবার আমাদের ভ্রমণসঙ্গীদের বিশেষ একজন ছিল সৌরভ সাখাওয়াত। তার বড় হবি ছবি তোলা। ছবি তোলার কারুকাজ সে দেখিয়েছে সেবার। দ্বিতীয়বার আমাদের ভ্রমণসঙ্গীর বিশেষ একজন ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। একটি বিশেষ কাজে তার এখানে আসা। বাইরে থেকে দেখে অনুমান করা যাবে না, কতটা রসিক তিনি। এবারই প্রথম তার সঙ্গে আমার এতদূর ভ্রমণ। আমাদের ভ্রমণপথে যাওয়া-আসার মাঝে জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা তিনি বলেছেন পরম আন্তরিকতায়। গাড়িতে যেতে যেতে আমরা যখন বলতে থাকলাম, জমিদার এত দূর কেন প্রাসাদ গড়েছেন, হাদী ভাই তার অভিজ্ঞতা থেকে রসিকতা করেই জানালেন সত্য তথ্যটিÑ নদীপথে চলাচল করতেন জমিদার। তখন তো যোগাযোগ বেশি ছিল কলকাতার সঙ্গে। পদ্মার বোটে চড়ে, কিংবা জাহাজে চড়ে কলকাতায় যেতে হতো তাদের। আমরা যখন আবার প্রশ্ন করলামÑ নদী কই, সব তো দেখছি ফসলের মাঠ। আমাদের একজন বললেন, বর্ষাকালে এসো, দেখতে পারবে জল। যদিও আমরা অনুভব করলাম, বাংলাদেশের অন্য নদীগুলোর মতো এখানকার নদীগুলোও মরে গেছে। যার ফলাফল আগেকার যুগে বানানো লোহার ব্রিজের নিচে গড়ে উঠেছে টিনের বাড়ি, ইটের ভবন, ভুট্টা ক্ষেত, লেবুর বাগান। আর ব্রিজের পাশে ফ্রিজ মেরামতের একটি দোকান দেখিয়ে হাদী ভাই এও জানালেনÑ তোমরা খোঁজ নাও, এখানে বিউটি পার্লারও পাবে। কত পরিবর্তন হয়েছে আমাদের। এ পরিবর্তন ভালো না মন্দ, তর্ক করে লাভ নেই। পরিবর্তনকে মেনে নেয়াই ভালো, ঝামেলা কম।
পরিবর্তনের ধারায় আরও একটি বড় পরিবর্তন দেখলাম। প্রাসাদের ভেতরে বিভিন্ন ফলের গাছ আছে। তার থেকে আমরা কাঁচা আম পেড়ে খেলাম। দেখলাম কেউ নিষেধ করল না। পাকা পেঁপে ভেবে গাছ থেকে হলদে রঙের যে ফলটি পেড়ে আনলাম, কেটে দেখি ভেতরে কাঁচা। তাই খাচ্ছি আমরা। হাদী ভাইকেও দিলাম খেতে। দিতে দিতে অনুভব করলামÑ জমিদার যদি থাকতেন, চাইলেও প্রাসাদের ভেতরে এভাবে ফল পেড়ে কি খেতে পারতাম আমরা! তবে হাদী ভাই এ প্রাসাদে এসেছেন জানলে বিশেষ আপ্যায়নের ব্যবস্থা হতো। কিংবা তিনি আসবেন জানলে নিশ্চয়ই জমিদার আগেই ঘোড়ার গাড়ি পাঠাতেন তাকে আনার জন্য। অভ্যর্থনার ব্যবস্থাও করতেন। মাঝেসাঝে তাকে দাওয়াত করে আনতেন গান শোনার জন্য। জমিদারের পানশালার অতিথি হতেন সৈয়দ আবদুল হাদী। আর আজ...। জমিদার নেই, জমিদারের জমিদারিত্ব নেই... প্রাসাদের জৌলুস ক্ষয়ে জরাজীর্ণ অবস্থা। অতিথি আপ্যায়নের অভিজাত আর বাহারি খাবারের আয়োজনও নেই। তবে প্রাসাদের ভেতরে যেটি জমিদারের রঙ্গশালা ছিল, সেখানে একটু আভিজাত্যের ছাপ সংরক্ষিত আছে। যেমনÑ জমিদারের রঙ্গশালায় কারুকাজ করা দেয়ালটি যতনে সংরক্ষিত। সে ঘরেই আছে জমিদার পরিবারের সদস্যদের ব্যবহার করা বেশ কয়েকটি দেয়াল আয়না। কত বড় আর কত সুন্দর আয়নাগুলো। সামান্য আলোয় আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখলাম, আমার মতোই স্বাভাবিক। এমন যদি হতো, জমিদারদের আয়নায় নিজের চেহারা জমিদারদের মতো মনে হতো, একটু ভাব নেয়া যেত। সে আশা পূরণ হলো না। ঘরে ঘরে ঘুরে দেখলাম কাঠের চেয়ার, কাঠের টেবিল, কাঠের খাট, কাঠ মানে যেই সেই কাঠ নয়, একেবারে স্টিকারে লেখাÑ সেগুন কাঠ। অন্য ঘরগুলোতে রাখা আছে ঝুলন্ত হারিকেন, চিমনি, ক্যাশ বাক্সসহ বেশকিছু আসবাব। প্রাসাদের বিশালত্বের তুলনায় খুব সামান্যই এসব আসবাব, জমিদারদের তুলনায় যেমন খুব সামান্য মানুষ আমরা। প্রাচীর ঘেরা সাতটি ভবনে মোট দু
শ কক্ষ। অথচ ঘরে সংরক্ষণে আছে মাত্র একটি খাট। অন্য আসবাব কি জমিদাররা নিয়ে গেলেন? অবান্তর এসব ভাবনা! ওখানকার একজন বললেন, বড় খাটটি আছে ঢাকা জাদুঘরে। অন্য আসবাবের খুব সামান্যই নিতে পেরেছেন জমিদার। বেশকিছু আসবাব নষ্ট হয়েছে যাচ্ছেতাই ভাবে। গুনে গুনে লোহার পনেরটি বড় সিন্দুক এ ভবনের নিচতলার একটি বড় কক্ষে সংরক্ষিত আছে। আগে কী থাকত এতে? টাকা, পয়সা, স্বর্ণ, অলংকার, গহনা। আর এখন কি আছে এতে? হাওয়া-বাতাস, শূন্যতা আর অন্ধকার।
প্রাসাদে যাওয়ার পথেই আমরা জেনেছিলাম, সৈয়দ আবদুল হাদী এর আগেও একবার এসেছেন এ প্রাসাদে। সেবার তিনি এসেছিলেন মাছ ধরতে। হাদী ভাইয়ের বিচিত্র শখের একটি মাছ ধরা। আগে অনেক শৌখিন মানুষের এমন শখ ছিল। এ প্রাসাদের পুকুরে মাছ ধরতেন তিনি। প্রাসাদের পেছনে পুকুরটি। একটি পুকুর, পাঁচটি ঘাট। ঘাট থেকে পুকুরে নামার সিঁড়িগুলো অনেক বড় লম্বা মনে হচ্ছে। এর কারণ পুকুরের পানি তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে। পানি নেই, মাছ থাকবে কই। জমিদারিত্ব বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে বুঝি মাছেরও বিলুপ্তি ঘটেছে। বিশাল এ পুকুরের পাড়ে আমরা বসে ছিলাম বহুক্ষণ, নিস্তব্ধ পুকুরের পাড়ে বসে পাখির ডাক শুনে আপনি গাইতেই পারেন
তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী। হাদী ভাই যেমনটি গাইছিলেন। বলা প্রয়োজন, এ পুকুরটিও বিশাল প্রাচীরে ঘেরা।
প্রাসাদের প্রবেশমুখে বোর্ডে টানানো তথ্যমতে, খ্রিস্টীয় উনিশ শতকে ইমারতগুলো ঔপনিবেশিক স্থাপত্যিক গঠন কৌশলে নির্মিত। বালিয়াটি জমিদারদের পূর্বপুরুষ গোবিন্দ রাম সাহা ছিলেন একজন ধনাঢ্য লবণ ব্যবসায়ী। তার পরবর্তী বংশধররা এসব ইমারতের প্রতিষ্ঠাতা। এরা হলেন যথাক্রমেÑ দাধী রাম, পণ্ডিত রাম, আনন্দ রাম ও গোলাম রাম। এদের বংশধররা বালিয়াটির ভবনগুলো ছাড়াও এ অঞ্চলে এবং রাজধানী ঢাকায় বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয় ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকার বিখ্যাত জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) এদেরই বংশধর বাবু কিলোরী লাল রায়ের নির্মাণ করা। বোর্ডের লেখা তথ্যগুলো পড়ে জমিদারদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই পারেন, তাদের টাকা-পয়সায় ঢাকায় বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, মন্দির হয়েছে। এমনকি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এ জমিদার বংশধরদের প্রতিষ্ঠা করা। খুব আগ্রহ হচ্ছিল জানতে, এ জমিদারদের বংশধরদের কে কে জীবিত আছেন এখন? তাদের পেশা কী? তারা কি এখনও আগের মতোই জৌলুসপূর্ণ জীবনের অধিকারী? নাকি আমাদের মতো সাধারণ, অতি সাধারণ। নাকি অবলম্বন হারিয়ে নিঃস্ব, অসহায়! মানবেতর চোখে দেখছেন তাদের ভৃত্যদের রাজত্ব।
ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে সাহা বংশপদের এক হিন্দু জমিদার ছিলেন। তাদের বাড়িটি এমন প্রাচীর ঘেরা ছিল।
৪৭-এ ভারত বিভক্ত হওয়ার পর তাদের অনেকেই এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। কেউ কেউ রয়ে গেছেন এদেশেই। তাদের জমিগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে, মানে সবই বেদখল। তাদের জমিতে অন্যরা বসবাস করছে এখন।
প্রাসাদের প্রাচীরে চারটি প্রবেশমুখ। প্রবেশমুখে উঁচু প্রাচীরের ওপর চারটি সিংহ। জমিদারদের প্রতাপ শৌর্য-বীর্যের প্রতীক হয়ে আছে গর্জনভঙ্গিমায়। আগে জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে হাঁটার সময় এ কারণেই কি ভয় পেত? সিংহগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে এখনি ধেয়ে আসবে? জমিদারদের পরিবারের সন্তানদের কেউ যদি আসেন এখানে, তাদেরও কি এমন মনে হবে?

  বালিয়াটির জমিদার বাড়ি

প্রায় দুশ বছরের ইতহাস-ঐতিহ্য বুকে লালন করে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বালিয়াটির জমিদার বাড়ি। মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটি গ্রামে এ জমিদার বাড়ির অবস্থান। সে সময়কার মানুষের জীবন-জীবিকা, চাল-চলন, আনন্দ-বিনোদন আর শৌখিনতার পরিচয় পাওয়া যায় এ জমিদার বাড়িটিকে দেখলে। মানুষের মেধা আর পরিশ্রমকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে উন্নতির শীর্ষে আরোহণ করা যেমন কঠিন নয়, এই জমিদার বাড়ির মানুষগুলোই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কেননা একটি নিুবিত্ত পরিবার থেকে এ জমিদার বাড়ির কর্তারা তাদের মেধা মননশীলতা আর পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে জমিদারি হাল-হকিকতে নিজেদের নাম লেখাতে পেরেছেন। উন্নতির শীর্ষে নিজেদের অবস্থানকে ধরে রেখেছেন যুগ থেকে যুগান্তরে।

যেভাবে এ জমিদার বাড়ি : একটি নিুবিত্ত সাহা পরিবার থেকেই বালিয়াটি জমিদার বংশের উদ্ভব। মহেশরাম সাহা নামে জনৈক বৈশ্য বারেন্দ্র শ্রেণীর ছোট্ট এক কিশোর ভাগ্য অন্বেষণে বালিয়াটিতে আসে। সেখানে জনৈক পান ব্যবসায়ীর বাড়িতে চাকরি নেয় মহেশরাম সাহা নামের ওই ছোট্ট বালক। চাকরিতে তার যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সেখানেই বিয়ে করে সংসারী হন। তার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে মহেশরামের ছেলে গণেশ রামকে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেন তিনি। গণেশ রাম তার পিতার আনুগত্যতায় লবণের ব্যবসা শুরু করেন। গণেশ তার মেধা ও পরিশ্রমকে কাজে লাগিয়ে লবণের ব্যবসায় বেশ উন্নতি লাভ করেন।
গণেশ রামের চার ছেলের মধ্যে একজন হল গোবিন্দ রাম। তিনিও তার পিতার ব্যবসাকে আরও অনেকদূর এগিয়ে নেন। গোবিন্দ রাম বিয়ে করেন বালিয়াটিতে। তার ঘরে জš§ নেয় চার ছেলে। যথাক্রমে আনন্দ রাম, দধিরাম, পণ্ডিত রাম ও গোপাল রাম। এ চার ভাইয়ের পৃথক পৃথক ব্যবসা ছিল। বাণিজ্য কেন্দ্র সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, নলছিটি প্রভৃতি স্থানে লবণ, সুপারি, চাল ইত্যাদি ব্যবসার মাধ্যমে অনেক অর্থের মালিক হন তারা। এদের ঐশ্বর্য বেড়ে উঠলে তারা জমিদারি ও তালুকদারি কিনতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা শান-শওকতে বসবাসের জন্য নিজেদের শৌখিনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে ইমারত গড়তে শুরু করেন। ওই চার ভাই থেকেই বালিয়াটি গোলাবাড়ি, পূর্ববাড়ি, পশ্চিম বাড়ি, মধ্যবাড়ি ও উত্তরবাড়ি নামে পাঁচটি জমিদার বাড়ির সৃষ্টি হয়। প্রত্যেক বাড়িরই রয়েছে পৃথক পৃথক নামকরণের বৈশিষ্ট্য।
গোলাবাড়ি : লবণের একটি বড় গোলা ছিল বলেই এ বাড়ির নাম গোলাবাড়ি। গোলাবাড়ির চত্বরে দোল পূর্ণিমার ১২ দিন পর বারুণীর মেলা বসত। সেই মেলা এখন বসে বালিয়াটির পুরনো বাজারে। এ বাড়ির জমিদাররা ছিলেন ধর্মপ্রাণ। বাড়ির মন্দিরে বিগ্রহের পূজা হতো। কিন্তু ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্য এবং রাজাকাররা গোলাবাড়ি আক্রমণ করে অনেক মূল্যবান সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে যায়।
পশ্চিম বাড়ি : জমিদার বাড়ির পশ্চিম অংশে অবস্থিত বলেই এ বাড়ির নাম পশ্চিম বাড়ি। দধিরাম ছিলেন পশ্চিম বাড়ির জমিদারদের পূর্বপুরুষ। এই বাড়ির উত্তরসূরি জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বিখ্যাত, জগন্নাথ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে এটি ছিল স্কুল। কলেজে উন্নীত হওয়ার সময় স্কুল শাখা আলাদা করা হয়। সেটি বর্তমানে কেএল জুবিলী হাইস্কুল নামে পরিচিত। বর্তমানে জগন্নাথ কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এছাড়াও ওই বাড়ির জমিদাররা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং পাঠাগার নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।


পূর্ববাড়ি : বালিয়াটির পূর্ব অংশে এ বাড়ির অবস্থান বলেই এ বাড়ির নামকরণ করা হয় পূর্ববাড়ি। এ বাড়ির প্রথম জমিদার পুরুষ রায় চাঁন। তিনি দুটি বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর সন্তানদের সম্পত্তির দশ আনা অংশ এবং দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রীর সন্তানদের দান করেন ছয় আনা অংশ। দশ আনির জমিদার বাড়িটিই বর্তমানে পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান। এ বাড়িটি ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর অধিগ্রহণ করে এবং এখনও এর সংস্কার কাজ চলছে। এ বাড়িটি বালিয়াটি প্রাসাদ নামে পরিচিত। এখানে পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত চারটি সুবৃহৎ অট্টালিকা বিদ্যমান। এগুলো বড় তরফ, মেঝো তরফ, নয়া তরফ এবং ছোট তরফ নামে পরিচিত।
ছয় আনির জমিদার বাড়ির অস্তিত্ব বর্তমানে নেই। ৫.৮৮ একর জমির ওপর বাড়ির মূল সৌধমালা। গোপাল রাম এবং পণ্ডিত রাম এ দুভাই হলেন এ বাড়ির প্রাচীন আদি পুরুষ। এ বাড়ির এক তেজস্বিণী মহিলা জমিদারের নাম উজ্জ্বলা রানী রায় চৌধুরানী। এ জমিদার বাড়ির প্রাণপুরুষ শাম্বিকা চয়নের মেয়ে কিরণ বালাকে বিয়ে করেছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের দানবীর শহীদ রণদাপ্রসাদ সাহা। যিনি আরপি সাহা নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বালিয়াটিতে হাসপাতাল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জমিদার এতে অনুমতি দেননি বলে তিনি নিজের গ্রাম মির্জাপুরে তার মায়ের নামে কুমুদিনী হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীরা আরপি সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। তিনি আর ফিরে আসেননি। এ বাড়ির জমিদারদের দ্বারা বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠিত অন্যান্য কীর্তির মধ্যে রয়েছে ধামরাইয়ের রথ, ঢাকার কেএল জুবিলী হাইস্কুল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বালিয়াটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যালয়, বালিয়াটি রামকৃষ্ণ মিশন, নহবত খানা, শ্রী শ্রী মাধব গৌড়ির মঠ ঢাকা, নিতাই গৌড়ের আখড়া ইত্যাদি।
বাড়ির স্থাপত্যকলা : বালিয়াটির জমিদার বাড়িটি স্থাপত্যকলার দিক দিয়ে বহু প্রাচীন। বাড়ির সূক্ষ্ম সুুনিপুণ কারুকাজ ও স্থাপত্যকলা যে কোন পর্যটকের নজর কাড়বে। বেশিরভাগ বাড়িই তিনতলা বিশিষ্ট। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা। বারান্দাগুলোতে রয়েছে লোহার কারুকাজ শোভিত প্রাচীর। তবে এ বাড়ির অনেক স্থাপত্য কীর্তিই এখন আর বর্তমান নেই। বাড়ির প্রতিটি দেয়ালই প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু। বাড়ির গাঁথুনিতে সিমেন্টের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে চুন-সুড়কি আর বেশ শক্তিশালী কাঁদামাটি। বাড়ির ছাদে লোহার রডের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে বেশ শক্তিশালী লোহার পাত। বাড়ির ভেতরে কখনও কখনও লোহার সিঁড়ি দেখতে পাওয়া যায়।
জমিদার বাড়ির প্রবেশ দরজার দু
পাশে উপরের দিকে রয়েছে দুটি তেজী সিংহের পাথরের মূর্তি। দেখলে মনে হবে এই বুঝি তেড়ে আসছে। সুতরাং প্রবেশদ্বারকে সিংহদ্বার বলতেই হয়। এ সিংহদ্বার পেরুলেই নজরে আসবে প্রশস্ত আঙিনাটি। যেখানে বর্তমানে রয়েছে ফুলের বাগান। বাড়ির পেছনের অন্দর মহল পেরুলেই চোখে পড়বে বিশালাকার পুকুর। পুকুরের একপাশে রয়েছে শৌচাগার। পুকুরের চারপাশে রয়েছে চারটি শান বাঁধানো ঘাট। সম্ভবত চার জমিদার আনন্দ রাম, দধিরাম, পণ্ডিত রাম ও গোপাল রামের জন্যই চারটি আলাদা আলাদা ঘাট বাঁধানো হয়েছে। বর্তমানে পুকুরটি পানিশূন্য রয়েছে। ১৭৯০ সালে ওই চার ভাইয়ের মাধ্যমেই বালিয়াটি জমিদার বাড়ির গোড়াপত্তন হয়।
বালিয়াটি জমিদার বাড়ির দৃষ্টিনন্দন ইমারত, নির্মাণ কৌশল আর অলংকরণের অপূর্ব সমাহার পর্যটকদের কাছে টানে। বিশাল বিশাল ভবন আর নির্মাণশৈলী জমিদার আমলে জমিদারদের বিত্তবৈভবের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ঝড়-বৃষ্টি ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বালিয়াটি জমিদার বাড়ি।


উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্পটসমূহঃ

· বালিয়াটি প্রাসাদ, সাটুরিয়া।

· প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র, কৈট্টা, সাটুরিয়া।

· তেওতা জমিদার বাড়ী, শিবালয়।

· স্বপ্নপুরী (পিকনিক স্পট) হরিরামপুর।

· ফলসাটিয়া খামার বাড়ী, শিবালয়।

· ক্ষণিকা (পিকনিক স্পট), মানিকগঞ্জ সদর।

· নাহার গার্ডেন (পিকনিক স্পট), সাটুরিয়া।

· শহীদ রফিক স্মৃতি যাদুঘর, সিঙ্গাইর।

· কবিরাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ সদর।

· পোদ্দার বাড়ী, হরিরামপুর।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24, জেলা তথ্যবাতায়ন।