Golden Bangladesh
কুষ্টিয়া জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

কুষ্টিয়া জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ: 

শত বছরের ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ

ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জেলার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হাজার বছরের পুরার্কীতি ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ। মসজিদটি ঘিরে রয়েছে নানা রহস্য। তবে এটি কবে, কে  নির্মাণ করেছেন তার সঠিক ইতিহাস কেউ জানে না। এমনকি মসজিদটি নিয়ে কোন ইতিহাস বা পুস্তকও নেই বলে জানা যায়। তবে স্থানীয় অনেকের মতে, বহু বছর আগে অলৌকিকভাবে মসজিদটি মাটি থেকে ফুঁড়ে ওঠে। সেই থেকে মুসলমান মসজিদ রক্ষণাবেক্ষণ ও ইবাদত-বন্দেগি করে আসছে। ওই সময় থেকে মসজিদ তৈরির কথা এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে এটি দেখতে আসেন অনেকে। অনেকে দাবি করেন, প্রায় ১১শ’ বছর আগে ইরাক থেকে শাহ সুফি আদারি মিয়া ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও বাগেরহাট এলাকায়  ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন। এর মধ্যে তিনি ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার মধ্যবর্তী ঝাউদিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কথিত আছে, তিনিই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন এবং গোটা অঞ্চলে  ধর্ম প্রচার করে আদারি মিয়ার মৃত্যুর পর মসজিদসংলগ্ন এলাকায় তাকে কবর দেয়া হয়। তবে ওই স্থানে তার কোন বংশধর নেই বলে স্থানীয়রা জানান। তার কবর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় একটি মাজার কমিটি।
এছাড়াও মসজিদ তৈরি নিয়ে রয়েছে আরও মতভেদ। মসজিদের  প্রবেশদ্বারে লেখা আছে ‘এটির বড় পরিচয় মানুষের তৈরি এবং এটা প্রতিষ্ঠিত হয়  মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে’।
কিন্তু ওই সময় কে নির্মাণ করেছে তার কোন উল্লেখ নেই। স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরাও এর উৎপত্তি সম্পর্কে কিছু বলতে পারেননি। মসজিদটি ইট, পাথর, বালি ও চীনামাটির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি। এর উপরিভাগে সুদৃশ্য ৫টি গম্বুজ ও ভেতরে প্রবেশ দরজায় দুটি মিনার রয়েছে। এটি অপূর্ব শৈল্পিক কারুকার্যসংবলিত। সহজেই মুগ্ধ করার মতো।
বর্তমানে এটির পরিচর্যা করছে সরকারের জাদুঘর ও প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর।

কুষ্টিয়ার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি

তপু রায়হান
বাড়ির খুব কাছেই থাকি অথচ কুঠিবাড়িটা কখনোই দুচোখ দিয়ে দর্শন করতে পারিনি, এ আফসোস আমার দীর্ঘদিনের। স্বয়ং বিশ্বকবির যেখানে তিন দশকেরও অধিককাল পদধূলি পড়েছে সে স্থানটা দর্শন না করাটা আমার মতো নিবিড় সাহিত্যপ্রেমীর জন্য চরম দুর্ভাগ্যেরই ছিল বৈকি। কেন রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই বলে গিয়েছেন, ‘বহু দিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে ... একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশির বিন্দু! আমার অবস্থাও ছিল তেমনটাই। বহু জায়গায় পা পড়েছে, কেবলই যাওয়া হয়নি রবীন্দ্রভবনে। সে আফসোসের অবশ্য পরিসমাপ্তি ঘটল এবার। ঝিনাইদহ থেকে কুষ্টিয়ার দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটার। আর কুষ্টিয়া থেকে কুঠিবাড়ি পর্যন্ত মোটামুটি বারো কিলোমিটার হবে। বহুদিনের জমানো সঞ্চিত উৎসাহ ব্যয় করে সত্যি সত্যিই এবার সার্থক হয়েছে সাহিত্য প্রেম-রবীন্দ্র মুগ্ধতা। বাংলার মাটি, বাংলার জল যে বিশ্বকবির কতটা প্রিয় ছিল সেটাও যথাযথ উপলব্ধি হল কুঠিবাড়ির একটি বিকেলে। দুই ভ্রমণপিপাসু বন্ধুবর ফখরুল আযম রাসেল ও হাসান হাফিজুর রহমান ডলারের সাহচর্যে রওনা দিলাম কুঠিবাড়ির উদ্দেশ্যে। কুষ্টিয়ায় পৌঁছতেই অন্তরে শিলাইদহের টান। সেই টানই টেনে নিয়ে গেল নিঃসীম সবুজের ফাঁক গলে বয়ে চলা আঁকা-বাঁকা রাস্তা ধরে কুঠিবাড়িতে। কুষ্টিয়া চৌড়হাস থেকে মূল রাস্তার শেষ হয় আলাউদ্দিন নগর পর্যন্ত। তারপর থেকে সরু পাকা রাস্তা ধরে আলাউদ্দিন নগরের মাঝ দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা পিচঢালা রাস্তা দিয়ে কবিগুরুর বাড়িতে যাত্রা। যে মুগ্ধতা আহরণ এই যাত্রার উদ্দেশ্য সেই মুগ্ধতা আরও বৃদ্ধি পেয়ে গেল যাত্রাপথের চারদিকে কেবলই সবুজ ধানক্ষেত, গাছগাছালি আর মানুষের সংসার সাজানোর ব্যস্ততা চোখে পড়ায়। সত্যিই তো, গন্তব্যের পূর্ব পর্যন্ত যাত্রা পথটাও যদি সুখকর ও নয়নাভিরাম না হয় তাহলে মূল দর্শনীয় স্থানের প্রতি টানটা একটু মলিনই হয় বৈকি! গন্তব্য পথের সুশোভিত দৃশ্যে টানটা আমার আরও বৃদ্ধি পেয়ে গেল। প্রতিজন দশটাকা ভাড়ায় ভ্যানে চড়ে কুঠিবাড়ির পৌঁছলাম। বাড়িটার উচ্চতা আড়াইতলা। বাড়িটাই হল স্থানটার মূল আকর্ষণ। অপূর্ব নির্মাণশৈলীতে তৈরি বাড়িটার প্রকৃত সৌন্দর্য বলতে হলে বোধহয় বিশ্বকবির মতো কবিতার ভাষায় কবিতা লিখেই বলতে হবে। কেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মিসরের পিরামিড নিয়েই তো অসাধারণ একটি উক্তি করেছিলেন, এখানে পাথরের ভাষা মানুষের ভাষাকে অতিক্রম করিয়াছে...। আমার মনে হয় স্বয়ং কবিগুরুর এই অসাধারণ উক্তিটি তার কুঠিবাড়ি সর্ম্পকেও অবলীলায় চালিয়ে দেয়া যায়। তবে পিরামিডের পাথরের স্থলে এখানে বসাতে হবে ইটের কথা।
বাড়িটার চারপাশ দর্শন করেও অসীম মুগ্ধতা অর্জন করা গেল। বারবার শিহরিত হয়েছি এই ভেবে, এই কি সেই বাড়ি! যে বাড়ির এই উš§ুক্ত প্রান্তর দিয়ে আমরা হাঁটছি ঠিক এইখান দিয়েই শতবর্ষ আগে হেঁটে বেড়াতেন বিশ্বকবি? হাতে থাকতো কাগজ আর কালির দোয়াত, কলম। পেছনে সগৌরবে-সোল্লাসে বয়ে চলা পদ্মা নদীর সঙ্গে কথা কইতেন আর গীতি-কাব্য লিখে লিখে বাংলার আকাশ-বাতাস পুলকিত করতেন। কল্পনায় যেন রবিঠাকুরকে বেশ কয়েকবার চাক্ষুস করারও সৌভাগ্য হল। হওয়াটাই স্বাভাবিক, বাড়িটার অক্ষত জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে খোলা জানালা দিয়ে কবিগুরুর বাংলার প্রকৃতি দর্শনে পুলক দৃষ্টি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম। কবিগুরু সম্ভবত গাছগাছালি খুবই ভালবাসতেন। আর ভালবাসবেনইবা না কেন? প্রকৃতির মতো মনটাও যে সবুজ না হলে তো বিশ্বকবি হওয়া যায় না। সে কারণেই বাড়িটার চারধারে পশ্চিম-পূব-উত্তর কোণে রবীন্দ্রবয়সী কিছু গাছের ছায়া মিলল। বাড়িটার পেছন দিকটায় যে সুবৃহৎ বয়স্ক কাঁঠাল গাছ এখনও বর্তমান সেগুলোর অনেক ডালপালা রবীন্দ নাথের এ বাড়িটিতে চলা-ফেরার সাক্ষি। মনুষ্য স্বরধ্বনি পেলে হয়তো সত্যি সত্যিই তাদের কাছ থেকে কবিগুরু সর্ম্পকে অজানা অনেক কিছুই জানা যেত। পুব দিকে একসারে দাঁড়ানো চারটা তালগাছ। তিনটা একত্রিত, একটু দূরে একটি তালগাছ একদম একা। প্রিয় ছড়াটি বোধহয় কবি ঠাকুর তার সময়ই এই গাছগুলোর কোনও একটি দেখেই লিখেছিলেন এটা মনে মনে কল্পনা করে আবৃত্তি করতে থাকলাম, তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে...।
ঠাকুর পরিবার ৩০ বিঘা জমির ওপর এ কুঠিবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করে। তিনতলা এ কুঠিবাড়ির স্থাপত্যশৈলী অনেকটা প্যাগোডার মতো। দুই বিঘা জমির ওপর চোখ জুড়ানো ও মনকাড়া অপরূপ দক্ষিণমুখী এ বাড়ির চারপাশে রয়েছে পদ্মার ঢেউ খেলানো বাউন্ডারি প্রাচীর। পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ১৮৩০ সালে বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহী জেলার পতিসর ও পাবনার শাহজাদপুর নামক স্থানের জমিদারির মালিকপ্রাপ্ত হন। এসব জমিদারির কেন্দ্রস্থল ছিল শিলাইদহ। জমিদারি কাজ তদারকি করার উদ্দেশ্যেই কবির ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথসহ অন্যরা কুষ্টিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মনোমুগ্ধকর রূপ দর্শনে আগমন করেছেন শিলাইদহে। কবিগুরু শিলাইদহে প্রথম এসেছিলেন ১৮৭৬ সালে, পরবর্তী সময়ে ১৮৯২ জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে। শিলাইদহে কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু শিলাইদহের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবির কাছে এতই ভালো লেগেছিল যে, কবি মুগ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পদ্মা নদীর প্রতি কবির দুর্বার আকর্ষণ ছিল। এ শিলাইদহে ঠাকুর বংশের প্রায় সবই পল্লী ভবনে বাস করে পদ্মা, গড়াই বিধৌত পল্লী প্রকৃতির রূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। ১৮৯২ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। ১৯৫৮ সাল থেকে প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ব্যবস্থাপনায় শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িটি গৌরবময় স্মৃতিরূপে সংরক্ষিত আছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুঠিবাড়ির গুরুত্ব অনুধাবন করে কবির বিভিন্ন শিল্পকর্ম সংগ্রহপূর্বক একে একটি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজিতে ভরপুর এ রবীন্দ্র লীলানিকেতন। চিলাকোঠা স্থাপত্যে মূল ভবন ২ বিঘা জমির ওপর পদ্মার ঢেউ সাদৃশ্য বেষ্টনী প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত কুঠির ছাদের কার্নিশেও সেই একই ছাপ। প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ৮টি করে ১৬টি এবং তিন তলায় ২টি, মোট ১৮টি কক্ষ রয়েছে। তিন তলায় ছিল কবির লেখার ঘর। এ ঘরে বসে কবি লিখেছেন অনেক কবিতা ও গল্প। উত্তরে পদ্মা, দক্ষিণে গড়াইয়ের নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবিপ্রতিভার যে দৃষ্টি দায়িনী ছিল তা এখান থেকে বোঝা যায়। দেশী-বিদেশী ফুলের সাদৃশ্য বাগান কবিভবনটি আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পুরো ভবনটি এখন জাদুঘর হিসেবে দর্শকদের জন্য উš§ুক্ত। জাদুঘরের নিচ ও দ্বিতীয় তলায় ১৬টি কক্ষেই কবি রবীন্দ্রনাথ, শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, কৃষক বন্ধু রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ নানা বয়সের বিচিত্র ভঙ্গির রবীন্দ্রনাথের ছবি। বাল্যকাল থেকে মৃত্যুশয্যার ছবি পর্যন্ত সংরক্ষিত রয়েছে। তাছাড়াও রয়েছে শিল্পকর্ম এবং তার ব্যবহার্য আসবাবপত্র দিয়ে পরিপাটিভাবে সাজানো। তিন তলায় রয়েছে কবির ব্যবহƒত আসবাবপত্র। এছাড়াও রয়েছে কবির নিজ হাতে লেখা কবিতা, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর প্রকাশিত কবির ছবি ও সনদপত্র। কবিভবনে ব্যবহার্য জিনিসগুলোর মধ্যে আরও আছে চঞ্চলা ও চপলা নামের দুটো স্পিডবোট, পল্টুন, ৮ বেহারা ও ১৬ বেহারা পালকি, কাঠের চেয়ার, টি-টেবিল, সোফা সেট, আরাম চেয়ার, হাত পালকি, গদি চেয়ার, পালংক, চীনা মাটির তৈরি ওয়াটার ফিল্টারসহ অনেক প্রয়োজনীয় জিনিস। এছাড়াও রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও বিভিন্ন মনীষীর গ্রপ ছবি এবং কবির আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্ম।
রক্ষক কাম গাইড শাজাহান আলী অনেক সাহায্য করেছিলেন কবি ও কবিবাড়ি সর্ম্পকিত তথ্য দিয়ে। কেবল আমাদেরই নয়, কুঠিবাড়িতে প্রতিদিন সকাল বিকালে আগত অজস্র দর্শনার্থীকে কুঠিবাড়ির ভেতরকার রবিঠাকুরের ব্যবহত বিভিন্ন আসবাবপত্র, কবির কর্মকাণ্ড, শিলাইদহে অবস্থান করে কবির সৃষ্টি সর্ম্পকিত ইত্যাকার বিষয়ে বরাবর তিনিই সবাইকে তথ্য দিয়ে থাকেন। শুনে গৌরবান্বিত হয়েছিলাম যে ১৯১২ সালের দিকে রবিঠাকুর এই বাড়িতে অবস্থান করেই নাকি গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। যে সাহিত্য কর্ম কেবল তাকেই নয়, বাঙালিকেও দিয়েছিল বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি ও গৌরব!
সন্ধ্যের আকাশের সূর্যটা নিজেকে হারানোর তালে যেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল, রবীন্দ পল্লীর মায়া ছেড়ে বাড়ির পথে প্রত্যাবর্তন করি তিনজন। ফেরার পথে মায়া শুরু হয়।
আবার কবে সাক্ষাৎ হবে কুঠিবাড়ির সঙ্গে? যে বাড়ির প্রতিটি ইঞ্চি এখনও রবীন্দ  স্মৃতির ধারণ করে দর্শনার্থীকে জানানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যানে উঠে বসলাম। পেছনে নানাবিধ জিনিসপত্রের পসড়া সাজিয়ে বসা দোকান থেকে একতারার শব্দ ভেসে আসতে লাগল।
ওখানে একতারাও বিক্রি হয়! কুঠিবাড়ি যতই পেছনে সরতে লাগল ওবাড়ির কৃষ্ণচূড়া গাছটার ফুলগুলো যেন ততটাই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে আলোকিত করতে শুরু করল সন্ধ্যার অন্ধকার!

লালন শাহর মাজার

বন্ধন বিশ্বাস
মোটামুটিভাবে ১৭ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাউল মতের উন্মেষ ঘটলেও এই মত ও পথকে জনপ্রিয় করে তোলেন বাউল সম্রাট মরমি সাধক গুরু লালন ফকির। বাউল সম্রাট লালন ফকিরই বাউল ধারণার একটি স্বতন্ত্র ধর্ম সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
লালন ছিলেন হিন্দু ধর্মালম্বী। অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি শ্রীক্ষেত্রে যাত্রা শুরু করেন। ফেরার পথে তিনি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হলে সঙ্গীরা তাকে পথের মাঝে ফেলে রেখে যায় এবং তার মৃত্যু সংবাদ রটিয়ে দেয়। সিরাজ শাহ নামক এক নিঃসন্তান পালকিবাহক পথ থেকে লালনকে তুলে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তোলে। সুস্থ হয়ে লালন বাড়ি ফিরে গেলে মুসলমানের ভাত খেয়েছে বলে তাকে ঘরে উঠতে দেয়া হয় না। তার বউও জাতিচ্যুত স্বামীকে অস্বীকার করে। উপায়ান্তর না দেখে লালন তার আশ্রয়দাতা সিরাজ শাহর কাছে ফিরে আসে এবং তাকে গুরু পদে বরণ করে নেয়। ১৮২৩ সালের দিকে লালন নানা তীর্থ ভ্রমণ শেষে কুষ্টিয়া কুমারখালীর সেওড়িয়া গাঁয়ে এক মুসলিম মহিলাকে বিয়ে করে এবং এখানেই আখড়া গড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ১৮৯০ সালে লালনের মৃত্যুর পর এখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। যা বর্তমানে লালন শাহর মাজার নামে ব্যাপক পরিচিত।
 
গন্তব্য লালন শাহর মাজারকে সামনে রেখে যখন গাবতলী টার্মিনালে এসে বাসে চড়ি, তখন ঘড়ির কাঁটায় ৩টা বেজে ৫ মিনিট। বাস ছাড়ার পর একটা প্রস্বস্তি আসে, যাক রওনা তো হলাম। বাসে চড়ে মনে মনে ভাবতে থাকি কুষ্টিয়া নেমে প্রথমে হোটেল, তারপর বিশ্রাম, খাওয়া-দাওয়া, তারপর ঘুম। পরদিন সকালে সোজা সাঁইজীর মাজারে। এরপর... লালন শাহর মাজার বলে কথা। তার মাজার প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগেই মনে মনে বেজে উঠল লালনের গান। তারপর তো একের পর এক গলা ছেড়ে না গেয়ে থাকতে পারলাম না। গেয়েই চললাম কিছুক্ষণ পর সাভার পৌঁছলে একটু যানজট কোলাহল মাঝে এসে আবার সেই ব্যস্তচিত্র। কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেল লালনের গান। যানজট মুক্ত হয়ে আরেকটু এগুতেই জাতীয় স্মৃতিসৌধের ফলক চোখে পড়ল। মানিকগঞ্জ শহর পেরিয়ে তুলনামূলক রাস্তা একটু ফাঁকা থাকার কারণে বাস গতিপ্রাপ্ত হয়। এ সময় বাসের জানালা দিয়ে ঝিরিঝিরি বাতাস এসে গায়ে লাগতেই দু’চোখ বুজে যায়। চোখ খুলতেই পাটুরিয়া ঘাটে রয়েছি। কন্ডাক্টর সাহেব বললেন, ১০ মিনিট লাগবে, আরেকজন যাত্রী বললেন, আরও ১৫ মিনিট। তারপর ফেরি চলতে লাগল পদ্মার মাঝখান দিয়ে। বাস থেকে নেমে ফেরির তিনতলার দর্শক কেবিনে চলে গেলাম। তৃতীয় তলার উপরে বসে সর্বনাশা পদ্মাকে বেশ ভালো লাগছে। পড়ন্ত বেলার সূর্য ডুবে যাওয়ার সে এক অপূর্ব মুহূর্ত। কুষ্টিয়া এসে একটা হোটেলে উঠলাম। হোটেল ম্যানেজারের ব্যবহার খুব ভালো লাগল। রিপোর্টার বলে আপ্যায়নও করলেন এক কাপ চা বাড়িয়ে। রাতটা কোন মতে পার করে সকালের নাস্তা শেষ করেই রিকশাযোগে সোজা সাঁইজীর মাজার। মাজার গেটের সামনে নেমেই ডানপাশে ছোট্ট একটা বাজার লক্ষ্য করলাম। প্রায় সব দোকানেই একতারা, দোতারা, লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সমাহার। ভাবছিলাম আগে কিছু কিনব কিনা। শেষে ঠিক করলাম আগে গুরুর মাজার তারপর কেনাকাটা। 

গেট দিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই আপনা-আপনিই একটা শ্রদ্ধাবোধ কাজ করছিল নিজের মধ্যে। চারদিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বেশ গোছালো। সামনে মাজার যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছে মরমী সাধক গুরু লালন সাঁইজী। আরও কিছু সমাধী। বেশকিছু লালনভক্ত চেখে পড়ল। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে যে বকশিস পায় তা দিয়েই তাদের চলে। যেখানে চলে এই বিনোদন জানতে পারলাম এটা অডিটোরিয়ামের নিচতলা। উপরতলায় অডিটোরিয়ামের মূল কক্ষ। এখানে মাঝে মাঝেই নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। অডিটোরিয়ামটা বেশ উন্নত। পাশে একটা পাঠাগার ও জাদুঘর রয়েছে। জাদুঘরে বেশকিছু লোকজ সংগ্রহশালার নিদর্শনসহ রয়েছে লালন ফকিরের ব্যবহƒত একটি একতারা। সাশ্রয় মূল্যের হস্তশিল্প সামগ্রীও কেনাকাটার আগ্রহ বাড়িয়ে দিল।

তথ্যসূত্র : ট্যুরিস্ট গাইড 24