Golden Bangladesh
খুলনা জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

খুলনা জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ 

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সমাধিসৌধ

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে মোহাম্মদ রুহুল আমিন গোপনে পিএনএস বখতিয়ার নৌঘাঁটি ত্যাগ করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে বহু স্থলযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অংশ নেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টর থেকে নৌবাহিনীর সদস্যদের সেপ্টেম্বর মাসে আগরতলায় একত্রিত করা হয়। ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আগরতলায় একত্রিত হয়ে কলকাতায় আসেন। ভারত সরকারের উপহারকৃত ২টি টাগবোটে ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’ নিয়ে শুরু হয় নৌযুদ্ধের প্রস্তুতি। গার্ডেন রীচ নৌ ওয়ার্কশপে টাগবোট দুটিতে ২টি করে বাফার গান আর ৪টি করে ৫০০ পাউন্ড ওজনের মার্ক মাইন বহন করার উপযোগী করে গানবোটে রূপান্তরিত করা। ১২ অক্টোবর কলকাতার তৎকালীন মেয়র প্রফুল¬ কুমার ঘোষ গার্ডেন রীচ জেটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে গানবোট দুটিকে পানিতে ভাসান। ‘পলাশ’-এর ইঞ্জিনরুমের প্রধান আর্টিফিসারের দায়িত্ব পান রুহুল আমিন। ১০ ডিসেম্বর শুক্রবার মংলাবন্দরে পাকিস্তানি নৌঘাঁটি ও পিএনএস তিতুমীর দখল করার সময় পাক বিমানবাহিনীর আক্রমণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে তিনি শাহাদতবরণ করেন। সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ দুঃসাহসী বীর নাবিক মোহাম্মদ রুহুল আমিন অনায়াসেই জাহাজ ত্যাগ করে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচাতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। কারণ সেই মুহূর্তে তার নিজের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রণতরী। ‘পলাশ’কে রক্ষা করা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে পবিত্রতম দায়িত্ব। জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে অবিচল ছিলেন দেশপ্রেম আর কর্তব্যজ্ঞানের কাছে।

স্মৃতিবিজড়িত গল্লামারী

মুক্তিযুদ্ধের বেদনাবহ গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত আরেকটি স্থান গল্লামারী। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্নিকটে ময়ূর নদীর তীরে অবস্থিত এই গল্লামারী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই স্থানে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনী। খুলনা শহর মুক্ত হবার পর গল্লামারী খাল ও এর আশেপাশের স্থান থেকে প্রায় পাঁচ ট্রাক ভর্তি মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় ঐ স্থানে আনুমানিক ১৫০০০ মানুষ হত্যা করা হয়।

১৯৯৫ সালে এখানে প্রথম একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়। বর্তমানে সে স্মৃতিস্তম্ভ উন্নয়নের কাজ চলছে।

দক্ষিণডিহি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি

মাসুদ আলম
কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যারবি—
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল; সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার এই লাইন খোদাই করা আছে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর আবক্ষ ভাস্কর্যে। খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামে কবির শ্বশুরবাড়ির দোতলা ভবনের সিঁড়ির দুই পাশে স্থাপন করা হয়েছে কবি ও তাঁর স্ত্রীর আবক্ষ ভাস্কর্য। তাতে প্রাণ নেই বটে, আছে ইতিহাস। ২৫ বৈশাখ এলে রবীন্দ্রভক্তরা ছুটে আসেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শ্বশুরবাড়িতে, রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে। এ বছর পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী। প্রতিবছরের মতো এবারও এ বাড়িটি ঘিরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিন দিনব্যাপী সার্ধশততম রবীন্দ্রজন্মবার্ষিকী ও লোকমেলা।

৮ মে থেকে শুরু হয়ে আজ অনুষ্ঠানের শেষ দিন। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন হাজারো রবীন্দ্রানুরাগী। আলোচনা অনুষ্ঠান, সংগীত পরিবেশন, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্যানুষ্ঠান, নৃত্যালেখ্য ও নাটক রয়েছে অনুষ্ঠানমালায়। লোকমেলায় প্রাধান্য পেয়েছে আবহমান বাংলার ঐতিহ্য লোকশিল্প, চারুশিল্প ও কারুশিল্প। এসেছে নাগরদোলা। গোটা রবীন্দ্র কমপ্লেক্সজুড়ে এখন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কলেজশিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছেন শিকড়-বাকড়ের মতো। প্রতিবছর এই অনুষ্ঠানে ছুটে আসি মনের খোরাক মেটাতে।’ ব্যবসায়ী কবিরুল হাসান বলেন, ‘আলোচনা-গান-নৃত্যে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ, পাশাপাশি আবহমান বাংলার ঐতিহ্যে ঠাসা লোকমেলা খুবই ভালো লাগছে।’
কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণডিহির সম্পর্ক নিবিড়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা সুন্দরী দেবী জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই দক্ষিণডিহি গ্রামে। রবীন্দ্রনাথের কাকি ত্রিপুরা সুন্দরী দেবী এই গ্রামেরই মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী দক্ষিণডিহিরই মেয়ে। তাঁর ভালো নাম ভবতারিণী। যৌবনে পা দিয়ে কবি প্রায়ই তাঁর মায়ের সঙ্গে দক্ষিণডিহি গ্রামের মামাবাড়ি আসতেন। নিরঞ্জন রায়চৌধুরী ও হিরণ্ময় রায়চৌধুরী কবির দুই মামা। কবির মামাবাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির মধ্যখানে ছিল বিশাল এক পুকুর। নাম ‘তিতির পুকুর’। পুকুরটিতে ছিল শানবাঁধানো ঘাট। একদিন ‘ফেলী’ ওরফে মৃণালিনীর সঙ্গে তরুণ কবি রবির দেখা মেলে পুকুরপাড়ে। মৃণালিনীকে উদ্দেশ করে তিনি একটি ছোট্ট কবিতাও লেখেন,
‘মৃণালিনী ঘোমটা খোল
রবি তোমায় ডাকছে।’

পরবর্তী সময়ে এ কথা ফাঁস হয়ে গেলে দুই পরিবারের লোক মিলে এক সালিসে বসেন। মৃণালিনীকে বিয়ে করবেন বলে রবিঠাকুর জানিয়ে দেন। এরপর ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর (বাংলা ১২৯০ সালের ২৪ অগ্রহায়ণ) রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মৃণালিনীর বিয়ে হয় জোড়াসাঁকোয়। বিয়ের পর ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। ১৯০২ সালে (বাংলা ১৩০৯ সনের ৭ অগ্রহায়ণ) মারা যান মৃণালিনী দেবী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বেনীমাধব রায়চৌধুরী দেশ বিভাগের বহু আগে থেকে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর একমাত্র ছেলে নগেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী ওরফে ‘ফেলুবাবু’ জমিদারি দেখাশোনার জন্য মাঝেমধ্যে দক্ষিণডিহি আসতেন। ফেলুবাবুর ছেলেরা (বীরেন্দ্র কিশোর, ধীরেন্দ্র কিশোর ও কৃষ্ণ ভূষণ) তখন কেউ দক্ষিণডিহি, আবার কেউ কলকাতায় বাস করতেন। ১৯৪০ সালে পরিবারের সবাই দেশ ত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান। এর আগে ফেলুবাবু ও তাঁর স্ত্রী নলিনীবালা দেবী বাড়িসহ আশপাশের ৭ দশমিক ৮ একর জমি বাদে সমুদয় সম্পত্তি দক্ষিণডিহির আরেক জমিদার বিজনকৃষ্ণ দাসকে বন্দোবস্ত দেন। বাড়ি ও সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয় নায়েব নবকুমার মুস্তাফিকে। ১৯৫৫ সালে ফেলুবাবুর ছেলে ধীরেন্দ্র কিশোর শেষবারের মতো দক্ষিণডিহি আসেন। ১৯৬৫ সালে বিজনকৃষ্ণ দাস দেশ ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে নায়েব নবকুমার মুস্তাফির আর কোনো খোঁজখবর পাওয়া যায়নি। ফলে বেদখল হয়ে যায় বাড়িটি। স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এ বাড়িসহ সম্পত্তি দখল করে নেন। ৫০ বছর অবৈধ দখলে থাকার পর স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে বাড়িটি উদ্ধার করা হয়। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয় রবীন্দ্র কমপ্লেক্সের। সেই থেকে এখানে প্রতিবছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হচ্ছে রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী।

ফুল, ফল আর বিচিত্র গাছগাছালিতে ঠাসা সৌম্য-শান্ত গ্রাম দক্ষিণডিহি। খুলনা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ফুলতলা উপজেলা। উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গেলে দক্ষিণডিহি গ্রাম। গ্রামের ঠিক মধ্যখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র-মৃণালিনীর স্মৃতিধন্য একটি দোতলা ভবন। এটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি।

রাড়ুলী

বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য্যপ্রফুল্লচন্দ্র রায়(পি,সি,রায়) – এর জন্মভূমি। ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরবর্তী রাড়ুলীতে স্যার পি.সি. রায় জন্মগ্রহণকরেছিলেন।

পি,সি,রায় ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী,দার্শনিক ও শিল্পী। সমাজ সংস্কারে মানবতাবোধে উজ্জীবিত ছিলেন তিনি। তদানিন্তন সময়ে পল্লী মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায় ব্যাংক পদ্ধতি চালু করেন। ১৯০৯সালেনিজজন্মভূমিতেকো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। চারটি গ্রামের নাম মিলে ১৯০৩ সালে বিজ্ঞানী স্যার পি,সি,রায় দক্ষিণ বাংলায় প্রথম আর,কে,বি,কেহরিশ চন্দ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানক রেন।

কিভাবে যাওয়া যায়: 

খুলনা থেকে বাসে পাইকগাছা যাবার পথে, রাড়ুলী পাইকগাছা সংযোগ সড়কে নেমে, সেখান থেকে রিক্সা কিংবা অটোরিক্সায় যাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র :
http://www.khulna.gov.bd
http://touristguide24.com