Golden Bangladesh
জামালপুর জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

জামালপুর জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ

সবুজ গালিচায় মোড়া লাউচাপড়া ক্ষনিকা পর্যটন কেন্দ্র

প্রকৃতির রূপ লাবন্য মনোমগ্ধকর ছোট বড় অসংখ্য সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বকশীগঞ্জের গারো পাহাড়। প্রকৃতির উজার করা সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এ পাহাড়ি জনপদ আনন্দ জুড়িয়ে দেয় প্রকৃতি প্রেমিক মানুষের মন। এ পাহাড়ের ২৬ একর বনভূমি জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে লাউচাপড়ার ক্ষনিকা পর্যটন কেন্দ্র । অপার সম্ভাবনাময় এ পর্যটন কেন্দ্রটিকে ঘিরে বিনোদন  পিয়াসী মানুষের প্রবল আর্কষণ থাকলেও  দীর্ঘ এক যুগেও এর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। ফলে সম্ভাবনাময় এ পর্যটন কেন্দ্রটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে গড়ে উঠছেনা।

জামালপুর জেলা থেকে ৫০ কিলোমিটার এবং বকশীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে ভারতের তুরা পাহাড়ের পাদদেশে সরকারি প্রায় ১০ হাজার একর জায়গা জুড়ে গারো পাহাড়। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের পাহাড়ি এ বনভূমিতে জামালপুর জেলা পরিষদ ৯৬ সালে ২৬ একর জায়গা জুড়ে গারো পাহাড়ের চূড়ায় নির্মাণ করেছে ক্ষনিকা নামের  পর্যটন  কেন্দ্র । জেলার একমাত্র বিনোদন কেন্দ্রটি  বকশীগঞ্জের কামালপুর মিদ্যাপাড়া মোড় থেকে লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্র পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার পাহাড়ি সড়কটি  শেরপুর জেলা সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন। এক যুগ আগে রাস্তাটি নিমার্ণ হলেও ছোট দুটি ব্রিজ ও সড়কটি পনুঃ নিমার্নের অভাবে দীর্ঘ ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে আসতে হচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ শেরপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবহেলার কারনে রাস্তাটি পুনঃ সংস্কার না করায় এক যুগেও লাভজনক এ বিনোদন কেন্দ্রের কোন উন্নয়ন ঘটেনি। এ গারো পাহাড়ে এসে দেখা যাবে হাজারো প্রশান্তির বৃক্ষরাজি পাখিদের কোলাহল,  ঝর্ণার কলতানে মুখরিত এ পর্যটন কেন্দ্রে  ১শ ৫০ফুট উচুঁ পাহাড়ের চূড়ায় নির্মাণ করা হয়েছে ৬০ ফুট সুরম্য পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, টুরিস্ট কমপ্লেক্সসহ নানা স্থাপনা। টাওয়ারে দাড়িয়ে চারদিকে তাকালে চোখ পড়ে শুধু পাহাড়ের দূরের ও কাছের আকাশ ছোয়াঁ উচুঁ উচুঁ চূড়া। এ যেন সবুজ গালিচার মোড়া প্রকৃতি। এসব পাহাড়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণার ধারা। শোনা যায় অসংখ্য পাখির কলকাকলি। কোথাও গহীন জঙ্গল আবার কোথাও দেখা যায় বৃক্ষহীন ন্যাড়া পাহাড়। আরও দেখা যায় ওপাড়ে সীমানা পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ের অসংখ্য পাহাড়। ভারত সীমান্ত পাহাড়ের কূলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দর্শন। এছাড়া পায়ে হেটে চারদিকে ঘুরে পাহাড়ের উচুঁ নিচু ও আঁকা বাঁকা পথ চলতে চলতে দেখা যাবে সৌন্দর্যে মাখা বি¯তৃত অঞ্চল। এসব দৃশ্যাবলী দেখে মনে হবে কোন নিপুন চিত্রকর তার রঙের ভান্ডার উজার করে পরম যতেœ অংকন করেছেন মনোলোভা আলপনা। পাহাড়ের বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে আকাশমনি বেলজিয়াম ইউক্যালিপটাস উডলট কড়ইবৃক্ষ ছাড়াও চেনা অচেনা নানা জাতের লতাগুল্ম আর বাহারি গাছ গাছালির সৌন্দর্য মন্ডিত সবুজের সমারোহ। লাউচাপড়া , সাতানিপাড়া , দিঘলাকোনা , গারোপাড়া, বালিজোড়া, মেঘাদল শোখনাথপাড়া প্রভূতি গ্রামের গহীন গারো পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা পাশের কুল ঘেষেঁ সবুজের আড়ালে খড়ের অথবা মাটির ঘরে বসবাসরত গারো কোচদের চোখে পড়বে। আর এরই টানে অসংখ্য পর্যটক শীতের কুহেলিকা আর গানের টানে এখানে এসে ভিড় জমায় প্রতিবছর।  শীত মৌসুমের প্রতিদিন অসংখ্য অতিথিদের পদভারে  নির্ভিত অঞ্চলটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
এ বিশাল গারো পাহাড়ে রয়েছে নূড়ি পাথর, বোল্ডার পাথর, চিনামাটিসহ অনেক খনিজ সম্পদ। এ পাহাড়ি সম্পদ আহরণে সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার উদ্দোগে বিশাল আকারের শিল্প গড়ে ওঠার উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে পাশেই কামালপুর স্থলবন্দর থাকলেও পর্যটন কেন্দ্র্রে বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ খাবার পানি পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছে পর্যটকরা। অনুন্নত সড়ক যোগাযোগের কারনে বিকশিত হচ্ছে না সাগরের মতো গারো পাহাড়ের বিশালময় এ পর্যটন কেন্দ্রটি ।

পাহাড় আর অরণ্যের মাঝে সূর্য উৎসব

গাজী মুনছুর আজিজ
চারপাশেই পাহাড় আর বন। বনের মাঝখানেই ছোট্ট খাল। খালের পাড়ে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বুড়া-যুবা দাঁড়িয়ে। তাদের সবার হাতেই মঙ্গল প্রদীপ। আর সময়টা শীতকালের মধ্যরাত। লোকালয়ের মানুষ তখন গভীর ঘুমে। কিন্তু খালের পাড়ে মঙ্গল প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে ঘুম নেই। তারা সবাই অপেক্ষা করছে নতুন বছরের নতুন দিনের। তাই ঘড়ির কাঁটার দিকে সবার নজর। অতঃপর ঘড়ির কাঁটা ১২টা পেরিয়ে পা রাখে নতুন বছরের নতুন দিনে। ঠিক তখনই তারা শুভ দিনের প্রত্যাশায় মঙ্গল প্রদীপ ভাসিয়ে দেয় খালের পানিতে। তার সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে ওঠে নতুন দিনের আলোকবাতি। আর এভাবেই তারা বরণ করে নেয় নতুন বছরকে।
২০১১ সালকে বরণ করে নেয়ার এমন আয়োজনই হয়েছিল পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে। সূর্য উৎসব নামে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করে ইনসাইটা ট্যুরিজম।
৩০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকার শাহবাগের ছবির হাট থেকে শুরু হয় সূর্য উৎসবের যাত্রা। দুটি বাসে মোট ৫১ জন সদস্য নিয়ে বাস এগিয়ে চলে। পথে বাস বিরতি দেয় ময়মনসিংহের চুরখাই। সেখানে চা-নাশতা খেয়ে আবার চলে বাস। ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৭টার দিকে বাস এসে থামে জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে। বাস থেকে নেমে লাউচাপড়ার সৌন্দর্য দেখে সবাই এক বাক্যেই বলে উঠল, বাহ চমৎকার জায়গা।
দলনেতা মিলন ভাই সবাইকে যার যার রুম দেখিয়ে দিলেন। রুমে উঠে নিজের জায়গা বুঝে নিয়ে হাত-মুখ দুয়ে আবার সবাই এক হই নাশতা খাওয়ার জন্য। নাশতা হিসেবে গরম গরম খিচুড়ি। শীতের সকালে এ খিচুড়ি বেশ ভালোই লাগল। তারপর খানিক বিশ্রাম। আবার সবাই এক হলাম। তারপর সবাই সবার পরিচিতি দিলাম। পরিচিতি শেষে মিলন ভাই জানিয়ে দিলেন উৎসবের বিভিন্ন আয়োজনের কথা। তারপর শুরু হল আমাদের এলাকা পরিদর্শন।
লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্র ঘুরে আমরা এর আশপাশের লোকালয়, এখানকার গারো সম্প্রদায়ের পাড়া, খিস্ট্রিয়ান মিশনারি স্কুলসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়িয়ে আবার হাজির হলাম আমাদের থাকার জায়গায়। খানিক বিশ্রাম নিয়ে এলাম দুপুরের খাবার খেতে। খাবার খেয়ে যে যার মতো ঘুরতে বের হলাম। কেউ কেউ বিশ্রাম নিতে রুমে গেলেন।
সবাই সবার মতো থাকলেও আয়োজকরা ব্যস্ত ছিলেন সূর্য উৎসবের নানা প্রস্তুতি নিয়ে। আয়োজনের অংশ হিসেবে লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রের ক্ষণিকা অবসর বিনোদন কেন্দ্রের পাহাড়িকা ডাকবাংলো সাজানো হয় নানা রঙের কাপড় ও কাগজ দিয়ে। এছাড়া ডাকবাংলো সাজানোর পাশাপাশি কেউ কেউ ব্যস্ত ছিল সূর্য উৎসবের নমুনা সূর্য ও মঙ্গল প্রদ্বীপ তৈরিতে।
সন্ধ্যার ঠিক আগে সবাই হাজির হই এখানকার ওয়াচ টাওয়ারে। সমতল থেকে ১৫০ ফুট পাহাড়ের ওপর নির্মিত ৬০ ফুট উঁচু এ টাওয়ার থেকে আমরা বছরের শেষ সূর্যাস্ত দেখব। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকার কারণে সূর্যাস্ত দেখা গেল না।
সন্ধ্যার পর আমাদের টেলিস্কোপে আকাশ পর্যবেক্ষণ করার কথা। কিন্তু আকাশ মেঘলা থাকার কারণে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে দেরি হয়। বেশ খানিক পর আকাশ পরিষ্কার হয়। তারপর শুরু হয় আমাদের আকাশ পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাস্ট্রোনমি বিভাগের প্রধান জিকরুল আহসান টেলিস্কোপে আমাদের সবাইকে আকাশের বৃহস্পতি গ্রহ দেখান।
আমরা ছাড়াও আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে স্থানীয় অধিবাসীরাও আসেন। তারা টেলিস্কোপে আকাশে বৃহস্পতি গ্রহ দেখে বেশ আনন্দই পেয়েছে।
পর্যবেক্ষণ শেষে রাতের খাবার খাই। তারপর অপেক্ষা করতে থাকি কখন রাত ১২টা বাজবে। আমরা সবাই মঙ্গল প্রদীপ হাতে নিয়ে খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকি।
অতপর ১২টা বেজে ঘড়ির কাঁটা নতুন বছরে পা রাখে। সেই সঙ্গে আমরা খালে ভাসিয়ে দেই মঙ্গল প্রদীপ। তারপর খালের ওপর নির্মিত বৈঠকখানায় আসি। এটিও সাজানো হয়েছে প্রদীপ দিয়ে। এখানে আমরা আতশবাতি জ্বালিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাই। সত্যিই নির্জন এ বনে শীতের রাতে আলো জ্বালিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার এই আয়োজন বেশ ভালোই লেগেছে। বরণ শেষ করে গরম গরম পরাটা আর খাসির মাংস খেয়ে রুমে আসি ঘুমাতে।
লাউচাপড়া পর্যটন কেন্দ্রে যে কয়টি থাকার কটেজ বা রুম রয়েছে, তার মধ্যে আমাদের রুমটি পাহাড়ের অনেক উঁচুতে এবং অনেক দূরে ও নির্জনে। তাই ঘুমানোর সময় একটু ভয় করছিল। আমাদের এই রুমে আমিসহ উৎসবের সহযাত্রী সোহেল, শরীফ ও শাকিল ফারুক চারজন থাকার কথা। সারাদিন আমরা চারজন ছিলামও এক সঙ্গে। এছাড়া সারাদিনের ঘোরাঘুরির সময় আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় চট্টগ্রামের সহযাত্রী চিত্রশিল্পী আবেশ কুমার ইন্দু অপু’র সঙ্গে। তাই ঘুমানোর সময় আমরা তাকেও আমাদের সঙ্গে নিলাম। রাতে শিয়ালের ডাক শুনতে শুনতে ঘুমাই। দীর্ঘদিন পরে শিয়ালের ডাক শুনতে পেলাম এ বনে এসে।
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা সবাই আবার হাজির হই ওয়াচ টাওয়ারে নুতন বছরের প্রথম সূর্যোদয় দেখার জন্য। সবাই মাথায় নমুনা সূর্য পরে অপেক্ষায় থাকি নতুন বছরের সূর্য দেখার জন্য। কিন্তু সূর্য ওঠার সময় পার হয়ে গেল অথচ আমরা সূর্য দেখতে পেলাম না। কারণ আকাশ ছিল মেঘলা, তাই সূর্য ওঠা দেখা যায়নি। অবশ্য বেশ খানিক পরে সূর্য আকাশে উঁকি দিয়েছে। ততক্ষণে আমরা টাওয়ার থেকে নেমে নিচে চলে আসি। নতুন বছর উপলক্ষে আমরা একজন অন্যজনের হাতে রাখি পরিয়ে দেই।
উৎসবের ব্যবস্থাপক মাসুদুল হাসান জায়েদী বলেন, প্রতি বছর আমরা মাথায় পরার নমুনা সূর্যটা তৈরি করি হলুদের ওপর লাল রঙ দিয়ে। কিন্তু এবার আমরা এটা তৈরি করেছি সবুজের ওপর লাল রঙ দিয়ে, কারণ এর মাধ্যমে আমরা জানাতে চেয়েছি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আগামীতে সবুজ পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে।
টাওয়ার থেকে আমরা আবার খালপাড়ে আসি। এবার আমরা খালের পানিতে নানা রঙের বেলুন ফুলিয়ে ভাসিয়ে দেই। তারপর খেয়ে নেই সকালের নাশতা। নাশতা খাওয়ার কিছুক্ষণ পর শুরু হয় উৎসবে আসা অভিযাত্রীদের মধ্যে মজার মজার খেলা প্রতিযোগিতা। সবাই বেশ উপভোগ করেছিল এই খেলা।
তারপর সবাই মিলে গ্র“প ছবি তুলে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠি ফেরার জন্য। ফিরতি পথেও বাস বিরতি দেয় চুরখাই। রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাস এসে থামে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের সামনে। পরস্পরকে বিদায় দিয়ে বাসায় ফিরি।

যমুনার জন্মভূমিতে

মাহমুদুর রহমান রাজু
সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম। এমন সময় তিনি পাশে এসে বললেন, ‘ঘুরতে যাবেন’? তার দিকে তাকালাম, ২/৩ সেকেন্ড ভাবলাম, তারপর প্রশ্ন করলাম, ‘কোথায়’? ‘দেওয়ানগঞ্জ, জামালপুর জেলায় পড়েছে’। ‘কি আছে সেখানে’? ‘নদী-বাতাস-চর...’। ‘মানুষ আছে’? ‘তাতো আছেই, বঙ্গদেশে মানুষ থাকবে না’? ‘তাইলে চলেন’। আমার জন্য ট্যুর করা অনেক সহজ। তার কারণ, আমি ট্যুরে যাই মানুষ দেখতে। আর বাংলাদেশের মতো দেশে মানুষ দেখাতো খুবই সহজ বিষয়। প্রাচীন কোন পুরাকীর্তি-সাগর-পাহাড় এগুলো আমাকে যত টানে তার চেয়ে বেশি টানে অচেনা লোকালয়। আমাকে টানে নিস্তব্ধতা।
কমলাপুর রেলস্টেশনে ঢুকতেই আমি কেমন একটা নিস্তব্ধতা-নির্জনতা অনুভব করলাম। আমি, তিনি আর আমার বন্ধু কামরুল যাচ্ছি ট্যুরে। ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে সেই চিরাচরিত সমস্যা, টিকিট নেই। পরে ব্লাকে টিকিট কাটতে হল, তাও আবার চেয়ার কোচ পাওয়া গেল না, শোভন শ্রেণী, মানে লোহার বেঞ্চিতে টিকিট কাটা হল। ট্রেনে যতবার জার্নি করেছি, ততবারই এই একই সমস্যা, কাউন্টারে টিকিট থাকে না, থাকলেও স্ট্যান্ডিং টিকিট, কিন্তু কাউন্টারের সামনেই ব্লাকে টিকিট বিক্রি হয়। একবার দিনাজপুর থেকে স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঢাকায় এসেছিলাম, অথচ ফার্স্ট ক্লাসের পুরো বগিটা খালি ছিল।
সাড়ে সাতটার ট্রেন সাড়ে আটটায় ছাড়ল, কেন লেট, আমরা জানি না, জানতেও ইচ্ছে করল না। কিন্তু ছাড়ল যে! তাতেই আমরা খুশি। সিট সংক্রান্ত কারণে মেজাজ খারাপ নিয়েই যাত্রা শুরু হল। এমনিতে তো বেঞ্চ তার ওপর আবার সিট পাশাপাশি না, কামরুলের সিটটা বেশ দূরে। কিন্তু টঙ্গি ক্রস করে ট্রেন যখন শালবনের মধ্যে ঢুকল তখন মনটা ভালো হয়ে গেল। শীতে শালপাতা ঝড়ে যায়, বসন্তে আবার নুতন পাতা গজায়, নতুন পাতার রং ফ্লোরোসেন্ট গ্রিন। শালবন কেমন ছড়ানো ছিটানো দ্বীপের মতো, কয়েকশ’ বা কয়েক হাজার গাছ নিয়ে একেকটা দ্বীপ, তারপর কিছুটা খালি জায়গা, তারপর আরেকটা দ্বীপ। এরকম হাজার-হাজার, লাখ-লাখ দ্বীপ নিয়ে শালবন। মাঝে মাঝে খালি জায়গা, এই খালি জায়গাগুলো কি প্রাকৃতিক, নাকি মানুষ কেটেছে চাষবাসের জন্য বুঝলাম না। এখন বসন্ত চলছে তাই শালবনজুড়ে ফ্লোরোসেন্ট সবুজ পাতার বন্যা। আর তারই মধ্যদিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের ট্রেন।
শালবন পার হয়ে ট্রেন ঢুকল লোকালয়ে; ঘরের পেছন দিয়ে, পুকুরপাড় দিয়ে, ক্ষেতের মাঝ দিয়ে কোণাকুণি, রাস্তার ওপর দিয়ে, কিংবা রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে এসব দেখে মনে হচ্ছে একটা স্থির হয়ে থাকা সমাজের ঠিক ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। সমাজের নাড়িনক্ষত্র সব দেখা যাচ্ছে। ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালে ট্রেনলাইন বা কোন কোন ক্ষেত্রে পাথরগুলোও দেখা যায় না, তাই মনে হয় না আমরা কোন রাস্তা দিয়ে যানবাহনে চড়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে যেন কোন একটা চলন্ত ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে পাশের ঘর-বারান্দা, রান্নাঘর, রাস্তা, পুকুরপাড় দেখছি। যেন আমরা এদেরই প্রতিবেশী, জ্ঞাতি-গোষ্ঠীÑ পাশের ঘরের মানুষ।
ময়মনসিংহের ট্রেনগুলোতে প্রচুর মানুষ ওঠে, পা রাখার জায়গা থাকে না। ট্রেনগুলোও তত ভালো না। কিন্তু জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিতেই মাইলের পর মাইল সবুজ ধান ক্ষেত, সব ধান গাছ আবার একই রকম সবুজ নয়, কোনটা গাঢ় সবুজ, কোনটা হালকা সবুজ, কোনটা আবার উজ্জ্বল সবুজ। ময়মনসিংহ স্টেশনে ১০ মিনিট দাঁড়িয়ে ট্রেন যখন আবার ছাড়ল, তখন ট্রেনে আগের চেয়েও বেশি ভিড়। এবং সবাই টিকিট কাটা যাত্রী, কেউ ফ্রি যাচ্ছে না। জামালপুর এসে ট্রেনটা একটু খালি হল।
এতক্ষণ তিনি চুপচাপ ছিলেন, ভাবলাম এতক্ষণ কথা না বলাটা অভদ্রতার পর্যায়ে চলে যায়, তাই প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার নামটা তো জানা হল না’। ‘ব্রহ্মপুত্র’। আমি হেসে দিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘নিজের দেয়া নাম, নাকি বাবা-মায়ের দেয়া নাম’? তিনিও হাসলেন, বললেন, ‘জানি না’। ‘দেওয়ানগঞ্জ যাচ্ছেন কেন’? ‘কিছু স্মৃতিচারণ আর পুরনো হিসাব-নিকাশ বাকি আছে’। খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমাকে চেনেন কিভাবে? আমার কাছে কেন এলেন’? ‘১১০২ সালে সামারকান্দ শহরে তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা, ওমর খৈয়ামের অবজারভেটরিতে। তুমি বলেছিলে, তুমি ঘুরতে খুব পছন্দ কর। এরপর ১৯১২ সালে টাইটানিকের ডেকে তোমার সঙ্গে চা খেয়েছি, তোমার সঙ্গে ছিল তোমার ইরানি গার্লফ্রেন্ড আর ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়ামের’ মূল কপি, যেটা তোমারই ভুলের কারণে আটলান্টিকের জলে হারিয়ে গেল’। আমার চমকে ওঠা ভাবটা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগল, গম্ভীর হয়ে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি কি জš§ান্তরের কথা বলছেন? আমি ওসব বিশ্বাস করি না’। ‘আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করতে বলিনি, বলেছি শুধু দেওয়ানগঞ্জ যেতে’। তারপর আবার দু’জন চুপচাপ।
জামালপুর থেকে ট্রেন ছাড়ল এবং প্রায় নিশ্চিত নিয়মিত আমার বন্ধু কামরুলের পাশের সিটে এসে বসল এক কলেজপড়–য়া মেয়ে। কামরুল খুব সহজেই মেয়েদের সঙ্গে খাতির জমাতে পারে এবং যেখানেই যায় কারও না কারও সঙ্গে পরিচয় হয় এবং কোন না কোন ঘটনা ঘটে। এজন্যই বললাম নিশ্চিত নিয়তি। মেয়েটি জামালপুর কলেজে পড়ে, বাড়ি দেওয়ানগঞ্জের ইমিডিয়েট আগের স্টেশনে, কলেজ শেষে বাড়ি ফিরছে। মেয়েটি খুবই সহজ, সরল এবং স্বাভাবিকভাবে কামরুলের সঙ্গে কথা বলছিল। কামরুল সে তার অপরিচিত এটা তাকে দেখে মনেই হচ্ছিল না। প্রায় ৪৫ মিনিটের জার্নিটা তারা দু’জন বেশ হাসি-খুশিভাবে গল্প করে কাটিয়ে দিল। আমার পাশের সিটে এসে বসেছিল ১৭/১৮ বছর বয়সের এক কিশোর, তার মোবাইলের হিন্দি গানগুলো সে বাজাতে পারছিল না। আমার কাছে সাহায্য চাইল। কিন্তু আমিও কোন কূলকিনারা করতে না পারায় সে হতাশ হল। ট্রেন দেওয়ানগঞ্জ থামল প্রায় বিকাল ৪টায়।
দেওয়ানগঞ্জ রেল স্টেশন কেন্দ্রিক শহর, রেলস্টেশন কেন্দ্রিক শহরগুলো প্রায় বর্গাকার হয়। স্টেশনের চারপাশে শহর গড়ে ওঠে। এ শহরের মানুষগুলো সাধারণত অন্য জেলা থেকে আসে এবং নির্ঝঞ্ঝাট টাইপের হয়। আর নদী বন্দরকেন্দ্রিক শহরগুলো হয় লম্বা টাইপের, নদীর তীর বরাবর, আর চোর-বাটপারের আধিক্যও বেশি হয়। দেওয়ানগঞ্জ এক সময় দুটোই ছিল। কিন্তু যমুনা ব্রিজ চালু হওয়ার পর দেওয়ানগঞ্জ ঘাট বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই স্মৃতি নিয়ে যাতে দেওয়ানগঞ্জের মানুষ দুঃখ করতে না পারে তাই যমুনার ছোবলে নদী পাড়ের দেওয়ানগঞ্জ হারিয়ে গেছে, টিকে আছে শুধু রেললাইন কেন্দ্রিক দেওয়ানগঞ্জ। দেওয়ানগঞ্জ থানা সদর হলেও পৌরসভা, কাজেই যেকোন জেলা শহরের মতোই দেখতে অথচ অত লোকজন নেই। এ কারণে দেওয়ানগঞ্জ শহরটা বেশ সুন্দর, শহরের উত্তর দিক থেকে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র, ওই দিকটায় প্রচুর বাতাস, প্রচুর।
ট্রেন থেকে নেমে রিকশায় করে বাজারে গেলাম খেতে। সাধারণত নদীর দিকে গেলে আমি মাছ খেতে চাই, টাটকা মাছ পাব ভেবে। কিন্তু যেতে দেরি হওয়ায়, গিয়ে দেখি মাছ শেষ, মাংস দিয়ে ভাত খাওয়া লাগল। কিন্তু যে দই এবং মিষ্টি খেলাম, তা অতুলনীয়। দেওয়ানগঞ্জ গেলে কেউই কখনও মিষ্টি না খেয়ে আসবেন না। এরপর রওনা দিলাম নদীর ঘাটের দিকে। দেওয়ানগঞ্জ ঘাট থেকে ট্রলার যায় গাইবান্ধা, আড়াই ঘণ্টা লাগে। আমাদের ইচ্ছা ওপাড়ে গাইবান্ধা যাব, গিয়ে থাকতেও পারি আবার চলেও আসতে পারি, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। কিন্তু ঘাটে গিয়ে দেখি আজ আর ট্রলার যাবে না; সন্ধ্যার পর নদীতে ট্রলার চলে না, শেষ ট্রলার চলে গেছে। মন খারাপ করে ঘাটে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই দেখি একটা নৌকা যাচ্ছে একটা চরে। আমরাও উঠে পড়লাম। চরে যেতে লাগল ২০/২৫ মিনিট। অনেকটা কক্সবাজার বিচের মতো দেখতে চরটা। একটু এগিয়ে দেখি বিশাল ভুট্টা আর বাদামের ক্ষেত। সূর্যাস্ত দেখলাম, সন্ধ্যার লাল আকাশ দেখলাম। যমুনা নদীর মাঝে বিশাল চরে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ।
দেওয়ানগঞ্জ এবং আশপাশের মানুষজন খুব সহজ-সরল প্রকৃতির, বিশেষ করে এই চরের মানুষেরা। এখানে বিদ্যুৎ নেই, প্রযুক্তি নেই, ব্যস্ততা নেই কিন্তু জীবন আছে। এমন একটা চরে এক মাস থাকতে পারলে জীবনটাকে আরও বোঝা যেত মনে হয়। ইচ্ছে আছে নিদেনপক্ষে ১ সপ্তাহ এসে থাকব এর পরেরবার। ক্যাম্পিং করার জন্য এই চরের চেয়ে ভালো জায়গা বাংলাদেশে নেই।
সন্ধ্যার পর ফিরে আসার জন্য নৌকার ঘাটে এসে দেখি আমাদের সঙ্গে তিনি নেই, অনেক চিৎকার-চেঁচামেচি করেও কোন কূলকিনারা করা গেল না। কখন যে তিনি হাওয়া হয়ে গেলেন আমরা টেরই পেলাম না। আবার এটাই শেষ নৌকা, মিস হলে সারা রাত এই চরেই থাকতে হবে, তাই তাকে ফেলেই এপাড়ে চলে এলাম। এপাড়ে এসে হঠাৎ শখ জাগল বাংলা সিনেমা দেখব; স্টেশনের পাশে একটা হলে ঢুকলাম। কাজী মারুফের বস্তির ছেলে কোটিপতি মুভিটা চলছে, এর আগে সর্বশেষ বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম বিটিভিতে কোন এক শুক্রবার, আজ থেকে ১১ বছর আগে। বাংলা সিনেমা অনেক বদলে গেছে। এই সিনেমাটার কাহিনী যিনি লিখেছেন তিনি বেশ জানাশোনা লোক বলে মনে হল। কাহিনীতে অনেক লজিক আছে। হলের অবস্থা বেশ করুণ, কিন্তু যারা সিনেমা দেখছে তারা সিনেমার প্রত্যেকটা দৃশ্যের সঙ্গেই মিশে যাচ্ছে, উপযুক্ত রিঅ্যাক্টও করছে। আমাদের দেশে শুধু টাকা-পয়সা বিষয়ক বৈষম্যই নয় সাংস্কৃতিক বৈষম্যও বিরাট।
রাতে খেয়ে গিয়ে উঠলাম একটা হোটেলে। হোটেলের অবস্থা বেশি ভালো নয় কিন্তু এর চেয়ে বেশি ভালো আশাও করিনি। এরপর আমি আর কামরুল বের হলাম রিকশা ভ্রমণে, রিকশা চলছে ব্রহ্মপুত্র নদের বাঁধের উপর নির্মিত রাস্তা ধরে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ, ঝিরঝিরে বাতাস, রাত ১১টা বাজে, এমন সময় আমার মতো অভাগাকেই আরেকটা ছেলের সঙ্গে রিকশায় করে ঘুরতে হয়। আফসোস।
হঠাৎ দেখি বাঁধের উপর কে যেন বসা, কাছে গিয়ে দেখি আমাদের সেই তিনি, মানে ব্রহ্মপুত্র, ‘আরে আপনি কোথায় হাওয়া হয়ে গেছিলেন’? ‘উত্তরের দিকে গেছিলাম, ওখানে আমার সঙ্গে যমুনার বিচ্ছেদ হয়েছিল ১৭৮৭ সালে। এরপর এখান থেকে চলে গিয়েছিলাম, তারপর এই এলাম’। কামরুলকে একটা চিমটি কেটে ওনাকে আবার বললাম, ‘বস একটু খুলে বলুন তো আপনার কাহিনী, আলাদা আলাদা করে বললে বুঝতেছি না’। কামরুল কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, আমি ওকে থামিয়ে ওনাকে বললাম, ‘চলেন, হোটেলে যাই’। ‘তোমরা যাও আমি পরে আসছি’। 
রাত ১২টার দিকে রুমে ফিরলাম, সারাদিন তোলা ছবিগুলো ফেসবুকে আপ করে ঘুমাতে গেলাম। সকালে ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা করার আগেই ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি সেই একই ঘটনা, টিকিট নেই। মেজাজটাই খারাপ হয়ে  গেল। রাগ করে স্টেশন থেকে বের হয়ে আমি আর কামরুল ব্রহ্মপুত্র নদের কূলঘেঁষে শহরের রাস্তা ধরে হাঁটছি। দেওয়ানগঞ্জের মানুষদের বিষয়ে বলি; এরা খুবই সহজ সরল স্বাভাবিক প্রকৃতির। আমরা দু’জন অচেনা মানুষ রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর ছবি তুলছি, এই দৃশ্য দেখে যেকোন মেয়ে একটু সতর্ক হয়ে হাঁটবে, ছবি তুলছি কি-না খেয়াল করবে। অথচ এখানে যতগুলো মেয়ে আমাদের ক্রস করল, কেউ খেয়ালই করল না আমাদের, পাত্তাই দিল না। এমন একটা ভাব যেন এখানে কেউ নেই। বিষয়টা আমাদের মুগ্ধ করল। ব্রহ্মপুত্র এখন আর নদ নেই, বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত, বলা যেতে পারে ‘ব্রহ্মপুত্র ধান ক্ষেত’, এরকম একদিন স্বনামধন্য ‘পদ্মা ধান ক্ষেত’-‘মেঘনা ধান ক্ষেত’ও হবে এ দেশে। অনেক চেষ্টা তদবির করে দুটি টিকিট ম্যানেজ করে বিকালে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে।

তথ্যসূত্র : http://www.touristguide24.com